কাল একাদশ সংসদ নির্বাচনঃ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চুড়ান্ত যুদ্ধ

এক
আর একদিন বাদে নির্বাচন। দশবছরের স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্তি মিলবে কি না, সেই ফয়সালা হতে যাচ্ছে। যতই বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষে ভোট চাই, যতই স্বৈরাচার- রাজাকার- মৌলবাদ- অগণতান্ত্রিক শক্তি তথা আওয়ামীলীগ- বিএনপি- জামাত- জাতীয় পার্টিকে বর্জনের আহবান জানাই না কেন, এটাই আজকের বাস্তবতা যে- বাম গণতান্ত্রিক জোট নির্বাচনী রাজনীতিতে সামান্য প্রভাবও ফেলতে সক্ষম নয়; সেই হিসেবে আওয়ামী স্বৈরশাসন- অপশাসন- গুম-খুন-ধর্ষণ-অবাধ লুটপাটের মচ্ছব থেকে মুক্তির জন্যে জাতির সামনে বিএনপি-জামাত-কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। কি অদ্ভুত এক গ্যাড়াকলে পড়েছি আমরা; রাজাকারের-জামাতের হাত থেকে বাঁচতে নাকি শেখ হাসিনা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই, তেমনি গুম-খুন-হেফাজত-ব্যাংক,শেয়ার সবকিছু লুটপাট থেকে বাঁচতেও নাকি ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া বিকল্প নেই।

দুই
ফলে, এই দুই বিকল্পহীন উপায় নিয়াই সবার তুলনামূলক আলোচনা চলছে। বিএনপি জামাতকে ছাড়তে পারে নি? – আওয়ামীলীগ কম কিসে, সেও তো মান্নানকে নৌকায় নমিনেশন দিয়েছে! আওয়ামীলীগ গুম-খুনের রাজনীতি করছে, বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার খেলায় নেমেছে? – বিএনপিই বা কম কিসে, ২১ আগস্টের গ্রেণেড হামলার কথা ভুলে গেলেন! আওয়ামীলীগ শেয়ার ক্যালেংকারি, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার- ভয়ানক সব লুটপাটে যুক্ত? – বিএনপিই বা কম কিসে, হাওয়া ভবনের কথা ভুলে গেলেন! এইসব তুলনামূলক বাক-বিতন্ডাগুলো বেশ মজার; কেননা একটার চাইতে আরেকটার খারাপের তুলনা দিয়ে জায়েজিকরণ প্রচেষ্টা! পঁচা ডিমের (বা আমের) তত্ত্বও চোখে এলো- একটা পুরাই পঁচা ডিম আর একটা অনেকখানি পঁচা ডিমের মধ্যে কোনটা খাবেন- এমন মজাদার প্রশ্নও চোখে এসেছে, যেনবা – ভালো ডিম (/ আমের) কোন সন্ধান নাই বা ভালো ডিমের জন্যে অপেক্ষা না করে পঁচা/ আঁধ পঁচা ডিম খেতে বাধ্য!

 

তিন
তবে, মজার ব্যাপার হচ্ছে- একটা গুনগত পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। আগের নির্বাচনগুলোতে ধর্মীয় সুড়সুড়ি যেভাবে ব্যবহৃত হতো- সেটা অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকলে/ আবার আসলে ইসলাম নাই হয়ে যাবে- মসজিদ সব মন্দির হয়ে যাবে- এরকম প্রচারণা বিএনপি’র পক্ষে বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে- কেননা আওয়ামীলীগ কওমীর স্বীকৃতি, মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, হেফাজতের সাথে চুমাচুমি এসবে সবাইকে টেক্কা দিয়ে রেখেছে- এমনকি নির্বাচনী ইশতেহারে সবার আগে দেশের সমস্ত মসজিদের ইমাম- মোয়াজ্জিনের ভাতার ব্যবস্থার ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে। মসজিদে উলুধ্বনি তো দূরের কথা, বরং মহাজোটে ধরে এনে নাস্তিকদেরকে রীতিমত হাজি বানিয়ে ছেড়েছে। ফলে, এইসব প্রচারণায় সুবিধে করা এখন মুশকিল। উল্টোদিকে- বরাবর আওয়ামীলীগ যেভাবে বিএনপিকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত করতো, বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী তাণ্ডব টেনে এনে বিএনপি-জামাতকে চিহ্নিত করতো- সেটাও আসলে সেভাবে পারছে না- কেননা বিগত দশবছরের যাবতীয় উদাহরণ সামনে চলে আসছে- যেগুলোতে সরাসরি আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা যুক্ত। এমনকি ২০০১ এর ভিক্টিম পূর্ণিমাকেও আওয়ামীলীগ তার প্রচারকার্যে লাগাতে চেয়েছে- সেখানেও অনেকেই (এমনকি হিন্দুরা, আদিবাসীরাও) আওয়ামীলীগের আজকের স্বরূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন (তারা বিএনপিকে দায়মুক্তি দিচ্ছে না- কেবল জানাচ্ছে ২০০১ এর সংখ্যালঘু নির্যাতক- ধর্ষকরা আজকের আওয়ামীলীগে ভর করেছে)। এই যখন অবস্থা, বিএনপিকে কিছুটা প্রগতিশীল ভূমিকা নিতেও কখনো কখনো দেখা যাচ্ছে- অন্তত আপেক্ষিক (তুলনামূলক) অর্থে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের সরব দেখা যাচ্ছে; এই সরব হতে গিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারে মত বিএনপি’র একজন ২০০১ সময়কালের এমপি সংবাদ সম্মেলনে ঐ সময়কার নির্যাতন- নিপীড়নের ঘটনার জন্যে ক্ষমাও চেয়েছে

চার
মাঠ পর্যায়ে- মানে একদম আম পাবলিক পর্যায়ে কি অবস্থা? আমার রিডিং এ বলে- প্রকাশ্যে নৌকায় নৌকায় ছয়লাব করে দিলেও বস্তুত চারদিকে ধানের শীষের জোয়ার চলছে। নৌকার প্রচারণায় থাকা পরিচিতজনের কাছেও শুনেছি- তাদের মধ্যে থাকা অস্বস্তির কথা। ধানের শীষকে দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছে না, ফাঁকা মাঠে নৌকার প্রচারণা- এতে তাদের অনেকেই মন থেকে সায়ও দিতে পারছে না; পারিবারিক আলাপে সমালোচনাও করছে – এবং জানাচ্ছে আম পাবলিক মোটেও এটাকে ভালোভাবে নিচ্ছে না। এতো গেলো আওয়ামী সমর্থক সার্কেল, এমনকি নির্বাচনে নৌকার পক্ষে থাকা অনেক এক্টিভ কর্মীর অবস্থা! আর, সাধারণ মানুষের মাঝে যেমন ভয় কাজ করছে, তেমনি আছে প্রচণ্ড ঘৃণা। এবং, বলাই বাহুল্য ১২-১৭ বছর আগে কি হয়েছে, সেই সময়কার হাওয়া ভবন, গ্রেনেড হামলা- এগুলো ফেসবুক প্রজন্ম যত মনে রেখেছে- আম পাবলিক যেনবা ততই বিস্মৃত হয়েছে। ফলে, সামান্য সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও- আওয়ামীলীগের প্রায় সব আসনেই ভরাডুবি ঘটবে। এইটা অবশ্য আওয়ামীলীগ খুব ভালো করে জানে বলেই- তারা ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

পাঁচ
বিভিন্ন দলের – জোটের নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে বিস্তারিত আলাপের ইচ্ছে ছিল, সময়ে আলসেমিতে কুলিয়ে উঠতে পারিনি। নির্বাচনের আগে পরে হলেও কিছু লেখার তাগিদ বোধ করি- জানি না সম্ভব কি না। এখানে এক-দুই লাইনে আওয়ামীলীগ আর বিএনপি’র/ ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার নিয়া আমার জাজমেন্ট জানাচ্ছি। আওয়ামীলীগের ইশতেহারটা হয়েছে একেবারেই বস্তাপঁচা; বর্তমান কনটেক্সট গোনায় ধরলে- সেইটাকে উন্নয়নের নামে লুটপাট- পরিবেশ-প্রতিবেশ বিনাশ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারনামাও বলা যেতে পারে। সেই তুলনায় বিএনপি/ ঐক্যফ্রন্টের ছোট ছোট ইশতেহার দুটি কিছু কিছু ব্যাপারে ইতিবাচক। অন্তত আওয়ামী অপশাসনের বেশ কিছু ব্যাপারে খোলাখুলি ও শক্ত অবস্থান রয়েছে- যেমন গুম- বিচারবহির্ভূত খুন-রিম্যাণ্ডে নির্যাতন-লুটপাট ব্ন্ধ ও তদন্ত, ডিজিটাল আইন রদ, কুইক রেন্টাল বন্ধ, রামপাল পাওয়ার প্লান্ট পুনর্মূল্যায়ন- ইত্যাদি। এইসব দুষ্টক্ষতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াটা অবশ্যই ইতিবাচক ও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এইটুকু সাধুবাদ দেয়ার পরেও বলতে হচ্ছে যে, বিএনপি/ ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারেও এমন কিছু নেই যা আজকের এই জংলী শাসন ব্যবস্থা পালটিয়ে একটা স্থায়ী- টেকসই ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পত্তন ঘটাতে পারে! এবং সেই জায়গা থেকেই সন্দেহটা জাগে- একই রকম ব্যবস্থা কন্টিনিউ করতে গিয়ে আওয়ামীলীগকে যেমন বিএনপি হয়ে যেতে হয়, বিএনপিকেও আওয়ামীলীগ হয়ে যেতে হবে, অর্থাৎ আওয়ামীলীগের যাবতীয় অপশাসনকে নতুন মাত্রায় নতুনভাবে এগিয়েই নিয়ে যাবে হয়তো- সেই অর্থে এসমস্ত আশ্বাসের বড় অংশই হয়তো মানা হবে না, কেবল ততটুকুই মানা হবে- যেটায় আওয়ামীলীগের নেতাদের কোনঠাসা করে রাখা যাবে! এই সন্দেহ জারি রেখেও বলা যায়- বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার যদি হয় সম্ভাবনা- সন্দেহের দোলাচাল, আওয়ামীলীগ হচ্ছে সমস্ত সম্ভাবনার মৃত্যু। এতকিছুর পরেও বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট একটা কাঁচা কাজও করে রেখেছে। ঐক্যফ্রন্টের আর বিএনপি’র ইশতেহার আলাদা আলাদাভাবে প্রকাশ করেছে। দুটো আলাদা সংবাদ সম্মেলনে। এতে করে ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যকে যেমন কিছুটা দুর্বল হিসেবে হাজির করার প্রয়াশ পেয়েছে, তেমনি মিডিয়াকে দুই ইশতেহারের মাঝে মিল-অমিল নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ করে দিয়েছে। সেই গবেষণায় বের হয়ে এসেছে এক চুম্বক অমিল- যুদ্ধপরাধের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ব্যাপারে কমিটমেন্ট ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে থাকলেও বিএনপি’র ইশতেহারে নেই।

ছয়
বামদের ইশতেহার নিয়েও বস্তুত বেশ হতাশ। যদিও সবচেয়ে আশা ছিল তাদের কাছেই। ঐক্যফ্রন্ট- বিএনপির মত বাম গণতান্ত্রিক জোট- সিপিবি’র আলাদা আলাদা ইশতেহার দেয়া, পরে বাসদ সহ অন্যদেরও ইশতেহার প্রকাশ- বিভিন্ন দল নিজেদের ইশতেহার নিয়ে যাওয়া, বাম গণতান্ত্রিক জোটের ইশতেহার নিয়ে পাবলিকলি মুভ না করা; সবমিলে বাম গণতান্ত্রিক জোট ব্যাপারটাই আসলে কথার কথা হয়ে থাকলো। ঐক্যফ্রন্টের তবু একক মার্কা আছে- ধানের শীষ। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সেটাও নাই- তাদের মার্কা তিনটা, কাস্তে, কোদাল, আর মই; নিবন্ধন ছাড়া দলগুলো যারা কোদাল মার্কায় নির্বাচন করছে- তাদেরকে নিয়ে আবার অনলাইনে নিবন্ধন-ওয়ালা কোন কোন দলের কর্মী-সমর্থকেরা টিটকারিও করছে। এই হচ্ছে বামজোটের পরিস্থিতি। সেখানে একক মার্কায় নির্বাচন করার চিন্তাই অসম্ভব। গণসংহতি আন্দোলন আর বাসদ (মার্কসবাদী) এর নিবন্ধন না থাকায় তারা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কোদাল মার্কায় নির্বাচন করছে, নিবন্ধন থাকলে- বামদের মার্কা হয়ে যেত- ৫-৬ টি। ভাগ্যিস, নিবন্ধ ছিল না! আরো ভালো হতো যদি বাসদ (খা) ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিরও নিবন্ধন না থাকতো- তাহলে সকলে মিলে সিপিবি’র কাস্তে মার্কায় নির্বাচন করতে পারতো। যাহোক, যা বলছিলাম- বামদের ইশতেহারে কিছুটা হতাশ। কেননা সেই গতানুগতিক বক্তব্য, গতানুগতিক খতিয়ান এবং গতানুগতিক কর্মসূচি। নির্বাচনে অংশগ্রহণ যদি গণতন্ত্রের সংগ্রামকে জোরদার করার উদ্দেশ্যে হয়- তবে, দরকার ছিল- একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি- যেটা দেশ মেরামতের তথা আজকের এই সংকট পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষার অপরিহার্য দলিল হয়ে উঠবে। ইশতেহারে লেখা থাকবে আমরা জয়লাভ করে দেশশাসনের ভার হাতে পেলে এই এই করবো- কিন্তু যারাই পড়বে- পড়ার সাথে সাথেই মনে করবে- যেই ক্ষমতায় আসুক এমনটা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। বামদের ইশতেহারগুলো পড়ে আমার এমন মনে হয়নি। উলটো সক্ষম নারী পুরুষের বাধ্যতামূলক মিলিটারি ট্রেনিং এর কর্মসূচি কতখানি জরুরি ছিল, বিশেষ করে আজকের বাস্তবতায়- এই প্রশ্নটাই মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে বেশি। মিডিয়াও এই বিশিষ্ট, ব্যতিক্রমী কর্মসূচিকেই পিক করেছে, হেডলাইন করেছে- অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি- বক্তব্য তাতে আড়াল করাও সহজ হয়েছে। এইসব সমালোচনার পরেও তাদের হয়েই নির্বাচনের ভোটটি চাইবো, কাস্তে- কোদাল-মই মার্কায় দলে দলে ভোট পড়ুক এই আশাই করবো। কেননা, সত্যিকারের পরিবর্তন চাইলে তারা ছাড়া আর কোন বিকল্প নাই।

সাত
আওয়ামীলীগ আর বিএনপিকে একে অপরের বদলে একমাত্র বিকল্প হিসেবে দেখতে গিয়ে এই বাম-গণতান্ত্রিক শক্তিকে, সতিকারের দেশপ্রেমিক, মানবপ্রেমী, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ দরদী শক্তিকে দেখতে না পারাটা এই বাম দলগুলোর জন্যে যতখানি না দূর্ভাগ্যজনক, তার চাইতেও দেখতে না পারা পাবলিকের জন্যে এতটুকু কম দূর্ভাগ্যজনক না। অন্তত বিকল্প একটা অপশন হিসেবে হাতের সামনে থাকার পরেও- যারা ঘুরেফিরে আওয়ামীলীগ- বিএনপি – জামাত- জাতীয় পার্টি- ইসলামী শাসনতন্ত্র… দের ভোট দিয়ে যাচ্ছেন, তারা কি এইসব গণবিরোধী- গণতন্ত্রবিরোধী- স্বৈরতান্ত্রিক- সাম্প্রদায়িক- খুনী- ধর্ষক- লুটপাটকারী সরকারগুলোর যাবতীয় অপরাধের ভাগীদার হচ্ছেন না? হ্যাঁ, স্বীকার করছি- বাম গণতান্ত্রিক জোট ব্যর্থ – তারা কাউন্টেবল শক্তি হিসেবে আপনাদের সামনে বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই- তাদের ব্যাপারে আপনাদের আস্থা নাই বলেই- আপনারা তাদের ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করতে চান না; কিন্তু আওয়ামীলীগ-বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কেমন কি কতটুকু অপশাসন শুরু করবে- সে ব্যাপারে কি বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে? জেনেশুনেই সেই অপরাধের ভাগীদার কি হচ্ছেন না?

 

পরিশিষ্টঃ

আওয়ামী পাণ্ডারা গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান নেতা ও ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী জোনায়েদ সাকির ফেসবুক আইডি হ্যাক করে সেখান থেকে নানারকম পোস্ট দিচ্ছে। কখনো প্রধানমন্ত্রীকে উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখার জন্যে ধন্যবাদ দিচ্ছে, কখনো বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের নামে নিজ দলীয় লোককে মারধর করা টাইপের ফেইক নিউজ শেয়ার করছে, কখনো বা তারেক জিয়া – মির্জা ফখরুলের দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফখরুলের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করা পোস্ট দিচ্ছে।

আজকে একটা পোস্ট শেয়ার দিয়েছে- নির্বাচনের দিনে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট কি কি গুজব ছড়াবে- সে বিষয়ে [গুজবের এই ভিডিওটা শুধু জোনায়েদ সাকির হ্যাকড আইডি থেকেই না, খোদ শেখ হাসিনা ওয়াজেদের পেজ থেকেও শেয়ার করা হয়েছে]। সেই পোস্টে লেখা হয়েছেঃ “এত গোপনীয়তার মাঝেও এসব পরিকল্পনাগুলো ফাঁস হয় কিভাবে? আরো সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের”। এইরকম স্যাবোটাজমূলক কাজ ঘৃণাভরে ওভারলুক করতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু স্ক্রল করে নামার আগেই দুই একটা পয়েন্ট চোখে পড়লো; ফলে আগ্রহ নিয়েই দশটা পয়েন্টই পড়ে ফেললাম। এই কল্পিত গুজবনামার সাথে কেন জানি আজ প্রধানমন্ত্রীর আশংকার যোগ খুঁজে পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী আজ বলেছেনঃ “যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি নির্বাচন বয়কটের ঘোষণাও দেয়, তবুও আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না। আমি সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছি, বিএনপি-জামায়াতের একটি চরিত্রই রয়েছে। নির্বাচনের মাঝপথেই তারা ঘোষণা দিতে পারে, নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার এবং নির্বাচন বয়কট করার। … বিএনপি নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়ে হয়তো বলে বসবে, আমরা সংসদ নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না”। সারাদেশে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের উপর ধর পাকড়, হামলা, পোস্টার ছিড়ে ফেলা, মাইক ভাড়া না দেয়া, পোস্টার ছাপাতে বাঁধা দেয়া সহ- সমস্ত রকমভাবেই বিএনপি নেতাকর্মীকে নির্বাচনী ময়দানে দাঁড়াতে না দেয়ার পরেও বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট দাঁতে দাঁত চেপে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ানোয় শেখ হাসিনা তথা আওয়ামীলীগ একটু হতাশ। কিন্তু, এত কিছু এতদিন সহ্য করেও বিএনপি নির্বাচনের দিনে নির্বাচন বয়কট করতে যাবে কেন, কোন পরিস্থিতিতে? প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামীলীগ শুরু থেকেই চেয়েছে- বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট যাতে নির্বাচন থেকে সরে যায়, সেটা শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত চাইবে। তারই আগাম আশংকা শেখ হাসিনা জানালো। কোন পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করতে যাবে- সেগুলো জোনায়েদ সাকির হ্যাকড আইডি থেকে শেয়ার করা ঐ পোস্টে ১০টি পয়েন্টে “গুজব” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত- এই পয়েন্টগুলো আমার কাছে মনে হচ্ছে- আগামিকাল নির্বাচনকালিন আওয়ামীলীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড হতে যাচ্ছেঃ

 

# দেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপি-জামাতে পোলিং এজেন্টকে গুম করে ফেলা,
# সাংবাদিকদের মারধর করা, ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে ফেলা
# বিদেশী (ও দেশী) পর্যবেক্ষকদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া
# বিএনপি’র নারী পোলিং এজেন্টকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ
# ধানের শীষের ভোট দেয়ার অপরাধে নারীকে ধর্ষণ
# ভোট জালিয়াতির ভিডিও করায় সাংবাদিককে গুম
# প্রচুর জাল ভোট পড়ায় প্রকৃত ভোটারদের ভোট দেয়ার আগেই ব্যালট পেপার শেষ
# সেনাবাহিনীর নকল পোশাক পরে লীগ কর্তৃক ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটারদের উপর অত্যাচার
# জাল ভোট দিতে না দেয়ায় আওয়ামীলীগ কর্মী কর্তৃক প্রিজাইডিং অফিসারকে তুলে নিয়ে যাওয়া

 

বিএনপি কি গুজব ছড়াতে যাচ্ছে- সেটা আগে আওয়ামীলীগ প্রেডিক্ট করতে পারছে কেননা আওয়ামীলীগ এই কাজগুলোই আদতে আগামিকাল করতে যাচ্ছে। এসব করতে যাচ্ছে বিধায়- আগে থেকেই বিএনপি এরকম অভিযোগ করে নির্বাচন বয়কট করতে পারে বিবেচনা করে- এসবকে গুজব হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করছে। যদিও বেশ কাঁচা কাজ, সকলেই বুঝতে পারে এবং চারদিকে হাজার প্রমান থাকলে “গুজব” বলে এইসব অপকর্মকে আড়াল করাও অত সহজ হবে না …

আগামিকালের এই ভোটযুদ্ধে তাই সবাইকে সচেতন থাকার আহবান জানাই।

* অতি অবশ্যই আপনার ভোটটি দিতে ভোটকেন্দ্রে আসুন।
* সকাল সকাল আপনার ভোটটি দিন।
* ভোটটি দেয়ার পরেও যথাসম্ভব বেশি সময় ভোটকেন্দ্রের আশেপাশেই অবস্থান করুন। ভোটকেন্দ্র পাহাড়া দেয়ার দায়িত্ব নিজ কাধে তুলে নিন।


* যাদের ব্যক্তিগত ক্যামেরা আছে- সাথে নিতে ভুলবেন না। ক্যামেরা না থাকলে- হাতের মোবাইলটি নিয়েই প্রস্তুত থাকুন।
* যেকোন রকম অনিয়ম, জালিয়াতি, হামলা- হয়রানি ভিডিও করার চেষ্টা করুন।
* এসব যাতে দ্রুত প্রকাশ না পায়, ছড়াতে না পারে- সেজন্যে সরকার থ্রিজি- ফোরজি লাইন বন্ধ করে দিয়েছে। যাদের ব্রডব্যান্ড লাইন আছে- সেখান থেকে এগুলো ফেসবুকে- ইউটিউবে আপলোড করুন।
* ভোটের অধিকার রক্ষায় তথা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে প্রত্যেকেই ভোটার কাম- নির্বাচনী পর্যবেক্ষক- কাম নির্বাচনের রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন।

মনে রাখবেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের যাবতীয় ঘৃণ্য নীলনকশা একমাত্র জনগণের মিলিত শক্তিতেই প্রতিহত করা সম্ভব!

[পোস্টে উল্লেখিত লোগোর ছবি ও কার্টুনগুলি সবই ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত। কার্টুনিস্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 3 =