গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না

     আমার প্রাক্তন বিদেশিনী বউটা যখন অন্য নরকে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করত, আমি তখন মনে মনে বিপন্ন বোধ করতাম। ভাবতাম, সভ্যতার আর কিছুই বুঝি থাকল না । মানব জীবনটাই বৃথা হয়ে গেল। কলহ করেছি অনেক। পরে বুঝেছি ওসব ছিল আমার বিপন্নবোধ তাড়িত আচরণ। ওর আত্মীয়স্বজন এবং বান্ধবীরাও যখন আমাকেও আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে থাকল, তখন থেকে আমার ভুল ভাঙ্গতে শুরু করল। অবাক হয়েছিলাম একদিন, সেইদিন আমরা কথা বলছিলাম, নরদের আচরণ নিয়ে। ও জানাল, কোন এক দোকানে তার একদিনের অভিজ্ঞতা। কেনাকাটার পর দোকানদার যখন ভাঙতি পয়সা ফেরত দিচ্ছিল, সেই সুযোগে সে, তার আঙ্গুল একটুখানি ছুঁয়ে দিল, সেই ছোঁয়ায় যে ইঙ্গিত ছিল, সেই ইঙ্গিতময় আচরণের কারণে ও আর ওমুখী হয়নি।

 

  এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, নারীগণ শত শত বছর ধরে নরদের দ্বারা ( এখানে পুরুষ, মানব, মানবী, মানুষ শব্দগুলো সঙ্গত কারণে ব্যবহার করা হয়নি ) নিপীড়িত হয়ে এসেছে। এখানে শোষণশাসনের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে না। শোষণ শাসন নরনারী উভয়ের উপর জারী থাকলেও নিপীড়নটা নারীর উপর বাড়তি হয়ে , চেপে বসে আছে । একটা সময়ে ভারতে নারীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে, মৃত স্বামীর সাথে। আর মুসলমানরা নারীকে গৃহবন্দী করেই ক্ষান্ত হয়নি, একসাথে অনেকগুলো নারীকে বিয়ে করে ঘরে এনে, দাসী রেখে এক কথায় মানবেতর এক জীবন উপহার দিয়েছে। শুধু কি তাই, নারী যেহেতু তার শষ্যক্ষেত্র , তাই তাকে প্রহার করার অধিকারও পেয়ে গেছে স্বয়ং বিধাতার কাছ থেকে। ( দয়া করে কেউ ব্যতিক্রম নিয়ে এসে আলোচনার মূলধারাটকে নস্যাৎ করে দেবার চেষ্টা করবেন না ) এখানেই থেমে নেই, নরগণ যাতে ভুলে না যায় নারী কত কত খারাপ , তাই প্রতিনিয়ত ওয়াজ মাহফিলগুলো থেকে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে। নারীকে আখ্যায়িত করা হচ্ছে পাপ হিসাবে। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা আসবে কোথা থেকে?

 

   অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলতে নারীর কিছুই ছিল না । কাঙ্গালিনীর মত সবকিছুর জন্য নির্ভর করতে হত বাবাস্বামীছেলের উপর। অর্থনৈতিক কারণেই এই অবস্থার পরিবর্ত্তন হয়েছে। নারীও এখন উপার্জ্জনে। ফলে কথা বলার, চলার স্বাধীনতাও সে চায়। নরেরা চায় না , নারী স্বাধীনভাবে রাস্তায় চলুক। তাই প্রতি পদে পদে সৃষ্টি করে থাকে বিড়ম্বনার। আমার এক বন্ধু একবার জানিয়েছিল, সিএনজির চালক, তাকে গাড়ী থেকে নামিয়ে দিয়েছিল ওড়না ঠিকমত নাপরার কারণে। বাসে ট্রেনে যা ঘটে , অধিকাংশ নারী নীরবে তা হজম করে যায়, কিন্তু কতদিন?

 

   পুঁজিবাদী সমাজগুলোতে নারীর স্বাধীনতা কিঞ্চিত রয়েছে; কিন্তু বানিয়ে রেখেছে পণ্য করে। যে বিজ্ঞাপণের সাথে নারীর কোন সম্পর্ক নেই, সেখানেও নারীকে ব্রা বিকিনি পরিয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে। একদিকে ধর্ম্মীয় বিশ্বাস , অন্যদিকে পুঁজিবাদী সমাজগুলোর নিরন্তর প্রচারণার ফলে নারীর উপর ভক্তিভালবাসাশ্রদ্ধার বিপরীতে বাড়ছে ভোগ্যভাব; অর্থাৎ নারী ভোগ্য, ভোগের বস্তু। মানুষ নয়, মানবী তো নয়ই। তো বিস্ফোরণ তো ঘটবে একদিন।

 

    বিস্ফোরণ নয়, সামান্য ফোঁড়নেই নরেরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানাল, তা দেখেপড়েজেনে মনে হল এরা কোনভাবেই কোন নারীর গর্ভ থেকে জন্ম নেয়নি। অর্থাৎ অবলীলায় একজন নারীকে খানকি মাগী, কুত্তি আখ্যা দেয়ার মধ্য দিয়েই বুঝিয়ে দেয়, কী অপরিমেয় ঘৃণা নিয়ে এরা নিজ মাকে মা বলে। এদের কথা থাক। সমস্যা হল , নারী্র কথা বলতে গেলেই কিছু কিছু সচেতন মানুষকেও আঁতকে উঠতে দেখি। তারা বিচলিত বোধ করেন। নারীর প্রতিবাদের ভাষার ধরণধারণে তারা অস্বস্তিবোধ করেন। তারা মনে করেন, এতে সমাজে বিভক্তি বাড়বে। নর ও নারীর মধ্যে দূরত্ব বাড়বে ইত্যাদি ইত্যাদি। বলিনর নারীর সম্পর্কের সুশীতল ছায়ার মধ্যে কজনকে বড় হতে দেখেছেন? ব্যতিক্রম এখানের আলোচনায় থাকছে না । সাধারণভাবে যা ঘটছে, তাই আলোচ্য। তা আপনি একজন প্রগতিশীল বা সুশীল হয়ে যখন নারীকে প্রতিবাদের ভাষা শিখিয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠেন, তখন আমাদের ঘোরতর সন্দেহ হয়। এবং এর পরপরই আপনাদের আতংকের কারণ কিছুটা হলে ষ্পষ্ট হয়ে উঠে। আপনারা কোন রাখঢাক না রেখে বলেই ফেলেন, এর দ্বারা অনেক নর , নারীদের দ্বারা হয়রানির স্বীকার হতে পারে। এই যে হয়রানির কথা বললেন, ভুলে গেলেন, এটি হতে পারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন ঘটনাটাকে সামনে এনে প্রতিবাদের গোটা পর্ব্বটাকেই নস্যাৎ করে দিতে চাইছেন। উচিত ছিল উস্কে দেবার। আর কে না জানে, কোন শুরুই অত্যন্ত পরিপক্ক রূপে আসে না, আন্দলোন আর জাগরণের মধ্য দিয়েই পরিপক্কতা আসে। সমাজে বিভিন্ন স্তরে , জাগরণে যে ঢেউ উঠে, তাকে ধারণ করার, অনুপ্রাণিত করার কথা ছিল পরিবর্ত্তনকামীদের। কিন্তু সে সংখ্যা দেখতে হলে চোখে বাইনোকুলার লাগাতে হবে। যারা দক্ষিণ অর্থাৎ ডানপন্থাকে ত্যাগ করে বামপন্থার ধারক (left ), তাদের তো বুঝবার কথা। সমাজের বিভিন্ন স্তর, বিবিধ অবস্থান থেকে উঠে আসা আন্দোলনগুলোকে নিরুৎসাহিত না করে বরং কীভাবে অত্যন্ত যত্নের সাথে, ভালবাসার সাথে, প্রজ্ঞার সাথে সঠিক দিশা দেয়া যায় সেই কর্ম্মযজ্ঞে তৎপর হয়ে উঠা উচিত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − = 10