(৩৮) আল-নাসিক ওয়া আল-মানসুক ও সুরা তাওবাহ

ইসলামে কোন কোমল-মোডারেট-উগ্রবাদী, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক, শিয়া-সুন্নি-ওহাবী-সালাফি-কাদিয়ানী, সুফি-অসুফি; ইত্যাদি শ্রেণী বিভাগ নেই! তথাকথিত মোডারেট মুসলমান পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা কুরআন-সিরাত-হাদিসের অসংখ্য অমানবিক শিক্ষাকে সাধারণ সরলপ্রাণ অজ্ঞ মুসলমান ও অমুসলমানদের কাছ থেকে আড়াল করার প্রয়োজনে, ‘মুসলমানদের’ এই শ্রেণী বিভাগ-কে ‘ইসলামের’ শ্রেণী বিভাগ-রূপে আখ্যায়িত করেন। ইসলাম একটিই, আর তা হলো মুহাম্মদের ইসলাম; যার ভিত্তি হলো: কুরআন, সিরাত ও হাদিস। বলা হয়, ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হলো ‘কুরআন।’

কুরআন হলো মুহাম্মদের মুখনিঃসৃত বাণী-সমষ্টির সংকলন গ্রন্থ, যা তিনি প্রচার করেছেন তার চারিপাশের মানুষদের সম্মুখে। অতঃপর তিনি দাবী করেছেন, যা তিনি বলেছেন, তা আসলে তিনি বলেননি। স্বয়ং ‘সৃষ্টিকর্তা’ তার জিবরাইল নামের এক ফেরেশতা মারফত তাকে যা কিছু শুনিয়েছেন, তাই তিনি বলেছেন! তার সেই জিবরাইল-কে একমাত্র তিনিই দেখতে পান ও একমাত্র তিনিই তার কথা শুনতে পান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যাপী সাধারণ মানুষের অন্তরে লালিত ‘দেবতা, জ্বিন, আত্মা, অশরীরী শক্তি, সৃষ্টিকর্তা’ ইত্যাদি অপ্রমাণিত বিষয়গুলোর প্রতি বিশ্বাস-কে পুঁজি করে যেমন আজকের পৃথিবীর পীর-ফকির-কামেল-গুরু-বাবাজী জাতীয় লোকেরা দাবী করেন যে, তাদের শরীরে দেবতা-জ্বিন-আত্মা বা অশরীরী শক্তির ভর হয়! ভরপ্রাপ্ত অবস্থায় তারা যা কিছু বলেন, তা আসলে তাদের কথা নয়! দাবী করেন যে, তাদের সেই কথাগুলো প্রকৃতপক্ষে তাদের শরীরে ভর করা অশরীরী শক্তির! মুহাম্মদও ঠিক সেই কাজটিই করেছিলেন। আজকের পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ যেমন এই সকল কামেল-পীর-ফকির-গুরু-বাবাজীদের বিশ্বাস, ভক্তি সমীহ ও অনুসরণ করেন; মুহাম্মদ অনুসারীরাও মুহাম্মদ-কে তাই করেন। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, গুরু-ভক্তির এই প্রক্রিয়ার সমস্তটিই হলো, “কোন নির্দিষ্ট মানুষের প্রতি বিশ্বাস!”

কুরআনের মোট সুরা সংখ্যা ১১৪। এর সমস্ত আয়াত দুই ভাগে বিভক্ত: মক্কায় অবতীর্ণ ও মদীনায় অবতীর্ণ। সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত কুরানের উৎস মোতাবেক এর ৮৭ টি সুরা মক্কায়, বাঁকি ২৭ টি মদিনায় অবতীর্ণ। বর্তমান কুরআনের সুরা নম্বর অনুযায়ী মদীনায় অবতীর্ণ ২৭ টি সুরাকে ছড়ার আকারে সহজে মনে রাখার উপায়:

দুই থেকে নয়,
বাদ সাত ছয়।
বাইশ-চব্বিশ ও তেত্রিশ,
উনপঞ্চাশ-আটচল্লিশ আর সাতচল্লিশ।
সাতান্ন হইতে ছেষট্টি আর পাঁচ-পঞ্চাশ,
যিলযাল-নছর-ফালাক-আর নাসে মদিনায় সাতাশ।

যাবতীয় কসম ও শপথ, পুরাকালের নবীদের গল্প-গাঁথা ও মোজেজার বর্ণনা, দোযখের বীভৎস বর্ণনার মাধ্যমে পরোক্ষ হুমকি ও ভীতি-প্রদর্শন, মাঝে মধ্যে সহনশীলতার উপদেশ ও আধ্যাত্মিক কথাবার্তা; এ জাতীয় বাণীগুলো মুহাম্মদ প্রচার করেছিলেন মক্কায় ও তার প্রাথমিক মদিনা জীবনে (৬১০-৬২২ সাল); যখন তার বাহুবল ও জনবলের কোনোটাই ছিল না তার মতবাদে অবিশ্বাসী ও বিরুদ্ধবাদীদের শায়েস্তা করার। অন্যদিকে, অমুসলিমদের প্রতি যত কঠিন থেকে কঠিনতর আয়াত, প্রত্যক্ষ হুমকি ও হত্যার নির্দেশ, অমুসলিমদের সাথে সম্পর্ক ছেদের নির্দেশ, আইন ও বাধ্যবাধকতা; এ সমস্ত আয়াতের জন্মস্থান হলো মদীনা (৬২২-৬৩২ সাল); তা সে কুরানের যে অংশেই থাকুক না কেন। এ আয়াতগুলো মুহাম্মদের শক্তি-বৃদ্ধি মাপকঠির ধারাবাহিক বর্ণনা।

তথাকথিত মোডারেট ইসলামী পণ্ডিতদের সাথে সুর মিলিয়ে প্রায় সমস্ত ইসলাম বিশ্বাসী এবং কিছু অমুসলিম তথাকথিত বুদ্ধিজীবী লেখক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক দাবি করেন যে, ইসলাম অন্যান্য ধর্মাম্বলীদের প্রতি অতীব সহনশীল। আর তা প্রমাণ করতে কারণে-অকারণে তাঁরা উদ্ধৃত করেন মক্কা ও প্রাথমিক মদিনা সময়ের অল্প কিছু গৎবাঁধা সহনশীল বাণী। কিছু উদাহরণ,

“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই (কুরআন: ২:২৫৬);”
“আপনাকে তাদের সংরক্ষক করিনি (কুরআন: ৬:১০৭);”
“তুমি কি মানুষের উপর জবরদস্তী করবে ঈমান আনার জন্য? (কুরআন: ১০:৯৯)”;
“তুমিতো শুধু সতর্ককারী মাত্র (কুরআন: ১১:১২);”
“আপনি তাদের উপর জোরজবরকারী নন (কুরআন: ৫০:৪৫);
“যার ইচ্ছা, সে একে স্মরণ করুক (কুরআন: ৭৪:৫৫)”;
“আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, আপনি তাদের শাসক নন (কুরআন: ৮৮:২১-২২);” “তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্যে এবং আমার ধর্ম আমার জন্যে (কুরআন: ১০৯:৬)”
– ইত্যাদি।

এ বিষয়ে তাঁদের সবচেয়ে প্রিয় উদ্ধৃতিটি হলো, মদিনায় অবতীর্ণ ‘সুরা মায়েদার’ ৩২ নম্বর বাক্যটির শুরুর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশটি গোপন করে তার পরের অংশের উদ্ধৃতি; “—যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে।” তাঁদের এই উদ্ধৃতিটি একেবারেই “নন-সেন্স (Nonsense)!” কারণ, সুরা মায়েদার ২৭ থেকে ৩২ নম্বর আয়াতগুলো হলো “আদমের দুই পুত্রের মধ্যে খুনাখুনির কিচ্ছা”, যা মুহাম্মদ তার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে বর্ণনা করেছেন। সেই প্রসঙ্গেই মুহাম্মদের এই ৫:৩২ আয়াতটি, যা “বনি ইসরাইলদের প্রতি আল্লাহ লিখে দিয়েছেন” বলে মুহাম্মদ (আল্লাহ) এই বাক্যটির শুরুতেই সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। এই বাক্যটি অনুসারীদের প্রতি মুহাম্মদের কোন নির্দেশ নয়, তার নির্দেশ হলো এই বাক্যের পরের দুটি বাক্য:

মুহাম্মদের ভাষায়: [1]

৫:৩২ (সুরা মায়েদা) – এ কারণেই আমি বনী-ইসরাইলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। তাদের কাছে আমার পয়গম্বরগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী নিয়ে এসেছেন। বস্তুতঃ এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমাতিক্রম করে।”

৫:৩৩-৩৪ –“যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। কিন্তু যারা তোমাদের গ্রেফতারের পূর্বে তওবা করে; জেনে রাখ, আল্লাহ ক্ষমাকারী, দয়ালু।”

>> কী বীভৎস বর্ণনা! একটি অতি সাধারণ প্রশ্ন:

“কোন মানুষের পক্ষেই কী এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি-কর্তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সম্ভব?”

অবশ্যই নয়! সুতরাং, ৫:৩৩ বাক্যটির শুরুতেই মুহাম্মদ যে ‘আল্লাহ’ শব্দটি প্রয়োগ করেছেন, নিশ্চিতরূপেই সেই ‘আল্লাহর’ সাথে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তার (যদি থাকে) কোনই সম্পর্ক নেই। ‘আল্লাহ’ নামের এই বাহনটি মুহাম্মদ সৃষ্টি করেছিলেন তার নিজ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার প্রয়োজনে! এখানে মুহাম্মদ যা বলছেন, তার সরল অর্থ হলো, “যারা মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদেরকেই ধরে এনে এই ধরণের বীভৎস শাস্তি দেওয়া হবে।” আল্লাহর নামে মুহাম্মদ তার অনুসারীদের কীভাবে তার সমালোচনা-কারী ও বিরুদ্ধবাদীদের খুন ও বীভৎস সহিংসতায় লেলিয়ে দিয়েছিলেন, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হলো মুহাম্মদের এই ৫:৩৩ নির্দেশ! তবে, ধরা পড়ার আগেই যদি কেউ মুহাম্মদের বশ্যতা স্বীকার করে নেন, তবেই শুধু তাঁরা মুহাম্মদের এই বীভৎস শাস্তি থেকে মুক্তি পাবেন (৫:৩৪)!

আরও কিছু উদাহরণ:

৪:৮৯ (সূরা আন নিসা) – “তারা চায় যে, তারা যেমন কাফের, তোমরাও তেমনি কাফের হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সব সমান হয়ে যাও। অতএব, তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে হিজরত করে চলে আসে। অতঃপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে তাদেরকে পাকড়াও কর এবং যেখানে পাও হত্যা কর। তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না এবং সাহায্যকারী বানিও না।

>> হিজরত বিমুখ অনুসারীদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের এই নৃশংস নির্দেশ, “তাদেরকে পাকড়াও কর এবং যেখানে পাও হত্যা কর।”

৯:২৯ (সুরা আত- তাওবাহ) – “তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে।

>> অনুসারীদের প্রতি মুহাম্মদের এই নির্দেশ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের (আহলে-কিতাব) বিরুদ্ধে। “মুশরিকদের (Polytheist)” জন্য ইসলাম গ্রহণই বাঁচার একমাত্র উপায় (৯:৫); আর আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) প্রাণ রক্ষার জন্য বিশেষ ছাড় এই যে তাঁদের জন্য ইসলাম গ্রহণ ছাড়াও আরও একটি পথ খোলা আছে, আর তা হলো, “অবনত মস্তকে করজোড়ে” যিযিয়া প্রদান!

৯:৫২ – “আপনি বলুন, তোমরা তো তোমাদের জন্যে দুটি কল্যাণের একটি প্রত্যাশা কর; আর আমরা প্রত্যাশায় আছি তোমাদের জন্যে যে, আল্লাহ তোমাদের আযাব দান করুন নিজের পক্ষ থেকে অথবা আমাদের হস্তে। সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর, আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ।”

>> অনুসারীদের প্রতি মুহাম্মদের এই নির্দেশ হলো তার জিহাদ (যুদ্ধ) বিমুখ অনুসারীদের বিরুদ্ধে (৯:৪১- ৯:৫২)। মদিনায় মুহাম্মদের শক্তিবৃদ্ধির সাথে সাথে শুধু অমুসলিমই নয়, তার নির্দেশ যথাযথ পালন না কারী অনুসারীদের বিরুদ্ধেও কঠিন থেকে কঠিনতর প্রত্যক্ষ হুমকি ও হত্যার নির্দেশ! দোযখের হুমকির সাথে সাথে তিনি দুনিয়াতেই সে ‘শাস্তি’ প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা রেখেছেন [‘আমাদের হস্তে’ (৯:৫২)]! আল্লাহর আযাব অনিশ্চিত বিশ্বাস মাত্র, আর অমুসলিম ও আজ্ঞা-পালন না কারী অনুসারীদের উপর মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের “আযাব” বাস্তব!

বিফল ও অক্ষম মুহাম্মদের মক্কার আপাত সহনশীল বাণী, “আপনি তাদের উপর জোরজবরকারী নন (৫০:৪৫)। আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, আপনি তাদের শাসক নন (৮৮:২১-২২)” – ইত্যাদি ছিল মুহাম্মদের মক্কা-জীবনে। যখন তার বাহুবল ও জনবলের কোনোটাই ছিল না তার সমালোচনা-কারী ও বিরুদ্ধবাদীদের সাথে যুদ্ধ করার। সে সময় অবিশ্বাসীদের শাস্তি আল্লাহর উপর (মৃত্যু-পরবর্তী দোযখ) ছেড়ে দেয়া ছাড়া মুহাম্মদের গত্যন্তর ছিল না। সেখানেও তিনি পরোক্ষ হুমকি-শাসানী-তাচ্ছিল্য কোন কিছুই বাদ রাখেন নাই। ঐ সব আপাত সহনশীল ও শান্তির বাণী কর্পূরের মত উধাও হয়ে মদিনায় সফল ও শক্তিমান মুহাম্মদের আসল চেহারায় আত্ম-প্রকাশ!

আল-নাসিক ওয়া আল-মানসুক (Al-Nasikh wa al-Mansukh):

১৬:১০১ (সূরা নাহল – মক্কায় অবতীর্ণ) – “যখন আমি এক আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত উপস্থিত করি এবং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন তিনিই সে সম্পর্কে ভাল জানেন; তখন তারা বলেঃ আপনি তো মনগড়া উক্তি করেন; বরং তাদের অধিকাংশ লোকই জানে না।” [2]

>> মুহাম্মদের এই ১৬:১০১ বাণীটিতে যা সুস্পষ্ট, তা হলো, মুহাম্মদ অনেক সময়ই পরস্পরবিরোধী বাণী প্রচার করতেন। “সৃষ্টিকর্তার বানী কখনোই পরস্পরবিরোধী হতে পারে না,” এই সত্য অবিশ্বাসীরাও জানতেন। সেই কারণেই অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা মুহাম্মদকে বলতেন, “আপনি তো মনগড়া উক্তি করেন।” কুরআনের যাবতীয় বাণী মুহাম্মদের। মুহাম্মদ একজন মানুষ ছিলেন। একজন মানুষ, সে যত তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি ও মেধার অধিকারীই হউন না কেন তার স্মৃতি কখনোই শতভাগ শুদ্ধ হতে পারে না। কুরআনে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে মুহাম্মদ মাঝে মধ্যেই স্মৃতি বিস্মৃত হয়ে (মানবিক বৈশিষ্ট্য), কিংবা নিজ উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়োজনে, কিংবা কোন উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রয়োজনে পরস্পর বিরোধী বাণী প্রচার করতেন। যখন অবিশ্বাসীরা তাকে তার পূর্বের প্রচারিত বানী এবং পরের প্রচারিত বাণীটির মধ্যে অসামঞ্জস্য ও বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তীক্ষ্ণ-বুদ্ধির মুহাম্মদ তখন আত্মরক্ষার প্রয়োজনে এই আয়াতটি আমদানি করেছিলেন।

কোন মানুষই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা হতে পারেন না। সমাজ ও সংস্কৃতি এক চলমান (Dynamic) প্রক্রিয়া। কোন চলমান প্রক্রিয়াকেই কোন স্থির (Static) বিধান বা মতবাদ দিয়ে অনন্তকাল পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আগের জারীকৃত আইন পরিবর্তন অপরিহার্য। সর্বোপরি মক্কায় ও প্রাথমিক মদিনা জীবনে ধনে-মানে-জনে দুর্বল ও শক্তিহীন মুহাম্মদের বানী “কিছুটা” আপাত সহনশীল হবে সেটাই স্বাভাবিক। সেই শক্তিহীন অবস্থাতেও কী মুহাম্মদ সহনশীল ছিলেন? অবশ্যই নয়। সেই শক্তিহীন অবস্থাতেও মুহাম্মদ তার বশ্যতা অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যে কী পরিমাণ হুমকি, শাসানী, তাচ্ছিল্য ও ভীতি প্রদর্শন করেছিলেন তার উদাহরণ ইতিহাস হয়ে আছে তারই রচিত জীবনী-গ্রন্থ কুরানের পাতায় পাতায়। সেই একই মানুষ যখন শক্তি-মত্তার অধিকারী হবেন তখন কী তিনি আর নিজেকে শুধু সহনশীল বানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন? [3]

‘ইসলামে’ দীক্ষিত হওয়ার একান্ত প্রাথমিক ও মৌলিক শর্ত হলো ইমান বা শাহাদা: “মুহাম্মদ ও তার আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস!” এই ‘ইমান’ ব্যতিরেকে কোন ক্রমেই কোন ব্যক্তি নিজেকে ইসলাম বিশ্বাসী বলে দাবী করতে পারেন না। ইসলামের এই একান্ত প্রাথমিক ও মৌলিক শর্ত অনুযায়ী, আল্লাহর নামে মুহাম্মদ ‘কুরআনে’ যে আদেশ ও নির্দেশ জারী করেছেন, তা তার অনুসারীদের জন্য অবশ্য পালনীয়। নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ বা ইচ্ছা-মাফিক তা গ্রহণ বা বর্জন করার কোন অধিকারই তাঁদের নেই। মদিনায় অবতীর্ণ সুরা গুলোতে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের এই ৫:৩৩ নির্দেশের মতই অসংখ্য বীভৎস নির্দেশ ও শিক্ষার বর্ণনা আছে, যা মুহাম্মদের মক্কা ও প্রাথমিক মদিনা জীবনের নির্দেশ ও শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত! এমত পরিস্থিতিতে, তার অনুসারীদের জন্য এই বিপরীত-ধর্মী নির্দেশের কোনটি অনুসরনীয় তা মুহাম্মদ নিজেই সুস্পষ্টভাবে তার অনুসারীদের অবহিত করিয়েছেন।

এ বিষয়ে তার সুস্পষ্ট নির্দেশ হলো:
২:১০৬ (সূরা আল বাক্বারাহ) – “আমি কোন আয়াত রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি।”

>> অর্থাৎ, যদি কুরআনের দুই বা ততোধিক আয়াত পরস্পরবিরোধী হয়, তবে যে আয়াতটি “পরে” নাজিল হয়েছে সেটাকেই উত্তম ও গ্রহণযোগ্য ধরতে হবে। যার সরল অর্থ হল, সেরূপ ক্ষেত্রে মদীনার আয়াত (পরে নাজিলকৃত) মক্কার আয়াতগুলোকে বাতিল (Abrogate) করে। ইসলামী পরিভাষায় যা আল-নাসিক ওয়া আল-মানসুক নামে অবিহিত। পরে নাযিল কৃত গ্রহণযোগ্য আয়াতটিকে বলা হয় “আল নাসিক,” আর এই আয়াতের দ্বারা পূর্বের যে আয়াতটিকে বাতিল করা হয়েছে তাকে বলা হয় “আল মানসুখ।” সে কারণেই, বিপরীতধর্মী কোনো বিশেষ আয়াতের কোনটি গ্রহণযোগ্য, তা জানতে সে আয়াতের জন্মস্থান ও সময়কাল জানা অত্যন্ত জরুরী।

নাজিলের সময়ের ক্রমানুসারে কুরআনের সর্বশেষ সুরা হলো সূরা নছর, বর্তমান কুরআনের ১১০ নম্বর সুরা। এটি মাত্র তিনটি বাক্যের এক সুরা, যাতে কোন নির্দেশ নেই। কুরআনের সর্বশেষ নির্দেশ-যুক্ত সুরা হলো “সুরা আত-তাওবাহ”, বর্তমান কুরআনের ৯ নম্বর সুরা। এটি ১২৯ বাক্য বিশিষ্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুরা। তথাকথিত মোডারেট ইসলাম বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতদের সুবিধাজনক বক্তৃতা-বিবৃতিতে বিভ্রান্ত হতে না চাইলে এই সুরাটি ‘মর্মার্থ (meaning) ও ব্যাখ্যা বা শানে নজুল’ সহ পাঠ ও অনুধাবন করা প্রতিটি অক্ষর-জ্ঞান সম্পন্ন ইসলাম বিশ্বাসীদের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয়। আর তার কারণ হলো, [4][5]

যেহেতু সুরা আত-তাওবাহই হলো মুহাম্মদের সর্বশেষ নির্দেশ-যুক্ত সুরা, সেহেতু ইসলামের ‘আল-নাসিক ওয়া আল-মানসুক’ নিয়ম অনুযায়ী, কুরআনের অন্যত্র কোথাও উদ্ধৃত যে কোন শিক্ষা, হুকুম ও নির্দেশ যদি এই সুরা-বর্ণিত নির্দেশের বিপরীত-ধর্মী হয়, তবে সেই নির্দেশটি অগ্রহণযোগ্য বা বাতিল (Abrogated) বলে বিবেচিত হবে।

যে সমস্ত মৌলবাদী জেহাদি ভাইয়েরা আল্লাহর রাস্তায় জান-মাল সর্বস্ব বাজী রেখে অপরকে মারছেন এবং নিজেও মরে তাদের বিশ্বাসের গভীরতার প্রমাণ দিচ্ছেন, তারা কুরআনের সেই সেই শিক্ষা, আদেশ ও নিষেধ মান্য করেন, যেগুলোর জন্মস্থান হচ্ছে মদীনা। বিশেষ করে ‘সুরা তওবাহর’ বাণী। মৌলবাদী জিহাদিরা একান্ত সহি ভাবে জানে যে, তারা সত্য পথের উপর আছে। তারা খুব ভালভাবে জানে যে, পরবর্তী সময়ে নাযিল-কৃত আয়াত পূর্ববর্তী আয়াতকে নাকচ করে দিয়েছে। অত্যন্ত সহজ তাদের যুক্তি: পৃথিবীর অন্য সব আইনের মতই পরবর্তীতে জারিকৃত আইন ও নীতিমালা পূর্বের জারিকৃত আইন ও নীতিমালাকে নাকচ করে দেয়। এই সহজ বিষয়টা তথাকথিত মোডারেট মুসলমানেরা বুঝতে পারে না। কারণ তারা হয় ধর্ম বিষয়ে অতিশয় অজ্ঞ, অথবা বুঝতে চায় না কারণ তারা হিপোক্রাইট বা অতিশয় ভণ্ড।

“তথাকথিত” মোডারেট ইসলাম পণ্ডিত হলেন তারাই যারা যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে সাধারণ মুসলমানদের কাছে ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ গোপন করে উপস্থিত দর্শক শ্রোতার মানসিক চাহিদা মোতাবেক যেখানে যেমন প্রয়োজন সেখানে তেমন “কুরান-সিরাত-হাদিসের বর্ণনা” পরিবেশন করেন। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের মতই মুসলমানেরা ও তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় যাবতীয় প্রয়োজনেই পরিপার্শ্বিক সমাজ ও সংস্কারের আদর্শ ও নিয়ম দ্বারাই পরিচালিত হন, ধর্ম-শাস্ত্রের প্রতিটি নিয়ম কানুন তাঁরা জানেন না এবং/অথবা মানেন না। তাঁদের কাছে মুহাম্মদের “সন্ত্রাস ও নৃশংসতার” শিক্ষা প্রচার নিরাপদ নয়। তাই সংগত কারণেই তাঁরা তা গোপন রাখেন। কিন্তু যে সমস্ত মুসলমান ভাইয়েরা “ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা” জানা ও মানার জন্য বদ্ধপরিকর তারা ঠিকই জানেন যে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় কাফেরদের বিরুদ্ধে “জিহাদ” অত্যাবশ্যক।

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর।
http://www.quraanshareef.org/

কুরআনের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ:
https://quran.com/

[2] ইবনে কাথিরের কুরআন তাফসীর:
http://www.qtafsir.com/index.php?option=com_content&task=view&id=2935&Itemid=71

[3] মক্কায় মুহাম্মদ – হুমকি-শাসানি-ভীতি-অসম্মান ও দোষারোপ:
http://www.dhormockery.net/2014/02/blog-post_4476.html

[4] নাজিলের সময়ের ক্রমানুসারে কুরআনের সর্বশেষ সুরা – সুরা আত-তওবাহ:
সহি বুখারী: ভলুম ৫, বই নম্বর ৫৯, হাদিস নম্বর ৬৫০:
http://www.hadithcollection.com/sahihbukhari/92–sp-608/5394–sahih-bukhari-volume-005-book-059-hadith-number-650.html

[5] নাজিলের সময়ের ক্রমানুসারে কুরআনের সুরা ও তার ক্রমিক নম্বর:
http://www.webcitation.org/query?url=http://www.qran.org/q-chrono.htm&date=2011-05-13

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “(৩৮) আল-নাসিক ওয়া আল-মানসুক ও সুরা তাওবাহ

  1. “আমি কোন আয়াত রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি।” এখানে কথা হচ্ছে ‘রহিতকৃত’ অথবা ‘বিস্মৃতকৃত’ আয়াতগুলো কি এখনো কোরানে লিপিবদ্ধ রয়েছে?? আমার মনে হয় মুসলমানেরা এই এ্যাঙ্গেল থেকে তর্ক করতে চাইবে।

    1. ভাই মোহাম্মদ আব্দুল ফাত্তাহ,
      পড়া ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। মুহাম্মদ ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধিসম্পন্ণ একজন মানুষ। এ ধরণের বালখিল্য যুক্তির মাধ্যমে কেউ যদি তাকে “নির্বোধ” প্রমাণ করতে চান, করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কুরআনের সম্পুর্ণ বিপরীতধর্মী ও পরস্পরবিরোধী নির্দেশের কোনটি গ্রহণযোগ্য, তার কোন সমাধান হবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

24 − = 20