পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও জেনারেল এরশাদ

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ষাট হাজারেরও বেশি আদিবাসী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় গ্রহন করলে এবং ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হতে থাকলে,পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টি বিদেশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের উপর সেনাবাহিনী এবং বহিরাগত অনুপ্রবেশধারী সেটেলার বাঙালী কতৃক সংঘটিত গণহত্যা,হত্যা,ধর্ষণ,লুঠপাট,গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনা এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন বিদেশের সংবাদপত্র, রেডিও,টেলিভিশনে প্রচার পেতে থাকে।তাছারা বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা যেমন, Amnesty International,The Anti Slavery Society, তাদের বিভিন্ন প্রচারপত্রে বিস্তারিত বিবরণ দিতে থাকে এবং ঐসব বিষয় বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও বিভিন্ন আলোচনা সভায় আলোচনা হতে থাকে এবং বাংলাদেশকে সাহায্যকারী বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও তাদের সরকারকে বাংলাদেশে সাহায্য দান করা থেকে বিরত থাকার জন্য আবেদন ও চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কাছে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে জবাবদিহি করতে বাধ্য হয়।১৯৮৩ সাল থেকে আই,এল,ও প্রতিবছর বাংলাদেশকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে তথ্য গোপন করার জন্য প্রকাশ্য অভিযোগ করতে থাকে।

জেনারেল এরশাদের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা বিনয় কুমার দেওয়ান বলেছিলেন।একদিন সকালে বিনয় কুমার দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর বাসায় যান।কিছুক্ষন আলাপের পরে প্রধানমন্ত্রী তাকে তাঁর সাথে বঙ্গভবনে যেতে বলেন এবং জানান যে ঐদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর বঙ্গভবনে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক হবে।বিনয় কুমার দেওয়ান প্রধানমন্ত্রীর সাথে বঙ্গভবনে যান এবং মন্ত্রীপরিষদ রুমের একটি আসনে বসেন।সভার কাজ তখনো শুরু হয়নি।কিছুক্ষন পরে মন্ত্রিপরিষদের উপসচিব মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বিনয় দেওয়ানের কাছে আসেন এবং খুবই বিনীতভাবে তাকে বলেন যে,তাকে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ডাকা হয়নি,তাই তাকে চলে যেতে হবে।বিনয় কুমার দেওয়ান তখন খুবই অপমানিত বোধ করেন।বিনয় দেওয়ানের সাথে আরো একটি ঘটনা ঘটেছিল সেটিও মন্ত্রিপরিষদের একটি বৈঠক সম্বন্ধে।বৈঠকে নির্ধারিত বিষয়াদি আলোচনার পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়টিও আলোচনায় আসে।জেনারেল এরশাদ তখন বিনয় দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে প্রয়োজন হলে সকল উপজাতিকে(আদিবাসী) পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উৎখাত করা হবে।এই দুটি ঘটনা এবং নানা কারণে বিনয় দেওয়ান মন্ত্রী হলেও খুবই হতাশাগ্রস্ত এবং বিক্ষুব্ধ ছিলেন।

 

১৯৮৮ সালের আই,এল,ও এর একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের সাথে দেখা করেন।প্রতিনিধিদল বিনয় দেওয়ানের সাথেও দেখা করেন।ঐ সময় বিনয় দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের উপর বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক লেখা কৌশলে আই,এল,ও প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর কররন।উল্লেখ্য,শরদিন্দু শেখর চাকমা তথসময়ে উক্ত তথ্যভিত্তিক লেখাগুলো বিনয় দেওয়ানকে দিয়েছিলেন।প্রতিনিধিদর ফেরত গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে খুবই বিরূপ মন্তব্য করে একটি প্রতিবেদন পেশ করে।এসব কারণে এরশাদ সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিকট খুবই চাপের মূখে পড়ে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার সমস্যার উন্নতি না হলে আন্তর্জাতিক সাহায্য বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।ফলে জেনারেল এরশাদ সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নেয়।উপেন্দ্র লাল চাকমা,নকুল চন্দ্র ত্রিপুরা এবং কেএসপ্রু কে নিয়ে একটি যোগাযোগ কমিটি গঠন করা হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে আলোচনার জন্য তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার মার্শাল(অবঃ) এ কে খন্দকারের নেতৃত্বে ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেন।কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবদুস সালাম,চট্টগ্রামের কমিশনার আলী হায়দার খান,পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রানলয়ের আরো দুই কর্মকর্তা।

জেনারেল এরশাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা বিনয় কুমার দেওয়ানকে কমিটিতে রাখা হয়নি এবং কমিটি গঠনের ব্যাপারে তাঁর সাথে কোন আলোচনাও হয়নি।

জাতীয় কমিটির সাথে জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দের ৫ বার বৈঠক হয়।জনসংহতি সমিতি তাদের নিম্নোক্ত ৫টি দাবি সরকারের কাছে পেশ করেন।

১.পার্বত্য অঞ্চলকে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন প্রদান করা।

২.পার্বত্য অঞ্চলে জনগণের মতামত ব্যাতিরিকে যাতে পার্বত্য অঞ্চলের প্রশাসনিক মর্যাদা পরিবর্তন করা না হয় সে ব্যাপারে সাংবিধানিক বিধিনিষেধের ব্যাবস্থা রাখা।

৩.১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্টের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপনকারী বাঙালীদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সম্মানজনকভাবে সরিয়ে নেয়া।

৪.পার্বত্য অঞ্চলের উন্নতিকল্পে বিভিন্ন খাতে কেন্দ্রিয় তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ করা।

৫.পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা।

উপরোক্ত ৫টি প্রধান দাবির সাথে আরো ২৫টি দাবি সেখানে ছিল।সরকারপক্ষ এবং জনসংহতি সমিতি ৫ বার বৈঠক করলেও কোন মীমাংসায় পৌঁছতে পারেনি।তখন জেনারেল সালাম পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলা থেকে কয়েকজন নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব,সরকারি কর্মকর্তা এবং ছাত্রকে বাছাই করেন এবং তাদের সাথেই জাতীয় কমিটির আলোচনা আরাম্ভ করেন।উল্লেখ্য,১৯৮১ সালের ১৮ এপ্রিলের এক সরকারি ঘোষনা বলে তদানীন্তন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার বান্দরবান মহকুমাকে নিয়ে বান্দরবান জেলা নামে একটি পৃথক জেলা করা হয়।আদিবাসীর পাহাড়ীরা নতুন জেলা করাকে আদিবাসী পাহাড়ীদের মধ্য বিভক্তি এনে তাদেরকে দুর্বল করার কৌশল বলে মনে করতে থাকে।

বিভবক্তির আগে শরদিন্দু শেখর চাকমা এবং চাকমা রাজ পরিবারের সদস্য নন্দিত রায় একবার তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী অংশুয়ে প্রু চৌধুরীর সাথে দেখা করেন এবং তাঁকে নিয়ে একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করার প্রস্তাব করেন।অংশুয়ে প্রু চৌধুরী তাঁদের বলেন, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে বিভক্ত করার বিরুদ্ধে ,কিন্তু সরকারের মন্ত্রী হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যেতে অপারগ।এর কিছুদিন পরে মংচীফ মংপ্রু সাইন ঢাকা আসেন।ঐ সময়ে উপেন্দ্র লাল চাকমাও ঢাকায় ছিলেন।শরদিন্দু শেখর চাকমা আর উপেন্দ্র লাল চাকমা তাঁর  সাথে দেখা করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব করেন।অনেক অনুরোধের পর তিনি তাঁর পরের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যেতে রাজি হন।কিন্তু তার পরের দিন সকালে তাকে টেলিফোন করার হলে জানানো হয় যে মংচীফ রাত্রেই ঢাকা থেকে চলে গেছেন।১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাসে খাগড়াছড়ি মহকুমাকেও পৃথক জেলায় রূপান্তরিত করা হয়।

যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাটি ৩টি জেলার জন্য একই তাই ৩ জেলার নেতৃবৃন্দ একসাথে বসেই জাতীয় কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।কিন্তু জেনারেল সালাম তাতে রাজি হন নি।ফলে তিন জেলার আলোচক দল শেষ পর্যন্ত জাতীয় কমিটির সাথে পৃথক পৃথকভাবে আলোচনায় বসেন।।তবে সরকার পক্ষের মূল আলোচক ছিলেন মেজর জেনারেল আবদুস সালাম।৩টি জেলার নেতৃবৃন্দই পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি  আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়েছিলেন।কিন্তু জিওসি তাতে সায় দেন নি।শেষ পর্যন্ত কাউকে ভয় দেখিয়ে ,কাউকে লোভ দেখিয়ে অথবা কাারো উপর চাপ প্রয়োগ করে ৩টি জেলার জন্যই স্থানীয় সরকার পরিষদ মেনে নিতে নেতাদের বাধ্য করেন এবং ৩টি জেলার নেতৃবৃন্দের সাথে পৃথক পৃথকভাবে চুক্তি হয়।মূলত জেনারেল সালামের জন্যই আদিবাসী পাহাড়ীরা আঞ্চলিক পরিষদ পায় নি।এই জেনারেল সালামই সেই লোক যিনি ১৯৭৯ সালের ২৬ মে (তখন সেনাবাহিনীর কর্নেল) এবং ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ্ পানছড়িতে এক প্রকাশ্য জনসভায় বলেছিলেন, ‘We want the land,and not the people’  অর্থাৎ আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জমি চাই,মানুষ চাই না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 + = 35