মুক্তিযুদ্ধ, ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:- চতুর্থ পর্ব

স্বাধীন পাকিস্তানের স্বপ্ন যখন মানুষের মধ্যে দানা বেঁধেছিল তখন মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল স্বাধীন পাকিস্তান গঠিত হলেই আমাদের সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব, আমরা প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে পারব! এই বিশ্বাস হেতু 1940 সালের 23 শে মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে শেরে বাঙ্গাল এ কে ফজলুল হক পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেইসঙ্গে এটা নিশ্চিত হয় ভারত আর এক দেশ থাকবে না বরং তা দ্বি-খন্ডিত হওয়ায় ভবিতব্য! 1943 সালে শুরু হয় ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর'(১৩৫০ বঙ্গাব্দ) এই মন্বন্তরে প্রায় তিরিশ লক্ষের অধিক মানুষের মৃত্যু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার ফলে ব্রিটিশরা খাদ্য সামগ্রী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করে এর ফলে দেশে তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় কিন্তু তাতে কারোর বিশেষ ভ্রুক্ষেপ ছিল না। সকলে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ব্যস্ত থাকে। 1946 সালের 16 ই আগস্ট মুসলিম লীগের ‘লাড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ এই ধ্বনিতে কলকাতায় গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং শুরু হয়। এই সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন (তৎকালীন প্রান্তের প্রধানকে প্রধানমন্ত্রী বলা হত, সেই অর্থে আজকের মুখ্যমন্ত্রীর সমতুল্য)। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে এই দাঙ্গাটি হিন্দুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত করেন। এই অভিযোগ অনেকাংশেই সত্য প্রমাণিত হয়। 18 ই আগস্ট পর্যন্ত চলা এই নারকীয় হত্যাকান্ডে প্রায় পাঁচ থেকে দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল ভবিষ্যৎ কিন্তু এই নেতা আবার মহাত্মা গান্ধীর সহযোগিতায় হিন্দু মুসলমান ঐক্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। চাঞ্চল্যকর তথ্য হল পাকিস্তান গঠিত হলেও তিনি পাকিস্তানে যান নি বরং কলকাতায় থেকে যান। 1949 সালে তৎকালীন ভারত সরকার তার উপর ক্রমবর্ধমান করের বোঝা চাপালে তিনি ভারত ত্যাগ করে পাকিস্তান চলে যেতে বাধ্য হন। মুসলিম লীগের অন্যতম ছাত্র নেতা ও সোহরাওয়ার্দীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী শেখ মুজিবুর রহমানকে অনেকেই এই দাঙ্গায় সোহরাওয়ার্দীর সহযোগি হিসাবে মনে করেন। যদিও এর বিরুদ্ধ মত ও আছে তাদের মতে ছাত্রনেতা মুজিবুর রহমান তখন এতটা গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন না। তবে যাইহোক এই দাঙ্গায় মুজিবের কতটা অংশগ্রহণ ছিল তা তর্কসাপেক্ষ বিষয় তবুও সোহরাওয়ার্দির অনুগামী হিসাবে কাজ করার জন্য তার ভাবমূর্তি অনেকাংশে কালিমালিপ্ত হয়েছে এবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই! তবে এটা ঐতিহাসিক সত্য এই পর্বে মুজিবুর রহমান পাকিস্তান প্রস্তাবের কট্টর সমর্থক ছিলেন এবং জীবন পন করে পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করেছিলেন।

এরপরে দাঙ্গা নোয়াখালী, বিহার, বোম্বাই সমেত পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতীয় কংগ্রেস দেশভাগের প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়। শেষের দিকে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসু জিন্নার অঙ্গুলিহেলনে 1947 সালের 27 শে এপ্রিল অখণ্ড স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা পেশ করেন। বলাই বাহুল্য এই প্রস্তাব কংগ্রেস গ্রহণ না করার ফলে অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। শেষে 1947 সালের 15 আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস 14 ই আগস্ট উৎযাপন করা হয়, অন্যদিকে ভারতে 15 ই স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়। একরাশ স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তানের জন্ম হয়। নবগঠিত পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল ছিলেন কায়ইদে আজম মহম্মদ আলি জিন্না, পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন লিয়াকত আলি খান এবং প্রথম রাষ্ট্রপতি হন ইস্কান্দর মির্জা। পাকিস্তান পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। পূর্ববঙ্গের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলের মানুষদের স্বাধীনতার স্বপ্ন খুব দ্রুতই কঠোর বাস্তবের সম্মুখীন হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষরা পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণকে হীন দৃষ্টিতে দেখত তাদের ধর্ম, বর্ণ ভাষাকে নিম্ন শ্রেণীর মনে করত। নতুন দেশে উর্দুর প্রভাব দেখা যায়। তাই বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব বঙ্গের মানুষরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করতে শুরু করে। এর বিরুদ্ধে প্রথম তীব্র প্রতিবাদ করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। 1948 সালের 23 শে ফেব্রুয়ারি তিনি পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের পক্ষে প্রস্তাব পেশ করেন। এই প্রস্তাবের সোচ্চার সমর্থন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তথা দেশের তামাম বুদ্ধিজীবী মহল। ভাষার ভিত্তিতে চাপিয়ে দেওয়ার নীতি ক্রমশ প্ররলক্ষিত হচ্ছিল। এটি রোধ করার উদ্দেশ্যে 1948 সালের 15 ই মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে ‘রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের’ একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয় এতে উল্লেখ করা হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে।

নোয়াখালী দাঙ্গা

ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান ভাগ আসলে যথার্থ ছিল না এবং বাংলা যে আসলে একটি উপনিবেশে পরিণত হচ্ছে তা স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র এক বছরের মধ্যেই প্রস্ফুটিত হয়। 1948, 21 শে মার্চ মহম্মদ আলি জিন্না ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দম্ভভারে ঘোষণা করেন উর্দুই একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে। 1948, 24 শে মার্চ জিন্না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে পুনরায় ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। স্বভাবতই এর বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গর্জে উঠেছিল। অনেকে মনে করেন বুদ্ধিজীবীরা কেন হঠাৎ এত ক্ষুব্ধ হয়েছিল? আসলে বিষয়টি তা নয় বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র সমাজ একদিনে ক্ষুব্ধ হয়নি বারংবার প্রতারণার ফলে ছাত্র সমাজ ক্ষুব্ধ হয়েছিল। 15 ই মার্চ খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে চুক্তিতে এটা স্থির হয় বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে অথচ এরপর জিন্নার ঘোষণা করে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা অর্থাৎ এই চুক্তিকে জিন্না কার্যত অস্বীকার করেন, স্বভাবতই ছাত্র সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে!

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হল 1949 সালের 23 শে জুন ওইদিন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বলাই বাহুল্য বাংলাদেশের গঠনে এই দলের অবদান অনস্বীকার্য। দল গঠনের সময় শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে 1955 খ্রিস্টাব্দে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামটি পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানের ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণটি করা হয়। 23 শে জুন দিনটি এই কারণেই ঐতিহাসিক 1757 সালের 23 শে জুন এই দিনেই পলাশীর প্রান্তরে বাংলার মুক্তসূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়ে যায়! পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা দিনে দিনে ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল 1950 সালে পাকিস্তানে জমিদারি প্রথা রদ হয়। অর্থিক ও জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান এগিয়ে থাকলেও তারা বিশেষ কিছু সুযোগ সুবিধা পাইনি। সমস্ত অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা, সরকারি চাকুরি ও সেনাবাহিনী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হস্তগত। বলাই বাহুল্য পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুঠ করে পশ্চিম পাকিস্তান সমৃদ্ধ হচ্ছিল অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান দিন দিন আরও নিঃস্ব হচ্ছিল! তাই এটাই বলা যথার্থ পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে নিজের উপনিবেশের অধিক কিছু মনে করত না!

পাকিস্তানের প্রতারণার এখানেই শেষ নয় 1952 সালের 26 শে জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বলাই বাহুল্য এই প্রস্তাবে দেশের তামাম ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ তীব্র প্রতিবাদ শুরু করে। অথচ 1948 সালের 15 ই মার্চ এক চুক্তিতে এই নাজিমুদ্দিনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে। নাজিমুদ্দিনের এই ঘোষণাই মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট রচনা করে। এই ঘোষণার বিরুদ্ধে 1952 সালের 30 শে জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দলমত নির্বিশেষে সকলে উর্দুর বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করা। আসলে বাংলাকে অস্বীকার করা মানে পুরো বাঙালি জাতিকে অস্বীকার করা। এরপরই আসে সেই ঐতিহাসিক দিন 1952 সালের 21 শে ফেব্রুয়ারি, এই দিন বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র সমাজ তীব্র আন্দোলন শুরু করে। পুলিশের গুলিতে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার প্রমুখ ছাত্রের মৃত্যু হয় শুরু হয় মহান ভাষা আন্দোলন। এই মৃত্যুকে মনে করে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি আমাদের চিরদিন উদ্বুদ্ধ করে। এই মহান ভাষা আন্দোলনই বাংলাদেশ গড়ে ওঠার মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এই দিনটিকে মনে রেখে জাতিসংঘ 1999 সালের 17 ই নভেম্বর, ইউনেস্কো,21 শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে!

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বছর হল 1953 সাল। ওই বছর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর আওয়ামী মুসলিম লীগ, শেরে বাংলা ফজলুর হকের কৃষক প্রজা পার্টি, আওয়ামী লীগের নেতা সোহরাওয়ার্দী মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। যদিও যুক্তফ্রন্টে নিজাম ই ইসলাম, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল, পাকিস্তান খিলাখত দল প্রভৃতি বেশ কিছু ছোট দল যুক্ত ছিল। 1954 সালের মার্চে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট জয়যুক্ত হয়। 30 শে মে কেন্দ্রীয় সরকার কতৃক এই নির্বাচন বাতিল করা হয় সেই সঙ্গে গণ পরিষদ ও বাতিল করা হয়। বলাই বাহুল্য এটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। আসলে বাঙালিরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে এটা পশ্চিমের লোকেরা কোন মতেই চাইনি।

পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে আবু হোসেন সরকার 1955 সালের 9 জুন থেকে 1956 সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিল একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দান ও সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তি স্থাপন এবং বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা। হঠাৎ খাদ্য দ্রব্যের অভাব ও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের হয়। তাই আবু হোসেন 1956, 30 শে আগস্ট মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। 1956 সালের মার্চ মাসে বহু টালবাহানের শেষে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। সংবিধানে ‘পাকিস্তানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ আখ্যায়িত করা হয়, আওয়ামী লীগ এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে। উল্লেখ্য এই সংবিধানে মহান ভাষা আন্দোলনের ফলস্বরূপ বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। 1956, 12 ই সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে রিপাবলিকান কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। 1958 সালের 7 ই অক্টোবর ইস্কান্দর মির্জা এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। তবে তাঁর এই সুসময় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি মাত্র কুড়ি দিন পর 1958, 27 শে অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে। আইয়ুব খান গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাধা দেন তিনি সামরিক শাসন চালিয়ে যেতে সচেষ্ট হন। সেই উদ্দেশ্যে আবু হোসেন ও অন্যান্য নেতৃত্বের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্যতা সম্পর্কিত আদেশ ‘এবডো’ (Elective Bodies Disqualification Order) ঘোষণা করেন। এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারকল্পে 1962 সালে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) গঠন করা হয়। বলাই বাহুল্য আইযুব খান এই প্রচেষ্টাকে ভালো ভাবে নেই নি। 1962 সালে সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হয়। 1965 সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এই নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী লীগের নেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সম্মিলিত বিরোধী দল বা ‘কপ’ গঠিত হয়, এখানে উল্লেখ্য সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মতপার্থক্য হেতু ভাসানী 1957 সালে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ বা ন্যাপ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এরা মহম্মদ আলি জিন্নার বোন ফতেমা জিন্নাহকে প্রধানমুখ করে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। কিন্তু ফতেমা জিন্নাকে পরাজিত করে আইযুব খান রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। আইয়ুবের সময় 1965 এর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ সংগঠিত হয়। বলা হয় এই সময় দেশে প্রভৃত উন্নয়ন সাধিত হয় কিন্তু কতটা উন্নয়ন হয় তা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক আছে।

শেখ মুজিবুর রহমান 1966 সালের 25 শে জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সভাপতি হন (1966, 25 শে জানুয়ারি- 1974, 18 জানুয়ারি)। সেইসঙ্গে আধুনিক বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই বেগবান হয়। 1966 সালের 5 ও 6 ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ‘ছয় দফা দাবি’ পেশ করেন এর উদ্দেশ্য ছিল স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের (পাকিস্তান প্রস্তাব) সঙ্গে মিল রেখে এটি 1966, 23 শে মার্চ উত্থাপন করা হয়। আশা করা হয়েছিল এই প্রস্তাব পাশ হলে পূর্ব পাকিস্তান স্বায়ত্তশাসন লাভ করবে।

1966 সালের এই ছয় দফা দাবি সমূহ গুলি হল:-

প্রস্তাব – 1 : শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি:-

দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমনি হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারী ধরনের। আইন পরিষদের (Legislatures) ক্ষমতা হবে সার্বভৌম। এবং এই পরিষদও নির্বাচিত হবে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারনের সরাসরি ভোটে।

প্রস্তাব – 2 : কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা:-

কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবল মাত্র দু’টি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে- যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।

প্রস্তাব – 3 : মুদ্রা বা অর্থ-সমন্ধীয় ক্ষমতা:-

মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দু’টির যে কোন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারেঃ-

(ক) সমগ্র দেশের জন্যে দু’টি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে।

অথবা

(খ)বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্যে কেবল মাত্র একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসূ ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভেরও পত্তন করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক বা অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।

প্রস্তাব – 4 : রাজস্ব, কর, বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা:-

ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্যগুলির কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গ-রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলির সবরকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।

প্রস্তাব – 5 : বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা:-

(ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।

(খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলির এখতিয়ারাধীন থাকবে।

(গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোন হারে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিই মিটাবে।

(ঘ) অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা করজাতীয় কোন রকম বাধা-নিষেধ থাকবে না।

(ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বানিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং স্ব-স্বার্থে বানিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।

প্রস্তাব – 6 : আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা:-

আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।

প্রাসঙ্গিক ভবে বলা যায় এই ‘ছয় দফা দাবি’ বাঙলি জাতির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে বেগবান করে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই আন্দোলন এত গুরুত্বপূর্ণ যে একে ‘ম্যাগনা কার্টা বা বাঙালির মুক্তি সনদ’ বলা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে আর একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মমলা হল ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। পাকিস্তান সরকার 1968 সালের প্রথম দিকে শেখ মুজিব সমেত আরও 35 জনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনেন তাঁরা ভারতের সঙ্গে মিলে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই মামলাটির নাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং মামলা’। যদিও এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে বেশি পরিচিত। এখানে উল্লেখ্য 2011 সালে এই মামলার অন্যতম মূল আসামী ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী এই ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করেন।

এই মামলাটির পরিপ্রেক্ষিতে মুজিব সহ তার সমস্ত সঙ্গিদের পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করে। এই গ্রেফতারের বিরাট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। 1969 সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তদের মুক্তির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটে। এই অভ্যুত্থানে ছাত্র, যুব, নারী, পুরুষ, শিক্ষক, ডাক্তার, উকিল, কৃষক, শ্রমিক নির্বিশেষে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। 1969, 5 ই জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। 20 ই জানুয়ারি আইযুবের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম ছাত্র নেতা আসাদুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয় তিনি ‘শহীদ আসাদ’ নামে অধিক পরিচিত হন। 1969 সালের 15 ই ফেব্রুয়ারি ছাত্র নেতা সিরাজুল আলম খান ও কাজী আরিফ আহমেদ ‘বাহিনী’ নামে এক সংগঠন গড়ে তোলেন এরা ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস গোষ্ঠীর’ সদস্য ছিলেন।

1969, 15 ই ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক বন্দি অবস্থায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গুলিতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যু সংবাদে পরিস্থিতি এমন উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠে যে, বিকেলে মওলানা ভাসানী লক্ষাধিক লোকের জনসভায় বলেন দু মাসের মধ্যে ১১ দফার বাস্তবায়ন এবং সকল রাজবন্দির মুক্তি দেওয়া না হলে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি আরও বলেন যে, প্রয়োজন হলে ফরাসি বিপ্লবের মতো জেলখানা ভেঙ্গে শেখ মুজিবকে ছিনিয়ে আনা হবে। সভাশেষে জনতা মন্ত্রীদের গৃহে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা নিহত হলে ক্রুদ্ধ ও ভাবাবেগে আপ্লুত হাজার হাজার ছাত্র জনতা সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। এই ঘটনা গুলির ফলশ্রুতি হিসেবে 1969 সালের 22 শে ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং মুজিব সহ সমস্ত বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়। আইয়ুব শাহির স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবুর রহমান আন্দোলন সংগঠিত করেন অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর আন্দোলন সংগঠিত করেন। এই তীব্র প্রতিবাদের ফলে শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খান 1969, 25 শে মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসেই সমস্ত সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি 1970 সালে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা করেন।

1970 সালের 12 ই নভেম্বর বাংলাদেশে এক ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পূর্ব পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এই জাতীয় বিপদ থেকে রক্ষাকল্পে পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার সেভাবে অগ্রসর হয় নি যায় ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। 1970 সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সংগঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বিস্ময়কর ফল সামনে আসে। পূর্ব পাকিস্তানের 162 টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ 160 টি তে জয়যুক্ত হয়। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের 138 টি আসনের মধ্যে 81 টি আসনে ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি জয়লাভ করে। পাকিস্তানের সংসদের মোট 300 টি আসনের মধ্যে 160 টি আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। তাই স্বাভাবতই আওয়ামী লীগের শাসন ক্ষমতা লাভ ন্যায়সঙ্গত ছিল কিন্তু ভুট্টো তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। তাই ভুট্টোর পরামর্শে ইয়াহিয়া খান অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে।

তবে এই পর্বে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ্য।
1971 সালের 1 মার্চ রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান ও মুজিবের আলোচনা ব্যার্থ হয় এবং ইয়াহিয়া খান পার্লামেন্ট বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। বলাই বাহুল্য এটি বাঙালি জাতির প্রতি তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ, স্বভাবতই এর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র প্রতিক্রিয়া সংগঠিত হয়। জনসাধারণ বুঝতে পারে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকলে তাদের মর্যাদা রক্ষিত হবে না। 1971, 2 মার্চ আ স ম আব্দুল রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। উল্লেখ্য বাংলাদেশ তখনও পাকিস্তানের অধীনে ছিল তাই এটি দেশদ্রোহীতার নামান্তর। এথেকে বোঝা যায় জনসাধারণ স্বাধীনতার জন্য কতটা উদগ্রীব ছিল এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি ছিল। ওই দিন বাংলাদেশের এই প্রথম পতাকার নকশা তৈরী করেন ‘শিব নারায়ণ দাস’ নামে এক ছাত্র। এই পতাকায় বাংলাদেশের মানচিত্র অঙ্কন করা হয়েছিল পরবর্তীকালে নিজেদের সুবিধার্থে কামাল হাসানের নকশাকৃত নতুন পতাকা জাতীয় পতাকা হিসাবে গ্রহণ করা হয়, এটিই বর্তমানের বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা রূপে ব্যবহৃত হয়। ছাত্রদের এই গোষ্ঠীগুলি মূলত বাম মনোভাবাপন্ন ছাত্র সংগঠন ছিল। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাম ছাত্র সংগঠনের অসীম ভূমিকা ছিল। এই ছাত্র গোষ্ঠীকে ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস গোষ্ঠী’ বলা হত।

1971 সালের 3 রা মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানে প্রথম স্বাধীনতার ইস্তাহার প্রকাশ করা হয়। এই ইস্তাহারটি প্রথম পাঠ করেন ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ। ওই দিন মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক ঘোষণা করা হয়। মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেন- তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রদের নিউক্লিয়াস গ্রুপ চাইছিল মুজিব ওইদিনই স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা করুক কিন্তু মুজিব এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন আগামী 7 ই মার্চ আমি আমার কর্মসূচি ঘোষণা করব। আসলে মুজিব তখনও মনে করছিলেন আলোচনার মাধ্যমে কোন সমাধান সূত্র বের হয় কি না? তিনি দ্বিধান্বিত ছিলেন অনেকেই মুজিবকে এই অর্থে সমালোচনা করে বলেন মুজিব যদি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারত তাহলে হয়ত পাকিস্তান ভাগ হত না। কারণ এটা সত্য মুজিব মনে প্রাণে পাকিস্তান চেয়েছিল এবং সেই আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শুধু মুজিবই বলি কেন বরং বলা ভাল পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ জনগণই মনেপ্রাণে পাকিস্তান চেয়েছিল যাইহোক এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠে 1971 সালের 7 মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক বক্তব্য দেন- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম! জয় বাংলা!”। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের জনসাধারণকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন।

1971 সালের 16-23 মার্চ ইয়াহিয়া- মুজিব আলোচনা ব্যার্থ হয়। 1971, 23 শে মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস কিন্তু ওই দিন পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ সর্বত্র পাকিস্তানের বদলে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। বলাই বাহুল্য এটা পশ্চিমের প্রতি স্পষ্ট বার্তা ছিল আর আমরা তোমাদের অধীনে থাকতে চাই না, আমরা মুক্তি চাই, আমরা স্বাধীনতা চাই। 1971 সালের 25 শে মার্চ শেখ মুজিবকে পাকিস্তানি সেনা গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগে তিনি তার স্বাক্ষর করা এক ঘোষণা টেলিগ্রাম মারফত চট্টগ্রামের কয়েকজন ছাত্রের কাছে প্রেরণ করেন। এই ঘোষণাটির বাংলা অনুবাদ করেন ডঃ মঞ্জুলা আনোয়ার। কি ছিল এই ঘোষণাপত্রে? এই ঘোষণাপত্রটি ছিল সেই বহু কাঙ্খিত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র’। 25 শে মার্চ ওই রাতেই পাক বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। এই দিন রাত্রে অর্থাৎ 26 শে মার্চ এই ঘোষণা পত্রটি প্রথম জাতির উদ্দেশ্যে পাঠ করেন আওয়ামী লীগের ছাত্র নেতা এম এ হান্নান। পরবর্তীতে 27 শে মার্চ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি চট্টগ্রামের বাংলাদেশ রেডিওর কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বার বার পাঠ করে শোনান। তবে জিয়া প্রথম থেকেই ক্ষমতা লোভী ছিল তার প্রমাণ ওই দিনই পাওয়া যায়। জাতির উদ্দেশ্যে তিনি প্রথম যে ঘোষণাটি পাঠ করেন তা হল- “I, Major Ziaur Rahman, Provincial head of the government, do here by declare that Independence of the people’s republic of Bangladesh”. তার কিছুক্ষণ পরে সন্ধ্যা 7:45 মিনিটে জাতির উদ্দেশ্যে তিনি দ্বিতীয় ভাষণে বলেন- “I, Major Ziaur Rahman, do here by declare the independence of Bangladesh in name of our great leader Seikh Mujibur Rahman”. পরে অবশ্য স্বাধীনতার এই ঘোষণাটি বেতার মারফত জিয়াউর রহমান বহু বার সম্প্রচারিত করেছিলেন। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর বোমায় ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীকালে 25 শে মে কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড থেকে এই বেতার কেন্দ্রটি চালু হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরও বেশ কিছুকাল এখান থেকেই সম্প্রচারণ করা হত। দুই বাংলার গুণী মানুষরা এখান থেকেই সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতায় উজ্জীবিত করত!

বালুচিস্তানের কসাই টিক্কা খানকে অপারেশন সার্চলাইট কার্যকর করার প্রাথমিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই টিক্কা খান নৃশংসতার সীমা পরিসীমা ছাড়িয়ে যায়। তার নির্দেশে 25 শে মার্চ কালরাত্রিতে পাক বাহিনী স্বাধীনতার সংগ্রামের অতুড় ঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। পাক বাহিনীকে প্রথম প্রতিরোধের চেষ্টা করেন- রাজার বাগ পুলিশ লাইন। বলাই বাহুল্য মান্ধাতার আমলের বন্দুকের সাহায্যে আধুনিক রাইফেল যুক্ত পাক বাহিনীকে রোখা সম্ভব ছিল না। তাই এই বীর পুলিশ বাহিনী নিজেদের জীবন আহুতি দিয়ে প্রথম মুক্তি সংগ্রামের প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তবে অনেকের মতে EPR বা East Pakistan Rifles বা পরে Bangladesh Raifles এর জাওয়ানরা প্রথম এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। যাইহোক এই ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস খুব শীঘ্রই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগদান করে।ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিংক এর মত কিছু সাহসী মানুষের তোলা ছবি না থাকলে বিশ্ববাসীকে বোঝানো সম্ভব হতো না পাকিস্তান কি পরিমাণ গণহত্যা চালিয়ে ছিল। 1971 সালের 3 রা এপ্রিল ‘মুক্তিফৌজ’ গঠন করা হয় যা পরবর্তীতে ‘মুক্তিবাহিনী’ নামে পরিবর্তিত হয়। 1971, 10 ই এপ্রিল কলকাতায় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। 1971 সালের 17 ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার এসে পৌঁছায়। সেখানে পাক বিমান বাহিনীর হানার ভয়ে এক আম বাগানের সংক্ষিত অনুষ্ঠান হয়। আম বাগান কেন? কারণ পলাশীর প্রান্তরে এক আমবাগানে বাংলার মুক্তিসূর্য চিরতরে অস্তমিত হয় তাই স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিসূর্য উদয়ের প্রচেষ্টা এই আম বাগান থেকেই পরিলক্ষিত হয়। ওই দিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলি। এই ঘোষণাটি পরে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত করা হয়। এই সরকারকে ‘মুজিবনগর সরকার’ বলা হত এবং এই দিনকে ‘মুজিবনগর দিবস’ বলা হয়। আর একটি উল্লেখযোগ্য দিন ছিল 1971, 18 ই এপ্রিল কারণ ওইদিন কলকাতায় বিদেশি মিশনে প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

মুজিবনগর সরকার

এই মুজিবনগর সরকার পরিচালিত হত কলকাতার 8 নং থিয়েটার রোড থেকে। বাংলাদেশের এই অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি হন- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদিও তিনি তখন পাকিস্তানের জেলে বন্দি। প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন- তাজউদ্দিন আহমেদ। বলাই বাহুল্য মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্ব দেন। এক যুদ্ধ বিধ্বস্ত জাতিকে অনুপ্রেরণা বলে এক নতুন রাষ্ট্র অর্জনের উপযোগী লড়াইয়ে বলীয়ান করে তোলেন। শেষ অবধি তার অসাধারণ নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে এই কারণে তাজউদ্দিন আহমেদকে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি’ বলা হয়। এই সরকারের উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন- সৈয়দ নুরুল ইসলাম তিনি রাষ্ট্রপতির অবর্তমানে কার্যনির্বাহী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ চালিয়ে যান। স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী ছিলেন- এ এইচ এম কামরুজ্জামান। অর্থমন্ত্রী ছিলেন- এম মনসুর আলী। পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন- খন্দকার মোশতাক আহমেদ। এবং সেনাবাহিনীর প্রধান হন- জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানি। সমস্ত বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল ওসমানী। তিনি 3 টি ব্রিগেডকে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

যুদ্ধের সুবিধার জন্য বাংলাদেশকে 11 টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। চট্টগ্রাম ছিল 1 নম্বর সেক্টরের অধীনে সেখানের কম্যান্ডার ছিলেন জিয়াউর রহমান পরে পরিবর্তিত হয়ে কম্যান্ডর হন মেজর রফিক। 2 নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল ঢাকা মহানগরী, এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশারফ পরবর্তীতে এটি পরিবর্তিত হয়ে কম্যান্ডর হন এটি এম হায়দার। এরমধ্যে 10 নম্বর সেক্টরে কোন কম্যান্ডার ছিল না কারণ এটি নৌবাহিনীর অন্তর্গত ছিল। বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসীকতার সঙ্গে যুদ্ধ জাহাজের নীচে মাইন সংযুক্ত করেন এরফলে বহু পাকিস্তানের যুদ্ধ জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায়। এরফলে পাকবাহিনী বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয় এই ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামে পরিচিত। গেরিলা বাহিনীর আক্রমণে বিপর্যস্ত পাক বাহিনী হঠাৎ এক নতুন বিপদের সম্মুখীন হয়। একরাত্রে হঠাৎ ইস্টার্ন রিফাইনারি বিমান হামলায় জ্বলে ওঠে। পাক বাহিনী বুঝতেই পারেনি এই আক্রমণ কারা সংগঠিত করেছিল? 1971, 28 শে সেপ্টেম্বর নাগাল্যান্ডের এক পরিত্যক্ত রানওয়েতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্ম হয়েছিল এই আক্রমণটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সংগঠিত করেছিল। এ কে খন্দকার এই বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন।

যুদ্ধশুধু দেশেই হচ্ছিল না বরং বিশ্বজুড়ে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছিল। 1971 সালের 1 লা আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ‘The concert for Bangladesh’ নামে এক সংগীত অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। উদ্দেশ্যে ছিল এতে উপার্জিত অর্থ বাংলাদেশে যুদ্ধ বিধ্বস্ত মানুষদের কাছে পাঠানোর হবে। বিটলস গ্রুপ এতে অংশগ্রহণ করে ‘George Harrison and friend’ এরা এতে অংশগ্রহণ করেন। বব ডিলান ছিলেন উল্লেখযোগ্য শিল্পী। তবে ভারতীয় সেতার বাদক পন্ডিত রবি শংকর ছিলেন এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোগতা তার কাছেই বাংলাদেশের জনগণের এই দুরবস্থা শুনে বিটলস গ্রুপ এই সংগীতানুষ্ঠানটি করেন। পন্ডিত রবি শংকর ও এতে অংশগ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত পাক বাহিনী 1971 সালের 3 রা ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিম সীমান্তে আক্রমণ করে। এরপর ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে ভারত সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করে। বলাই বাহুল্য পাকিস্তানের কফিনের শেষ পেরেক এই ঘটনাতেই পোঁতা হয়। ভারত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ফলে পাক বাহিনীর থরহরিকম্প লেগে যায়। 6 ই ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশ মিত্রবাহিনী যশোর পাক সেনার দখল মুক্ত করে। সেইসঙ্গে 6 ই ডিসেম্বর পার্লামেন্টে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এতদিন নিশ্চুপ থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পরাজয় দেখে 1971 সালের 7 ই ডিসেম্বর জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। বলাই বাহুল্য এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হত না। কিন্তু ভারতের সহযোগি হিসাবে সোভিয়েত রাশিয়া এই প্রস্তাবের উপর ভেটো প্রদান করে। তাই এই প্রস্তাব কার্যকরি হয়নি।

আমেরিকা এই যুদ্ধে নিজের যুদ্ধ জাহাজ পাকিস্তানের সমর্থনে পাঠিয়েছিল। পাক-চীন-মার্কিন জোট যেকোনো সময় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে পারত অন্যদিকে ভারত ও রাশিয়ার সহায়তায় বাংলাদেশ স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হয়। স্বাধীনতার প্রাক মুহূর্তে 1971 সালের 14 ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর সঙ্গে আল বদর ও আল শামস এর ঘাতক বাহিনী দেশের হাজার হাজার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। এই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। এদের মধ্যে কয়েকজন বুদ্ধিজীবী হলেন- শহীদুল্লাহ কাইসার, গোবিন্দ চন্দ্র, মুনির চৌধুরি প্রমুখ। এখানে উল্লেখ্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর যখন ঢাকায় প্রবেশ করে তখন রাস্তাঘাট ফাঁকা ছিল কিন্তু মানুষ যখন বুঝতে পারে ভারতীয় সেনাবাহিনী সেখানে উপস্থিত হয়েছে মানুষ বাড়ি থেকে বাইরে এসে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। সকলে জয় বাংলা ধ্বনিতে আকাশ, বাতাস মুখরিত করে তুলেছিল। ভারতীয় সেনাদের গলায় ফুলের মালা দিয়ে সম্বোধন করা হচ্ছিল। সেই সঙ্গে মানুষ ভারতীয় সেনাদের জড়িয়ে ধরে অনেকে আনন্দে কাঁদছিল! সে এক অপূর্ব অনুভূতি, মুক্তির স্বাদ হয়ত এমনই হয়! 1971 সালের 16 ই ডিসেম্বরে এসে যায় সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে 93,000 হাজার পাক সৈন্য সমেত জেনারেল এ এ কে নিয়াজি ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরা নিকট আত্মসমর্পণ করেন। বাংলাদেশি বাহিনীর পক্ষ থেকে বিমান বাহিনীর প্রধান এ কে খন্দকার এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় আত্মসমর্পণ পৃথিবীর ইতিহাসে আর দেখা যায় না। সেইসঙ্গে পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’!

বাংলাদেশের এই স্বাধীনতা এমনি এমনি আসেনি? বহু শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা! প্রায় তিরিশ লক্ষের অধিক মানুষের রক্ত ও দুই লক্ষের অধিক নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই কাঙ্খিত স্বাধীনতা! যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য 7 জনকে বীর শ্রেষ্ঠ পদক দেওয়া হয়। এরা হলেন- সিপাহী মোস্তাফা কামাল, ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রব, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান, ল্যান্স নায়েক নূর মহম্মদ, সিপাহী হামিদুর রহমান, স্কোয়াড্রন ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ রুহুল আমিন, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। বীর উত্তম পদক প্রদান করা হয় 68 জন বীর যোদ্ধাকে, 2010 সালে কর্নেল জামিলকে বীর উত্তম পদক দেওয়া হয়। তাই বর্তমানে বীর উত্তম পদক প্রাপ্ত যোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে 69 জনকে, বীর বিক্রম পদক দেওয়া হয় 175 জনকে, বীর প্রতীক পদক দেওয়া হয় 426 জন সেনানীকে। মোট 677 টি সন্মাননা পদক প্রদান করা হয়। নারী বীর প্রতীক হিসেবে তারামন বিবি ও সেতারা বেগম এই দুই নারীকে সন্মাননা প্রদান করা হয়। বিদেশি বীর প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয় ডব্লিউ এস ওডারল্যান্ডকে। ওডারল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ছিলেন কিন্তু ডাচ বা নেদারল্যান্ডসের বংশোদ্ভূত ছিলেন। তিনি বাটা সু কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তিনি পাক বাহিনীর নৃশংস বর্বরতা দেখে অস্ত্র হাতে তুলে নেন, তিনি ছিলেন একমাত্র বিদেশি যোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ কতটা মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছিল তা আমরা বুঝতে পারি শহীদুল ইসলাম নামে এক 12 বছরের শিশু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে!

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতে ইন্দিরা গান্ধীর অসামান্য অবদানের জন্য ইন্দিরা গান্ধীকে ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা সন্মাননা’ প্রদান করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বাংলাদেশ পঁচিশ বছরের বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশেকে প্রথম স্বীকৃতি দেয় ভারত, 1971 সালের 6 ই ডিসেম্বর। প্রথম আফ্রিকার দেশ হিসাবে সেনেগাল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে, এটি প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র যারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। স্বাধীনতা অর্জনের কিছুদিনের মধ্যেই ইজরায়েল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। তবে মুসলিম উম্মার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ হেতু বিদেশমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ এই স্বীকৃতি বহুদিন স্বীকার করেন নি। প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসাবে পূর্ব জার্মানি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র 1972 সালের 4 ঠা এপ্রিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। পাকিস্তান 1974 সালের 22 শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, সর্বশেষ রাষ্ট্র হিসেবে চীন 1975 সালের 31 শে আগস্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে।

তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এমনি এমনি অর্জিত হয় নি বরং বহু ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে এই স্বাধীনতা। আজ অনেকেই দেখি ভারত বিদ্বেষী কথা বলে, এগুলি দেখলে সত্যিই খারাপ লাগে। অনেকে যেমন বলেন- আমরা মুক্তিযুদ্ধ লড়াই করলাম কিন্তু পাক বাহিনী কেন ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করল? আবার অনেকে বলেন মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই করল অথচ নাম হয় ভারতের? আসলে এই সমস্ত পাকি প্রেমিক ভারত বিরোধী মানুষদের কাছে আমার সবিনয় অনুরোধ সঠিক ভাবে ইতিহাসের পাঠ নিন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা রেখেই বলছি ভারত যদি এই যুদ্ধে না অংশগ্রহণ করত তাহলে কি বাংলাদেশের পক্ষে স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হত? এত শক্তিশালী পাক সেনাবাহিনীকে কি শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের দ্বারাই প্রতিহত করা সম্ভব ছিল? আসল কথা হল এটা আদপেই সম্ভব ছিল না ঠিক যেমনটি বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে ঘটছে বেলুচিস্তানে এত অত্যাচার হলেও তারা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আমেরিকা- চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করতে রাজি ছিলেন এবং এত শক্তিশালী বিশ্বশক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে সোভিয়েত রাশিয়া ছিল ভারতের সহযোগি। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে ভারতের প্রত্যক্ষ ও সোভিয়েত রাশিয়ার পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এদের অবদান অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করা। আসলে দ্বিজাতিতত্ত্বের বীজ এখনও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আছে। আর এই অপব্যাখ্যার মূল কারিগর কিছু সেনাশাসক এরা এক প্রজন্মকে ভারত ও রাশিয়া বিদ্বেষী হিসাবে গড়ে তোলে। ভারত বাংলাদেশের কতটা সহযোগি এটা বোঝানোর জন্য একটা উদাহরণই যথেষ্ট। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ যদি ভারত না হয়ে অন্যকোন দেশ হত সেক্ষেত্রে প্রতি বছর কম করে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত 30 হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা বাজেট করতে হত। এই হিসাবে 47 বছর স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশের মোট প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হত 30,000× 47= 14,10,000 কোটি টাকা। অর্থাৎ বোঝায় যাচ্ছে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশকে ব্যায় করতে হয়নি তার সামরিক খাতে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ খরচ করতে পেরেছে তার অর্থনৈতিক উন্নয়নে। আর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধ রাজনীতির উত্থান সম্ভব নয়। তাই আমরা আশাবাদী ভারত, বাংলাদেশের এই বন্ধুত্ব সদা বজায় থাকবে এবং বাংলাদেশ এক সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে!

চলবে…

তথ্যসূত্র:-
1. উইকিপিডিয়া।
2. মনোরমা ইয়ারবুক।
3. এই সময়।
4. এবিপি নিউজ।
5. আজতক।
6. ইন্টারনেট থাকা বিভিন্ন তথ্যসূত্র।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 − = 19