আশার আলো

সকাল ৮.৩২ মিনিট। বিষন্ন মনে থানার অভ্যর্থনা কেন্দ্রে বসে আছি— আমি আর মজুমদার সাহেব। গত রাতে তার ফোন সহ মানিব্যাগ রুম থেকে চুরি হয়ে গেছে। যে চুরি করেছে, বাসার সি সি ক্যামেরায় তার ভিডিও পাওয়া গেছে— চেহারা বোঝা যায় অনেকটা। তবে সমস্যা হল আশেপাশের কেউ চিনে না তাকে। অবশ্য প্রফেশনাল চোররা নিজেদের এলাকায় চুরি করে না সচরাচর— ইনফরমেশন কালেক্ট করে অন্য এলাকা থেকে চুরি করে। এই ব্যাপারে প্রফেশনাল চোর এবং সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অফিসারদের মধ্যে আমি ভীষণ মিল খুঁজে পাই। দুই দলই ইনফরমেশন কালেক্ট করতে পটু।

যাইহোক এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত ফোন চুরি হল মজুমদার সাহেবের। বছর দুয়েক আগে ফোন চুরি হল তার পকেট থেকে। সন্ধ্যায় নিউ মার্কেট থেকে আসার পথে গাড়িতে ভীষণ ভিড় ঠেলে উঠেছিল সে এবং তারপর একজন এক্সপার্ট চোর দিব্বি তার পকেট থেকে ফোনখানা নিয়ে উধাও। যখন হুশ হয়েছে যে পকেটে ফোন নেই, ততক্ষণে চোর বহুদূর! সাথে সাথে বাস থেকে নেমে ভীষণ আশা নিয়ে মজুমদার সাহেব গিয়েছিল থানায়। দাদারা ঘটনা শুনে হেলতে দুলতে, আস্তে ধীরে একখানা ফরম ধরিয়ে দিয়ে বলছে পূরণ করতে। প্রথমবার লিখতে গিয়ে ভুল হল— আবার নতুন করে কাগজ দেয়া হল। মজুমদার সাহেব শক্ত মানুষ, দ্বিতীয়বারের মত ফরম পূরণ করল। আমি হলে কখনোই আশা করতাম না, লিখতামও না। কেন লিখব, কিভাবে লিখব, সদ্য ফোন হারানো মানুষের মানসিক অবস্থা কেমন থাকে তা জানা নেই তাদের! সামান্য আশা দিয়ে অন্তত সাময়িকের মেন্টাল ট্রমা থেকে বের হতে সাহায্য তো দূর বরং আমাকেই লিখতে বলবে! কেন তারা কয়েক লাইন লিখে দিলে কি ক্ষতি! শেষে ফরম জমা নিয়ে বলল কিছু হলে জানাবে। আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি তারপর। আমি শিওর ওই থানার আশেপাশের ঝালমুড়িওয়ালার পিছনে লেগে থাকলে কোন একদিন মজুমদার সাহেবের গুটি গুটি লিখাওয়ালা জিডির কাগজটা পাওয়া যেত। গতকাল রাতে দ্বিতীয়বারের মত ফোন হারানোর পর আজ সকালে মজুমদার সাহেব আবার ভীষণ আশা নিয়ে বললেন,
– একটু থানায় যাব। যাবি আমার সাথে?
– তাতে কি লাভ হবে?
– লাভ ক্ষতি জানি না, মনকে শুধু সান্ত্বনাটা দিই, অন্তত চেষ্টা করি!
– যাব।

অবাক হয়ে ভাবছিলাম, মানুষ কি অদ্ভুত! মজুমদার সাহেব খুব ভালো করেই জানেন যে এটা একটা অসম্ভব ব্যাপার। তার বড় মাপের কোন রেফারেন্স নেই যে তার বিশ হাজার টাকার ফোনটা খুঁজতে দাদারা পরিশ্রম করবে। কিন্তু সব জানার পরও কত আশা। তার আশা দেখে আমার সত্যি মনে হচ্ছিল, ইস! আজ যদি সত্যি মানুষের আশা পূরণ করার জন্য পুলিশ থাকত! কিংবা আমি যদি পুলিশে থাকতাম, অবশ্যই মজুমদার সাহেবের ফোনটা ফিরিয়ে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতাম। ইদানিং মাঝে মাঝেই ভাবি, পুলিশে যোগ দিলে কেমন হয়? আমি! পুলিশ! কথাটা মনে হলেই ভীষণ হাসি। শেষবার পুলিশের কাছে আটক হয়েছিলাম ২০১৩ সালে। সেবার কানে ধরে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবনে আর কোনদিন পুলিশ আমাকে আটক করতে পারার মত স্কোপ খুঁজে পাবে না। এখন অবশ্য কথা ভিন্ন, আমার এই লিখাটার করণে কাল আমি আটক হয়ে যেতে পারি— কোন ব্যাপারই না। বুঝলেন, বাংলাদেশে এখন আর আটক হতে স্কোপ লাগে না, দাদাদের ইচ্ছেই যথেষ্ট। তা যাই হোক, যতই হাসি— আমার উচিত পরিবর্তনের চেষ্টা করা। এমন চিন্তা আসার পেছনে একজনের প্রভাব আছে। আমার কাছের এক বন্ধু, “মৌ” যতটা পাগল গোছের তার চাইতেও বেশী কবি গোছের মানুষ। এই তে সেদিন কথা, ভিডিও কলে দুঃখ করতে করতে বললাম,
– দেশ ছেড়ে চলে যাব রে মৌ! আর ভালো লাগছে না এই অসহায় সমাজটাকে।
– পালিয়ে যাবি তুই?
– ধরে নে তাই গেলাম।
– শোন, এসব কাপুরুষের মত কথা তোর মুখে মানায় না। তুই এখনো জোয়ান, এই তো সময় পরিবর্তনের চেষ্টা করার, ভূমিকা রাখার। যাদের এই সমাজটা বদলানোর কথা তারাই যদি দেশ ছেড়ে পালায় কাপুরুষের মত, তো দেশটার কি হবে?
কথাটা যেখানে আঘাত করেছিল সেখানটা ছুয়ে দেখা যায় না, শুধু তার গর্জে উঠার আওয়াজ শোনা যায়। আর এই পরিবর্তনে ভালো রকমের ভূমিকা রাখতে হলে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রির প্রোডাকশন বাড়ানোর কাজ করা যাবে না— প্রশাসনে যোগ দিতে হবে। তাই ইদানিং লজ্জা লাগলেও পুলিশে যোগ দেয়ার কথা ভাবি।
অবশেষে ডাক পড়ল আমাদের, ডিউটি অফিসার একজন মহিলা। তিনি বললেন,
– কি সমস্যা আপনাদের?
– ফোন আর মানিব্যাগ চুরি হয়েছে।
কথাটা শুনে সে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
– কই থেকে? কবে? কিভাবে? আপনারা কি করেন?
তার হাসি দেখে মনে হচ্ছিল আমার সামনে ব্যাটসম্যানের জোকার বসে আছে। এখনি হয়তো আস্তে আস্তে কাছে এগিয়ে এসে বলবে, “হোয়াই সো সিরিয়াস!”
সব খুলে বললাম। শুনে বলল, আপনারা অপেক্ষা করুন। তার পাশে বসে থাকা একজনের দিকে ইশারা করে বলল, উনি আপনাদের অভিযোগ লিখে দিবেন। বলেই মহিলা উঠে চলে গেলেন। প্রথমে মহিলা অফিসারের উপর সামান্য রাগ হলেও পরে ভাবলাম, থাক! সারা রাত জেগে বসে আছে, অন্তত তার তো কোন অতিরিক্ত অবৈধ ইনকাম নেই— না হয় একটু হেসেছেই!

বাইরে ছোটখাট একটা জটলা, কয়েকজন কনস্টেবল কি নিয়ে যেন কথা বলছে, হাসাহাসি করছে। লক্ষ্য করলাম অফিসার মহিলা তাদের সামনে গিয়ে কি যেন বলল, তাদের হাসি আরও বেড়ে গেল। তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, ম্যাডাম আমাকে অনেক ভালোবাসে। সবাই আরও পূর্ণ উদ্যেমে গসেপিং শুরু করল। এক পর্যায়ে অফিসার মহিলা উচ্চস্বরে বলল, হ্যাঁ আজকে তো ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস— ভালোবাসিই তো।

আচ্ছা, আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি! যাহ, গতকাল মজুমদার সাহেবের ফোন হারানোর শোকে দেখি কিচ্ছু মনে নেই আমার! থানায় না আসলে তো জানতেই পারতাম না যে আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তা যাই হোক, কি যায় আসে! পুঁজিবাদী সমাজে এসব দিন হল এক রকম ব্যবসা। মনে থাকলেই কি না থাকলেই কি!
যে আমাদের অভিযোগ লিখে দিবেন তার সামনে একজন মহিলা বসা, সাথে একটা বাচ্চা ছেলে আছে। উনার পর আমাদের সিরিয়াল। লোকটা মহিলার কথা শুনছে আর একটু পর পর ওয়ারলেসে বিভিন্ন সাংকেতিক কথা বলছে। আমি একটু ধৈর্য ধরে মহিলার কথা শোনার চেষ্টা করলাম। লক্ষ্য করলাম সে ভীষণ দুঃখ নিয়ে বলছে,
“আমার স্বামী আমারে সিগারেট দিয়ে ছ্যাঁকা দেয় শরীরে। প্রতিদিন বাড়ি ফিরা মারধর করে। আমারে আর সহ্য অয় না অহন তার। এ পর্যন্ত তিনবার আমার মাতা ফাটাইছে।”কথাটা শেষ করেই মহিলা আমার দিকে একবার তাকাল, আমি অবাক হয়ে দেখলাম তাকে। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রং, কত সুন্দর চেহারার গড়ন, এই পাবলিক বড় লোকের মেয়ে হলে কত পুরুষই না তার পিছে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে মরত! হয়তো এসবের সুযোগ নিয়ে কত পুরুষকে ঠকাতো সে! অথচ শুধুমাত্র অশিক্ষা, দারিদ্রতা আজ তাকে এতটা অসহায় করে দিয়েছে। যাইহোক মনে হল তার কথা শেষ হয়েছে— সামনে বসে থাকা পুলিশ তার কথা অনুযায়ী নোট করে নিয়েছেন সব। এবার অসহায় মহিলাটি উঠতে যাচ্ছে এমন সময় সামনে থাকা পুলিশ তাকে দুইশো টাকা দিতে বলল। বলল টাকাটা দিতেই হবে, ডিউটি অফিসার যে মহিলা সে একটা সাইন করতে নাকি ১০০ টাকা নেয়, আর বাকীটা লিখে দেয়ার জন্য সে নিবে। একটা সাইনের দাম ১০০! অথচ একটু আগেই ভাবছিলাম হয়তো ওই মহিলার কোন অতিরিক্ত অবৈধ ইনকাম নেই— কি ভুলটাই না ভেবেছিলাম! সত্যি সে ওই অসহায় মহিলার কাছ থেকে টাকাটা নিল হাত পেতে, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এই অসহায় মহিলার থেকে নেয়া টাকা যাদের অন্ন যোগাতে খরচ হবে, তাদের ক্ষুধা কোনদিন মিটবে না। হলফ করে বলতে পারি, এই ক্ষুধা তাদের একদিন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিবে। এবার আমাদের পালা। প্রথমেই সে পরিষ্কার জানিয়ে দিল চেষ্টা করা হবে তবে শিওরিটি নেই। আর অভিযোগ করলে মামলা নিবে কি না তারও গ্যারান্টি নেই, প্রতি মাসে নাকি পাঁচ হাজার শুধু মোবাইল চুরির ঘটনাই ঘটে। এত মামলা নেয়া নাকি সম্ভব না! তাই সে বুদ্ধি দিল এসব সি সি টিভির ফুটেজ বাদ দিয়ে হারানো গেছে উল্লেখ করে জিডি করতে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অবশেষে মজুমদার সাহেব বললেন,
আচ্ছা জিডিই করুন। অন্তত জিডির কপি নিয়ে গেলে আমি পরিচয়পত্র আর এটিএম কার্ডটা তুলতে পারবো।
পুলিশ লোকটি তখন হাত দিয়ে ইশারা করে চুপ থাকতে বললেন। ততক্ষণে তার পাশে একজন কনস্টেবল এসে দাঁড়িয়েছে, সে তাকে ভীষণ গুরুত্ব দিয়ে বুঝিয়ে বলছে,
আজ খাদ্য মন্ত্রী আসবেন আমাদের এরিয়া দিয়ে। ১৬ টার সময় তিনি রওনা হবেন, তাকে রিসিভ করে আনতে হবে। তিন গাড়ি পুলিশ যেতে হবে।
মিনিট পাঁচেক লাগল তার কথা শেষ হতে। তারপর সে বলল, এবার বলুন কি করবেন। মজুমদার সাহেব পুনরায় বললেন,
জিডি করব— লিখুন হারানো গেছে, সমস্যা নেই।
লোকটি এবার বিভিন্ন তথ্য নিয়ে লিখল। তারপর টাকা নিল। আমি পুরোটা সময় তাকিয়ে রইলাম অবাক নয়নে— চুপ করে।
থানা থেকে বের হয়ে মজুমদার সাহেব একখানা ব্যানসন ধরিয়ে বেশ জোরে টান দিতে দিতে বলল,
বুঝলি এখানে টাকা ছাড়া কিছু হয় না। এখানে অভ্যর্থনা কেন্দ্রে টাকার বিনিময়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়।
মজুমদার সাহেবের কথা শেষ না হতেই বললাম, আমি পুলিশে যোগ দিব।
হাসতে হাসতে মজুমদার সাহেব বললেন, ঢুকে যা খুবই দরকার তো। অন্তত আমরা তোর সুবাদে তখন কিছুটা হলেও রেহাই পাবো।
আমি চুপ করে রইলাম। দেখতে দেখতে ততক্ষণে ১০ টার বেশী বেজে গেছে। সূর্যের তাপ গায়ে লাগছে, সামান্য ভালো লাগছে। ভীষণ অন্ধকারের মাঝেও যেন একটুকু আলোর দেখা পাচ্ছি— এই আলোটা একসময় চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। সামনে বহু পথ পাড়ি দিতে হবে, বহুদূর যেতে হবে আমাকে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “আশার আলো

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 3