উচ্চ মাধ্যমিকে ইসলাম শিক্ষা বিভাগ

খবরে দেখলাম বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে “ইসলাম শিক্ষা” নামে একটা নতুন বিভাগ চালু হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের আরও পাঁচটি বিভাগ থাকার পর এমন একটা বিভাগ চালু করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

পৃথিবীতে মানুষ অন্যান্য প্রানী থেকে আলাদা। অন্যান্য প্রানী জন্মের পর থেকেই জীবন ধারনের প্রনালীগুলো স্বভাবজাতভাবেই পেয়ে থাকে। গরুর বাছুর জন্মের কিছুক্ষন পর থেকেই হাটতে পারে, পাখ-পাখালী পাখা গজাবার পর থেকেই উড়তে শিখে যায়। কিন্তু মানুষ জন্ম নেয়ার সাথে সাথেই কি জীবন ধারনের প্রক্রিয়াগুলো রপ্ত করে নিতে পারে? মানুষকে মানুষের মত জীবন ধারনের পদ্ধতিগুলো আলাদাভাবে শিখতে হয়, শিখতে হয় পরিবেশে টিকে থাকার বিদ্যাগুলো। পরিবেশে টিকে থাকার বিদ্যাগুলোই কালক্রমে নাম নিয়েছে “শিক্ষা”। অধুনাকালে শিক্ষা শুধুই টিকে থাকার বিদ্যা নয়, বরং মানব সভ্যতার উন্নয়ন তথা পৃথিবীর সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ন। বলা হয়, শিক্ষা যদি কারো মানোন্নয়ন ঘটাতে না পারলো তবে সে শিক্ষা ব্যর্থ।

শিক্ষা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। প্রতিটা মানুষের শিক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বর্তমানকালের রাষ্ট্রগুলো শিক্ষা প্রদানের জন্য তৈরি করেছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ব বিদ্যালয়। জ্ঞানকে সহজে বিতরনের জন্য তৈরি হয়েছে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা। অধুনা শিক্ষা ব্যবস্থার মূল তিনটি শাখা হচ্ছে মানবিক, বানিজ্য ও বিজ্ঞান বিভাগ। তিনটি বিভাগের জ্ঞান বা শিক্ষা মানুষের জীবনে কোনো না কোনোভাবে জীবন গঠন ও জীবন ধারণের জন্য কাজে লাগে। শুধু জীবন ধারণ কেনো মানব সভ্যতা তথা পৃথিবীর সার্বিক উন্নয়নেও ভুমিকা রাখছে।

আমাদের দেশে স্বাভাবিক শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি বর্তমানে আরেকটা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। যার নাম “ইসলামী শিক্ষা” ব্যবস্থা। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসাগুলোর মাধ্যমে শেখানো হয় ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর দর্শন। এর মাধ্যমে মুসলমান সমাজের মানুষগুলোকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যে, তারা মনে করে পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শনের একচ্ছত্র মালিক হলো ইসলাম। তাদেরকে এই শিক্ষা দেয়া হয় যে আরবের ধর্ম, শিক্ষা সংস্কৃতিই হলো একজন মানুষের জন্য আদর্শ, এর বাইরে মানুষের যে জীবন তা নিতান্তই অমূলক ও প্রয়োজনহীন। এমনতরো শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষের জীবনে কিভাবে কাজে লাগে তা ব্যপক গবেষনা ও চিন্তার বিষয়।

উপরন্তু, এর ফলে দেশে তৈরী হচ্ছে এক প্রতিক্রিয়াশীল ও অদক্ষ জনগোষ্ঠীর। যারা না জানে বিজ্ঞান, না জানে প্রযুক্তি, না জানে জীবন ধারণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। তাদের অর্জিত জ্ঞান পৃথিবীর উন্নয়ন তো দুরে থাক নিজেদের উন্নয়নেই কাজে লাগে না। ফলে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসম্পদ তৈরী না হয়ে তৈরী হচ্ছে বিরাট এক সামাজিক বোঝার।

গোদের উপর বিষফোড়ার ন্যয় এবার সরকার ধর্মের দোহাই দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে চালু করতে যাচ্ছে “ইসলামী শিক্ষা” নামে একটি বিভাগ। এই বিভাগে ইসলাম শিক্ষা, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং আরবী নামের তিনটা বিষয় বাধ্যতামূলক হিসেবে থাকবে। কেউ কি বলতে পারেন উক্ত তিনটা বিষয় মানুষের কোন কাজে লাগবে? এই বিষয়গুলো পড়ে কি কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, হিসাব রক্ষক কিংবা সমাজ কর্মী অথবা কোনো বিষয়ের গবেষক হতে পারবে?

ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে কি পড়ানো হবে জানি না। হয়ত ইসলামের বিভিন্ন বিষয় যেমন কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্জ , যাকাত প্রভৃতি পড়ানো হবে। এই বিষয়গুলো কি মুসলমানেরা এমনিতেই জানে না? হয়ত বলা হবে নৈতিক আচার আচরণ সংক্রান্ত বিষয়াবলীর জন্য এসবের প্রয়োজন আছে। কিন্তু মানুষকে সত্যিকারের মানুষ করতে গেলে ধর্মের দোহাইয়ের চেয়ে মানবতার শিক্ষাই কি অধিক কার্যকর নয়? ধর্ম তো কোনোভাবেই নৈতিকতার ভিত্তি হতে পারে না।

ইসলামের ইতিহাসে হয়ত পড়ানো হবে ইসলামের স্বর্নযুগের বীরদের বীরত্বগাথা। এই বীরেরা বিনা কারণে কেমন করে একটার পর একটা দেশে দখল করেছেন, কেমন করে আগে দেশ দখল করে পরে ইসলামের প্রচার করেছেন তা জেনে একটা ছাত্র কি শিখতে পারবে? না কি তার ভেতরে কৌশলে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের বীজ বুনে দেয়া হবে? ইসলামের ইতিহাস পড়ে এমন ভাবনা কিন্তু খুব স্বাভাবিক। কারণ অন্যান্য ধর্মের ইতিহাস যেখানে প্রচারের, ইসলামের ইতিহাস সেখানে বিজয়ের। এমন কোনো মুসলিম বীর কিংবা ইসলাম প্রচারকের ইতিহাস পাওয়া যায় না যিনি আগে ইসলাম প্রচার করেছেন পরে দেশ বিজয় করেছেন।

আরেকটা বিষয় আরবী। কেউ কি বলতে পারবেন, আধুনিক বিশ্বে আরবীর মত একটা ভাষা কতটুকু প্রয়োজনীয়। তদুপরি আরব দেশের সংস্কৃতি কি আমাদের দেশে কোন কাজে লাগতে পারে? বর্তমানে আরব দেশগুলোতে আমরা দেখি একদল অলস মানুষের সমাহার। আরবের লোকেরা নিজেদের গৃহ পরিচর্যার জন্যও নিজে কোন কাজ করে না। এদের গৃহস্থালী কাজ করার জন্য পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে থাকে। যে জাতী মানব সভ্যতার উন্নয়নে ভূমিকা দুরে থাক নিজেদের কাজগুলোও নিজেরা করতে পারে না, তাদের ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি আমাদের দেশে কি ভূমিকা রাখবে, প্রশ্নের বিষয় নয় কি?

মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে শিক্ষিত লোকগুলোকে আমরা একদল অথর্ব মানুষ ছাড়া কোন কাজে লাগতে দেখি না। তাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে বাড়ি বাড়ি দাওয়াত খাওয়া আর লিল্লাহ সংগ্রহ। এমন অবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে “ইসলামী শিক্ষা” বিভাগে যারা পড়বে তারা পরবর্তীতে কি করে খাবে? তারদেরও কি লিল্লাহ সংগ্রহ ভিন্ন কোন উপায় থাকবে?

সবচেয়ে বড় কথা হলো স্কুল কলেজগুলোতে বিজ্ঞানের চর্চা করা হয়। বিজ্ঞানের চর্চার আঙ্গিনায় অবৈজ্ঞানিক শিক্ষা স্পষ্টতই স্ববিরুধীতা, নয় কি? বিজ্ঞানের ক্লাশে ছেলে মেয়েরা শিখবে বাস্তুসংস্থানের বিদ্যা, আর অপরদিকে ইসলামী শিক্ষায় শেখনো হবে রিজিকের মালিক আল্লাহ। তাহলে বাস্তুসংস্থান বিদ্যা একটা ছাত্রের কি কাজে লাগবে?

শুধু কি তাই? আমরা কিছুদিন আগে হেফাজতি মোল্লাদের গোয়ার্তুমির চরম বহিপ্রকাশ দেখলাম, তাদেরকে কোন আস্বাস দেয়া হলেও তা প্রত্যাখ্যান করে, আলোচনায় বসতে বললেও তারা নারাজ। সভ্য সমাজের সকল নিয়ম কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তারা তাদের মধ্যযুগীয় চিৎকারেই বেশি পারঙ্গম। তারা বুঝতে নারাজ বিশ্বে গনতন্ত্র নামের কিছু মতবাদ চালু হয়েছে, তারা জানতে নারাজ বিশ্বে কমুনিজম নামে মতবাদ দেশ পরিচালনা করতে পারে। তাদের কাছে জিহাদই হচ্ছে একমাত্র পথ। যাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে শহীদি মরণ, তাদের কাছ থেকে সহমর্মিতা কিভাবে আশা করা যায়?

জানি না সরকার কোন কারণে অথবা কাদের প্ররোচনায় এমন সিদ্ধন্ত নিয়েছে। দেশে আরো একদল অথর্ব মানুষ তৈরীর এ ষড়যন্ত্রের হেতু কি? জিহাদি তামান্নায় আরো জঙ্গি তৈরীর চেষ্টা কি দেশ বিরুধী কোন সিদ্ধান্ত নয়? আমাদের সচেতন সমাজের মানুষগুলোকেও এ ব্যপারে একান্ত নীরব দেখছি?

[লেখাটি ২৩/০৫/১৩ তারিখের, ব্লগ আপডেটের কারণে এটি হারিয়ে যায়, বিধায় পুনরায় পোস্টাইলাম।]

বিগত ছয় বছরের ইসলামী শিক্ষার ফলাফলটা কিন্তু এখন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি ঠিকই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 5