বিশ্বাসের ভাইরাসে আক্রান্ত ইমামের সাথে এক নাস্তিকের কিছু সময়!

সকালের সূর্য উঠেছে। উঠেছে শামীমও। শামীমের ঘরটা মসজিদের পাশেই। মানুষ সাধারণত সকালে ঘুম থেকে উঠে সূর্য ওঠার পরে। তবে ইমাম মুয়াজ্জিনরা সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠে যান। শামীম ঘুম থেকে ওঠে ব্যায়াম করার জন্যে। প্রতিদিন ব্যয়াম করার সময় ইমাম সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ হয় শামীমের। ইমাম সাহেব হাঁটতে বের হন। বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে দৌড়াতে পারেনা। তাই হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। শামীমের সাথে ইমাম সাহেবের সম্পর্ক মোটামুটি ভালই বলা যায়। শামীম মাঝে মাঝে ইমাম সাহেবকে চা-নাস্তা খাওয়ান। ইমাম সাহেবও মাঝে মাঝে চা-নাস্তার বিল দিয়ে দেন।

ইদানিং গ্রামের কয়েকজন মানুষ শামীমের ব্যাপারে ইমাম সাহেবকে অবগত করেছেন। শামীম নাকি সব সময় উদ্ভট উদ্ভট কথা বলে। যে কথাগুলির সাথে সাধারণ মানুষের কথার কোনরকম মিল পাওয়া যায় না। তাই গ্রামের অনেকেই শামীমকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

প্রতিদিনের মতোই, শামীম ব্যয়াম করার জন্যে বের হয়েছে। শামীমকে দেখে ইমাম সাহেব ডাক দিলেন। শামীম আসার পর ইমাম সাহেব তাকে সালাম দিলেন। কিন্তু শামীম সালামের কোন উত্তর দিলো না। ইমাম সাহেব শামীমকে বললেন ছোটদের দরকার বড়দেরকে আগে সালাম দেওয়া। কিন্তু তুমি তা কর না। তুমি আমাকে সালাম দাওনা। আমি তোমাকে সালাম দিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে সালামের উত্তরও দিলেনা!
ইমাম সাহেব শামীমকে জিজ্ঞেস করলেন। তুমি সালামের উত্তর দিলেনা কেন? তুমি নামাজেও আসো না। তোমার বাবা মারা গিয়েছেন তার কবরের পাশে গিয়ে কখনো জেয়ারত করতে তোমাকে আমি দেখিনি। ইদানিং শুনতেছি তুমি মানুষকে আজেবাজে কথা বলে বেড়াও। ধর্ম আর আল্লাহ্ তায়ালাকে নিয়ে নাকি বিতর্ক কর। এগুলা কিন্তু ঠিক নয়। এলাকার মানুষ সবাই তোমার ব্যাপারে বলাবলি করতেছে। এই কাজগুলো তুমি কেন করতেছো?

ইমাম সাহেব শামীমকে অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন। আর শামীম সেইসব পশ্নের একটাই জবাব দিলেন। ইমাম সাহেব আমি ধর্মে আর ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না!
শামীমের কথা শুনে ইমাম সাহেব হতবাক হয়ে গেলেন। ইমাম সাহেব শামীমকে বললেন শামীম তুমি কি বলতেছ তুমি কি তা জানো?
শামীম বললো, জ্বী হুজুর আমি জানি। ইমাম সাহেব বললেন, জেনেও কেন তুমি এরকম উদ্ভট কথা বলতেছো? এইসব উদ্ভট কথা কেউ কি তোমাকে শিখিয়ে দিয়েছে? কেননা সাধারণত এই সব কথা মানুষের মনে কখনো আসে না। এই কথাগুলো আসা ঠিক নয়। এটার কারণে তোমার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। তোমাকে কবরের আগুন জ্বলতে হবে। শামীম ইমাম সাহেব কে বলল, কবরের আগুন আর ধর্ম এইগুলো সব ফালতু বিষয়।
ইমাম সাহেব এইবার হতভম্ব হয়ে গেলেন। ইমাম সাহেব নির্বিকার তাকিয়েছিলেন শামীমের দিকে। শামীমকে কী বলবেন সেটা ইমাম সাহেব নিজেও বুঝতে পারতেছেননা। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর ইমাম সাহেব শামীমকে প্রশ্ন করলেন, ধর্ম আর আল্লাহকে বিশ্বাস না করার কারণ কি? শামীম উত্তর দিলো, এগুলো সব মানুষের বানানো ঈশ্বর আর ধর্মের বাস্তবিক কোন প্রমাণ নেই। আর ধর্ম যারা পালন করে তারা সবাই এক প্রকার মূর্খ। তাদের চিন্তাশক্তি ক্ষীণ তারা সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারেনা।

ইমাম সাহেব এইবার শামীমকে বললেন, তারমানে তুমি বুঝাতে চাচ্ছো আমি নিজেও মূর্খ, আমার চিন্তাশক্তি ক্ষীণ। শামীম বলল, ঠিক তা নয়। অনেকেই ধর্মের এই বিষয়গুলি জেনে শুনেই না জানার ভান করে, আর ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। অনেকেই সব জেনে শুনেও মুখ বুঁজে সহ্য করে, চুপচাপ থাকে। ইমাম সাহেব শামীমকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোন ক্যাটাগরিতে আছি বলে তুমি মনে কর? শামীম বলল, এটা বুঝার ক্ষমতা আমার নেই। আপনার বিষয়ে এখন কোনো সিদ্ধান্ত যাওয়া ঠিক হবে না। হয়তো আপনি এইসব জেনে-বুঝেই চুপচাপ আছেন। বা এমনটাও হতে পারে আপনি এইসব বিষয়ে অবগত নন। ধর্মই আপনাকে হয়তো অন্ধ বানিয়ে রেখেছে।
শামীম এর কথা শুনে ইমাম সাহেব একপ্রকার হতভম্ব হয়ে গেলেন। তারপর অনেকক্ষণ ভেবে ইমাম সাহেব শামীমকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বলতো ধর্মের কোন বিষয়গুলো তোমার কাছে মিথ্যে আর বানোয়াট মনে হয়? এটা শুনে শামীম ইমাম সাহেবকে উল্টে জিজ্ঞেস করল, আপনি বলুন ধর্মের কোন বিষয়গুলো আপনার কাছে বাস্তবিক আর সত্য বনে মনে হয়? ইমাম সাহেব উত্তর দিলেন, আমার কাছে সব কিছুই সত্য বলে মনে হয়। ধর্ম ধ্রুবসত্য এটার বিপক্ষে যাওয়ার কোনো যুক্তি আছে বলে আমি মনে করিনা। ইমাম সাহেবের কথা শুনে শামীম জোরে হেসে ফেলল। তারপর ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, ধর্মের সত্যতা সম্বন্ধে একটা উদাহরণ দেন। এইবার ইমাম সাহেব খুব বড় গলায় বলে উঠলেন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এই পৃথিবী তৈরি হওয়া সম্ভব না এবং মানুষ সহ এই বিশ্ব ভূ-মন্ডলের সবকিছুই তিনি বানিয়েছেন।

এবার শামীম ইমাম সাহেবকে আবার প্রশ্ন করল, সৃষ্টিকর্তা যে পৃথিবী বানিয়েছে এর কোন প্রমাণ কি আপনার কাছে আছে? ইমাম সাহেব বললেন অবশ্যই আছে। এটার সব থেকে বড় প্রমাণ হলো কোরানশরীফ ও আমাদের নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস। শামীম আবার ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, কোরান আর নবী মোহাম্মদ যে সত্য এটার প্রমান কী? ইমাম সাহেবে এইবার খানিকক্ষণের জন্যে চুপ হয়ে গেলেন। শামীমের কথা শুনে ইমাম সাহেব একপ্রকার বিব্রত হয়ে গেলেন। তিনি কি বলবেন ঠিক বুঝতে পারতেছেনা। অনেকক্ষণ চিন্তা করার পর ইমাম সাহেব শামীমকে জিজ্ঞেস করলেন, কোরআনের বানী আর নবীর হাদীস যে মিথ্যে সেটার কি কোন প্রমাণ তোমার কাছে আছে? শামীম খুব গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন হ্যাঁ অবশ্যই আছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো কুরআনশরীফ। কোরানশরীফের বেশিরভাগ কথাই মিথ্যে এবং বানোয়াট। কোরানের লেখার সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই।

শামীম ইমাম সাহেবকে বললেন মাঝে মাঝে মাইকে আমি আপনার বক্তব্য শুনি। আপনি যেসব কথা আলোচনা করেন সেগুলোর বেশিরভাগই মিথ্যা এবং বানোয়াট। আপনার বক্তব্যের বেশিরভাগ সময়ই আপনে মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। যেমন, আপনি শয়তানের উদাহরণ দিয়ে কথা বলেন। কিন্তু আপনি কি জানেন শয়তান বলতে পৃথিবীতে কিছু নেই? আপনি ফেরেশতাদের নিয়েও কথা বলেন। আর সেটাও মিথ্যা ফেরেস্তা যে আছে সেটার বাস্তবিক কোনো প্রমাণ নেই। এটা শুধুমাত্র মোহাম্মদের তৈরি একটা কাল্পনিক চরিত্র মাত্র। আপনি মানুষকে কবরের আযাবের ভয় দেখান। সেটাও মিথ্যে কেননা কবরের আজাব বলতে কিছুই নেই। আপনি মাঝে মাঝে এটাও বলেন যে, কিছু মানুষের কবরকে মৃত্যুর পরে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দেওয়া হবে। এটাও ডাহা মিথ্যে কথা। মানুষকে কবর দিয়ে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই পোকামাকড়ে শরীরের বেশিরভাগ অংশই খেয়ে ফেলে। আর কয়েক বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ দেহটা মাটির সাথে মিশে যায়।

আপনি ইহুদিদের শত্রু ফেরাউনের জীবন সম্পর্কে আপনার মুসল্লিদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মূল কথা হচ্ছে লোহিত সাগর আর ফেরাউনের জীবন সেটাও মুসলমানদের বানানো গল্প। বাস্তবের সাথে এর কোন মিল পাওয়া যায় না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো স্বর্গ নরক বলতে কিছুই নেই। যেখানে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, সেখানে স্বর্গ-নরক থাকার কোন প্রশ্নই আসেনা। আর ধর্মের এই বিষয়গুলির সত্যতার প্রমাণ দেওয়া পৃথিবীর কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব না। শামীম ইমাম সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি আমার কথায় রাগ করেছেন? আমি যেটা সত্যি সেটাই বলেছি এতে রাগ করলে আমার কিছু করার নেই।
শামীম আবার ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি নিজে বিশ্বাস করেন সৃষ্টিকর্তার মত একটা কাল্পনিক চরিত্র আকাশের উপর বসে আছে? এটা শুনতেও হাস্যকর মনে হয় না? আপনি কি জানেন সাত আসমান আর সাত জামিন বলতে কোন কিছুই নেই? আপনি কি জানেন মোহাম্মদ যে মেরাজের ঘটনা বলেছিলেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট? আপনি নিজে কি বিশ্বাস করেন কোন মানুষের পক্ষেই এক রাতের ভিতরে আসমান এবং স্বর্গ-নরক নামের কাল্পনিক জায়গা থেকে ঘুরে আসা সম্ভব নয়? আপনি কি জানেন মোহাম্মদ যে ঈশ্বরের কথা বলেছিলেন, মোহাম্মদ নিজেই তো জানতো না সেই ঈশ্বর দেখতে কেমন! আপনি নিজেও কি বলতে পারবেন? আপনি যে ঈশ্বরের উপাসনা করতেছেন, তিনি দেখতে কেমন হতে পারে! আপনার সেই ঈশ্বর কি কথা বলতে পারে? সে কি আমাদের মত মানুষ নাকি কোন জন্তু জানোয়ারের মতো? সেই ঈশ্বরের শারীরিক গঠন সম্পর্কে আপনার কোন ধারনা আছে কি? সেই ঈশ্বরের কি হাত-পা-চোখ-নাক-মাথা এগুলো আছে? সেই ঈশ্বর কি খাওয়া-দাওয়া করতে পারে? সে কি ঘুমায় নাকি জেগে থাকে?। আপনি কি বলতে পারবেন আপনার সেই ঈশ্বর মানুষকে নিয়ে এত আগ্রহী কেন? আপনার কি কখনো মনে হয়নি ঈশ্বর নামের কোন বড়বাবু বিশ্ব ভূ-মন্ডল চালাচ্ছে এটা নেহাতই কল্পনা? আপনার কি কখনো মনে হয়নি, আপনার দৈনন্দিন কাজ আপনি নিজের ইচ্ছায় করতেছেন? এটাতে ঈশ্বর অথবা কোন ফেরেস্তা বা শয়তানের হাত নেই? আপনি কি অন্তত এটা বুঝতে পারতেছেন, আমি আপনাকে যে কথাগুলো বলতেছি নিজের শক্তিতেই বলতেছি? এটার পিছনে অন্য কারো হাত নেই। এমনকি আপনার সেই ঈশ্বরেরও কোন হাত নেই। কেননা মানুষই ঈশ্বর কে টিকিয়ে রেখেছে হাজার হাজার বছর ধরে। মানুষের ক্ষমতার বাইরে ঈশ্বরের কিছুই করার শক্তি নেই।

ইমাম সাহেব নির্বিকার। খুবই গম্ভীরভাবে বসে আছেন। কি বলবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারতেছেন না। ইমাম সাহেব কখনোই এইরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হননি। শামীম ইমাম সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলেন, ইমাম সাহেব কথা বলতে খানিকটা বিব্রত বোধ করতেছেন। ইমাম সাহেবের চোখ দুটো লাল হয়ে গিয়েছে। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর ইমাম সাহেব শামীমকে বললেন, আমার নফল নামাজের সময় হয়ে গিয়েছে। আমি এইসব বিষয়ে তোমার সাথে আর কথা বলতে চাইনা। তুমি এখন আসতে পার।

শামীম চলে যাওয়ার জন্য রওনা দিলেন। হঠাৎ ইমাম সাহেব শামীমকে ডেকে বললেন, শামীম তুমি যে আমার সাথে কথা বলেছ এগুলো কাউকে জানাবে না। তবে আমি তোমার সাথে আরো আলোচনা করব। কিন্তু সেই আলোচনা একান্তই তোমার আর আমার। যাই হোক তুমি পরে এক সময় আমার কাছে এসো।

শামীম চলে যাওয়ার পরে ইমাম সাহেব খুব গম্ভীরভাবে চেয়ারের উপর বসে আছেন। তার চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পড়তেছে। তার মুখ রক্তের মত লাল হয়ে গিয়েছে। এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে, এটা তিনি কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি। ইমাম সাহেব নফল নামাজের যে কথা বলেছেন সেটা মিথ্যে। আসল ঘটনা হলো ইমাম সাহেব চাইছেননা, শামীম তার সামনে ধর্মের এইসব বিষয় নিয়ে আর কথা বলুক। তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
শামীম চলে যাওয়ার পর ইমাম সাহেব খুবই তাড়াহুড়ো করে টেবিলের উপরে রাখা, বাংলা অর্থের একটা কোরআন শরীফ হাতে নিলেন। এবং পড়া শুরু করলেন। সামান্য একটা ছেলের প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেন না ইমাম সাহেব। ইমাম সাহেবের জন্যে এটা এক ধরনের ব্যর্থতা। তাই তিনি ভালোভাবেই কোরান শরীফ পড়া শুরু করলেন। যদি কোরান শরিফের ভিতরে শামীমের প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 8 = 1