দেবী দর্শন!

গতকাল রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিল। মোটে ঘন্টা তিনেক ঘুমানোর পর ঘুম ভেঙে গেল। ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে। চোখ খুলতেই দেখি আমার পাশে মজুমদার সাহেবের খাটের উপর তার বদলে একজন সুন্দরী মহিলা বসে আছেন। হাতের সংখ্যা দেখেই বুঝতে পারলাম উনি কে। তাছাড়া মজুমদার সাহেবও গত রাতে বলে রেখেছিলেন যে সকাল থেকেই তিনি থাকবেন না, সরস্বতী পূজায় যাবেন। অবাক হয়ে চোখ মুছতে মুছতে আবার তাকালাম খাটের দিকে। তারপর তাড়াতাড়ি উঠে বসে গদগদ হয়ে বলতে লাগলাম,

– প্রণাম নেবেন দেবী। হঠাৎ আমার ঘরে? যতদূর মনে পড়ে আপনাকে নিয়ে তো কিছু লিখি নি?
– বাইরে বড্ড শীত বাছা। তোর ঘরের শীতের প্রভাব একটু কম বলে এখানেই আসলাম। আর কিসের লিখার কথা বলছিস?
– (মনে মনে) আমারে চিনে না বেটি! বাশ দিলে ঠিকই চিনত।
নাহ মা কিছু না। এমনি।
– তোর ঘরে আশ্রয় নিলাম। বল বাছা কি চাই তোর?
– চাই তো অনেক কিছু। তবে আগে বলুন আছেন কেমন?
– আর বলিস নে বাছা, ব্রহ্মলোকে তো ভালোই ছিলাম। কিন্তু পৃথিবীতে যে এত শীত তা তো জানতাম না। এখন এই শীতের চো*নে থুক্কু শীতের জ্বালায় আর ভাল লাগছে না।
– বলেন কি! আপনি জানতেন না! আপনি না দেবী মা!
– আরেহ বলদ, আমি বিদ্যা, শিল্পকলা, সঙ্গীতের দেবী। ঋতু আমার ডিপার্টমেন্টের না।
– বলেন কি মা! আপনাদেরও ডিপার্টমেন্ট আলাদা করা?
– নয় তো কী! তোরা মানুষরা ডিপার্টমেন্ট আলাদা করা শিখেছিসই আমাদের থেকে৷
– হ্যা তা বটে। শ্রেণী বৈষম্যের শুরু তো আপনাদের কারণেই।
– (মৃদু রেগে গিয়ে) কি বললি রে ফিসফিস করে!
– না মা, বললাম কত ভাল সিস্টেম আপনাদের। ডিপার্টমেন্ট আলাদা থাকার যে কত সুবিধা!
– (শান্ত হয়ে) বল কি বলবি।
– মা আমি একজনকে বড্ড চাই।
– (মৃদু হেসে) কারে চাস বাছা?
– ওই ডাক্তারটাকে। ওই যে খালি কথায় কথায় চিল্লায়।
– জাত কি তার?
– সুন্নী।
– কিহ! মুসলিম! আর কিছু পেলি না! জানিস না মুসলিমরা ধোঁকাবাজ!
– আস্তে আস্তে মা! দিবেন না বলে দিন সমস্যা নাই। তাই বলে আমার পছন্দের মানুষ নিয়ে খারাপ কথা বলবেন না। এগুলো আমার সহ্য হয় না।
– আইছে প্রেমিক। এসব প্রেম পিরিতি আমার ডিপার্টমেন্টের না। আমার কাছে চাইলে পড়াশোনা চাইতে পারিস, সঙ্গীত চাইতে পারিস।
– ওহ আচ্ছা মা আপনি তো বিদ্যার দেবী তাই না? তো নিশ্চই পৃথিবীর সকল বিদ্যা আপনার জানা? সকল কোর্সও আপনার জানা?
– (একটু ভেবে চিন্তে) হ্যাঁ হ্যাঁ কিছুই আমার অজানা নয়!
– আচ্ছা মা এমএসসি করতে চাচ্ছিলাম টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং এর উপরে। চাপ কি অনেক বেশী হবে?
– চাপ তো থাকবেই! চাপ ছাড়া মানব সন্তানই অর্জন হয় না আর তো বিদ্যা!
– এ্যাঁ! থাক দেবী আর বলতে হবে না। এসব চাপ ঠাপের কথা আমার ভাল লাগে না। এটা বলুন সাবজেক্ট কয়টা থাকবে?
– এ্যাঁ?
– বললাম কয়টা সাবজেক্ট আর কত ক্রেডিট এমএসসিতে?
– (একটু থতমত খেয়ে) কেন এমএসসি কয়টা কোর্স? একটা কোর্সে একটা সাবজেক্টই তো থাকবে!
– এ্যাঁ! দেবী খাবার দিয়েছিল ভক্তরা?
– হ্যাঁ।
– লিকুইড কিছু ছিল কি?
– নাহ! কেন বল তো!
– ইয়ে মানে নদীর জলে ইদানিং অ্যালকোহল আসছে কি না তাই জিজ্ঞেস করলাম!
– ওহ তাই বল।
– ( অবাক হয়ে মনে মনে) আচ্ছা দেবীকে অ্যালকোহলের কথা বললাম, অথচ একটু রাগও করল না! বুঝতে পেরেছে তো মদের কথা?
– কি হে ছোকড়া! আবার কি ভাবছিস।
– নাহ কিছু না। আচ্ছা মা, বলুন তো অ্যালকোহলের সংকেত কী?
– (ইতস্তত হয়ে) মনে পড়ছে না।
– এ্যাঁ! আমি না হয় রসায়নে কাঁচা কিন্তু আপনি! আচ্ছা মা বাদ দেই। রসায়ন আমিও বুঝি না। এগুলো মনে রাখাও বড্ড কষ্টকর। বলুনতো  গ্রিনস থিউরামটা। কিংবা নিউটনস ফরোয়ার্ড ইন্টারপোলেশন সূত্রটা বলুন তো?
– কে গ্রিন? কে নিউটন?
– বলেন কি মা! নিউটনরে চিনেন না!
– কি আবল তাবল বকছিস! নিউটনরে আমি কি করে চিনবো! আমার সময় কি নিউটন ছিল? এসব প্রশ্ন ওই নাস্তিকগুলোর কাছ থেকে শিখছিস তাই না? সব বদের দল ওরা।
– ওহ আচ্ছা তা ঠিক। তবে আপনি জ্ঞান দান না করলে তো আর নিউটনে এগুলা আবিষ্কার করতে পারতো না!
– হ্যাঁ তা তো বটেই!
– আচ্ছা মা তাহলে এটা বলেন গাছ থেকে ফল মাটিতে পড়ে কেন, উপরের দিকেও তো যেতে পারত!
– কারণ পৃথিবী চলে দেবতাদের ইচ্ছায়। আমাদের ইচ্ছা তাই মাটিতে পড়ে।
– তাহলে অভিকর্ষজ বল কি?
– (রেগে গিয়ে) ধুর জানি না।
– আপনি না পৃথিবী তৈরি, পালন, ধ্বংসে সাহায্য করেন! তাহলে এগুলো না জেনে কেমনে কি? এগুলো জেনে পৃথিবীটা তৈরি করলে দুইদিন পরপর আর বান,ভূমিকম্পে ভুগতে হত না।
– (রেগে গিয়ে) চুপ বেয়াদব! এসব শিক্ষার থেকে বড় শিক্ষা হচ্ছে বিবেকের যার বলে দুনিয়ায় ভাল খারাপ বাঁচিয়ে রেখেছি।
– ওহ আচ্ছা। তাহলে সেই আপনাদের আমল থেকে দেবতারা সহ যে যুদ্ধে লিপ্ত হত! আপনি কখনো প্রতিবাদ করেন নি কেন? একজন শিক্ষিত বিবেকবান চরিত্র কখনো যুদ্ধ বিগ্রহ পছন্দ করে না! আপনি এগুলো প্রতিরোধ করতে আন্দোলন করেন নি কেন?
– এগুলো আমার ডিপার্টমেন্টের আওতায় না।
– বাহ দেবী! এই আপনার বিবেকের শিক্ষা? আমি তো ডাক্তার নই, অসুস্থ ব্যক্তিকে হাসপাতালে আমি কেন নেব? অনেকটা এই রকম তাই না?
– তুই তো বেজায় বদ। তুই আমার সন্তান হতে পারিস না। কে তুই? নাম কি তোর?
– জীহান রানা।
– কিহ! তুই মুসলিম না খ্রিস্টান!
– কেন দেবী, এতক্ষণ কথা বললেন, বুঝতে পারেন নি কোন ধর্মের ? কপালে সিল নিতে হবে?
– বুঝেছি তুই মুসলিম।
– এইতো লাইনে আসছেন দেবী। গুগল সার্চ করে আমার ধর্ম নিয়ে বাণীগুলো পইড়েন সময় করে। তাহলেই বুঝবেন আমি আদৌ কোন ধর্মের কি না!
– এখনো সময় আছে, ফিরে আয়।
– জ্বী, ফিরব। যেদিন দেখব আপনার ডিপার্টমেন্টে আপনার বদলে একজন বিজ্ঞানী এসেছেন, যেদিন দেখবো একজন শিক্ষিত চরিত্র যে যুদ্ধ বিগ্রহের বিপক্ষে প্রতিবাদ করার সাহস রাখে, যেদিন দেখবো ডিপার্টমেন্টভেদে সবাই মানবপ্রেমী হয়ে ওঠেছে, সেদিন ফিরে আসবো। সে পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করুন দেবী।
ঔঁ শ্রী বোক্সত্যৈ নমঃ ….

[অতঃপর তাড়াতাড়ি ঘর হইতে দেবীর প্রস্থান]

(প্রথম প্রকাশিত: ২২জানুয়ারী,২০১৮)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “দেবী দর্শন!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

22 − 14 =