একজন নুসরাত এবং ধর্ষণ

গত তিনদিন ধরে নুসরাত নামের একটি মেয়েকে নিয়ে ফেসবুকে শতাধিক আবেগীয় স্ট্যাটাস পড়তে পড়তে ক্লান্ত। এতো আবেগ, এতো মানবিক আমাদের দেশের মানুষ! বাঙালির আবেগ হচ্ছে মূর্খতার বহিঃপ্রকাশ। আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে মানুষজন বলছে, মেয়েটি মরে গিয়ে ভালোই হয়েছে। যারা এইসব বালের আবেগ প্রকাশ করেছ তাদের সাথে নুসরাতের পার্থক্য হচ্ছে- নুসরাত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন আর জীবিতরা মৃত নুসরাতের থেকেও মৃত।

গতকাল বোরকাওয়ালীদের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছিল। যেখানে অসংখ্য বোরকাওয়ালী নারী অপরাধী ধর্ষক নিপীড়কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যা দেখে আমাদের মানবিক বোদ্ধারা দুঃখে কষ্টে যন্ত্রণায় একাকার। শান্তিপ্রিয় প্রতিবাদীগণ জানতেন যে, ধর্ষণের জন্য নারীর দোষ এমন চিন্তা করা নারীর সংখ্যা অগণিত। কিন্তু এভাবে প্রকাশ্যে এসে যৌন নিপীড়কের পক্ষে সোচ্চার হওয়া দেখে অনেকেরই মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে। আবার অনেক আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নারীবাদী নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, মাদ্রাসার বোরকাওয়ালীদের জোরপূর্বকভাবে রাস্তায় নামানো হয়েছে।

বাঙালির স্মৃতিশক্তি বা স্মরণশক্তি খুবই ভোঁতা। ২০১২ ও ২০১৩ সালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যখন পুলিশদের উপর প্রকাশ্যে আক্রমণ চালানো হচ্ছিলো তখন পুলিশ ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর থেকে শতাধিক যৌনজিহাদি নারীকে গ্রেপ্তার করেছিল। সেটা ছিল আমাদের কাছে নতুন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা, আমাদের দেশেও যৌনজিহাদি আছে! নারী ধর্ষণে পোশাক দায়ী বা নারী দায়ী- এই বাক্যটি শুধু পুরুষেরাই জোরগলায় বলে না বরং নারীরাও বলে। পুরুষেরা তাদের অসুস্থ, বিকৃত চিন্তাধারা খুব সূক্ষ্মভাবে নারীদের মস্তিষ্কে ঢুকাতে সার্থক।

বাঙলাদেশে এখন যদি জরিপ করা হয় যে, ‘ধর্ষণে পোশাক দায়ী নাকি পুরুষ দায়ী’- তাহলে নিশ্চিত থাকুন যে ৫০ শতাংশের অধিক মানুষ ধর্ষণে নারীকে দোষারোপ করবে। মাত্র একজন নুসরাত কি মারা গেছে? না, প্রতিদিন এমন ঘটনা ঘটে। এবং আগামীতেও হাজার হাজার নুসরাত এভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাবে। ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যাবে। আত্মহত্যা করতে বাধ্য হবে।

আমাদের প্রতিবাদ স্বার্থকেন্দ্রিক, আমরা পোশাক দেখে প্রতিবাদী হয়ে উঠি। যতদিন এই পোশাকের রাজনীতি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারবো না, ততোদিন এই রাষ্ট্র আমাদের জীবন নিয়ে খেলা করবেই। সাম্প্রতিক মসজিদের ভিতরে একটি বাচ্চাকে হত্যা করা হয়েছে, পূর্বেও মসজিদের ভিতরে ধর্ষণের ইতিহাস আছে। তাতে কি মসজিদের অপবিত্রতা নষ্ট হয়েছে? সেই মসজিদে কি আর কেউ নামাজ পড়ে নি? হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধের প্রবেশে মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট হয়, কিন্তু ঈমাম, মুয়াজ্জিন দ্বারা মসজিদের ভিতরে ধর্ষণ, হত্যা হলেও বিশ্বাসীদের বিশ্বাসে আঘাত লাগে না। বোরকা, হিজাব, ঘোমটা, নামাজকালাম কোন কিছুই ধর্ষণ থেকে নারীকে রক্ষা করতে পারবে না।

যতোদিন পৃথিবীতে একজন পুরুষ অবশিষ্ট থাকবে, ততোদিন ধর্ষণ থাকবেই। তাহলে নুসরাতের মত মানুষের জন্ম কি শুধুমাত্র মৃত্যুর জন্যই? দাড়ি টুপি জোব্বা কাছে কি সকলেই অসহায়?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 18 = 20