ইসলামের অজানা অধ্যায় (পুনরারম্ভ): ইসলাম ও মুসলমান

‘ইসলাম’ ও তার প্রবর্তক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বানী, শিক্ষা ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা-কারীদের বিরুদ্ধে অধিকাংশ ইসলাম বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা যে কী পরিমাণ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, গালিগালাজ, শাপ-অভিশাপ, বিদ্বেষ ও এমনকি মৃত্যু-হুমকি প্রদর্শন করেন; তা আমরা প্রতিনিয়তই প্রত্যক্ষ করি। পৃথিবীর যে কোন মুসলিম প্রধান দেশে মুহাম্মদ ও তার মতবাদের ‘সামান্যতম’ সমালোচনা করার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। তা সেই সমালোচনাটি যতই তথ্য-নির্ভর, প্রামাণিক ও যৌক্তিকই হউক না কেন! পদে পদে মৃত্যু হুমকির আশংকা। সমালোচনা-কারীর কণ্ঠ ও লেখনী স্তব্ধ করে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পীড়ন যন্ত্রের মাধ্যমে। অন্যদিকে, পৃথিবীতে অসংখ্য তথাকথিত মোডারেট সাধারণ মুসলমান আছেন, যারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, ইসলাম ও নবী মুহাম্মদের সমালোচনা-কারীদের বিরুদ্ধে এ সকল কর্মকাণ্ড কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সমালোচনার জবাব সহিংসতা বা উগ্রতার মাধ্যমে নয়, তা হতে হবে শালীন, তথ্য-নির্ভর ও যৌক্তিক। নিশ্চিতরূপেই এই দুই দল ইসলাম বিশ্বাসীদের বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী।

সুতরাং, এই নির্দিষ্ট বিষয়ে ‘ইসলাম’ এর সঠিক শিক্ষা ও অনুশাসন প্রশ্নে মুসলমানদের এই দুই দল একই সাথে কখনই সত্য হতে পারে না। এই দুই দলের যে কোন এক দলের বিশ্বাস ও আচরণ ‘ইসলাম’ সম্মত, অন্য দল বিরুদ্ধবাদী। ইসলামের ভাষায়, ‘ইসলাম’ এর সঠিক শিক্ষা-অনুশাসন পালনকারী দলের সদস্যরা হলেন ‘মুসলিম’, বিরুদ্ধবাদীরা হলেন ‘মুনাফিক!’

“ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হলো স্ব-ঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্ব-রচিত ব্যক্তি-মানস জীবনী-গ্রন্থ ‘কুরআন।’ মুহাম্মদ তাঁর মতবাদে অবিশ্বাসী ও সমালোচনা-কারীদের বিরুদ্ধে যে কী পরিমাণ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, গালিগালাজ, শাপ-অভিশাপ, বিদ্বেষ, হুমকি-শাসানী-ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতার আদেশ ও মৃত্যু হুমকি প্রদর্শন করেছিলেন, তার সাক্ষ্য ধারণ করে আছে তাঁরই জবানবন্দি কুরআনের পাতায় পাতায়, অসংখ্য বানীতে। আর তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সবচেয়ে আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই বর্ণিত মুহাম্মদের জীবনী-গ্রন্থ (‘সিরাত’) ও হাদিস গ্রন্থের অসংখ্য ঘটনার বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, মদিনায় নবী জীবনে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তা কার্যকর করেছিলেন “নিজ হস্তে।” মুহাম্মদের শিক্ষা ও নির্দেশ অনুসরণ ও প্রতিষ্ঠা করা জগতের প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসীর জন্য অবশ্য কর্তব্য।”

সাধারণ মুসলমানদের অধিকাংশই ‘কুরআন’ ও আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই রচিত ‘সিরাত ও হাদিস’ গ্রন্থে স্পষ্ট নথিভুক্ত এ সকল ইতিহাস সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এর কারণ হলো, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মুসলমানদের কাছ থেকে যুগে যুগে এই ‘সত্যগুলো’ আড়াল করা হয়েছে এবং হচ্ছে। ইসলামের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন সত্য প্রকাশের পরিবেশ ‘ইসলামী আইনে’ কোন কালেই ছিল না, এখনো নাই; “মৃত্যুদণ্ডই” সে অপরাধের একমাত্র শাস্তি। গত ১৪০০ বছর ধরে মুহাম্মদ-কে আড়াল করে রাখা হয়েছে তার শৌর্য-বীর্য- বীরত্ব-মহানুভবতার কাব্য কাহিনী রচনা, বক্তৃতা-বিবৃতিতে।

বেশ কিছু দিন আগে, বহুবছর পর দেখা হওয়া আমার এক ডাক্তার বন্ধুকে যখন প্রাসঙ্গিক এক আলোচনায় বললাম যে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রায় সব ধর্ম প্রতিষ্ঠার পিছনে হাজারো মানুষ খুনের ইতিহাস জড়িত। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার জবাব, “একমাত্র ইসলাম ছাড়া।” অতঃপর তাকে যখন কুরআন ও ইসলামের আদি উৎসের ‘সিরাত’ ও হাদিস-গ্রন্থের বেশ কিছু রেফারেন্স দিলাম, তখনও সে দ্বিধান্বিত। নিশ্চিতরূপেই আমার বন্ধু আজিবর রহমান (ছদ্ম নাম) ইসলামের ইতিহাসের এ সকল স্পষ্ট নথিভুক্ত ‘রেফারেন্সগুলো’ কখনোই শোনে নাই। আজিবর কোন অশিক্ষিত বা অল্প-শিক্ষিত মানুষ নন। তার পেশায় সে একজন সুনাম ধন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নামাজী, হাজি ও বাজারে সহজলভ্য ইসলামী বই-পুস্তক নিয়ে পড়াশুনাও করেন।

আজিবর রহমানের মত পৃথিবীতে কোটি কোটি মুসলমান আছেন, যারা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে ‘ইসলামের’ প্রকৃত শিক্ষাটি কী তা না জেনেই মুক্ত-চিন্তা ও বিবেকের চর্চা করেন। আবার অনেকেই আছেন, যারা তা জানা থাকা সত্বেও ইসলামের সেই নীতিগুলো অনুসরণ না করে মানবিকতা ও মুক্ত-চিন্তার চর্চা করেন। কিন্তু বিভিন্ন পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন যন্ত্রের শিকার হওয়ার ভয়ে প্রকাশ্যে কোনরূপ উচ্চ-বাচ্য করার সাহস করেন না। সে কারণেই, কোন বিশেষ ধর্ম ও তার শিক্ষার সমালোচনা করতে গিয়ে সেই ধর্মের অনুসারী “সকল মানুষের” বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে কোন নেতিবাচক মন্তব্য গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে না। একই ভাবে, দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী নির্বিশেষে পৃথিবীর যে কোন সম্প্রদায়ের “সকল মানুষের” বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে যে কোন ধরনের কটূক্তি অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই আছে ভাল-মন্দ, জ্ঞানী-গুণী ও মুক্ত-চিন্তার মানুষ। আমাদের এই চলমান সভ্যতার অগ্রগতি ও সফলতার পিছনের কারিগররা হলেন কোটি-কোটি মুক্ত-চিন্তার বিবেকবান মানুষ, যারা বসবাস করতেন ও করেন পৃথিবীর প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে। পৃথিবীতে এমন কোন সম্প্রদায় হয়তো কখনোই ছিল না, যেখানে এই মানুষগুলো ছিলেন একেবারেই অনুপস্থিত। সে যাই হোক, অনুসারীদের প্রতি মুহাম্মদের (আল্লাহর) ‘শেষ নির্দেশ’ এবং ‘চূড়ান্ত নির্দেশ চূড়ান্ত শিক্ষা’ সম্পর্কে অধিকাংশ তথাকথিত মোডারেট মুসলমানরা আজিবরের মতই। আমি নিজেও ছিলাম তাঁদেরই একজন।

>>> গোঁড়া মুসলমান পরিবারে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ছোট বেলায় নামাজ না পড়লে বাবা-মা রুষ্ট হতেন। গ্রামের ছেলে। শৈশব মফস্বল শহরে। মফস্বল শহর থেকে মাধ্যমিক ও জেলা শহরের নামী পুরনো সরকারী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে খুবই ভাল রেজাল্ট করে ঢাকায় গেলাম উচ্চ-শিক্ষার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে। ঢাকায় পরিচিত কেউ নেই। দূরের গ্রামের এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয় পড়েন ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে। ঠিকানা জোগাড় করে তাঁর কাছে হাজির হলাম। তিনি ছিলেন তাবলীগের বিরাট নেতা। কাকরাইল মসজিদের ‘মুরুব্বীদের’ সাথে সেই ছাত্র জীবনেই তাঁর ছিল উঠবস। খুবই বিনয়ী, নম্র ও একান্ত ভালমানুষ। তিনি ও তাঁর আরেক তাবলিগী বন্ধু মিলে আমার পিছনে ‘তশকীল’ করলেন তবলীগে এক চিল্লা সময় দেয়ার জন্য। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ, মেডিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু হতে অনেক দেরি। বোঝালেন, “দ্বীনের রাস্তায়” সময় দেওয়ার এটাই সুবর্ণ সুযোগ! যেহেতু আমিও ছিলাম ধর্ম-ভীরু, খুব সহজেই তাঁরা আমাকে প্রভাবিত করলেন। তখন ছিল রমজান মাস। প্রথম বিশ দিন তাঁদের সাথেই একই জামাতে অন্তর্ভুক্ত ছিলাম ঢাকা থেকে অনেক দূরের এক জেলা শহরে। পরের বিশ দিন অন্য এক জামাতে। প্রথম ২০ দিনেই ‘ঈমান’ বেশ মজবুত হয়ে গিয়েছিল। তাই পরের ২০ দিন বন্ধু-বান্ধব-হীন পরিবেশে, সম্পূর্ণ অপরিচিত তাবলিগী ভাইদের সাথে সময় কাটাতে একটু অসুবিধা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ঈমানের জোরে তা উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। জানতাম, আল্লাহর রাস্তায় যে বান্দা যত কষ্ট করে, জান্নাত তার ততই নিকটবর্তী হয়! তাবলীগ জামাতে একাধারে পাক্কা চল্লিশ দিন (এক চিল্লা) সময় লাগানোর পর ঈমান আরও মজবুত হলো। ঈমানের তাগিদে গ্রামের মসজিদের ইমামতী করলাম কিছুদিন। সাথে বে-নামাজীদের আল্লাহর রাস্তায় ফেরানোর জন্য সপ্তাহে দুদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষদের ধর্ম-কর্মে আহ্বান করতাম (‘গাস্ত’)। ইসলামের অনুশাসন যথাযথ পালন না করে এই সমস্ত বে-নামাজী মানুষরা যে দোজখের আগুনে জ্বলবে, এটা ভেবে খুবই খারাপ লাগতো।

তাবলীগে যাবার আগে কুরআন পড়েছি, পড়েও পড়েছি। অবশ্যই তা ছিল আরবিতে। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানদেরই মতই পরম ভক্তি ভরে। নিয়মিত সুর করে তা পড়তাম। কিন্তু তার সবই ছিল তোতা পাখীর বুলি। সুরা ফাতিহা ছাড়া আর কোন কিছুরই অর্থ বুঝতাম না। তার তাগিদ ও ছিল না। অর্থ বুঝে কুরআন পড়ার চেয়ে ‘উচ্চারণ সহি’ করে পড়ার গুরুত্বই ছিল বেশী। “কুল” না বলে গলার ভিতর থেকে “কূ-ঊ-ল” বলতে হবে। উচ্চারণ সহি না হলে আরবি শব্দের অর্থ হয়ে যাবে আলাদা। এমনকি একদম ‘উল্টা মানেও’ হয়ে যেতে পারে। তাতে হবে গুনাহ (পাপ)। আল্লাহ পাক সেই গুনাহ মার্জনা নাও করতে পারেন। পুড়তে হবে দোযখে! মৃত্যু অবধি উচ্চারণ সহি-শুদ্ধ করার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তাতেও যদি সফলকাম না হওয়া যায়, “তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” কিন্তু বান্দা যদি আল্লাহর পবিত্র ‘আরবি ভাষা’ উচ্চারণ শুদ্ধির কোন চেষ্টায় না করেন, তাহলে তো আল্লাহ ন্যায়সঙ্গত ভাবেই ক্রোধান্বিত হবেন! পরিণাম অনন্ত দোজখ বাস। কোন ইমানদার মুসলমানেরই তা কাম্য হতে পারে না। তাই “উচ্চারণ’ সহি করার গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই! অর্থ (meaning) বুঝে কুরআন পড়ার তেমন কোন গুরুত্ব সে সময়ের কোন মওলানা সাহেবের কাছ থেকে তেমন পাই নাই। যদিও মাঝে মাঝে তাঁরা বলতেন, “অর্থ বুঝে কুরআন পড়লে বেশী সওয়াব।” সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলতেন, “অর্থ না বুঝলেও কোন অসুবিধা নাই।”

শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত মুসলমানদের শেখানো হয়, “’কুরআন’ পড়লেই সওয়াব।” প্রতিটা শব্দ উচ্চারণের সাথে সাথেই নেকী। তা সেটা অর্থহীন ‘আলিফ-লাম-মীম’ জাতীয় কোন শব্দ, পুরাকালের নবীদের উপাখ্যান, অবিশ্বাসীদের শাপ-অভিশাপ-হুমকি-শাসানী-ভীতি প্রদর্শন, কিংবা উদ্ভট অবৈজ্ঞানিক কল্প-কাহিনী – ইত্যাদি যাইই হোক না কেন! এই সকল শিক্ষার মাধ্যমে প্রকারান্তরে অর্থ বুঝে ‘কুরআন’ জানার চেয়ে বেশী বেশী করে তা পড়া ও মুখস্থ করাকেই অনেক বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়, উৎসাহিত করা হয়। তখন আরও জেনেছিলাম, সুরা ইয়াসিন পড়ে ঘুমলে কি সওয়াব পাওয়া যায়। কত হাজার ফেরেশতা পাঠকারীর জন্যে দোয়া করেন। তিনবার আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিলে বালা-মুসীবত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। টেলিভিশন চ্যানেল গুলোতে দেখি, কিভাবে ছোট ছোট বাচ্চাদের আরবি-তে কুরআন শেখানো হচ্ছে। বার বার তাদের-কে উচ্চারণ শুদ্ধির তাগিদ দেয়া হচ্ছে। গত ১৪০০ বছরে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভূত-পূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে, কিন্তু ‘ডিজিটাল মিথ্যাচার ছাড়া’ গত ১৪০০ বছরে ইসলামী শিক্ষার বোধ করি আর কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় নাই। মুসলমানরা সেই “কুল আর কূ-ঊ-ল” এর পাঁকেই ঘুরপাক খাচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। কৃতিত্ব সম্পূর্ণই ইসলাম বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতদের পাওনা। তাঁরা যা বোঝান, সাধারণ মুসলমানরা তাইই বোঝেন। জ্ঞানী-গুণী, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক-প্রভাষক-ডক্টরেট, ধনী-দরিদ্র, চাষী-কুলি-মজুর কেউই তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁদের কাছ থেকেই ‘ধর্ম-জ্ঞান’ শিক্ষা পেয়ে আমরা ধন্য হই।

ফলশ্রুতিতে, ‘কুরআন’, সিরাত ও হাদিস গ্রন্থের অভ্যন্তরের যাবতীয় অমানবিক শিক্ষা, আদেশ ও নৃশংসতার খবর সাধারণ মুসলমানরা কখনোই জানতে পারেন না। তাঁদের-কে জানতে দেওয়া হয় না। বিভিন্ন কলা-কৌশলে তা গোপন করা হয়, কিংবা মিথ্যাচারের মাধ্যমে তার বৈধতা দেয়া হয়।

প্রথম খটকা:
প্রথম খটকাটা লাগলো ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের পরের কিছু ঘটনায়। মহকুমা শহরে বিহারী পাড়ার এক প্রান্তে আমাদের বাসা। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত সমবয়সী বিহারী ছেলেরাই ছিল আমার সহপাঠী ও বন্ধু-বান্ধব। ১৬ই ডিসেম্বরের অল্প-কিছুদিন পরে তাদেরই বাসা-বাড়ী, আসবাবপত্র বাঙ্গালীরা লুট-পাট করে নিয়ে যাচ্ছে। এমন কি তাদের দালানের ইট পর্যন্ত। যেমন করে তারাও আমাদের বাসা-বাড়ীর সমস্ত কিছু লুট করেছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়গুলোতে। আমার আব্বা পরহেজগার মানুষ। তাঁর ধারনা “অপরের সম্পত্তি লুট করা ইসলাম সমর্থন করে না, এটা হারাম।” নিশ্চিত হওয়ার জন্য, তিনি আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে এ ব্যাপারে ইসলামী বিধান কি তা জানতে চাইলেন। আমি তখন আব্বার পাশে। ইমাম সাহেব জ্ঞানী মানুষ। একাধারে ক্বারি এবং হাফেজ। আমাদের মহকুমা শহরের বিশিষ্ট আলেম ও মসজিদের ইমাম। তিনি কোন জামাতে ইসলামী, রাজাকার কিংবা আলবদরের সাথে কখনোই সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি নির্দ্বিধায় আব্বাকে বললেন,

“ইসলামী দৃষ্টিতে এটাকে বলা হয় গনিমতের মাল, সম্পূর্ণ জায়েজ। আপনি নিতে পারেন।”

জানলাম যুদ্ধে পরাজিত সম্প্রদায়ের ‘মালামাল লুট’ ইসলামে আইন সিদ্ধ। তখনও জানতাম না যে পরাজিত দলের ‘স্ত্রী-কন্যা-মা-বোন’ সবই বিজয়ী দলের গনিমতের মাল। কিন্তু পাকিস্তানী ফৌজ এবং তাদের সহোদর রাজাকার-আল বদর ও অন্যান্য ইসলামী বাহিনীর সদস্যরা হয়তো এই বিষয়টি ভালভাবেই জানতেন। তাই আমদের মা-বোন-স্ত্রী-কন্যাদের ইজ্জত-হানী ও লুট-তারাজে তাদেরকে বিবেকের দংশন পোহাতে হয় নাই!

দ্বিতীয় খটকা:
১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। আমার এক নিকট আত্মীয়া ‘ইসলামিক হিস্টরিতে” অনার্স পড়েন। তাঁর বাসায় বেড়াতে গিয়ে তাঁর সিলেবাসের ইসলামের ইতিহাসের বইগুলো মনযোগী হয়ে পড়লাম। বইগুলো পড়ে খুবই হতাশ হলাম। জানলাম তথাকথিত শান্তির ধর্মের ঊষালগ্ন থেকেই অশান্তির সূত্রপাত। ৬৩২ খৃষ্টাব্দের জুন মাসে মুহাম্মদের মৃত্যু হয়। মুহাম্মদের মৃত্যুর দিন সমস্ত উপস্থিত মুসলিম সম্প্রদায় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়: [1]

১) আদি মদিনা-বাসী সাদ বিন ওবাইদার পক্ষে – সমস্ত আনসার (আদি মদিনা-বাসী),
২) আলী ইবনে আবু তালিবের পক্ষে – মুহাম্মদের চাচা আল-আব্বাস, আল জুবায়ের প্রমুখ বহু আদি মক্কাবাসী (মুহাজির) ও কিছু আনসার, এবং
৩) আবু বকর ইবনে কুহাফার পক্ষে – উমর সহ অন্যান্য মক্কাবাসী মুসলমান ও কিছু আনসার।

ইসলাম জাহানের পরবর্তী নেতা কাকে বানানো হবে সে বিশয়ে বচসা শুরু হয়। আদি উৎসের এক বর্ণনায় জানা যায়, মুহাম্মদের মৃত লাশ বিনা দাফনে তাঁর বিছানায় ছিল প্রায় আড়াই দিন। তাঁর মৃত্যু হয় সোমবার দুপুরে এবং তার কবর দেয়া হয় বুধবার দিবাগত রাত্রে। উমরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ক্ষমতায় আসেন আবুবকর। ক্ষমতায় আসার পর পরই আবু বকর নবী কন্যা ফাতেমা-কে তার বাবার উপহার দেয়া ‘ফাদাক’ ও খায়বার এর ইহুদিদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত তাঁর পিতা মুহাম্মদের রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তির ন্যায় সংগত উত্তরাধিকার থেকে করেন বঞ্চিত। স্বাভাবিক কারণেই, এই ঘটনায় নবী কন্যা ফাতিমা ও তার গোত্র, হাশেমী গোত্রের পরিবার সদস্যরা ভীষণ মনক্ষুন্ন হোন। বাবার মৃত্যুশোকে চোখের পানি শুকানোর সময়ও আবু বকর-উমর গংরা ফাতেমা-কে দেন নাই। এই ঘটনার পর ফাতেমা ছয় মাস কাল জীবিত ছিলেন। ফাতেমার মৃত্যুকাল অবধি আলী খলিফা হিসাবে আবু-বকরের বশ্যতা স্বীকার করেন নাই। [2] [3]

মুহাম্মদের মৃত্যুর পর শুরু হয় ইসলামের ইতিহাসের খুলাফায়ে রাশেদিনের রাজত্বকাল (৬৩২-৬৬১ সাল)। মুহাম্মদের দুই শ্বশুর আবু বকর ইবনে কাহাফা ও ওমর ইবনে খাত্তাব এবং জামাতা ওসমান ইবনে আফফান রাজত্ব করেন সুদীর্ঘ ২৪ বছর (৬৩২-৬৫৬ সাল)। মুহাম্মদের পরিবার হাশেমী বংশের সদস্যরা হোন বঞ্চিত। ইসলামী জাহানের এই তিন শাসক ইসলাম প্রচার ও প্রসারের নামে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অবিশ্বাসী কাফের রাষ্ট্র ও জন-গুষ্ঠির বিরুদ্ধে ৬৩২ সাল থেকে ৬৫৪ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ১৯ টি আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা করেন। যুদ্ধ মানেই আক্রমণ, দমন, নিপীড়ন, খুন, জখম, রক্তপাত, লুট, দখল ও সেকালের দাস ও দাসী-করণ (গণিমত)! ফলাফল প্রচুর রক্তপাত! এই সব যুদ্ধে অগণিত কাফেরদের খুন, জখম ও দাস ও দাসী-করণের ফসল, ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা নামের আড়ালে আরব সাম্রাজ্যবাদের সূচনা ও প্রতিষ্ঠা! [4]

চার খুলাফায়ে রাশেদিনের তিন জনই নৃশংস ভাবে খুন হোন আততায়ীর ছুরির আঘাতে। ৬৪৪ সালের নভেম্বর মাসের এক সকালের নামাজের সময় ইসলামে ইতিহাসের দ্বিতীয় খুলাফায়ে রাশেদিন ওমর ইবনে খাত্তাব-কে নির্মমভাবে খুন করে আবু লুলু ফিরোজ আল-নিহিওয়ানদি (Abu Lu’lu’ah Fayruz al-Nihiwandi) নামের এক আদি পারস্য-বাসী খ্রিস্টান যুবক। যুবকটি ছিল আল মুঘিরা বিন শুবাহ (al-Mughirah b. Shu’bah) নামের এক মুসলমানের ক্রীতদাস। আবু বকর ও ওমরের শাসনামলে মুসলমান-মুসলমানদের মধ্যে কোন বড় ধরণের সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে নাই। মুসলমান-মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনার সূত্রপাত ও প্রসার ঘটে ওসমানের রাজত্বকালে শেষাংশে। পরিণতিতে ৬৫৬ সালের জুন মাসে ওসমান ইবনে আফফানকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। খুনিরা ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম খুলাফায়ে রাশেদিন আবু-বকর ইবনে কুহাফার পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবু-বকর ও তার ১৩ জন সঙ্গী; কোন বিধর্মী-কাফের নন। [5] [6]

ওসমানের নৃশংস খুনের পর এক অস্বাভাবিক পরিবেশে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হোন হাশেমী বংশের আলী ইবনে আবু তালিব। তাঁর ক্ষমতা আহরণের পর মুসলমানদের মধ্যে প্রথম গৃহযুদ্ধ (ফিতনা) শুরু হয়। ক্ষমতায় আসার পর-পরই প্রথমেই আলীকে এক রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে যাদের সাথে মোকাবিলা করতে হয়, তিনি হলেন তার নিজেরই শাশুড়ি নবী-পত্নী আয়েশা বিনতে আবু বকর ও তার অনুসারীরা। ইসলামের ইতিহাসে যা “”উটের যুদ্ধ” (Battle of the Camel /‘Jange Zamal’) নামে বিখ্যাত, যা সংঘটিত হয়েছিল ৬৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে। দু’পক্ষের অসংখ্য মুহাম্মদ অনুসারী হন খুন ও জখম। জয়লাভ হয় আলীর। এরপরেই আলীকে যুদ্ধের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হয় মুহাম্মদের আর এক বিশিষ্ট অনুসারী মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও তার অনুসারীদের সাথে। ইসলামের ইতিহাসে যা “সিফফিনের যুদ্ধ” (Battle of Siffin) নামে বিখ্যাত। যা সংঘটিত হয়েছিল ৬৫৭ সালের জুলাই মাসে। দুই পক্ষের অগণিত নিবেদিত প্রাণ মুহাম্মদ অনুসারী হন খুন ও জখম।

সিফফিনের যুদ্ধ শেষে আলীর সাথে মতভেদের কারণে একদল মুহাম্মদ অনুসারী আলী ও তার অনুসারীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইসলামের ইতিহাসে যাদেরকে “খারেজী” (Kharijites) নামে আখ্যায়িত করা হয়। অতঃপর এই খারেজীরা বিদ্রোহ করে আলী ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। তাদেরকে দমনের উদ্দেশ্যে ৬৫৮-৬৫৯ সালে (হিজরি: ৩৮ সাল) আলী ও তার অনুসারীরা যে যুদ্ধ পরিচালনা করে, ইসলামের ইতিহাসে তা “নাহরাওয়ানের যুদ্ধ” (Battle of Nahrawan) নামে বিখ্যাত। অমানুষিক নৃশংসতায় তারা ২৪০০ মুহাম্মদ অনুসারীকে হত্যা করে। এই যুদ্ধে ২৮০০ জন খারেজীর মধ্যে মাত্র ৪০০জন জীবিত ফিরে যেতে সক্ষম হয়। এ সমস্ত নৃশংস ঘটনার ধারাবাহিকতায় কুফা নগরীতে ৬৬১ সালের জানুয়ারি মাসে, ইবনে মুলজাম আল-মুরাদি ও শাবিব বিন বাজারাহ নামের দুই মুহাম্মদ অনুসারীর (খারেজী) বিষ মিশ্রিত তলোয়ারের আঘাতে আলী ইবনে আবু তালিবের জীবনের নির্মম পরিসমাপ্তি ঘটে! [7][ [8]

আলী ইবনে আবু তালিবের নৃশংস খুনের মধ্য দিয়ে খুলাফায়ে রাশেদীন রাজত্বের যবনিকাপাত ঘটে। উমাইয়া বংশের শাসনকাল (Dynasty) শুরু হয় ৬৬১ সালে। প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান। নবীর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হাসান ইবনে আলী ইবনে আবু তালিবকে মুয়াবিয়ার চক্রান্তে বিষ প্রয়োগে খুন করা হয় ৬৭০ সালে। আরেক দৌহিত্র হুসেইন ইবনে আলী ও তার ঘনিষ্ঠ পরিবার সদস্যদের খাদ্য ও পানি বঞ্চিত করে চরম পিপাসার্ত-করুন অবস্থায় কারবালার মরু প্রান্তরে অবরোধ করে রাখা হয় প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতায়। তারপর, হুসেইন ইবনে আলীকে ৬৮০ সালের অক্টোবর মাসে কারবালা প্রান্তরে চরম পিপাসার্ত অবস্থায় নৃশংসভাবে খুন করে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের সৈন্যরা। উমাইয়া বংশের রাজত্বকাল দীর্ঘ ৯০ বছর। ৬৬১ সাল থেকে ৭৫০ সাল পর্যন্ত।

“ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মৃত্যুর ৪৮ বছরের মধ্যে তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ সক্ষম পুরুষ সদস্যদের প্রায় সবাইকে একে একে নৃশংসভাবে খুন করেন তারই সহচর সাহাবী অথবা সাহাবী-সন্তানরা।”

মুয়াবিয়া তার রাজত্বকালের প্রথম পনের বছরে (৬৬২-৬৭৭ সাল) কমপক্ষে একুশটি যুদ্ধ পৃথিবীবাসী-কে উপহার দিয়েছিলেন। আর তার ছেলে ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া (৬৮০-৬৮৩ সাল) ও অন্যান্য উমাইয়া উত্তরসূরিরা তাদের রাজত্বকালের ৬৮০ সাল থেকে থেকে ৬৯২ সাল পর্যন্ত (ইসলামের ২য় গৃহযুদ্ধ) নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করেছেন কমপক্ষে চৌদ্দটি। অর্থাৎ নবী পরবর্তী ষাট বছরে (৬৩২-৬৯২ সাল) নবীর প্রাণ-প্রিয় সাহাবা এবং তাদের সন্তানরা কমপক্ষে সাতান্নটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িত ছিলেন। “যুদ্ধ” শব্দটির অর্থই হল সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ ধ্বংস। উপর্যুপরি যুদ্ধ-বিগ্রহের সাথে জড়িত ইতিহাসের এসকল নায়কদেরকে “শান্তির” বার্তাবাহী বলে ভুল করার কোনই অবকাশ নেই। ইসলামের ইতিহাস পড়ে লেগেছিল খটকা। ইসলামে কেন এত হানাহানি? আমি তখনও অধিকাংশ ইমানদার বান্দাদের মতই বিশ্বাস করতাম ‘ধর্মের কোন দোষ নেই, দোষ মানুষের।’ তারা ইসলামকে ঠিকমত বুঝতে পারে নাই, কিংবা পালন করে নাই। “ইসলাম শান্তির ধর্ম ও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ।” এ চিন্তার বাহিরে তখন কিছুই ভাবতে পারি নাই।

তৃতীয় খটকা:
তৃতীয় ধাক্কাটা পেলাম ‘কুরআনের” বাংলা তরজমা আর ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে মুহাম্মদ অনুসারীদেরই লিখিত ‘সিরাত’ ও হাদিস গ্রন্থগুলো পড়ার পর। সময়টি ছিল ১৯৮৩ সালের দিকে। অর্থ ও তাফসীর সহ বুঝে ‘কুরআন’ পড়ার পর বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা “আল্লাহর” বৈশিষ্ট্য এমন হতে পারে!

>>> নিজের ধর্মটাকে আরও ভালভাবে জানার আগ্রহ নিয়ে সেই থেকে শুরু। ২০১১ সালের শেষার্ধে বেশ কিছু গুণগ্রাহী পাঠকদের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহে ‘এ বিষয়ে’ কলম হাতে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। এ পর্যন্ত মোট ১৭৫-পর্ব পর্যন্ত ‘কুরানে বিগ্যান’ নামে অনলাইনে প্রকাশিত। লেখাগুলোর ১৫৯-পর্ব পর্যন্ত “ইসলামের অজানা অধ্যায়” নামে মোট চার-খণ্ড ই-বুক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। অনিন্দ্য সুন্দর এই ই-বুকগুলোর নির্মাতা “নরসুন্দর মানুষ।” নরসুন্দর নিজেও একজন উচ্চ মানের ‘ইসলাম’ গবেষক। মূলত: তাঁরই অনুপ্রেরণায় বইটির পঞ্চম খণ্ডের বাঁকি অংশগুলো যথাসম্ভব দ্রুত শেষ করার তাগিদ অনুভব করেছি। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।।

যে মানুষটির সাহায্য, সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা ছাড়া আমি হয়তো কোনদিনই সাধারণ মুসলমানদের অজানা ‘ইসলামের এই অধ্যায়-গুলো’ প্রকাশ করতে পারতাম না, তিনি হলেন, “ধর্মপচারক!” আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় আমার প্রত্যেকটি লিখার প্রুফ রিড করেছেন, বিভিন্ন সময়ে অনুবাদে সাহায্য করেছেন ও পরামর্শ যুগিয়েছেন। এই বইটির নামকরণ ও করেছেন তিনিই। তিনি আমাকে আজীবনের জন্য ঋণী করে রেখে গেছেন।

ইসলামের অজানা অধ্যায় (প্রথম খণ্ড): [9]
এই খণ্ডের প্রথমাংশে ‘কুরআনে’ যে কী পরিমাণ “বিগ্যান” আছে, তার কিছু নমুনা পাঠকরা জেনে নিতে পারবেন। অতঃপর ‘ইসলাম: উদ্ভট উটের পিঠে’ শিরোনামে সামগ্রিকভাবে কুরআন ও তার অ্যনাটমি, ইসলাম প্রচার শুরু করার পর মুহাম্মদের সাথে কুরাইশদের বাক-বিতণ্ডা, যুক্তি-প্রতিযুক্তি, মুহাম্মদকে দেয়া তাদের ‘চ্যালেঞ্জ’, তাদেরকে দেয়া মুহাম্মদের চ্যালেঞ্জ; ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় খণ্ড: [10]
এই খণ্ডে মুহাম্মদের মদিনা হিজরতের পর থেকে কুরাইশদের বিরুদ্ধে তার আক্রমণাত্মক হামলা, নাখলা আক্রমণ, বদর যুদ্ধ ও বদর যুদ্ধ পরবর্তী হত্যাকাণ্ড-গুলো, বনি কেউনুকা ও বানু নাদির গোত্র উচ্ছেদ ও ‘মদিনা সনদ’ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।

তৃতীয় খণ্ড: [11]
এই খণ্ডে ওহুদ যুদ্ধ, ওহুদ যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি, খন্দক যুদ্ধ, বানু কুরাইজা গণহত্যা, বানু লিহায়েন হামলা, বানু আল মুসতালিক হামলা, নবী পত্নী আয়েশার বিরুদ্ধে অপবাদ, মুহাম্মদের যৌন জীবন, হুদাইবিয়া সন্ধি পূর্ববর্তী সাত মাসের ঘটনা প্রবাহ ও উম্মে কিরফার পাশবিক হত্যা-কাণ্ডের সবিস্তার আলোচনা করা হয়েছে।

চতুর্থ খণ্ড: [12]
এই খণ্ডে ‘হুদাইবিয়া সন্ধি’, খায়বার যুদ্ধ, ফাদাক আগ্রাসন, মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে নবী কন্যা ফাতিমা ও জামাতা আলী ইবনে আবু তালিব ও হাশেমী বংশের অন্যান্য লোকদের সাথে আবু বকর-উমর গংদের বিবাদ বিষয়ের বিশদ ও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

পঞ্চম খণ্ড (অসমাপ্ত): [13]
এই খণ্ডের ষোল-টি পর্ব (পর্ব-১৬০-১৭৫) প্রকাশিত হয়েছে। এই পর্ব-গুলোতে বিভিন্ন শাসকদের কাছে মুহাম্মদ চিঠি প্রদানের বিশদ ও বিস্তারিত আলোচনা, নবী-পত্নী উম্মে হাবিবার উপাখ্যান, হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি পরবর্তী বছরে মুহাম্মদের ওমরা যাত্রার বিবরণ ও ‘আল-মুলায়িহ গোত্রে ডাকাতি’ পর্যন্ত ঘটনা-প্রবাহের বর্ণনা করা হয়েছে। বাঁকি অংশগুলো “ইস্টিশনে” ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করা হবে। মুহাম্মদের ঘটনা বহুল নবী জীবনের ধারাবাহিকতা-কে উপেক্ষা করে তাঁর কর্ম-কাণ্ডের সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। সে কারণেই “মুহাম্মদের কর্মকাণ্ড ও মনস্তত্ত্ব” এর সঠিক ধারণা পাওয়ার সুবিধার্থে, উৎসাহী পাঠকরা যদি মুহাম্মদের কর্ম-জীবনের পূর্ববর্তী অংশগুলো জেনে নেন, তবে তা তাঁদের জন্য মুহাম্মদের জীবনের পরবর্তী ঘটনাগুলো বুঝতে সহায়ক হবে।

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:
[1] মুহাম্মদের মৃত্যুকালীন সময়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব:
“তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৯, (The Last Years of the Prophet) – translated and Annotated by Ismail K. Poonawala [State university of New York press (SUNY), Albany 1990, ISBN 0-88706-692—5 (pbk), পৃষ্ঠা ১৮৬-১৮৯ ও ১৯২-১৯৪
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

অনুরূপ বর্ণনা: “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ: A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৬৮৩-৬৮৭
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] মুহাম্মদের দাফন ক্রিয়া:
Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬৮৮; Ibid আল-তাবারী, ভলুউম ৯: পৃষ্ঠা ২০২ ও ২০৪;

[3] মুহাম্মদের বিশাল সম্পদ নিয়ে নবী কন্যা ফাতিমা ও আবু বকর দ্বন্দ্বের শুরু:
Ibid “আল-তাবারী-ভলুউম ৯,” পৃষ্ঠা ১৯৬-১৯৭

[4] মুহাম্মদের মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে মুসলিম শাসকদের যুদ্ধের খতিয়ান:
কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির – লেখক: মুহাম্মদ ইবনে সা’দ (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজী অনুবাদ: Aisha Bewley. Ta-Ha publication, London, 1997, ভলুউম ৭, ISBN 1-897940-62—9 (pbk), পৃষ্ঠা xxi
http://kitaabun.com/shopping3/product_info.php?products_id=293

[5] দ্বিতীয় খুলাফায়ে রাশেদিন উমর ইবনে খাত্তাবের হত্যাকাণ্ড:
“আল-তাবারী – ভলুউম ১৪,” translated and annotated by G. Rex Smith,The University of Manchester, State University of New York Pres, ISBN 0-7914-1194-6 (pbk), পৃষ্ঠা ৯০-৯১
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21297&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[6] তৃতীয় খুলাফায়ে রাশেদিন উসমান ইবনে আফফানের হত্যাকাণ্ড:
“আল-তাবারী – ভলুউম ১৫”, translated and annotated by R. Stephen Humphreys, University of Wisconsin, Madison State University of New York Press, ISBN 0-7914-0155-3 (pbk.), পৃষ্ঠা ১৯০-১৯১ এবং ১৯৮-১৯৯
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21300&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[7] “নাহরাওয়ানের যুদ্ধ”
“আল-তাবারী – ভলুউম ১৭”, ইংরেজী অনুবাদ: G. R Hawting, School of Oriental and African Studies, University of London, Published by – State University of New York press, Albany; ISBN 0-7914-2394—8 (pbk), পৃষ্ঠা ১৩০-১৪১
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21303&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[8] চতুর্থ খুলাফায়ে রাশেদিন আলী ইবনে আবু তালিবের হত্যাকাণ্ড:
Ibid “আল-তাবারী – ভলুউম ১৭,” পৃষ্ঠা ২১৩-২১৭

[9] ইসলামের অজানা অধ্যায় (প্রথম খণ্ড):
https://drive.google.com/file/d/0BwbIXqxRzoBOejFmTXhTdk5zNDA/view

[10] ‘ইসলামের অজানা অধ্যায় (দ্বিতীয় খণ্ড)
https://drive.google.com/file/d/0BwbIXqxRzoBOX01sZ0Q1cGJsSzg/view

[11] ইসলামের অজানা অধ্যায় (তৃতীয় খণ্ড):
https://drive.google.com/file/d/0BwbIXqxRzoBOT3l5NmpOR3VwWEE/view

[12] ইসলামের অজানা অধ্যায় (চতুর্থ খণ্ড)
https://drive.google.com/file/d/0BwbIXqxRzoBOUVBOUnlRUXkxX0E/view

[13] পঞ্চম খণ্ড (অসমাপ্ত): পর্ব-১৭৫
http://www.dhormockery.org/2017/10/blog-post_30.html

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 7 = 17