ঢাকা : মৃত্যুর শহরে বাঁচার লড়াই

এক
ঢাকা শহরটার দিকে তাকালে আমার খুব অবাক লাগে! দুনিয়ায় এইরকম ক্যাপাবল সিটি আর একটাও নাই। ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষকে কনটেন্ট করে আছে সে। পুরা নেদারল্যাণ্ডের (আয়তন প্রায় বাংলাদেশের সমান) জনসংখ্যা হচ্ছে ১ কোটি ৭০ লাখ! বিশ্বব্যাংকের প্রেডিকশন- ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা হবে সাড়ে ৩ কোটি। পুরা কানাডায় (আয়তনে ৭০ টা বাংলাদেশের সমান) বাস করে সাড়ে ৩ কোটি। এই ঢাকা শহরকে যত দেখি অবাক হই। এখানে মানুষ গিজগিজ করে, এখানে সবকিছুই গিজ গিজ করে। ভার্সিটি, স্কুল, সরকারি অফিস, ক্যান্টনমেন্ট, বাড়িঘর, কলকারখানা, গুদাম, মার্কেট, শপিং মল, কাচা-পাকা বাজার, গার্মেন্টস, রিকশা, মিনি-মাইক্রো বাস, বাস স্ট্যাণ্ড, টার্মিনাল, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বস্তি, ফ্লাইওভার, কনস্ট্রাকশন … সবই গিজগিজ করে! কিন্তু তারপরেও কি সুন্দর সব চলে যাচ্ছে,- কোনকিছুতেই শহরটার কোন ছেদ্ভেদ নাই- এইখানে বাস করা মানুষদেরও কোন ছেদ্ভেদ নাই …

দুই
ঢাকা শহরের মধ্যে আবার অনেকগুলো শহর আছে। এই যেমন- মিরপুর। কিংবা এই যেমন- গুলশান-বনানী। এই যেমন ধানমণ্ডি। সেইরকমই শহরের ভিতর শহর হইতেছে- পুরান ঢাকা। দুনিয়ার মধ্যে ঢাকা যেইরকম, ঢাকার ভিতরে পুরান ঢাকা সেইরকম! পুরান ঢাকার আবার আলাদাভাবে আছে- ঐতিহ্য। সেইটা আরেক কাঠি সরেস জিনিস। খানাপিনার ঐতিহ্য, ব্যবসাপাতির ঐতিহ্য, ঘিঞ্জি ঘরবাড়ি- পাড়ামহল্লার ঐতিহ্য, বাসাবাড়িতেই ফ্যাক্টরি-গুদামের ঐতিহ্য! রাস্তাগুলো এমনই চিপা যে- আগুন ধরলে- সব রাস্তায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারবে না, এমন কোন রাস্তা নাই- যেইখানে বিপরীত দিকের চলাচল বন্ধ না করে- ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলতে পারবে! “ভাগ্য ভালো” যে, নিমতলী- চকবাজারের আগুন রাতেই ধরেছে!

তিন
হ্যাঁ- ব্যাপারটা পুরাটাই ভাগ্যের উপরেই। ঢাকা শহর- কিংবা পুরান ঢাকার যাবতীয় কেরামতি ঐ ভাগ্যদেবতারই দান! স্বাভাবিক যুক্তি বুদ্ধিতে এই ঢাকা শহরের টিকে ও বেঁচে থাকাটার কোন কারণ পাই না বলেই- ভাগ্যদেবতারে টানি। ঢাকা শহর কিংবা পুরান ঢাকা যে দাঁড়ায় আছে- সেইটারে অলৌকিক বলে স্বীকার না করে উপায় নাই! ভূমিকম্পের একটা মোটামুটি মাত্রার ঝাঁকিতেই পুরান ঢাকার ৬০-৭০% বিল্ডিং ধ্বসে পড়বে … কিন্তু মাত্র ২০% বিল্ডিং ধ্বসলেই সেইটা পুরান ঢাকাকে দুনিয়ার মধ্যে স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে বড় মৃত্যুপুরীতে পরিণত করবে। যেই মৃত্যুর মাত্র ৫-১০% হবে তাৎক্ষনিক মৃত্যু- বাকিদের বরণ করতে হবে আহত- অভূক্ত অবস্থার করুণ মৃত্যু- কেননা রেসকিউ কাজ সারতে বছরের উপরে সময় লেগে যাবে। রানা প্লাজার ঘটনায় আমরা জানি- এই ব্যাপারে আমাদের এক্সপার্টিজ শুন্যের কোঠায়- কিন্তু সেজন্যে বলছি না। পুরান ঢাকার গঠনটা এমন যে- দুনিয়ার সমস্ত এক্সপার্টিজ এনে হাজির করা হলেও- আটকে পড়াদের ধারেকাছে সহসা পৌছানো সম্ভব হবে না!

চার
তো এই হচ্ছে- পুরান ঢাকা। এই হচ্ছে- ঢাকা শহর। মানুষে- অমানুষে গিজগিজ করা শহর। অমানুষরা দেশটা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন; এবং তারাই পুরান ঢাকা সহ ঢাকা শহরকে আল্লাহর ওয়াস্তে আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। পুরান ঢাকার রাস্তা বড় করা, ঝুকিপূর্ণ বিল্ডিংগুলো ভেঙ্গে ফেলা-সহ হাজারও পরিকল্পনা, হাজারো সুপারিশ, হাজারো গবেষণা- সবকিছুই এই অমানুষেরা ঢেকে রেখে দিয়েছেন! খুব ভালো কথা! এট লিস্ট- এত্ত এত্ত মানুষ আর ভয়ানক বিপজ্জনক কারখানা- গুদামগুলোর সহ-বাস বন্ধ করে ইমিডিয়েট ঝুকি থেকে মানুষগুলোকে বাঁচানোর উদ্যোগ তো নেয়া যেত! না, সেইটাও নেয়া হয়নি। নিমতলীর ঘটনার পরেও নিদেন রাসায়নিক গুদামগুলো সরানো হয়নাই। চকবাজারের পরেও হবে না- কেননা অমানুষদের কিছু হর্তাকর্তারে (মন্ত্রী পদস্থ) বলতে শুনলাম- পুরান ঢাকায় নাকি কোন রাসায়নিক গুদাম নাই, কোন রাসায়নিক কারখানাই নাই! যেইখানে পুরান ঢাকারে কিছুটা গড়ে পিঠে সাইজ করা, সামান্য বাসযোগ্য করে তোলা বিশাল কঠিন এবং মহাপরিকল্পনা ও মহাকর্মযজ্ঞের ব্যাপার- সেইখানে মহামান্য অমানুষেরা সব অস্বীকারের লাইনে হাটছেন!

পাঁচ
এই হচ্ছে পুরান ঢাকা। এই হচ্ছে ঢাকা শহর। ৭৫- ১০০- ২০০- ১২০০-২০০০ -এগুলো কেবলই সংখ্যা। পোড়া মানুষগুলো কিংবা ধ্বংসস্তুপে থাকা মানুষগুলো তাই ঢাকার চলার পথের বাঁধা হয় না। ঢাকা চলতে থাকে। কোন ছেদ্ভেদ ছাড়াই। ঢাকার গিজগিজে মানুষদেরও কোন ছেদ্ভেদ ঘটে না। ঢাকার বাতাসে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিষ, ঢাকার জনজট দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ানক, ঢাকার নাগরিক ঝুকি দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি, ঢাকার নাগরিক সুবিধা দুনিয়ার মেট্রোসিটিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম … হওয়ার পরেও- মানুষদের কোন ছেদ্ভেদ নাই। একটু শোক- একটু মাতম আছে কি নাই- তারপরেই সব যেযার মত চলতে থাকে। থমকে দাঁড়ানোর ফুসরত কই? প্রতিবাদ করার আগ্রহ কই? একটু নিরাপদে বাঁচতে চাওয়ার দাবি তোলার ভাবনা কই? হাহ, সবই আল্লার ওয়াস্তে আল্লার হাতে ছেড়ে দেয়া!

ছয়
অমানুষগুলারও কোন ছেদ্ভেদ নাই- তারাও উন্নয়নের গল্প শুনায়; সবকিছুই উন্নয়নের যুক্তিতে ছাড় পেয়ে যায়। যানজট বাড়ছে? – ‘এটাই প্রমাণ করছে- অনেক উন্নয়ন হচ্ছে’। বাতাসে বিষ?- ‘উন্নয়নের কিছু বাই-প্রোডাক্ট তো থাকবেই’! তাজরীন- নিমতলী- রানা প্লাজা – চকবাজার সমস্ত হত্যাকাণ্ডই কি তাহলে উন্নয়নের বাইপ্রোডাক্ট? হ্যাঁ, কোনটাই দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড। নাহ- স্রেফ হত্যাকাণ্ডও তো নয়- এইসবই গণহত্যা। উন্নয়নের বাইপ্রোডাক্ট কি এইসব কাঠামোগত গণহত্যা? নাকি- প্রোডাক্ট? উন্নয়নের প্রোডাক্ট কি তবে? জিডিপি? ফ্লাইওভার? মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া? গণতন্ত্র হত্যা- স্বৈরশাসন? দুর্নীতি- কালোবাজারি, ব্যাংক ডাকাতি? – ‘নাহ! ওগুলোও বাইপ্রোডাক্ট’! মানে- স্বৈরশাসন-দুর্নীতি-ব্যাংক ডাকাতি-প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংস- এবং এইসব কাঠামোগত গণহত্যা- সবই তাইলে বাইপ্রোডাক্ট? ‘হ্যাঁ, বাই প্রোডাক্ট- তাই ভুলে যাও- ভুলে থাকো’। অমানুষেরা তাই বলছেন, তাই শোনাচ্ছেন। আমরা শুনে যাচ্ছি …

সাত
অমানুষরা কিন্তু খুবই দয়ালু, বিবেকবান। নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পরে একটাও রাসায়নিক কারখানা-গুদাম না সরলেও- অগ্নিকাণ্ডে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত এক পরিবারের তিন কন্যা প্রধানমন্ত্রীর কন্যা হয়ে যান, তাদের বিয়ে দেয়া হয়। সারাদেশে এমন মহানুভবতায় ধন্যি ধন্যি পড়ে যায়! মিডিয়ায় ৬-৮ বছর পরেও সেই তিনকন্যার খবরাখবর ছাপা হয়- তিন কন্যার নতুন মা- এখনো তাদের খোজঁখবর রাখেন, প্রতি ঈদে আম-খেজুর পাঠান, জামা দেন- এমন খবর ছাপা হয়। আমরাও ধন্যি হই, বিগলিত হই। তারপরে ভুলে যাই- অন্যসব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কথা। চকবাজারের ঘটনায় নিহত-আহতদের যারা শ্রমিক তারা ১ লাখ ও ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পাবে বলে- আরেক অমানুষ (মন্ত্রী পদস্থ) জানিয়েছে। আহা, কি অসীম দয়া ওনার!

আট
এই হচ্ছে ঢাকা শহর। স্ট্যান্টবাজ মহানুভব, দয়ালু অমানুষে গিজগিজ ঢাকা শহর। মানুষে- অমানুষে গিজগিজ। ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে যখন মানুষগুলো পুড়ছে- তখন অমানুষেরা শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। ঢাকা মেডিকেলের মর্গে যখন পোড়া কালো শরীরগুলো জমা হচ্ছিল- তখন শহীদ মিনার গিজগিজ করছিলো- রঙ বেরঙের ফুল হাতে মানুষেরা। ঢাকা শহরের মানুষ। রফিক- জব্বার-সালামের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন? ৫২-এর শহীদদের জন্যে শোক করতে এসেছেন? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গর্বে গর্বিত হতে এসেছেন? দমবন্ধ হওয়া শহুরে জীবনে উৎসবের আনন্দে মাততে এসেছেন? আচ্ছা ৬৭ বছর আগের ভাইরের রক্তের কথা ভুলিতে না পারা মানুষগুলোর নাকে কি ১০০গজ দূরে থাকা পোড়া ভাইয়ের পোড়া গন্ধ ভেসে আসেনি? মায়ের ভাষায় কথা কইতে চাই-এই দাবিতে প্রাণ দেয়া ভাইদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো কি সম্ভব, আজকে বাঁচার দাবি না তুলে? আচ্ছা, ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে বা প্রভাতফেরিতে জমা হওয়া গিজগিজ করা মানুষদের দল যদি চিৎকার করে বলতো- বাঁচার মত বাঁচতে চাই, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই; কাঠামোগত গণহত্যার অবসান চাই- হত্যাকারীর বিচার চাই; তারা যদি সমস্বরে গাইতো- আমার ভাইয়ের পোড়া গন্ধে একুশে ফেব্রুয়ারি – আমি কি ভুলিতে পারি; তাইলে সেই আওয়াজ কতদূর যেত? রফিক, বরকত, সালাম, জব্বার অবধি পৌছানোর কোন উপায় নেই- কিন্তু যদি পৌছতো, সন্দেহ নেই- সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন তারা!

নয়
এই হচ্ছে ঢাকা শহর। মারাত্মক সহনশীল, ধৈর্যশীল। ছেদ্ভেদ হীন। মানুষগুলোরও সহনশীলতা, ধৈর্য প্রায় অসীম পর্যায়ের। তাই কোনকিছুতেই বিশেষ কোন ছেদ্ভেদ দেখা যায় না। প্রতিক্রিয়া বলতে কিছু আহা উহু ইশ- উশ করা, কাছাকাছি থাকলে কাহিনী দেখার জন্যে গিজগিজ করে ভিড় জমানো, আর কয়েকটা দিন শোক করা। এখন এই প্রযুক্তির যুগে তার সাথে যুক্ত হবে- ফেসবুকে জ্বালাময়ী কয়েকটা স্ট্যাটাস প্রসব করা আর টিভি চ্যানেলে টকশো’ মেরে মেরে মুখে ফ্যানা তুলে দেয়া। ব্যস! তারপর? যে আর সেই! পরবর্তী ঘটনার জন্যে অপেক্ষা! ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষের তুলনায় ৭৫-১০০ টা মানুষ আর কতই! এ যেন সাগরের পানি থেকে এক মুঠো বা এক বালতি পানি নিয়ে নেয়ার মতই- সাগরের কিছুই যায় আসে না …

দশ
তারপরেও, এই হচ্ছে ঢাকা শহর। ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষে গিজগিজ করা শহর। ২০৩৫ সালে সাড়ে ৩ কোটি মানুষ গিজগিজ করবে। আশায় থাকি- একদিন হয়তো এই অসীম সহনশীল মানুষদের সহনশীলতা ভাঙবে, যেমনটা ভয়ে থাকি- ঢাকা শহরেরও সমস্ত সহনশীলতা- ধৈর্য- সমস্ত বাঁধই কোন একদিন না ভেঙ্গে পড়ে! তাই- উপায়হীন হয়েই আশায় থাকি- মানুষগুলোর সহনশীলতা ভেঙ্গে যাক আগেই। শুধু চিন্তা করে দেখেন- ঢাকার ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ যদি একসাথে চিৎকার করে ওঠে- সেই শব্দ দুনিয়ার এমন কোন প্রান্ত আছে যে শোনা যাবে না? এই ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ যদি সব একসাথে জোরে করে একটু ফু-ও দেয়, গণভবন- বঙ্গভবন- সংসদ ভবন – সচিবালয় – ক্যান্টনমেন্ট থেকে শুরু করে সমস্ত অমানুষদের আখড়াগুলো কোথায় উড়ে চলে যাবে, ভাবুন! চিন্তা করি, ভাবি, দিবাস্বপ্ন দেখি আর লোভ হয় … তাই আশাও ছাড়তে পারি না ….

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 + = 36