শেষনিদ্রা

ঠেলাগাড়িতে করে কাগজের চালান এসে জিন্দাবাহার লেনে পৌছে। কাগজের ব্যাবসা ততদিনে ঢাকায় বেশ জমজমাট। রামপ্রসাদ দত্ত সে ব্যাবসা শুরু করেছেন। আগের ব্যাবসা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে গোডাউন-ব্যাবসা সে দেখেন না। ছেলে উত্তম দত্ত দেখেন। শুধুমাত্র বিকেল হলে টিপু সুলতান রোড থেকে হাটা দিয়ে জিন্দাবাহারে এসে পৌছান। রাত ন-টা অব্দি বাজার আগেই রামপ্রসাদ বাড়ি আসেন। উত্তম হিসাব গুছিয়ে একটু এদিক সেদিক দেখে বাড়ি ফেরেন। দোতলা বাড়ি। দেখতে একদম বেখাপ্পা। কোন সুস্থির পরিকল্পনা নেই। মনে হয় যে ইট জোড়া দিয়ে দেয়াল-ছাদ তোলাই দায় ছিলো। আগে একতলাই ছিলো। উত্তম বিয়ে করার আগে আগে দোতলা করা হয়েছে। কাঠের রেলিং দিয়ে বারান্দার মত বানানো হয়েছে। বারান্দাতে একটা ইজি চেয়ার এক পাশে আর আরেক পাশে তুলশির চারা লাগানো মাটির সরাইতে। দোতলায় দুটি কক্ষ করা হয়েছে। ছোট ছাদের মতো অংশের দক্ষিন দিকে মন্দিরের মতো করা হয়েছে। লক্ষী আর গণেশের প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে। বাড়ির ভেতরে কিছু ফাকা জায়গা। সবজির চাষ করেছে রামপ্রসাদের পত্নী নির্মলা দেবী। আরেক পাশে ইন্দিরা। খাবার, রান্না আর স্নানের জলের সংস্থান হয় ওতে।
উত্তমকে বিয়ে করানো হয়েছে টাঙ্গাইলে। সন্তোষের দত্ত বাড়ির মেয়ে শ্যামলীর সঙ্গে উত্তমের বিয়ে হয়েছে মাসদুয়েক। সে বিয়েও তাড়াহুড়ো। টাঙ্গাইলে মুসলিম লীগের লোকেরা উৎপাত শুরু করেছিলো। শ্যামলীর বাবা খুব ঠেকে গিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। জাহ্নবী স্কুলের পড়তেন শ্যামলী। কিন্তু নাহ, সে আর হয়ে উঠে নি। মুসলিম লীগের লোকেরা তখন সনাতন সম্প্রদায়ের নারীদের শান্তিতে থাকতে দেয় নি। জোর করে বিয়ে করা, কটু কথা বলা কিংবা সম্ভমহানি করার ঘটনা তখন হরহামেশাই ঘটতো। শ্যামলীর বাবা নরেশ দত্তের মনে আছে এই তো গেলো নোয়াখালী দাঙ্গার সময় দত্তবাড়ি এবং আশপাশে হিন্দুপাড়া কেমন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছিলো। হাতে বিড়ি মুখে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্থান- স্লোগান দিয়ে এদিক সেদিক একাকার করে করে ফেলতো মুসলিম লীগের লোকেরা। মেয়েদের টেনে নিয়ে কাগমারিতে আটকে রেখে ধর্ষন করা হয়েছিলো। অনেকে তখনি চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু নরেশ দত্ত ভেবেছিলেন থেমে যাবে সবকিছু। উলটো, খুব স্বস্তির দিন কাটে নি তাদের। শ্যামলীর বিয়ে দেয়াও সে কারনেই। ঘরে মেয়ে থাকলেই লোকের দৃষ্টি পড়ে। স্কুল যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরে তো বিয়েই দিয়ে দিলেন। উত্তম দত্তের সাথে বিয়ে হবার পরে শ্যামলী দু মাসে মাত্র একবারই এসেছিলেন সন্তোষে। বাবা বারণ করেছিলেন।
রামপ্রসাদ খুব নির্ভেজাল মানুষ। কার সাতেও নেই পাঁচেও নেই। উত্তমও তেমনি অনেকটা। বাইরের কোন ঝূটঝামেলা খুব সহজে বীতশ্রদ্ধ করতে পারে না। মহল্লার লোকেদের সকলেই খুব নরম -সরম মানুষ বলেই চেনে তাকে। টিপু সুলতান রোডের বাড়ি আর কাগজের গুদাম ছাড়া তেমন কিছু নেই তার। তবে অভাব নেই রামপ্রাদ বাবুর। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে দিব্যি চলে যাচ্ছে তার। অন্তত বেচে থাকার সংস্থান খুব ভালো করেই চলে যাচ্ছিলো।
লোকমান পার্টির নেতা। এলাকায় মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা খাজা খায়েরুদ্দিনের সহচর। উত্তমের দোকানের পাশে সেও গুদাম খুলেছে। উত্তমকে প্রায় প্রতিদিনই বলে, “কি মিয়া, যাইব্যা না তুমি? নিজের দ্যাসে যাওগা মিয়া। ইহানে কি কাম আর?”
উত্তম কথা না বললে আরেকটু বাড়িয়ে বলে, “শুনলাম বিয়া সাদি করছ। তাইলে আর থাইক্কা কাম কি! বাপেরে কও, না কি হেয় যায় না? … যাইব যাইব, বুঝাও হেরে বুজাও”।
রামপ্রসাদ নিজে নির্ঝঞ্জাট থাকতে চাইলেও যে থাকে না সেসব বুঝতে চায় না। উত্তম বুঝাতে চায় বাবাকে। কিছুদিন আগেও লক্ষ্মীবাজারে মিষ্টির ব্যাবসা করতেন নগেন ঘোষ। দোকানে আগুন লাগিয়ে দিয়ে একদম ছারখার করে দিলো। রাস্তার পাশে জমিসহ দোকান ফেলে শেষাবধি আর থাকলোই না, চলে গেলো। কেরানিগঞ্জে বর্মনপাড়ায় ঘরে স্বামীকে আটকে রেখে এক গৃহবধূকে ধর্ষন করেছে পার্টির লোকের মদদে। এসব শুনেও যেন রয়ে যান রামপ্রসাদ। সবকিছু ঠিক হবে ভেবে অপেক্ষা করছিলেন। মিটে যাবে সবকিছু এমন ভাবছিলেন।
উত্তম বাবা কে বলছিলেন, “বাবা, খরিদ্দার দেখলেই চমকায়। ব্যাবসাও কত্তে দিচ্চে না”।
রামপ্রসাদ ততদিনে একবার হলেও ভাবার চেষ্টা করেছেন সত্যি যদি না থাকা যায়। কিন্তু এও ভেবেছেন কলিকাতায় গিয়ে উঠবেন কোথায়! না আছে আত্নীয়-স্বজন, না আছে অবলম্বন। আর যারা আছে তাদের বাসা বাড়িতে উঠাই যাবে না। রামপ্রসাদের কাকাবাবু বরিশালে সোনার ব্যাবসায়ী ছিলেন। সে চলে গেছে সাতচল্লিশেই। সেখানে গিয়ে দু একবার চিঠি দিয়েছিলো। ইচ্ছে করলে যোগাযোগ করা যায় কিন্তু তাদের সেখানে নিজে নিয়ে যেতে চান না পরিবারকে। সেখানে সোনার ব্যাবসায় আরো বিস্তার ঘটিয়েছেন। রামপ্রসাদ করুনা নিতে চান না। আবার ভাবেন নগেন ঘোষের সাথে যোগাযোগ করবেন। কিন্তু পরক্ষনেই ভেবে উঠেন, নাহ! নগেন ঘোষই যে অবস্থায় দেশ ছেড়েছেন তাতে কি আর তাকে বিরক্ত করা যায়।
রোজকার রাতের আহারাদির সাজসজ্জা উত্তমকে খুব আরাম দেয়। বৌয়ের নিরামিষের চচ্চরি নতুন স্বাদ এনে দিয়েছিলো। শ্যামলীর ঈষৎ হাসি আর চেপে থাকা অভিমান যখন একাকার হয় একেকটি রাত যেন আরো সজ্জিত হয়। হলুদাভ গালের মধ্যে রক্তের চলাচল টাংস্টেন আলোয় মিলিয়ে যায়।তবে সকালের সদ্য ফোটা আলোতে রক্তের স্পন্দন যেন বুঝা যায় স্পষ্টতর। সারারাত্তিরের সংলাপ যেন তাকে আরেকটু ঘনীভূত করে আরেকটি রাতের প্রতীক্ষা করে। তুলসিকে পূজো দিয়ে তারপর শ্যামলি মহাদেবকে স্মরন করেন। শিবের পূজার জন্য মানত পোষেন।
কিন্তু উত্তম বলছিলো অন্য কথা,
“শোন, পূজো দিতে আর বাইরে যেও না। অবস্থা সুবিধের না তো বাইরের। ঘরেই অর্চনা সারো”
শ্বশুর রামপ্রসাদও বলে দিয়েছে, “বউ, মন্দিরে আর যাইও না”
উত্তমকে নিয়ে নাজিরা বাজারে গিয়েছিলেন সেদিন রামপ্রসাদ। উত্তমকে সাথে করে ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন। ডাক্তার গোবিন্দ গোস্বামীর চেম্বার ছিলো নাজিরা বাজারের ভেতরে। খুব নামি হোমিওপ্যাথির ডাক্তার। কিন্তু রামপ্রসাদ গিয়ে দেখেন ডাক্তার গোবিন্দর চেম্বার বাড়ির কোন শ্রী অবশিষ্ট নেই। লোকের কাছে শোনা গেলো এক মাস আগেই ফুলবাড়িয়াতে যে গণ্ডগোল হয়েছিলো সেসময়ে লোকে চাপ দিয়ে ডাক্তারের হাতে কিছু টাকা পয়সা গুজে দিয়ে বাড়ির দখল নিয়েছে। হোমিওপ্যাথির শিশিগুলোকে বস্তায় করে ফেলে দিয়েছে দূরে। নাজিরা বাজারের চারদিকে মুসলিম লীগের নেতারা পাকিস্থান জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে হুল্লোর করছে তখন। হিন্দুদের বাড়িঘর লুটতারাজ চালিয়ে কি এক তান্ডবনৃত্য সেসময়ে। রামপ্রসাদের নিজেরও ভয় হয়। বাড়ি থেকে তাই বের হন না। সেদিন বড্ড প্রয়োজনে খানিকটা পথ পেরিয়ে নাজিরা বাজার এসেছিলেন। তবে খুব দ্রুতই বাড়ি ফিরলেন সেদিন। সেসময়ে রামপ্রসাদ দত্তের ফরাশগঞ্জে ব্যাবসা ছিলো পরে সেটা বাদ দিয়েই জিন্দাবাহারে কাগজের গুদাম নেন। তখন সেখানে যারা ব্যাবসা করতেন তাদের প্রায় অনেকেই হিন্দু ছিলেন। যেমন, টিপু সুলতান রোড, কে জি গুপ্ত লেন, নবদ্বীপ বসাক লেন, প্যারিদাস রোডে হিন্দুদের ব্যাপক বসতি। অস্থির দিনগুলোতে মুসলিম লীগের নেতারা এখানে সরাসরি সংঘাতের পথে কমই হেটেছে। হুমকি ধামকি দিয়ে, শাসিয়ে কিংবা যেকোনভাবে হাত করে হিন্দুস্থানে পাঠানোতে তাদের মনযোগ ছিলো বেশি। অনেককেই এখন দেখা যায় না। বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছে। অবনীমোহন সেন প্রেসের ব্যাবসা করবে বলে কত আয়োজন করলো ফরাশগঞ্জে। কিন্তু ছোট ছেলেকে ধরে নিয়ে বেদম পেটানো হয়েছে। সে ভয়েই ওসব রেখে চলে গেছে। আর সুবিশাল বাড়িটা এখন কি ভূতুরে রূপ নিয়েছে না দেখলে বুঝা যায় না। যাদের ঘরে সুন্দরী মেয়ে আছে তাদের যেন আরো বিপদ। চারদিকে যা হচ্ছে রামপ্রসাদ তাতে ভড়কে যাচ্ছেন। রামপ্রসাদ বাবুর স্কুলের বন্ধু আওরঙ্গজেব এসেছিলো একদিন বাসায়। রামপ্রসাদকে দেখেই বুঝেছিলো উদ্ভূত ভয় তাকে গ্রাস করেছে। আওরঙ্গজেব রামপ্রসাদ আর নির্মলা দেবীকে অভয় দিচ্ছিলেন, বউদি ডরাইও না, আমরা আচি না? আরে ঐ রামবাবু ভয় পাচ কেলা? আমরা কি মইরা গেচি নি”।
আওরঙ্গজেব না হয় বদলায় নি কিন্তু মোজাহার কিন্তু বদলে গেছে আগাগোড়া। মুসলিম লীগের একজন পাড় সমর্থক হয়ে উঠেছে। কংগ্রেসি, স্বদেশীদের কথা যেন ওর শরীর না সওয়া হয়ে গেছিল। আলখাল্লা একটা গায়ে ঝুলিয়ে দাড়িতে মেহেদি মেখে পাকিস্থান জিন্দাবাদ বলতে বলতে যেন রগরগে হয়ে উঠে গলার শিরা। রামপ্রসাদ অনেক দিন থেকে মোজাহারের চোখে পড়েন না। এড়িয়ে যান। অথচ; আওরঙ্গজেব, মোজাহার, রামপ্রসাদসহ বন্ধুবান্ধবরা বিগত জীবনে কন হুল্লোর না করেছেন। এইতো বছর সাতেক আগে মাঝবয়েসেও নগেন ঘোষের মিষ্টির দোকানে কত আড্ডা মেরেছেন। আরমানিটোলা মাঠে কত ফুটবল খেলেছেন। কিন্তু সেসব যেন এখন নেই হয়ে গেছে। উবে গেছে। কি থেকে কি হলো, সব যেন ভেঙ্গে গেলো।
রামপ্রসাদের মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি কোনদিন চলে যেতে হয় তবে রাতের ঘুম টুকু হবে তো। এতো শান্ত, স্থির বায়ুর সম্মিলন নিমেষে ক্লান্তি শেষ করে দেয়, যে বাড়িটা শান্তির ঠিকানা হয়ে উঠেছে- এমন কি কিছু থাকবে? রামপ্রসাদ বিশ্বাস করেন না। টিপু সুলতান রোডের এই অপরিকল্পিত বাড়ি তার এতো আপন। ইন্দিরার পানি ছাড়া যে তার স্নান হয় না- সেটাই বা সমাধা হবে কিভাবে? রামপ্রসাদ এসব ভেবে উঠতে পারেন না। নির্মলা দেবী তো আরো ছাড়তে চান না। এখানেই মরতে চান।
“শোনো, মরলে একানেই মরবো, যাব না গো” নির্মলা দেবী সেদিন পুজো সেরে গম্ভীর স্বামীকে বলছিলো।
নাজিরা বাজার থেকে ফিরলে উত্তমকে বলে দিয়েছে মা, “উত্তম, ঘড়ের বা’র কম হও বাবা”।
সাতচল্লিশ থেকে সে অব্দি চারদিকের বাতাসে কোন মৃদুমন্দতা ছিলো না মনে হয়। এদিক সেদিকে মানুষের গৃহহারা ছবিগুলো যেন নতুন করে তৈরি হচ্ছিলো। চারদিক শুধু উত্তাল হয়েছে।
মানুষের দেশান্তরের মিছিল থামছিলো না।
শ্যামলি বাড়িতে এসে চারদিকটা আঁচ করতে পেরেছে। সন্তোষে যেসব বীভৎস কথা শুনেছে সেসব এখানেও ঘটে এবং ঘটছিলো। দুর্গাপূজার দিনে ভোরবেলা ছয় আনি বাজারের ঘরে আগুন দিয়ে একজনকে মেরে ফেলা হয়েছিলো। কাঠের বাড়ি ছিল। আগুনের শিখা যেন গর্জে উঠছিলো। পুরে আঙ্গার দেহ শ্মাশানে নেবার প্রয়োজন পরে নি আর। অথচ, কোথাও কোন শব্দ ছিলো না। কারো আফসোস ছিলো না। কারো চোখে কোন অপরাধ ছিলো না। অবলীলায় নিয়ম করে রুদ্ধ সকালের সংখ্যা বাড়ছিলো দিনের সাথে সাথে। শ্যামলীর সঙ্গে উত্তমের কথা হয় রাতে। অতিশয় গোপন এবং পরম নিবেদনের প্রারম্ভ তখনি। নিত্যরাতে জমে থাকা কথাগুলো তখন একে একে বেরুতে থাকে। আহ্লাদের নিরন্তরতা যেন রাতগুলোকে শূন্য হাতে ফেরায় না। বৈশাখের দমকা হাওয়া যখন বইতে শুরু করে ওরকম কোন রাতে, শ্যামলী জাপটে ধরে উত্তমকে। শুধু উন্মাত্তাল বায়ুর ত্রাসে নয়, সেরকম বীভৎস সকাল নেমে আসে কি না এখানেও-সে ভয়ে! শ্যামলী উত্তমকে বলছে,
‘মানুষের সাথে অতশত কথা বলবা না’
-হুম, বলি না
-আর, এতো রাতে না আসলে কি হয় না?
-হুম, আসব তো, তাড়াতাড়ি আসব এখন
পরদিন ঠিকই দ্রুত ফিরেছিল উত্তম। দোতলায় ঘরে ঢুকে শ্যামলীকে দেখে অল্পস্বল্প হাসছিল। মুচকি হাসির থেকে খানিক স্তূল হাসি। শ্যামলী হাসির প্ততুত্ত্যর করছিলো হাসিতেই। উত্তম শ্যামলীর হাতটা হঠ্যাৎ ধরে ফেললো। শ্যামলীর ঘোমটা পরে গেছিল।
-তোমার কি টাঙ্গাইল যেতে মন চায়’
-একলা না, তুমিও
-জিন্দাবাহার?
-ক’দিন বন্ধ থাক
বলতেই আরো শক্ত করে জাপটে ধরছিলো। বা’হাতে জামার পকেট থেকে সন্তোষের চিঠি ধরিয়ে দিলো, ‘বাবা পাঠাইছে’। এতদিন পরে সন্তোষের চিঠি পেয়ে খুব খুশি হয়েছে। ভাবছিলো বাবা এবার যেতে বলেছে মনে হয়। সন্তোষ এখন আগের মতো। তা না হলে কি আর বাবা যেতে বলে। শ্যামলী ভেবে রেখেছে লৌহজং এর পাড়ে অনেক কাশফুল ফোটে। ছোট ছোট ঢেউ দোল খায়। লৌহজং এর পাশে এক পিসির বাড়ি আছে। সে পিসির বাড়িতে বেড়াতে যাবেন। বাড়ির সামনে এসে লৌহজং এর ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ে। বাব্র সঙ্গে ছোটবেলায় এক পূজার বিসর্জনে গেছিলেন শ্যামলী। আবারো যেতে চান। সন্তোষের কাছেই। তবুও যেতে চান উত্তমকে নিয়ে।
-আমি কি চিঠি পড়তে পারি, উত্তমবাবু?
-হুম, ছেড়ে দিলাম। পড়।
বারান্দায় ইজি চেয়ারটাতে বসে আলো জ্বালিয়ে চিঠি পড়ছিল।
আর উত্তমকে বলছিল, স্নান করলে করে নাও, খাবার দেবো।… ভাল হয় স্নান না করলেই। রাতে ঠাণ্ডা লাগবে।
উত্তম ইন্দিরা থেকে স্নান সেরে আসতেই শ্যামলীকে দেখলো কাদছিলো। উত্তমের হাতটা ধরে বলছিলো, আমাকে কালই সন্তোষ নিয়ে চল
-কালই? কেন, কি হয়েছে?
-বাবা, এই হপ্তায় চলে যাচ্ছে
-কি বলছো?
-হ্যাঁ, তাই
উত্তম চিঠিটা নিয়ে পড়ে দেখলো। শ্যামলীর দাদা-বউদি আর বাবা-মা মিলে চলে যাচ্ছে এই হপ্তায়।
চিঠিতে শুধু লিখেছে-কোনকিছুর জবাব দেয়ার উপায় যেখানে যায় না, সম্মান-সম্ভ্রম যেখানে রক্ষা করা যায় না সেখানে আর থাকা সম্ভব নয়। শ্যামলীর দাদাবাবুর তরফে চিঠি এসেছিল।
বাড়ির পাশে পুকুরের স্নানঘাটে শ্যামলীর বউদিকে নোংরা ভাষা ব্যাবহার করেছে। মুসলিম লীগের কর্তাদেরকে বলে কোন বিচার পাওয়া যায় নি। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা আর থাকছেন না।

মধ্যরাতের নীরব প্রকৃতি জোনাকির অভাবে আরো অন্ধকার। আলো ফোটার প্রসববেদনায় এমন নিকষ অন্ধকার। তবে ভোরের আলো স্বস্তি আনে না। ততক্ষণে চারদিকে অচ্ছুৎ হবার তীব্র উপলক্ষ। ধ্বংস হবার অনেক হেতু।
গোয়ালন্দ ঘাট থেকে ট্রেনে উঠে পড়েছে অঞ্জনা। অনেক পথ হেটে শেষমেষ অনেক মানুষের সাথে ঘাটের স্টেশনে মিশে গেছে। এখানে সবাই অঞ্জনার মতোই দুর্দশায় পতিত। অঞ্জনার বাড়ি আর পারাজুড়ে সারা রাত তান্ডব চলেছে তাতে বাবাকে সোজা জবাই করেছে ওরা। মা কোথায় চলে গেছে দিগবিদিক তাঁর কোন ঠিকানা নেই। বড় বৌদিকে ঘরে ঢুকিয়ে পাঁচজন মিলে টেনে হিঁচড়ে খুবলে খেয়েছে। দাদাকে তুলে নিয়ে গেছে। সিন্দুকটা বাঁশে ঝুলিয়ে নিয়ে চলে গেছে। কোন বিধান-কানুন নেই পাড়াজুড়ে। জন্মজনমের বাসিন্দারা এরকম অসহায় হবে-এমনটা ভাবাও দুষ্কর। দমকা হাওয়ার মতই আছড়ে পড়ছে এদিক থেকে সেদিক। পূজোর ঘর থেকে বাইরের এতোসব হাঙ্গামা দেখে আঁচ করতে পেরেছিলেন-ভয়ানক কিছু ঘটছে। কিন্তু জানা দুঃসাধ্য ছিলো।
প্রতিমার আড়াল থেকে অন্ধকারে চুপ করে বেড়িয়ে পড়েছেন। গোয়ালন্দ ঘাটে এসে ট্রেনে উঠে পড়েছেন। অঞ্জনা তখনো অবিবাহিত। সিঁথিতে সিদুর ছিলো না। তাই মানুষের বুঝার উপায় ছিলো না হিন্দু কি মুসলমান। গোয়ালন্দ ঘাটে তখন মানুষের আনাগোনা। ট্রেন ধরে সোজা চলে যাচ্ছে। ওপারে গিয়ে কোথায় নামবে সেটা কেউ জানে না। কুষ্টিয়া, পোড়াদহ গেলে সে ভিড় আরো বেড়ে যায়। পাবনা, আটঘরিয়ার মানুষও এসে জমে উঠে। এদের কারো হাতে বলার মতো কিচ্ছু নেই। যার যার মতো করে বাক্সপেটরা নিয়েছে। বাড়িঘর সম্পত্ত্বির মায়া অনেকে ধরে রেখেছিলো আবার অনেকে ভেবেছে, আর ফেরা হবে না। কি এক অসহায় মুখচ্ছবি। নিতান্ত দরিদ্র কিংবা কোনরকম দিন গুজরান করা মানুষগুলোই পাড়ি জমিয়েছে। যাদের ঘরে সুন্দরী বউ, মেয়ে ছিলো তাদের যেন তখন দরিদ্রতাই আরো বড় অভিশাপ হয়ে উঠেছিলো। অঞ্জনাও সেসব লোকের ভিড়ে এখন একজন। যার বাবা-মা কারো কোন খোজ নেই। এতোসব স্বজনের জন্য কোন হতাশা, চিন্তা যেন ওর মধ্যে আর নেই। একটা পাথর যেন শুধু নিজের কোন ঠিকানা খুজছিলো তখন পৃথিবীতে। হয়তো ঠিকানাও খুঁজছিল না। যেতে হবে তাই যাচ্ছিলো, পেছনে ফেরার কোন ঊপায় যে আর নেই!শঙ্কার রাশভারী রূপ ধসিয়ে দিয়েছে ভেতরটাকে। একজন বৃদ্ধার কাছে জিজ্ঞেস করছে, জল পাওয়া যাবে জেঠিমা?এক অসহনীয় যাত্রার সময় যেন শুধু দীর্ঘ হচ্ছিলো। ট্রেনে লোকে বলাবলি করছে, ট্রেন থেকে নেমে কিছু একটা ব্যাবস্থা আছেই। আবার কেউ কেউ অদৃষ্টের হাতে সপে দিয়ে বলছে, দেখা যাক কি আছে কপালে। হালকা শীত বইছিলো। শীতেও যেন ঘাম ঝড়ে পড়ছিলো। সিঁথির সিদুর লেপ্টে গেছে কপালে অথচ খেয়াল নেই গৃহবধূ রমণীদের। দুগ্ধবতী পোয়াতী সন্তানের কান্না থামাতে না পেরে মানুষের সামনেই স্তন গুজে দিয়েছে। বৃদ্ধা তাঁর মৃত পুত্রের জন্য বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলো। এতো মানুষ অথচ কেমন যেন আতঙ্ক; অন্যরকম নিস্তব্ধতা। অর্ধেকের বেশি মানুষ এখানে দেশান্তরী। তাদের সংজ্ঞাহীনতায় বাকিরাও যেন গুমড়ে গেছে। অঞ্জনা বসে আছে জানালার পাশে একদম গুটিসুটি হয়ে। কোনরকম বিকার নেই ওর। কোথায় যাচ্ছে তাঁর কোন ঠিকানা জানা নেই। রয়ে যাবারও কোন উপায় নেই। আশ্রয়ের মানুষগুলোরই কোন অস্তিত্ব নেই।
ট্রেনের একেকটি হুইশেল অঞ্জনাকে বিভ্রম থেকে সম্বিত এ ফেরায়। জরাগ্রস্থ শোক তাকে যেন আরো গভীরে ফেলতে জাগিয়ে তোলে। রোজ সকালে ফুটা ফুল, শিশিরে আছাদিত ফুল, নিপুণ প্রতিমার পাশে যেন বৌদির ছেড়া শাড়ি, মায়ের আহাজারি কালো রেখা তৈরি করছে মনে মনে। অন্তরজুড়ে দুটি প্রতিচ্ছবি ভড়কে দেয় অঞ্জনাকে। অঞ্জনারা চলেই আসতো। জায়গাজমি, ব্যাবসাপত্র গোছাতে শুরু করেছিলো বাবা, দাদা। বাবা যখন বলছিলো শিলিগুড়ি চলে যাবে। অঞ্জনার সবচেয়ে বড় পিসির বিয়ে হয়েছে ব্যারাকপুরে। পিসি বলছিলো ব্যারাকপুরেই চলে যেতে। অঞ্জনার বাবা সেখানে গিয়েছিলেনও কিছুদিন আগে। ব্যারাকপুরে জুটমিলে দাদার একটা চাকরির ব্যাবস্থা করে দেবে পিসতুতো দাদারা। সেখানে গোছগাছও চলছিলো।
বাগানে নতুন চারা লাগাচ্ছিলেন অঞ্জনা। বাবা বলছিলেন তখন, ‘ওসব এখন করে কি হবে? চলেই যাবি তো’। কিন্তু অঞ্জনা ওসব ছেড়ে যেতে চাইতো না। এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে এমন ভাবতেই যেন খুব কষ্ট হচ্ছিলো। শেষবেলার সন্ধ্যে প্রদীপ, স্বরসতীর প্রতিমায় আরো ধুসর হয় ধুপের কুণ্ডলীতে। পুজোটে ব্যাথার সম্মিলন ঘটে, প্রদীপে অনুরাগ ভেসে উঠে। চোখের কোণ আধটু জলাচ্ছাদিত হয়, আর্দ্র হয়। সন্তোষের অনেকেই গত কয়েকদিনে ভিটেমাটি ছেড়েছে। শ্যামলী বাবা উত্তমকে খুব অনুযোগ করে বলেছে, “বাবা আর থাকিও না। শ্যামাকে নিয়ে তোমরাও চলে আসো। এখানে থাকতে পারবে না”।
আর শোন, তোমার বাবাকে আমার চিঠিটা দিও।……বলে উত্তমের হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিলো।
শ্যামলীর তখন ভেতরটা বের হয়ে আসছিলো। বাবা মা দাদাকে এভাবে ছেড়ে দিতে হচ্ছে, যেন মেনে নেয়া যাচ্ছিল না। ভাবছিল, আর মনে হয় এই জন্ম জন্মান্তরে দেখা হবে না। খানিক পর পর উত্তমের বুকে গড়িয়ে পরছিলো। শ্যামলীরও যেতে ইচ্ছে করছিল বাবা-মার সাথে। কিন্তু সে কি আর হয়। এখন তো উত্তমের কাছে সে বাধা পড়েছে। এই কয়েকমাসের ব্যাবধানে উত্তমকে ছেড়ে থাকাটা কল্পনাতেও আনতে পারে না। তবুও শ্যামলীর অনুচ্চারিত কথাটা এমন, উত্তমসহ চলুক।
টাংগাইল শহরজুরে তখন নয়া পাকিস্থানের মিছিল। হাতে বিড়ি মুখে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্থানের স্লোগান তখনও যেন আকাশে বাতাসে। মাথায় টুপি আর গায়ে আলখাল্লা পাঞ্জাবির সেই দাপট। মন্দির ভাঙ্গা গুড়িয়ে দেয়া তখন যেন ইবাদত, সাচ্চা মুসলমানের বাচ্চারা যেন রক্ত নিয়ে, ঘরছাড়া করে ইবাদত করছে। মুসলিম লীগের নেতারা অন্তত তাই বলছে।
শ্যামলীকে নিয়ে উত্তম ঢাকায় ফিরেছে। হুলুস্থুল কান্ড বেধে গেছে চারদিকে। নারিন্দা,সূত্রাপুরে প্রসিদ্ধ অনেক হিন্দুই নেই। ব্যাবসাপত্তর গুটিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। এই বিগত পনেরো ষোল দিনে যেন উৎপাত ঢের বেড়ে গেছে। এখানে কে প্রশাসন, কে সরকার তাঁর কোন কিচ্ছুই ঠিক নেই। মুসলিম লীগই যেন এখানে প্রশাসন!! জিন্দাবাহার লেন এর নৃসিংহ ঘোষের মেয়েকে কারা যেন রাতে তুলে নিয়ে গেছে। কোন খোজ খবর পাওয়া যাচ্ছে না। দেখতে অসঅম্ভব সুন্দরী মেয়েটি ঘর থেকে বেরই হত না। শোনা গেলো যে, এক মুসলিম যুবক জোর করে বিয়ে করেছে। শেষমেশ নৃসিংহ ঘোষও চলে গেছে।
বাড়িতে ঢুকতেই বিমর্ষ রামপ্রসাদের চেহারা প্রত্যক্ষ করলেন উত্তম। বাবার মুখটা দেখেই বুঝেছিলেন কিছু একটা ঘটেছে। বাবা কে কিছু না বলে দোতলায় উত্তমের মা শুয়ে ছিলেন। শ্যামলী শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েচে মা, শরীল খারাপ করেচে? মাথায় হাত দিয়ে দেখছিলো শ্যামলী।
শাশুড়ি উঠে বসে বলছিলো, ‘না গো বৌ আমার কিচ্চু হয় নি। গোডাউন নাকি লুট করেচে’!
হ্যা, রামপ্রসাদও উত্তমকে বলছিলেন। গোডাউনে আর তেমন কিচ্ছু নেই। ক্যাশবাক্স নিয়ে চলে গেছে। মালপত্তর যা ছিলো নিয়ে গেছে, যা আছে তা বিশেষ কিচ্ছু নয়। রামপ্রসাদ গোডাউন থেকে ভাঙ্গা গণেশের প্রতিমাটাকে এনে রেখে দিয়েছে ঘরে। সমস্ত গোডাউন তছনছ করে রেখেছে। কাগজের স্তূপে গনেশ পরে ছিলো।
……
শিয়ালদহ স্টেশনে পূর্ববঙ্গ থেকে একেকটি ট্রেন যখন আসছে তখন যেন তাদের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ভয়,আতঙ্ক,অনিশ্চয়তা। স্টেশনে তিল ধারনের জায়গা নেই। হাওড়া, বিহার, আসাম এবং পশ্চিমবাংলার অন্য জায়গার থেকেও যেসব ট্রেন আসছিলো সেসবের যাত্রীরা একদম বিরক্ত। প্রতিদিন এতো উদ্বাস্তু মানুষ ভিড় করছে। তারাও শঙ্কিত এতো মানুষ থাকবে কোথায় এখানে। সদ্য ভারত সরকারেরও কোন মাথাব্যাথা যেন নেই। শিয়ালদহ স্টেশন যেন এক মৃত্যুপুরী অথবা ভাগাড়। স্বচ্ছল এবং খানিকটা মধ্যবিত্ত হিন্দুরা অনেকেই এখানে আত্নীয় স্বজনদের বাসাবাড়িতে উঠেছে, চাকরি বাকরি বা কোন একটা দিনের নিদান করে নিয়েছে। কিন্তু একটু দরিদ্র, অস্বচ্ছল বা টেনেটুনে সংসার চালানো হিন্দুদেরই বেশি বিপত্তি। এদের না আছে আবাস, না আছে খাবার। ৬০০ মানুষকে প্রতিদিন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার উদ্বাস্তু কলোনিতে নিয়ে রেখে আসছে। আবার সেগুলো স্থান পূর্ণ হচ্ছে নতুন উদ্বাস্তুতে। স্টেশন সুতা দিয়ে বেধে দেয়া হয়েছে এরিয়া। এর মধ্যেই উদ্বাস্তুরা রাত কাটাচ্ছে, দিন কাটাচ্ছে আর অপেক্ষা করছে কখন গাড়ি আসবে কখন যাবে নতুন ঠিকানায়। শিয়ালদহ স্টেশনের সকালের চিত্রটা আরো মারাত্নক। স্টেশন থেকে এই কিছুটা দূরেই , একেবারে রেললাইন ঘেষে অনেকে নিজের লজ্জার পর্দাকে দূরে ঠেলে প্রাকৃতিক কর্ম সারছে। এ মানুষগুলো তো নিরুপায়। শিয়ালদহ স্টেশনে শৌচাগার ১২ টা। আর মানুষের হিসেব নেই। স্নানকার্য প্রায় অসম্ভব। তবুও যুবতী তরুণীরা খোলা জায়গায় স্নান করছে। ঋতুবতী নারীদের কাপড় রক্তাক্ত কিন্তু পরনের বস্ত্র নেই অনেকের। ঘটনার আকস্মিকতায় যারা এসেছে এখানে শুধু জীবনটা নিয়েই এসেছে অনেকে। মানুষের বিষ্ঠার গন্ধ নাকে আসছে, এর পাশেই মানুষ ঘুমুচ্ছে। কলেরা, বদহজম, ডায়রিয়া বেধে গেছে মানুষের। একদিন পর পরেই শোনা যায় একজন শিশু মারা গেছে। ডায়রিয়া, কলেরায় মারা যাচ্ছে বেশি। দেখার জন্য ডাক্তার নেই, ওষুধ তো দূরে থাক। রাজ্য সরকার আর কেন্দীয় সরকারের ‘ডোল’ এর আশায় দিন কাটতো এদের। ডোল হলো সামান্য কিছু অর্থ আর চিড়া-গুড়ের যৎসামান্য সাহায্য। সেই খাবারও অস্বাস্থকর, পরিমাণে অল্প। কলকাতার মধ্যিখানে শিয়ালদহ স্টেশনের মানবেতর জীবনের স্রোত যেন দীর্ঘতর হচ্ছে দিনকে দিন। অঞ্জনা এখানে এসে পড়েছে উদ্বাস্তু হিসাবে। গোয়ালন্দের ট্রেন এখানে এসে ভিড়েছে।
সাদা শাড়িতে অঞ্জনাকে বড় মিষ্টি লাগে। এলো চুল অবাধ, বাধা মেনে চলতো না। সদা অস্ফূট হাসির জন্য দেবতার কাছে নিজেই কৃতজ্ঞতা জানাতো। সত্যিই অসাধারণ মোহময় সে হাসির বিহ্বলতা। মাঝারি স্বাস্থের মধ্যে কটিদেশ স্থির তবে চঞ্চল ছিলো। কন্যাদর্শনে আলোয় অপরূপ। উদ্বাস্তুদের ভিড়ে অঞ্জনা তাই খুব চেনা। খুব পরিচিত। এতো অমন সলজ্জ, অপাংক্তেয়, নিঃস্ব আলোর প্রভা তবু জ্বলছে। এতো এতো ক্ষুধা,এতো ব্যাথা, এতো ভয়ের মাঝেও যেন রূপলাবণ্য প্রতিভাত। শিয়ালদহ স্টেশনের বিরুদ্ধবাস আর কতো? অঞ্জনা খেই হারিয়ে ফেলার উপক্রম। এই অবসন্ন দেহের দেহশক্তি তো বিলিন হতে পারে। এখানে এসে ওর বয়েসি অনেক তরুণী এসেছে। ওদের কোন না কোন অবিভাবক আছে, দেখার কেউ আছে। ওর তো তেমন কোন আশ্রয় নেই। তবে হ্যা, এখানে অনেকেই এখন পরিচিত। বরিশালের এক দাসপত্নীর বিছানায় ঘুমান অঞ্জনা। দাসপত্নীর সাথে ঠায় বসে থাকেন। ডোল আসলে একসাথে আনতে যান। অঞ্জনার মনে পড়ে একদিন নিত্যানন্দ তাঁর হাত ধরেছিলো। সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালিয়ে বাড়ির পেছনের কাশবনে দেখা হয়েছিলো নিত্যানন্দের সাথে। সেদিনের স্পর্শ, ঝড়ের বেগে ঠোট ভিজিয়ে দেবার পরে সে কি কান্না অঞ্জনার। তবে সে কান্না ঠিক হারানোর কান্না নয় তাই অঞ্জনা এখনো নিত্যানন্দকে মনে করেন। সে স্পর্শ অনুভূতি এখনো শিহরিত করে তাকে। নিত্যানন্দ আর ওর বিয়েটা হয়েই যেত। কিন্তু এখন নিত্যানন্দ কোথায় অঞ্জনা জানে না। নিত্যানন্দকে আজ খুব মনে পরছে ওর। শিয়ালদহ স্টেশনে উদ্বাস্তু যুবতী বা আধ বয়েসি নারীদের খদ্দের তখন ঘুরঘুর করে। অল্প পয়সার খদ্দের তবে ওদের ভাষায়, ‘খাছা মাল! অল্প টাকার খাছা মাল’!! অঞ্জনা তখন পণ্য।
প্রায় দুদিন ধরে ডোল বন্ধ। আর কত?
আর সহ্য হয় না অঞ্জনার। ডোলের চিড়া খেয়ে ফুড পয়জনিং এ শরীর এমনিতে আর চলে না। আর এই অভাবের জায়গায় কারো খাবার কেউ কাওকে দেয় না। অর্থকড়ি যাদের সঞ্চিত আছে তারাও কেউ কাওকে দেয় না। অঞ্জনা প্রথমবার যখন একটি মাঝ বয়েসি পুরুষের শয্যা গ্রহন করেছে চোখটা ফুটে যেন জল তীব্র বেগে ছুটে বেরুচ্ছিলো কিন্তু নির্গত হবার জো ছিল না। সেই তীব্র ব্যাথার চিৎকারে মাকে ডেকেও পাচ্ছিলো না। আর অমন একটা বর্বর পুরুষ একজন দানব সিংহ। কি হিংস্র!! ওপারের রক্ত হোলি এপারেও থামে নি। তবে যা কিছুকে আগলে রাখা কোন এক মধুশয্যার প্রতীক্ষায়, যেমনটি সকল নারীর বলাবাহুল্য বাঙালি নারী মাত্রের-সেই অমূল্য ব্যাঞ্জনাকেও বিকিয়ে দিলো অঞ্জনা। এ বঙ্গ আর ও বঙ্গ- কেউ তো তবে ছেড়ে কথা বলল না। বাকি থাকে শুধু ওপারের নিত্যানন্দ। অঞ্জনা রক্তাক্ত শয্যায় বসে তবুও অস্ফূট গলায় বলছে, ‘নিত্যানন্দ, তোমায় ভালোবাসি’।

কলকাতায় উদ্বাস্তুদের স্রোত যেন থামছিলোই না। কলকাতার রাজনীতি, কেন্দ্রিয় সরকারের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ যেন উদ্বাস্তুদের ইস্যুকে দূরে ঠেলে রাখতে পারছিলো না। কলকাতায় তখন রেভুলুশনারি সোসালিস্ট পার্টি(আরএসপি), কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া(সিপিআই) আর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দাপট। তবে আরএসপি ও সিপিআই এখানে উদ্বাস্তুদের মধ্যে অধিক ক্রিয়াশীল। আরএসপি দক্ষিন কলকাতার রেলপথ ঘেষে ‘সংহতি’ নাম নিয়ে অনেকগুলো ক্যাম্প তৈরি করে ফেলল, সিপিএম ‘কর্মপরিষদ’ নামে ক্যাম্প খুলতে শুরু করলো। তবে এর বাইরে উদ্বাস্তুরা নিজেরাই ফাকা জায়গা পেয়ে সেখানে ক্যাম্প তৈরি করে বসবাস শুরু করছিল। ততদিনে কলকাতায় সংযুক্ত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদ গঠিত হয়ে গেছে। মূলত উদ্বাস্তুদের অধিকারের জন্য এসব তৈরি হচ্ছিলো। বামপন্থিরা তাদের মতো করে এখানে থেকে বিপ্লবী কর্মী বাহিনী গড়ে তোলাতে তৎপর। এ যেন সিপিএম দলভারি করবার উপলক্ষ পেলো। আরএসপিও তাই। কেউ যেন উদ্বাস্তুদের মূল সমস্যায় আন্তরিক নয়। পার্টি কংগ্রেসে নতুন থিসিসে নতুন সংগ্রামী পন্থায় তখন মশগুল। ভারত এবার তারা লাল করেই ছাড়বে! সোভিয়েতের লাল নিশান এখানে তারা উড়াবে। শ্রমিক কৃষকের অভ্যুত্থান ঘটাতে ক্যাম্পে ক্যাম্পে বামপন্থীদের গোপন মিটিং। পার্টি তো রীতিমতো শিহরিত হয়ে যাচ্ছে এই ভেবে যে, এই শ্রমিক মজদুরেরা বিপ্লবে লাইন লাগাবে। উদ্বাস্তুদের আশ্রয় আবাসের চিন্তা আর শ্রমিক কৃষকের বিপ্লবী কাফেলা যেন এক হবে। পার্টির বেয়ারা কর্মীরা বলছে, থিউরিকেলি এসব বলা যায়ই। যান,গিয়ে দেখেন উদ্বাস্তু কলোনিতে। এসব বিপ্লব ফিপ্লব ওরা করবে না। এবং হলোও তাই, অনেকগুলো ক্যাম্পে সংগঠন বিস্তৃতি করতে গেলে উদ্বাস্তু সংগঠনের নেতারা তাড়িয়ে দিল। কৌশল পালটে সিপিআই আটঘাট বেধে নেমে পরলো। পরিচয় গোপন করে সংগঠন গড়ে তুলতে হলো। কিন্তু দেখা গেলো বামপন্থী উদ্বাস্তু নেতারা নিজেদের মুখোশ আর রাখতে পারলেন না। রাজনৈতিক সংবেদনশীলতায় নিজেদের উদ্বাস্তুদের সঙ্কটের সাথে নিজেদের বিলীন করে দিলেন। উদ্বাস্তু জীবনের কান্না ছাপিয়ে উঠল সব কিছুকে। চারদিকে জেগে উঠলো উদ্বাস্তু সংগঠনগুলো। অন্য সংগঠনগুলোর তৎপরতাও দীর্ঘ হয় নি। উদ্বাস্তুদের কেন্দ্রীয় সংগঠনের দাবিনামার চাপে এসব রাজনৈতিক তৎপরতা বেগ পায় নি। সকলে এম মঞ্চে এসে বাধ্য হয়েছে উদ্বাস্তুদের কথা বলতে। কেন্দ্র, রাজ্যের উদাসীনতা রণে ভঙ্গ দিয়েছে। তবে সেসব মন্থর তৎপর কর্মকলাপ হালে পানি দেয় নি। স্থানে স্থানে গড়ে উঠছিল জবরদখল করা কলোনি, কলকাতার ফাকা বাড়িঘর দখলের যাদের ক্ষমতা ছিলো তারা দখলে নিয়েছে আর যারা দরিদ্র উদ্বাস্তু তারা যে যেখানে যেমন করে পেরেছে ক্যাম্প তৈরি করে বসবাস করা শুরু করেছে। আবার কখনো তাদের জবরদখল কলোনি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আবার দখল করা হয়েছে। কলকাতার রাস্তায় পুলিশের সাথে কলোনি নিয়ে খবার নিয়ে সংঘাত সংঘর্ষও ঘটেছে কয়েকবার। এভাবে কোনরকমে দিন গুজরান করবার পথ বাতলে নিয়েছে নিজেরাই। ভারতের কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন মন্ত্রী মোহনলাল সাকসেনা কলকাতা এসে বৈঠক ডাকলেন উদ্বাস্তুদের সমস্যা সমাধানে। কিন্তু উদ্বাস্তু স্রোতের সাথে জমতে থাকা বিক্ষোভ যেন আরো বাড়ছিলো। রাজনৈতিক দলগুলির প্রারম্ভিক নিরবতা এবং স্ব স্ব কৌশলী অবস্থান যেন আরো সংকুল করেছে পরিস্থিতি। রানাঘাট, ফুলিয়া আর গঙ্গার দুপাড়ে গড়ে উঠেছে নতুন ক্যাম্প। গঙ্গার দুপাড়ে চটকলের গুদামগুলোতে হয়েছে একেকটি ক্যাম্প। আবার শাহপুর,যোধপুর,বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরর সময়ে সৈনিকদের পরিত্যাক্ত ক্যাম্পে গড়ে উঠেছে উদ্বাস্তু ক্যাম্প। হুগলী, ব্যারাকপুর, বনগাঁ, কাচরাপাড়াসহ কলকাতা ও কলকাতার আশেপাশে গড়ে উঠছে উদ্বাস্তু ক্যাম্প। মাসিক দশ টাকা থেকে পনেরো টাকা সাহায্য পেতো লোকজন। এ থেকে ক্যাম্পের মধ্যে সরকারের দেয়া চাল কিনে খেতে হতো। ডোল পেতো নিয়ম করে। বাঁশের চাটাই বিছানো। কোন কোন জায়গায় আবার দোতলা করে দেয়া। কাঠের পাটাতনের উপর নিচে বিছানা। ওসব খুপড়িতে কোন জানালা নেই। এক ঘরে এরকমও হতো শ্বশুর শাশুড়ি, স্বামী স্ত্রী, বাচ্চা, বড় মেয়ে একসাথে গাদাগদি করে ঘুমাতো। রাতের অন্ধকারে ক্লান্তিতে ঘুম ওদের মধ্যে চিরকালের লালিত সংস্কার, আদবকেতাকে দূরে ভুলিয়ে রাখতো। হয়তো তুমুল কষ্টেও ইচ্ছে হওয়া মিলনটুকুও হতো না। চেপে রাখতো।
অঞ্জনা প্রথমে গঙ্গাপাড়ের চটকলের গুদামে একটি ক্যাম্পে উঠেছিলো। মাঝেরহাট ক্যাম্পের কমান্ড্যান্ট অঞ্জনার খদ্দের। ক্যাম্পে সরকারিভাবে নিয়োগকৃত লোকরাই কমান্ড্যান্ট। কমান্ড্যান্ট অঞ্জনার জন্য একটা ছোট একা থাকার ঘর দিয়েছে। সেখানে অঞ্জনার দিন কাটে। অঞ্জনার হাতে এখন ভালোই টাকা পয়সা। ক্যাম্পের খাবার অঞ্জনা এখন খায় না। খেলেও খুব কম। কমান্ড্যান্ট এর নাম অর্জুন। একদিন সকালে অর্জুন ডাকছিলো অঞ্জনাকে, ‘একটা মেয়ে এসেচে ওপার থেকে। তিন চারদিন থাকবে। এরপর যোধপুর ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিবো’।
-আমার সঙ্গে থাকতে পারবে তো?
-হুম, পারবে পারবে।
-আমি যা বলচি তা বুঝেচো?
-আরে হ্যা, আমি বুঝেচি
-আচ্চা, পাঠিয়ে দিও
-রাতে আনবো
শ্যামলীর সিঁথিতে সিঁদুর। অঞ্জনা বুঝেছে মেয়েটি বিবাহিত। বাড়ি টাঙ্গাইলের সন্তোষে। অঞ্জনা জায়গাটির নাম শুনেছে দাদার কাছ থেকে তবে যায় নি কোনদিন। আর বিয়ে হয়েছে ঢাকায়। শ্বশুরবাড়িতে কাগজের গোডাউন ছিল। সেটি চুরি যাওয়া নিয়ে কথা কাটাকাটিতে শ্বশুর কে মেরে ফেলা হয়েছে। স্বামী উত্তম কে বেধে রেখে ধর্ষণ করেছে শ্যামলীকে। শিয়ালদহ স্টেশনে নেমে আর মনে হয় নি এই মুখটা উত্তমকে দেখাবে। শাশুড়ি আর উত্তমকে স্টেশনে বসিয়ে রেখে কলকাতায় বেড়িয়ে পড়েছে। জবরদস্তি করে হেনস্থা হওয়া শরীরটাতে তখন শুধু আক্ষেপ। এ কি হলো। নাহ! আমার স্বামী অন্তত আমাকে আর স্পর্শ না করুক।
সবশেষে দিন তিনেকের ব্যাবধানে মাঝেরহাটে।
আর অঞ্জনা বলছিলো তখন, তোমাকে খেয়েছে জোর করে আর আমাকে খেয়েছে বিপদে ফেলে। তফাৎ কি?
-নাই তফাৎ
-তোমার শরীর থেকে অনেক দুর্গন্ধ বের হচ্চে যে, স্নান কর নি মনে হচ্চে
-হু, করবে নে!
-নাহ, চল যাই, তোমাকে স্নান দিয়ে নিয়ে আসি। ক্যাম্পে জায়গা পাবে না।
-তাহলে?
-খদ্দের আছে, খদ্দের। কিছু খদ্দেরের দিল আচে, বুচ্চো?……বুজতে হবে না, চলো

……

হলো তো পড়ায় দশ বছর। এখন অব্দি আর চলছে না। ভাজ পড়েছে গলায়। শরীরের সব চেয়ে আদৃত হবার কথা ছিলো যে অঙ্গের কিংবা লজ্জায় যার খেলো খেলো আনন্দ অদ্ভূত সুন্দর সে অঙ্গের বিকিকিনিই জীবন হয়ে উঠেছে। রঙচঙে গোগ্রাসে গিলতো যেসব মানুষজন তাদের আর ভালো লাগে না। নেতিয়ে পড়া স্তনযুগুল ওদের কাছে খেলনা হয় না আর। কামড়ে দেবার অসংখ্য দাগ এখনো ব্যাথাতুর। দাতের বিষাক্ত ছোবল মানুষেরও যে আছে শ্যামলী কিংবা অঞ্জনার শরীরে, বুকে যেন সেসব প্রগাঢ়। কোনদিন যদি ভুলেও ভালবাসার মতো করে ইচ্ছে করে, ভুল করেও ক্ষনিকের জন্য ভালবেসে আলিঙ্গন করতে ইচ্ছে হয়; সেটিও অচ্ছুৎ হয়। অমন বিকিকিনিতে ভালবাসা হয় কি করে। কখনো যদি ভালাবাসাচ্ছলে, মনের গোপন থেকে উঠে আসা প্রত্যাশা জমে উঠে ক্ষোভ জেগে উঠে,
-‘অই মরদ, আস্তে হয় না, আমারে কি যন্তর মনে করিস নে কি?’
খদ্দেরের সেসব যেন শুনে অভ্যেস নেই। হাতকে ঝাটকা দিয়ে বলছে,
‘এ্যাহ, মাগিকে কেমনে করবে!হুহ!!’
শ্যামলী জলপাইগুড়িতে এখন ব্যারাকুপুরে। মাঝেরহাট থেকে যখন অঞ্জনা বশিরহাটে চলে আসে তখন কমান্ড্যান্ট অর্জুনকে দিয়ে যোগাযোগ করে শ্যামলীর বাবা, দাদার ঠিকানা যোগাড় করে দিয়েছিলো। শ্যামলী অঞ্জনার সাথে মাস তিনেক থেকে চলে গেছে। অঞ্জনা তাকে আর এখানে থাকতে দেয় নি। যাবার সময় মাথায় হাত রেখে দিব্যি করিয়েছে অঞ্জনা।
-দিদি, আমায় যদি কোনদিন কিছু ভেবে থাকো, বলছি যে অন্তরের কেউ ভাবো তবে একটা কথা দিবে?
-হ্যা, বল
-তুমি সিঁথিটে সিদুর পরেচো, আমি পরি নি। কিন্তু আমি বুঝি ওটা কেমন, কি ভাড় তার। দাদাবাবুর সাথে যদি কোনদিন দেখা হয় তবে কোনদিন বলিও না যে, তুমি এ পথে ছিলে। আর হ্যা, কোনদিন ভাববেও না যে, তুমি কারো জন্য বিকিয়েছিলে’
শ্যামলী কথা বলছিল না। শুধু একবার কথা বলার চেষ্টা করছিল তখনি মুখটা চেপে ধরল অঞ্জনা। অঞ্জনা বলছিলো, তুমি কি বলবে আমি জানি।
-কি?
-আমি কবে এপথ থেকে ফিরব। তাই না?
-হ্যা, কবে?
-সে তুমি ভাবিও না দিদি। আমার যাবার জো নেই যে……
-আমার সঙ্গে চলো।
-নাহ, দিদি, আমি গেলে তুমি ময়ূখ দেখাবে কেমন করে। আমাকে দেখলে তুমি তোমার অতীত মনে করবে। আমি যাব না তোমার সঙ্গে।
বলতেই দুজনে অঝোরে কেদেছিলো।শ্যামলী সেদিনই চলে গেছে ব্যারাকপুরে বাবা দাদার কাছে।
মহেশ জঙ্গলমহালের লোক তবে বশিরহাটে থাকতো দীর্ঘদিন। মাঝে মাঝে যায় জঙ্গলমহাল। মহেশ দেখলে অঞ্জনার একটু ভালো বোধ হয়। এই দীর্ঘ সময়ে একমাত্র মহেশের সাথে যখনই আলিঙ্গনে বদ্ধ হয়েছে তখনি একটু স্বাদ পেয়েছে। মনে হয়েছে এ আমার মনের পুরুষ না হলেও অন্তত জানোয়ার না। বন্য হিংস্র না। আরেকটি কারনে মহেশকে অনেক শ্রদ্ধা করে অঞ্জনা। অঞ্জনার এখন যা বয়স, শরীরের যা বাহ্যিক সৌনদর্য তাতে খুব ভালো মানের খদ্দের আসার কথা না। অঞ্জনা তা বোঝে। কিন্তু মহেশ যেন শুধু টার কাছেই আশে। মহেশ যে অন্য কাওকে খুজে না তা নয় তবে অঞ্জনার কাছে আসে প্রথমে তারপর অন্য কারো কাছে যায়। মহেশ মুচি। নিম্নবর্নের হিন্দু। কিন্তু গায়ের রঙ আর আবাভাবে বোঝা যাবে না। অঞ্জনাকে হাড়িয়া মদ এনে দেয় মহেশ। মহেশের সাথে জঙ্গমহাল যাবে বলে ঠিক করেছে অঞ্জনা। একদিন খুব চাঁদ উঠেছিল। সেই গোয়ালন্দের মতো চাঁদ। বিভীষিকার সেই চাঁদের আলো। মহেশের সঙ্গে গিয়ে হাড়িয়া খাবে, আর ঘুমাবে অঞ্জনা। জঙ্গলমহালের হাড়িয়া মদ নাকি বেহুশ করে। অঞ্জনা এখন ঠিক তাই হতে চায়। অঞ্জনা বলছিলো,
-শোন, মহেশ একদিন জঙ্গলমহাল নিয়ে যাবি?
-কি কারনে?
-হাড়িয়া খাব হে, বলে হো হো করে হেসে উঠল অঞ্জনা।
মশের কোলে মাথা রেখেই অঞ্জনা একদম ঘুম দিয়েছে। রাতটা আর শেষ হয় নি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

42 + = 44