স্বপ্নভঙ্গ

শহরজুড়ে নতুনত্ব। স্পষ্ট মনে আছে এদিকটায় এতো গাছপালা ছিলো! কিন্তু এখন নেই। যে জায়গাটাতে একসময় সন্ধ্যেবেলা হলের ছেলেরা এসে আড্ডা মারতো সেখানে এখন একটা বিশাল অট্টালিকা। শহরের রাস্তা যত ভেতরে যায় মানুষ তত বাড়ে। সময়ের গভীরে সময় যত যায় ততই ঘটনা বাড়ে। সময়ের গতিধারা অত সহজে পরিমাপ করা যায় না, গভীর থেকে গভীরে ঘটে যাওয়া ঘটনা খুব স্থির হয়ে অনুধাবন করতে হয়। কিন্তু শহরজুরে জোড়াশালিকের উড়াউড়ি, ছায়াতে মোড়ানো চারদিক যে এখন বিলোপ হয়েছে সেটা এমনিতেই অনুধাবন করা যায়। এতোসবের মাঝে সময়ের পরম্পরায় সবই স্পষ্ট। সেদিনের উপলক্ষ থেকে আজকের উপলক্ষ ভিন্ন। শত সহস্ত্র মানুষের উপলক্ষগুলো জন্মের তরে নতুন জন্মের পৃথিবী গড়তে চায়। মানুষেরা বিক্ষোভ করে বাঁচার জন্য কিংবা অনাগত কালকে বাঁচাবার জন্য। সত্যই তাই, জন্ম থেকে জন্মান্তরে বাঁচার কিংবা বাঁচবার সংগ্রামই বিবর্তন। লোকে বলে সভ্যতার বিবর্তন। রক্তে মাংসে গড়া মানুষের রক্ত মাটি স্পর্শ করে। ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। দ্বিধাও করে না! মিছিল থেকে মিছিল আজো ছুটে চলে। সেক্রেটারিয়েট, রমনা, পল্টন, শাহবাগ এখনো মিছিলে থমথম করে। নিশি নন্দীর ডায়েরিতে সেসব মিছিলের দিনিলিপি এখনো তরতাজা। তাজা শস্যের মতো গন্ধ ছড়াচ্ছে। ডায়েরিটা খুলে একজনের কথা মনে পরতেই হবে। যাকে একসময় প্রায়শই মনে পড়তো। ইদানিং পড়ছিল না। একজন বিশেষ সহযোদ্ধা। সেদিনের ছোট্ট শহরের মিছিল, মিছিল শেষে ফিরে আসা, একটু পাশাপাশি বসা, সবার চোখের আড়ালে একটু কথা বলে নেয়া, লজ্জার রেখাপাত ঘটে যাওয়া মুখমন্ডল, বিকেলে সময় পেলে একটু আধটু বসে পড়া- সবই যেন এই তো সেদিনকার কথা। তবে সহযোদ্ধার মিছিল জয়ধ্বনি দিতে দিতে একদিন থেমেছিলো। স্বপ্ন দেখেই থেমেছিলো সেই মিছিল। ভবিষ্যতের স্বপ্ন। একটা গণতন্ত্রের স্বপ্ন। মিছিল তো শেষ হয়েছিলো, গণতন্ত্রের কি হলো? নিশি নন্দী তাই ভাবছে।
অনিক দেবনাথের মনেও কি সেই ভাবনা হয় না? নিশি নন্দী যাকে এডি বলতেন সেই অনিক দেবনাথ কিভাবে আছে এখন? এখন কি ভাবছে? গণতন্ত্রের সেসব মিছিলের দাবিনামা কি জ্বলজ্বল করে এখনো? নিশি নন্দীর ডায়েরির পাতায় সেসব প্রশ্নের উত্তর নেই। নিশি আজকে ভাবছে, হয়তো এডি’র কাছে উত্তর আছে। এখান থেকে দূরদেশ বাংলাদেশের মানুষের কাছেও সে উত্তর আছে।
………

কানাডাতে বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে নিশি নন্দীকে প্রায় অধিকাংশ লোকেই চেনে। আশি থেকে নব্বই এর দশকের অনেকেই এখানে আছে। সেসময়ের অনেক মুখগুলোকে এখন এখানে দেখা যায়। পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি বা অন্য কোন দেশীয় দিবস, আয়োজনে সবাই ভিড় করে। নিশি নন্দী সেসব আয়জোনের কোনটি মিস করেন না। মেয়েকে নিয়ে সোজা হাজির হন। নিজে লালটিপ পড়েন মেয়েকেও পড়ান। এরপর দুজনে বেড়িয়ে পরেন। মা মেয়ের মধ্যে খুনসুটি বেশ জমে উঠে। কানাডাতে অন্যান্য বাঙালিদের কাছে নিশি নন্দী এবং তার মেয়ে অঙ্কিতার এমন সাযুজ্য বেশ জানাশোনা সবার। অকেশনগুলোতে মেয়েকে নাচ করাতে নিয়ে যান। বেশ ভালো নাচে অঙ্কিতা। অঙ্কিতা এখানেই পড়াশুনা করেন এখন। দেশ থেকে এসেছেন-এই তো বছর পাঁচেক। মেয়েকে দেশেই সেকেন্ডারি লেভেল শেষ করে মা-মেয়ে উড়াল দিয়েছেন। বাবা তো আর এখন নেই। অন্য কারো সাথে ঘর করছেন। তবে সেসব নিয়ে মা-মেয়ের খুব একটা ভাবনা নেই।
অঙ্কিতা মাকে আরো বলেন, ‘মা তুমি তো বিয়ে করতে পারো। তোমাকে আমি বিয়ে দিবো’।
নিশি নন্দী বলেন, তুই আর আমি একসাথে বিয়ে করব; বলে দুজনে হো হো করে হেসে উঠেন।
মেয়ের সঙ্গে সবই ভাগাভাগি করে নেন। বলতে পারা যায়, করতে পারা যায় এমন কিছুই মেয়েকে ছাড়া করেন না নিশি। আর মেয়েকে যদি কোন বাঙালি কমিউনিটির ছেলেরা প্রপোজ করতে চায় নিশি বারণ করেন,
‘মা মনি, এখানে বিয়ে করবে?’ ভ্রুটাকে কুঞ্চিৎ করে আধিখ্যেতা দেখান নিশি। ‘না, মা মনি, এখানে কেন করবে? এখানকার এই ছেলেগুলো কালচার জানে? বাংলা কালচার জানে, মাটি চেনে, মাটির গন্ধ চেনে? চেনে না , মা। এদের প্রপোজ এক্সসেপ্ট করবে!! যাক বাবা…তোমার লাইফ, ডিসিশন ইজ ইওরস’-গলায় জোর দিয়ে বলেন নিশি।
অঙ্কিতা মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি বল দেশ, দেশের মাটি। তাহলে তুমি এখানে আনলে কেন? আমরা দেশেই থাকতাম’।
-তুমি জানো তো কেন ছেড়েছি। আমি চাই না আমি আর বিয়ে করি। আমার ভাল্লাগবে না সেটা। দেশে মানুষের কত কথা শুনতে হবে! স্বামীকে ছাড়া একা থাকা- সে তুমি এখনি নাও বুঝতে পারো। আর শোন, তোমার বাবাকে আর দেখতে ইচ্ছে করে না আমার।
-হুম-ম-ম-ম, বুঝেছি, বলে মাথা নাড়ে অঙ্কিতা। অঙ্কিতা মাকে চোখ টিপে টিপে বলছ, ‘তুমি তোমার বন্ধু এডি কে বিয়ে করলেই পারতে। তোমার কমরেড বন্ধু’; বলে দুজন আবারো হো হো করে হেসে উঠে
অঙ্কিতা আবারো জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা মা! এই এডি লোকটার কথা তুমি খুব কম আলাপ করো। অন্য সবার কথাই গল্প করো। কেন মা, কেন?কেন?কেন?’;বলে মা কে সুরসুরি দিতে যায় অঙ্কিতা। মা মেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
নিশি নন্দী মেয়েকে ছাড়াতে চায়। দুজনের হুড়োহুড়ি করে বিছানায়-ছাড় তো অঙ্কিতা,প্লিজ।উহু…………অঙ্কিতা,প্লিজ। আচ্ছা বলব,বলব; বলে সে যাত্রায় মেয়ের কাছ থেকে ছাড়া পায় নিশি নন্দী।
নিশি মেয়েকে নিয়ে ডাইনিং এ যায়, ‘চলো, এবার খাবো, ক্ষুধা লেগেছে’।

জোবায়েদ মুজিববাদী ছাত্রলীগ করতো। বেশ একরোখা। শেখ মুজিবকে নিয়ে কোন দ্বিমত সহ্য করতো না। তখন ছাত্রলীগ দুভাগ। বাকশাল নেতৃত্বাধীন জাতীয় ছাত্রলীগ। জাতীয় ছাত্রলীগের মোয়াজ্জেম খুব নিবেদিত। ছাত্রদের সাথে মিশে যেতে পারতেন অনায়াসে। আর বামপন্থী ছাত্রনেতাদের খুব শ্রদ্ধা করতেন।নিজে কেন বামপন্থী নন-সে কথার উত্তর নেই। বাদল জাসদ ছাত্রলীগের স্লোগান মাস্টার ছিলো, ককটেল চার্জ করাতে খুব দক্ষ ছিলো। সে সময়ে লোকে ধারণা করতো; মিছিলের লোকবলের শক্তি ছাত্র ইউনিয়নের,পুলিশ-প্রশাসনের সাথে ফাইট দিতে জাসদ ছাত্রলীগ বেশ ডাকাবুকো, আর তত্ত্ব দিতে ওস্তাদ ছিলো বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ফেডারেশন। বাদলও সেরকমই একজন। দুর্দান্ত সাহসী। চোখগুলো দেখলে বুঝা যেতো না, মায়ার চোখ ছিল। আরেকজন বাদল ছিলো, সেও ছাত্রলীগ করতো তবে বাসদ ছাত্রলীগ। বাসদ ছাত্রলীগ পরে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নামে আত্নপ্রকাশ করে। ছাত্রফ্রেন্টের বাদল থিওরিকেলি ডিসেন্ট থাকতো। ব্যাগে শিবিদাস ঘোষের বই নিয়ে ঘুরতো। শিবদাস ঘোষ কে?- এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে দুই তিন মিনিট ধরে বুঝাতো, ভারতের সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান নেতা, এ যুগের মার্ক্সবাদি চিন্তানায়ক……আরো অনেক কিছু। আর ভাবে এমন কিছু প্রকাশ করতো, শিবদাস ঘোষকে চিনো না!হায় হায়!! শাহাদাৎ ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, তবলা বাজাতেন খুব ভালো। গান, বাজনা বাদ্যিতে ওদের মত্ততা অন্যদের হিংসার কারণ হতো তবে সিরিয়াস বিপ্লবী সংগঠন বলে দাবি করা ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রফ্রন্ট টিপ্পপনি কাটতো হারমোনিয়াম পার্টি। মোনাজুদ্দি ছাত্রমৈত্রীর বুয়েটের নেতা ছিলেন, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে তার বেশ আপত্তি ছিলো। তর্ক জুড়ে দিলে আর থামতো না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যাবাদকে এক শূলে চড়িয়ে আক্রমন শানাতেন। জগন্নাথ কলেজের মাজেদ, পুলিশ ভায়োলেন্সে তক্কে তক্কে লেগে থাকতো। ছাত্রফ্রন্টের নেতা ছিলেন। বক্তৃতায় ইমোশনাল টাচ দিতেন। একবার কার্জনের সামনে একটা মিছিলে পুলিশ বেধড়ক মেরেছিলো ওকে; পরে ছাড়িয়ে আনা হয়েছিলো। নাহার ছিলো রোকেয়া হলে, মুজিববাদী ছাত্রলীগ করতেন। এখন নাকি এমপি হয়েছে পার্লামেন্টে। ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক’; বলে যার রাজনীতি শুরু সেই নাহারের দল এখন স্বৈরাচারের সাথে জোটে আর সে জোটভুক্ত এমপি। রমা নামের একজন নারী কমরেড ছিলো ছাত্র ফেডারেশনের। ছাত্র ফেডারেশনের একজন কমরেডকে বিয়ে করে সংসার করছে। তবে যাকে বিয়ে করেছে সেই ফয়েজ এখনো রাজনীতি করে। প্রেসক্লাবে একটা ব্যানার নিয়ে সামনে পনেরো বিশজন নিয়ে বেশ জম্পেশ বক্তৃতা করে। ঢাকা মেডিকেলে পড়তেন সেস সময়ে। আলাপ আলোচনার সময় এরশাদকে একটা গালি দিয়েই আলাপ শুরু করতেন ফয়েজ। ডাক্তারি এখন আর করেন না। রাজনীতিই করেন। আর অনিক দেবনাথ ছাত্র ইউনিয়ন করতেন সেসময়। থাকতেন মুহসীন হলে। টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে বাড়ি। ছাত্র ইউনিয়নের সেসময়ে দেয়ালচিকা মারতে সিদ্ধহস্ত একজন ছিলেন অনিক দেবনাথ। রাতবিরাতে দেয়ালচিকা মারতে বেড়িয়ে পড়তেন। সকালবেলা ক্লাস থাকলে মধুর ক্যান্টিনে এসে একটা বাটার বন খেয়ে সারাদিন পার করে দিতে পারতেন। তবুও দেহটা ছিলো সুঠাম, শক্ত। তবে হ্যা, বিকেল বেলা যখন যেখানেই খেতে বসতেন, অন্য দুজনের সমপরিমাণের ভাত গোগ্রাসে গিলে ফেলতেন। অমন শক্ত পোক্ত মানুষ হয়ে উঠেছিলো সেকারনেই বোধহয়। আর সিগারেট ফুঁকতেন, দেদারছে। কাধে ঝোলানো ব্যাগে সিগারেট প্যাকেট থাকতো। মুহিসীন হলের ছাত্রভোটে ক্রীড়া সম্পাদক পদে নির্বাচন করে বাসদ ছাত্রলীগের কাছে হেরে গিয়েছিলেন অল্প ভোটে।
নিশি নন্দী এবং অনিক দেবনাথ তখন প্রায় একই শিক্ষাবর্ষে ছিলেন। কিন্তু বাবা মারা যাবার পর অনিক দীর্ঘসময় বাড়িতে ছিলেন। এসে আর সে বছরে পরাশুনাটা চালিয়ে নেন নি। নতুন ব্যাচের সাথে শুরু করেছিলেন। তাই এখন দুজন একই বর্ষে। মজিদ খানের শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে সারাদেশের ছাত্ররা ফুসছে। ডাকসু, রাকসু, চাকসু,জাকসু এবং কলেজ সংসদগুলো কর্মসূচীর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। ডাকসুর সেই মিছিলে হাটার দিনটা খুব ভয়ের ছিলো। অমন জঘন্য আক্রমণের কথা ভাবতেও পারে নি ছাত্ররা। শিক্ষা সংকোচন, ধর্মীয়করনের বিরুদ্ধে রুদ্রস্রোতের সে মিছিলে গুলি চালনার পর নিশি ওর পাশেই ধপাস করে পরতে দেখেন একজন টগবগে যুবককে। হাতে থাকা ফেস্টুনে লেখা, ‘শিক্ষার অধিকার সার্বজনীন’। হাতে থাকার ফেস্টুনটাকে লাথি দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তিনজন পুলিশকর্মী টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিলো। কাদানে গ্যাস, লাটিচার্জে চারদিক যেন অন্ধকার। কার্জন হলের ভেতরে যেন দম বন্ধ পরিস্থিতি। ওদিকে শাহবাগ থেকে রায়ট কারের সাথে ছাত্রদের খন্ডযুদ্ধ। দুদিক থেকে ছাত্রদের উপর রাষ্ট্রশক্তির আক্রমন ছিলো কল্পনাতীত। একটু বেলা গড়াতে গড়াতেই খবর চাউর হয় জাফর,জয়নাল,দীপালি সাহাদের নাম। নিশির সামনে পড়ে যাওয়া সেই যুবকটির তবে কি নাম! ভেবে অস্থির হয় নিশি। সেই ছেলেটি কি মরে গেছে? কেউ কি তার খোঁজ পেয়েছে? অথবা সেই কি জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন? নিশি আরো দ্বিধায় পড়ে। তবে বেঁচে থাকলে এই স্বৈরযন্ত্রের বিরুদ্ধ মিছিলে আরেকবার দেখা হতো। আরেকবার দেখা যেতো অন্য কোন ফেস্টুনে। আসলেই আর নেই। জাফর, জয়নালদের নামগুলো সৌভাগ্যক্রমে না হয় আজো স্মরিত হয় তবে অমন নাম না জানা যুবকের আরো কত দায় যে আমাদের কাঁধে, তা বলা মুশকিল। তবে নিশি নন্দীর একটা সান্ত্বনা আছে, জ্ঞাত লোকের দায়ই আমরা মেটাই নি আরও তো অজ্ঞাত! শাসকের বিরুদ্ধে মিছিলে নিশির পদচারনা আরো দীপ্ত তখন। জাফর জয়নাল দীপালি কাঞ্চনদের নামে তখন চারদিক ফেটে পড়ছিল। ছাত্রদের রোষ যেন এখনি পুড়িয়ে দেবে মসনদ। কিন্তু স্বৈরযন্ত্র কি এতো সহজে টলে? না টলে নি। সেই মিছিল সময়ের দৈর্ঘে্য, মানুষের দৈর্ঘ্য আরো প্রলম্বিত হচ্ছিলো। দেশময় যেন বারুদের দাবানল জ্বলছিলো। উত্তাপের মিছিল থেকে কি করে আটকায় নিজেকে মানুষ! দ্রোহী যুবার স্রোত নিজেদের আটকাতে পারে নি।
পল্টন থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত গনমিছিলের কর্মসূচীতে সেদিন পনেরো দল, সাত দলের জোটের কর্মসূচি। যুগপৎ কর্মসূচী। সেখানে ছাত্রদেরও ব্যাপক অংশগ্রহন ছিলো। মিছিল বংশাল রোডে পৌছাতেই পুলিশ পেছন থেকে মুহুর্মুহু কাদানে গ্যাস ছোড়া শুরু করে। পুলিশ পেছন দিক থেকে ধাওয়া করলে অনিক বংশালের ভেতরে ঢুকে পরে। কাদানে গ্যাস যেন অস্থির করছিলো ওকে। পাশ থেকে একটা মেয়ে বলছে, ভেজা রুমাল আছে, দেবো?
অনিক মুখটা তুলে বলছে, দিন।
-আমি নিশি। আমি ছাত্র ইউনিয়ন করি
-হ্যা আপনাকে আমি দেখেছি মিছিলে। ভেবেছিলাম অন্য সংগঠন করেন। আমিও ছাত্র ইউনিয়ন করি।
-আমি রোকেয়া হলে থাকি, ইংলিশে পড়ছি
-অনিক দেবনাথ, বাংলায় পড়ি। মুহসিন হলে থাকি।
নিশি নন্দীর সাথে এভাবেই পরিচয় অনিকের।
তপ্ত দুপুরে সেদিন দুজন মিলে গল্প করতে করতে নাজিরা বাজার, কার্জন হল হয়ে ক্যাম্পাসে ফিরেছিলো। গরমে কাহিল অবস্থা।
-হলে যাই, কেডস পরে গরমে ফোসকা পড়েছে; নিশি বলছে।
-হুম, অনেক উত্তাপ। দেখা হবে পরে।
…………

মানভঞ্জনের বিকেলগুলো সুন্দর। মৃদু মৃদু আঁচ ফেলা রোদ্দুর শেষবেলায় হলুদাভ হয়ে যায়। সাদার মধ্যে ফুলেল চেকের শাড়ি নিশির খুব পছন্দ। পূজোতে বাবা ব্দিয়েছিলেন গতবার। স্বোইরাচারের ফরমান আসছে। দিনকে দিনে নতুন নতুন ফরমান আসছে। আসনে অধিষ্ঠিত শাসকের জলপাই রঙের ট্যাংক ফরমান তামিল করতে মার্চপাস্ট করছে শহরে। তরুণীর রাঙা ঠোটের উছলে উঠে উচ্ছ্বাস্কে দমাতে নেমে পড়েছিলো প্রতিক্রিয়ার দালাল হয়ে। মসনদ টেকাতে প্রতিক্রিয়ার শক্তির সঙ্গে সহবাসের অভিলাষে শহীদ মিনার বাদ যায় নি। শহীদ মিনারে কোরানখানির আদেশ স্মম্ভিত করেছে নিশিকে। গণতন্ত্রী মানুষ ভাবছিল, এ কি- একেও ধর্মে ঢেকে দেয়ার মতলব। সংবিধানের সর্বজনস্বত্বাকে সামরিক পোশাকের শাসক ইসলামের নামাঙ্কিত করেছে রাষ্ট্রে! আশ্চর্য! বিরুদ্ধ সময়ের কপটভেরিকে চপেটাঘাত করছে নিশি নন্দী। সামরিক ফরমানের বিরুদ্ধ স্রোতে শহীদ মিনারে ফুল তুলে দিয়েছে। স্বৈরাচারের শহর ঘুরে ঘুরে একটি ফুল তুলে আনে অনিক। মশাল মিছিলের মশালে দুজনে আগুন জ্বালায়। সবার সাথে স্লোগানে গলা মেলায়। নিত্যদিনের একেকটি যুদ্ধ যেন পূর্বের থেকে আরো শক্তিমান।
-তোমায় আমি এডি বলি?
-নাম তো অনিক দেবনাথ। এডি ডাকবে? …হেসে বলল, ঠিক আছে, ডাকিও
তখন থেকে অনিককে এডি বলেই ডাকে নিশি। অনিক বলছিলো; তুমি নিশি নন্দী, তাহলে তোমায় ‘ডাবল এন’ বলে ডাকি?
নিশি মুচকি হাসছিলো। সত্যিই ডাকতে চাও ওরকম করে?, নিশি মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করে।
অনিকও হাসলো, ‘আরে নাহ! এমনি বললাম। নিশি নন্দী। এটাই ভালো, বেশ-শ-শ-শ’।
দৃঢ় প্রতিজ্ঞ একেকটি ভালবাসার জুটি। জলপাই রঙের ট্যাংককে ব্যারাকে না ফিরিয়ে কেউ প্রেয়সীকে চুমু খাবে না, পরম আলিঙ্গনকে স্থায়ী করবে সেদিনই যেদিন এই বেহায়া বিদায় নেবে। এডি আর নিশি নন্দী আলতো করে চুমু খয়ে অপেক্ষা করছিলো একটা দীর্ঘস্থায়ী চুমুর জন্য।
-চলো এডি, দেশটা আমাদেরও…ভালবাসব আমরাও
-হ্যা চলো।
-গণতন্ত্রের আসবে কবে এডি?
-গনতন্ত্র যে আনতে হয়। আমরাই আনবো।
-হ্যা আমরাই আনবো।
-কিন্তু, আরো কত রক্ত যাবে?
-জাফরের রক্ত,জয়নালের রক্ত,বসুনিয়ার রক্ত…বলতেই ঠোট চেপে থামিয়ে দিলো এডি। এডি বলছিলো, ইতিহাসের কোন বসুনিয়াই ব্যার্থ নয়। রাউফুন বসুনিয়াও ব্যার্থ হবে না।
-হবে না তো?
-নাহ, হবে না… কিন্তু চুমু, দীর্ঘতম চুমু?
নিশি নন্দী হাসছিলো তখন; হ্যা, সময়টা উত্তপ্ত-সংক্ষিপ্ত-ব্যাস্ত। তাই দীর্ঘ হবে না, ক্ষণকালের চুমুর সময় এখন।
-হ্যা, তোলা থাকলো।

বসুনিয়ার রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন ছিলো। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ছিলেন বসুনিয়া। জাতীয় ছাত্রলীগের নেতা। বসুনিয়াকে হত্যা করা হয় যে মিছিল থেকে সে মিছিলের পাশেই দাড়িয়ে ছিলেন অনিক। বসুনিয়াকে গুলি করে মারার সে দৃশ্য যেন কাটা দিয়ে উঠে। মিছিলে গুলি করে হত্যা করা হয় বসুনিয়াকে। বসুনিয়াকে হত্যার প্রতিবাদে ছাত্রদল হরতাল আহবান করেছিল। আশ্চর্য! তাই নাকি? হ্যা তাই। নিশি নন্দীও আজকের দিনে অবাক হয়। যুগপৎ আন্দোলনের ছাত্রশক্তির এমন ঐক্যবদ্ধতা নিশি নন্দীকে এখনো ভাবায়, সেই লড়াই’র শক্তি তাই’ই এতো প্রবল ছিলো।

শ্রমিকের মিছিল এসে মেলে। মজুরি, বেসরকারিকরন, কারখানা বন্ধ করে দেবার তাবৎ আয়োজন চারদিকে। ডেমরা, পোস্তাগোলা, শ্যামপুরের কারখানাগুলোতে বন্ধের আতঙ্ক, মজুরি না পাবার আতঙ্ক, ব্যাক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেবার আতঙ্ক। স্বৈরাচারের রাষ্ট্র পরিচালন কৌশলে শ্রমিকরা চিনতে পেরেছে-এই অগণতন্ত্রী শাসকের আয়ু বাড়া মানা তাদের আয়ু কমা। শ্রমিকদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে শাসকের বিদায় না হলে মুক্তি নাই। রুটি,রুজি,মাকানের স্বপ্ন কে ফেরি করে শতাব্দীকাল ব্যাপী শ্রম-শ্রমিকের মুক্তি বোধহয় এখানেই। ঝাঁপিয়ে পড়ে শ্রমিকরা। ছাত্রদের রক্তের রঞ্জন যেন একাকার হয় ডেমরা, শ্যামপুরের ঘামঝড়ানো মানুষগুলোর রক্তের সাথে। বামশিবির স্বপ্ন দেখে আরেক সোভিয়েত বুঝি এই এলো। আরেকদল স্বপ্ন দেখে, গ্রাম থেকে শহর ঘেরাও করতে এই শ্রমিকই মৈত্রী গড়বে কৃষকের সাথে। নয়া গনতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ পেরুতে দুহাত তুলে স্বাগত জানাবে এরা। বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর আনোয়ার আন্ডারগ্রাউন্ডে ঘুরে সে কার্যক্রমই এগিয়ে নিচ্ছে। খতম করবে সামন্তীয়-মুৎসুদ্দি-দালাল শ্রেনীকে। আর অন্যরা এতো থিউরি বিচার করছে না। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির জোট বলছে, এরশাদ! তুমি চলে যাও। তুমি গেলেই মুক্তি। শ্রমিকদের বুঝাচ্ছে, এরশাদে মুক্তি নাই। ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র জোয়ার তুলেছে- বেসরকারি মালিকানা, মজুরিহীনতা, কারখানা বন্ধের মূলে এরশাদ। আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির আরেক অংশ কংগ্রেসে থিসিস উপস্থাপন করেছে রাষ্ট্র ফ্যাসিবাদী তাই প্রকাশ্যে তৎপরতা চালানো যাবে না। বুর্জোয়াদের সাথে ঐক্য করে আগে বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে। প্রকাশ্যে অন্য পার্টির ভেতরে তৎপরতা চালিয়ে বুর্জোয়া বিপ্লব ত্বরান্বিত করতে হবে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আরো তেড়েফুঁড়ে লড়াইয়ে আসছে। যে সন্তান জমিতে ফলানো ফসল বিক্রির টাকায় পড়তে এসেছে সেই ছেলের কপালেও চিন্তার ভাজ পড়েছে। ফসল বিক্রির জায়গা খুজে পায় না অথবা বিক্রিত ফসলের অর্থে যে সন্তানকে এদ্দুর শিক্ষাদীক্ষা দিয়েছে মজিদ খানের নীতি তো তাতে পেড়েক ঠুকে দিচ্ছে, শিক্ষার ব্যায় বাড়িয়ে তুলছে। দেশের নিদারুণ দারিদ্রে নিমজ্জিত মানুষের জীবন ধারণের সংস্থান না করে এই শাসক হাজির হয়েছে রাষ্ট্রধর্মের নিদান দিতে। যৌবনের উত্তাল সময়ে এসব সহ্য করেছে কোন যুগে,কে? কেউ করে নি। দ্রোহের সঞ্জীবনী সেখানেই। শ্রমিক কৃষকের লড়াই তাই এক বিন্দুতে এসে মিলেছিলো।

রোকেয়া হলের সমচেয়ে দস্যি মেয়েটার নাম নিশি নন্দী। ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হয়ে উঠেছেন হঠ্যাৎ করেই। নিশির রুমমেট তখন ছাত্র ইউনিয়নের রোকেয়া হলের কর্মী। তার সাথে আসতে যেতেই ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হয়ে পড়েন। তবে খুব বেশি কিছু বুঝেশুনে যুক্ত হন নি। কমিউনিস্ট পার্টির একজন নেতা ছিলেন আব্দুল মতিন। নিশির বাবার কাছে আসতেন ওদের ময়মনসিংহের গোলকিবাড়ির বাসায়। তখন সেই মতিন কাকু তার জন্য লজেন্স নিয়ে আসতেন। তখন একটু আধটু জানতেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এই উত্তপ্ত লড়াই ওকে ছাত্র রাজনীতিতে এনেছে। ছাত্রভোট করে সদস্য হয়েছিলেন একবার। চে গুয়েভারার ডায়েরি, লেনিনের রচনা পড়তে পড়তে রাজনীতিটা ভালোই বুঝে উঠছিলেন। একসময় ভেবেছিলেন, ট্রেড ইউনিয়ন করবেন। রোকেয়া হলের সামনে রাস্তার ওপাশে এডি দাড়িয়ে থাকে। রিক্সায় ঘুরে বেড়াতে খুব ভালো লাগে দুজনের। টিএসসি থেকে রিক্সায় করে সাড়া ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে এমন কিছু নেই যেখানে ঘোরা হয় নি দুজনের। বর্ষার বৃষ্টিতে বেড়িয়ে পড়তেন দুজন অথবা তীব্র শীতের সকালে দুজনেই হল থেকে বেড়িয়ে চলে যেতেন কামরাঙ্গীচরের দিকে। সেখানে নতুন চালের ভাপা পিঠা বিক্রি করতেন একজন বয়স্ক মহিলা। সে পিঠার খোজ পেয়েছিলেন সেরকম ঘুরতে ঘুরতেই। পুরান ঢাকায় সদরঘাটের দিকে বুড়িগঙ্গা বেশ ব্যাস্ত। মানুষের ভিড় দেখতে সেদিকেও চলে যেতেন। ওদিকে পোস্তাগোলা, ডেমরা সাভারে- কোথায় না ঘুরেছেন দুজন। আশির দশকের উত্তপ্ত রাজনীতিতে প্রণয়ের এমনি, সোদাসিক্ত। তবে চারদিকে যেখানেই চোখ পড়েছে সেখানেই শুধু বিদ্রোহ আর মুক্তির কাফেলা। শোষণমুক্তি আর একটি স্থায়ী গণতন্ত্রের মাঝেই কৃষকের মুক্তি, শ্রমিকের মুক্তি, ছাত্রদের মুক্তি, শিক্ষার মুক্তি এমনকি প্রেমিক-প্রেমিকারও মুক্তি। এদের প্রণয়ও তাই এসে নতুন করে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

নিশির একজন বৌদি থাকতেন চানখারপুলে। মাঝেমাঝে সেখানে যেতেন দুজনে। বৌদি ঢাকায় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। দাদা সোনালি ব্যাংকে চাকরি করতেন। সেখানে নিশি একা গেলে বৌদি বলতেন, তোর কমরেড কোথায়?
-আনবো বৌদি, আনবো।
-তুই সাবধানে থাকিস, যা শুরু করেছিস না তুই। কাকাবাবু জানে এসব রাজনীতির খবর?
-রাজনীতি তো দায়িত্ব। করতেই হবে।
-যা অবস্থা, এই ব্যাটা ক্ষমতা ছাড়বে না মনে হচ্ছে। দেখ তোরা কি করতে পারিস
-মানুষ আর কত সহ্য করবে। তোমরা বোঝো না বৌদি, দাদাবাবুরাও বোঝে না। তোমরা চাকরি-বাকরি করো তো।কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে, ছাত্রদের বেতন বাড়াবে, কি সব ধর্ম কর্মও নাকি এই বেহায়াটা স্কুল কলেজে পড়াবে। কি সব! উফ অসহ্য! বৌদি।
-ঠিকই বলেছিস। আমরা বুঝি না রে। কি করব বল,
চাকরি করি তো আমরা
-আমরা বলি সুবিধাবাদী শ্রেণী।
-এই থাম তো! এবার থাম! আর রাজনীতি না।
বলতেই নিশি সেদিনের মতো চলে আসবে। আজ আর থাকবো না, এদিকে এসেছিলাম মেডিকেলে। তাই দেখা করে গেলাম। তুমি থাকো, শুক্রবার আসবো।
বৌদি বলছে; না রে শুক্রবার না , শনিবার আয়। শুক্রবারে তোর দাদা বাসায় থাকে। কথাও বলা যায় না।
-আচ্ছা বৌদি তাই আসবো
নিশি বের হতেই বৌদি পেছন থেকে ডেকে মুচকি হেসে স্মরণ করিয়ে দিলো, কমরেডকে আনবি সঙ্গে করে-এ-এ…

পনেরো দলীয় জোট ভেস্তে যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আন্দোলনের একটি গ্রুপ, এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যায়। ছাত্র ইউনিয়নের অভ্যন্তরে যখন দ্বিধাবিভক্তি। পল্টনে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। এরশাদের অধীনে আওয়ামী লীগ,কমিউনিস্ট পার্টির নির্বাচনে যাওয়াতে ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্র কমরেডদের একটি অংশ বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
তবে এরশাদের সামরিক বাহিনী সারাদেশে ব্যাপক কারচুপি করে ক্ষমতায় আসার পরে সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করেন বিরোধী দলগুলো। কিন্তু অনিক ততদিনে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছেন। অনেক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। কিন্তু স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রোষ তো কারো কমে নি। ডেমরা, শ্যামপুরের কারখানাগুলো; চিটাগাং,নারায়ণগঞ্জ,খুলনার চটকলগুলোর শ্রমিকেরা ঝিমিয়ে পড়া লড়াইকে যেন টেনে তুলছিলো। ছাত্রশক্তির আন্দোলনও সাতাশি সালের শেষদিকে আরো গতিশীল আরও রণংদেহী। তবে অনিক তখন ভিন্ন রণকৌশলের ছায়াতলে। নতুন করে শান দিচ্ছে মতবাদে,স্লোগানে।
নিশি মধুতে এসে ছাত্র ইউনিয়নের টেবিল বসে ছিলেন। অনিক আসলে নিশি বলছিল, ‘বৌদি যেতে বলেছে। আমি কাল বিকেলে যাব ওখানে। চলে এসো’।
-কয়টায় থাকবে তুমি?
-বৌ্দি বাইরে থেকে ৩ টায় আসবে। আমি দুপুরে গিয়ে রান্না করবো, তুমি এসো দুপুরের পরপরেই।
-তোমার সঙ্গে কিন্তু আমার আর দেখা হবে না। চলে এসো।
-আচ্ছা যাব। শোন, কি রান্না করবে; হেসে হেসে জিজ্ঞেস করছিলো অনিক
-এডি! আগে আসো তো। বৌদি মণ্ডা এনেছে মুক্তাগাছা থেকে। খেতে পারবে। আর আমি কি রান্না করবো সেটা বলব না। আগে তো আসো।
-আচ্ছা, যাবো।

অঙ্কিতা রাতে মাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘মা তুমি যেভাবে দিনিলিপি লিখে রেখেছো এভাবে আরেকজন মানুষ লিখতো। জানো তো তিনি কে?’
-উহু, জানি না। মনে পড়ছে না। কে বলো তো?
-ক্লূ দিচ্ছি। তিনি জাতীয় চারনেতাদের একজন
-অহ, ইয়েস। তাজউদ্দীন আহমেদ
-ইয়াহ, ইউ গট ইট
-রিমি বের করেছিলো, মানে উনার মেয়ে বের করেছিলো ডায়েরিটা। কারেক্ট?
-এবসলিউটলি
অঙ্কিতা মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মাকে অনেকদিন একটা কথা বলতে চান। মানে রিকোয়েস্ট করতে চান। অঙ্কিতা মাকে জিজ্ঞেস করতে চান, ‘মা; তোমাকে একটা রিকোয়েস্ট করি? মানে ঠিক রিকোয়েস্ট না। জানতে চাই…’
-না, মামনি, তুমি কি জানতে চাও আমি জানি
-কি, বলো তো
-আমার ডায়েরিটা তুমি পড়তে পারো কি না?
অঙ্কিতা কোন কথা বলে উঠতে পারছে না। অঙ্কিতা বুঝেছে মা চান না মেয়ে সেটা পড়ুক। মায়ের প্রতি বিশ্বাস আছে ওর। মা ওর কতটা আপন ও সেটা বুঝে। তাই আর কথা বাড়ান না। মায়ের যে একটা গোপন পৃথিবী, বিশেষ পৃথিবী আছে সেটা মায়ের থাকুক, সেটা শুধু মায়ের নিজের- মা সেটাই চায়, বুঝতে পারে অঙ্কিতা। নিশি নন্দী বলছিল, ‘মামনি, তুমি যখন কনজুগাল লাইফে যাবে সেদিনই দিবো তোমায়’
-মা-আ-আ…না। আমি ওসব বিয়ে-ফিয়ে করব না। করলেও আমি শ্বশুর বাড়ি-টারি যাবো না। তোমাকে কে দেখবে। আর বলবে না এমন কথা। আমার ডায়েরি লাগবে না- বলে মাকে গলা জড়িয়ে ধরেন।
নিশি নন্দী মেয়ের কথা শুনে হাসেন। নিজের কি হবে সেটা ভাবেন না তিনি। মেয়ের বিয়ে নিয়ে নিশি নন্দী খুব যে ভাবেন তা নয়। তবে সেটা যে নিজের শেষদিনগুলো কিভাবে একাকি কাটবে সে দুশ্চিন্তায়- তা নয়। মেয়ের প্রিফারেন্সিকে গুরুত্ব দেন। নিশি নন্দী ভাবেন, এসব মেয়ের ছেলে মানুষি। বড় হলে মেয়েই খুজে নিবে নিজের মতো। নিশি নন্দী নিজে কিছু চাপিয়ে দিতেও চান না মেয়ের উপর। নিশি নন্দী এখনো পরিপাটি। বয়েসের গতি আছে কিন্তু শরীরে সে গতির প্রভাব কমই। ছিমছাম, পরিপাটি থাকতে পছন্দ করেন এখনো। কপালে লালটিপ পড়েন এখনো। এখনো সকাল করে হাটতে বের হন। ডায়েট করেন। নিয়ম করে খাবার খান। কোলেস্টেরলের হার বেশি হলে সেটাও অনুমান করে মেপে নেন, খেতে বিরত থাকেন বেশিরভাগ সময়। আর ভাত খান দিনে একবার। জিম করেন নিয়মিত। একদম ফিট বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। অঙ্কিতা মাকে তাই মাঝেমাঝে বলে, তোমাকে কিন্তু সত্যিই আরেকবার বিয়ে দেয়া যাবে, ‘তোমার বিয়ে দেই না মা-আ-আ……আমি নাচব তোমার বিয়েতে’।
নিশি মেয়ের গালটিপে দিয়ে বলেন, ‘ইউ হ্যাভ গান টু ম্যাড লেডি। তুমি বিয়ে করবে, আমি নাচবো। ওকে ডিয়ার?’
-অহ নো মা, আই ওন্ট ডু ইট।

ডায়েরির সেদিনকার পাতাগুলো উল্টাচ্ছিলেন একা একা। বৌদিদের বাসার সেদিনকার স্মৃতি চোখে ভাসছিলো। খুব করে অনুভব করছিলেন সেদিনটা। নিশি ভাবেন, একজন দেবতা ভগবানের মতোই নিষ্পাপ এডি। ঈশ্বরের অস্তিত্বে নিশির বিশ্বাস বড়ই দুর্বল। সংশয়ে পূর্ণ। তবে এডি দেবতার মতোই। এমন নির্মোহ রাজনৈতিক কর্মীই তো ভগবান হয়। লোকের পূজ্য হয় তো এমনি। অথবা যেসব ঈশ্বর মানুষের পূজ্য সেসব পাল্টে ফেলা উচিত। বরং এডি’ই ঈশ্বর, পূজ্য-পূজনীয়। বৌদি’র বাসায় এসে এডি মুখটা ধুয়ে নিচ্ছিলো। ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো। কোত্থেকে যেন কাহিল হয়ে ফিরে এসেছে। খুব চিন্তিত। কি যেন ঘটেছে, নিশি জানো কি ঘটেছে?
-কি গো?
-জাহিদ ভাইকে চিনতে?
-না মনে পড়ছে না। কি হয়েছে বলো
-যা হোক দেখলে চিনবে অবশ্যই।
হুম
-উনাকে এই খানিক আগে এরেস্ট করেছে। সব দিকে এরেস্ট করা শুরু করেছে।
-বুঝা যাচ্ছে। আওয়ামী পদত্যাগ করাতে বেহায়াটা চাপে পড়েছে
-আমি কিন্তু আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করি না।
-যাই হোক, আমাকে তোমাকেও সাবধানে থাকতে হবে। ফ্রেশ হয়েছ। বসে রেস্ট করো। শুবে?
-হ্যা শুবো একটু
নিশি নন্দীর লালটিপ অসম্ভব সুন্দর। শাড়ির সঙ্গে নিশি প্রায়ই টিপ পড়ে। বড় লালটিপ। নিশির চুলগুলো একদম খোলা। পাখার বাতাসে এদিক থেকে সেদিকে যাচ্ছে। সাদা ব্লাউজের দৈর্ঘ্য পেড়িয়ে বাহু দুটো সরু লতার মতো দুলছে। প্রতিমার মতো দেখাবে যদি স্থির হয়। প্রতিমাকে ছুঁতে ইচ্ছা হয়েছে সেরকম নয় তবে না ছুয়ে থাকা যায় না। প্রতিমার প্রতি বিশ্বাস অনিকের নেই তবে চোখের সামনে প্রতিমার উপর অগাধ বিশ্বাস। নিশি নন্দী বিশানার পাশে গিয়ে বসলে অনিক জিজ্ঞেস করলো; ডাবল এন, কেমন আছো? দুষ্টুমি করে জিজ্ঞেস করছিলো অনিক। নিশি হো হো করে হেসে গড়াগড়ি খেয়ে হেসে লুটিয়ে পড়লো অনিকের উপরে। ‘জ্বি এডি বলুন। আমি ভালো আছি’।
শহরে চড়ুই পাখির বাসা দেখা যায় না। তবে এই বাসার উত্তরদিকের জানালা ঘেষেই একটা প্রকাণ্ড সুপাড়ি গাছ। তিনটে সুপাড়ি গাছের সারি। দুটো চড়ুই পাখির বাসা। দুজনের ছোট্ট বাসা বেশ যুতসই না। সদ্য ঘর বেঁধেছে। হাত বাড়ালেই সুপাড়ি গাছের পাতা স্পর্শ করা যায়। কিচির মিচির শোনা যায় ভেতর থেকে। দুজনের খুনসুটি দেখা যায়। পরম মমতা, ভালবাসার আলিঙ্গন বুঝতে বাকি রাখে না-ওরাও ভালবাসে। একজনের ঠোটের খাবার অন্য জনে কেড়ে নেয়। আবার লুটোপুটি খায়। কিছুক্ষণ পড়ে বাসায় ঢুকে পড়ে। এ খেলা নিরন্তর।
বিক্ষুব্ধ নগরীরঅনাসৃষ্টি,অপ্রাপ্তি,বিদ্রোহ থেকে ওরা খানিক ছুটি নেয়। ওরাও তো মিছিল দেখে,গুলি দেখে, জলকামান দেখে। ওদের জীবনেরও মুক্তি দরকার। মিছিলের অবসরে তাই ওরাও বাসায় ঢুকে পড়ে। একান্তে কাটায়। নিশি নন্দী আর এডি’ও এসব থেকে কিঞ্চিৎ দূরে তখন। হয়তো পরম কোন মুহুর্তেও অবতারণা ঘটছে দুজন নরনারীর মধ্যে। হ্যা, তাই’ই!

…………

ছাত্র ইউনিয়ন ত্যাগ করেছিলেন ছিয়াশির নির্বাচনের পরেই। তবে ছাত্র ইউনিয়নে থাকা অবস্থায়ই পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির তৎকালের কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন অনিক। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও সিরাজ সিকদারের পার্টির বিভিন্ন বিভক্ত গ্রুপ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের আড়ালে কার্যক্রম চালাতো। পার্টির থিসিস অনুযায়ী প্রকাশ্য গনসংগঠনে ঢুকে তৎপরতা চালাতো। নিশি তখন অনিককে প্রশ্ন করার সাহসও করেন নি, কেন ছাত্র ইউনিয়নে আর নেই সে কারন উত্তরটা তার জানা। তবে নিশি তখনো এবং স্বৈরাচারের পতনের দিন পর্যন্ত ছাত্র ইউনয়নের সাথেই ছিলেন। নিশি এখন এবং তখনো জানতেন, ছাত্র ইউনয়নের সঙ্গে ছিয়াশির পরের সম্পর্ক যতটা আদর্শিক তার থেকেও অন্যান্য কমরেডদের সঙ্গে ব্যাক্তিগত সম্পর্ককেন্দ্রিক। আর স্বৈরাচার পতন মুখ্যত হওয়ায় বিভাজিত রাজনৈতিক শক্তি অত প্রভাব ফেলে নি। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সকলেই যেন একই কাফেলার যাত্রী। কিন্তু অনিককে তখন শুধু গনতান্ত্রিক আন্দোলনের স্ট্রাকচার ফলো করলেই চলবে না। রীতিমতো শ্রেণী সংগ্রামে ধাতস্থ হতে হবে। থিসিসমতে পার্টি কমান্ড করেছে যা তা পালন করতেই হবে নচেৎ বিপ্লবের কি হবে! অনিক তখন রাজশাহী, কুস্টিয়া, পাবনাতে সাংগঠনিক সফরে যায়। রাজশাহীতে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি দেখেন আবার তানোর,গোদাগাড়িতে কৃষকদের সংগঠন গড়ে তুলতে থাকেন। মাসের মধ্যে সাত আটদিন ঢাকার বাইরে থাকতে হয়। তবে পার্টি একটা সময় বলে দেয়, এখন ছাত্র প্রতিনিধিদের ঢাকায় থাকা উচিত। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আন্দোলন তখন দুর্বার হচ্ছে। ছাত্র মঞ্চ নামের নতুন যে প্লাটফর্ম গড়া হয়েছে তার রাজশাহী অঞ্চলের নেতা তখন জেলে, ময়মনসিংহের শাহিন ধরা পড়েছেন, আরও অনেক জায়গাতেই ধরপাকড় চলছে। বুঝাই যাচ্ছিলো একটা চুড়ান্ত ধাক্কা দিতে চাচ্ছে বিশ্ববেহায়া। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের অনেককেই গ্রেফতার করা হচ্ছে সারাদেশ থেকে। চুড়ান্ত ধরপাকড় বলতে যা বোঝায় তাই। কারফিউ জারি করে পরিস্থিতি শান্ত করার আয়োজন হাতে নিয়েছে শাসক।
ডাক্তার মিলনকে গুলি করে মারা হয়েছে পরের নব্বই’র নভেম্বরে দিকে। সে গুলিবিদ্ধ মিলনের লাশ যেন স্বৈরাচারের গদিতে আগুন ঢেলে দিলো। পথে পথে জনতার স্রোত রুখার সাধ্য কার। ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় পথে নেমে ব্বিক্ষোভ করছে জনতা। সেনা কারফিউ ভেঙ্গে রোকেয়া হল শামসুন্নাহার হল থেকে লাঠি হাতে নেমে পড়েছে মেয়েরা। স্বৈরাচারের কারফিউ ভঙ্গ করে ছাত্রীদের দাপট যেন কাপিয়ে দিলো সাড়া দেশকে। রাজশাহী, ময়মনসিংহ বরিশাল, চট্টগ্রামে যেন এই কারফিউ ভঙ্গের মিছিলে জোয়ার বইয়ে দিলো। ডেমরা, যাত্রাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক জনতা কারফিউ ভেঙ্গে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। ছাত্রীহলের সেদিনকার মিছিলের বিবরণটা নিশি সবচেয়ে দীর্ঘ করে লিখেছেন ডায়েরিটা। লাঠি হাতে মিছিলের সে কি তেজ। সেদিনের শাসকের দেয়াল এই অস্বাভাবিক জাগরণেই যেন ভেসে যাচ্ছিলো। এর কধ্যে একদিন মালিবাগে দুজন পথচারি নিহত হয়। ডাকসু থেকে মিছিল বের হয়। সে মিছিলের শেষে টিএসসির গেটে নিশিকে ডাকলো পেছন থেকে এডি।
আমার কাছে একদম টাকা পয়সা নেই, টাকা দাও
-কত দিবো?
-দাও, একদম নেই
নিশি টাকা বের করে এডিকে দিলো। টাকাগুলো নিয়ে এডি বলল, সাবধানে পরিস্থিতি দেখো, মুভ করো সাবধানে। চারদিক কিন্তু বেশ ঘোলাটে এখন।
-হ্যা, তুমিও সাবধানে মুভ করো।
চার ডিসেম্বর রাতে স্বৈরাচার পদত্যাগের ঘোষনা দিলে চারদিক যেন প্রকম্পিত হয়ে যায়। পল্টন মোড়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা, মালিবাগ, সদরঘাট সব দিকে যেন হুল্লোর। রাতেই বেড়িয়ে পড়েছে উৎফুল্ল জনতা। ওদিক থেকে শ্রমিকরা এসে ছাত্রদের সাথে যোগ দিচ্ছে। ভোর রাত অব্দি মানুষের উৎফুল্লতা। বিশ্বজয়ের আনন্দ যেন চোখেমুখে। আদমজি,ডেমরা,শ্যামপুরে এক শ্রমিক আরেক শ্রমিককে জড়িয়ে ধরছে। কেউ কেউ আবার আনন্দাশ্রুতে উল্লাসনৃত্য করছে। কৃষকের ধান কাটার মৌসুম বুঝি এবার দ্বিগুন হাসি নিয়ে হাজির হবে। ছাত্র-যুবার চোখেমুখে মুক্তির রেখা ঝিলিক দিয়ে উঠে। এই বুঝি তবে বেসরকারিকরন, বাণিজ্যিকিকরনের কবর রচিত হলো। প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র এবার আর ঠেকায় কে। দেশের যাবতীয় জঞ্জাল স্বৈরাচার বুঝি ধুয়ে মুছে সাঙ্গ করে নিয়ে চলে গেলো। একাত্তরের পর যেন আরেকটি একাত্তরের উচ্ছ্বাস নেমে এসেছে জনতার দরবারে। দেশের সকল প্রান্তে এমন ঐক্যবদ্ধ জনতার স্ফূরন ওই একবারই ঘটেছিলো; সে একাত্তরে। অধিকাংশ মানুষ হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে এসেছে। ছোট শিশু-বাচ্চা নিয়ে বের হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার তরুণ তরুণীর উচ্ছ্বাস যেন বাঁধভাঙ্গা। হল থেকে বেড়িয়ে জনতার সাথে মিশে যাচ্ছিলো ছাত্ররা। পথে পথে কবি নাট্যকারদের কবিতা-নাটকের পসরা বসেছে। বিদ্দজ্জনদের পদচারনায় রাজপথ শিল্প হয়ে উঠেছিলো সেসময়। মানুষও এসে আছড়ে পড়েছে। রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে কেউ নাটক দেখছে, কেউ কবিতা শুনছে, কেউ গান শুনছে, কেউবা আবার শুধু উচ্ছ্বাস দেখতেই এসেছে। সন্ধ্যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি দীর্ঘতম চুম্বনে নিশি এবং এডি আবদ্ধ হলো। জোনাক পোকার মিটিমিটি আলো শহরের আলোতেও যে এতো রাঙিয়ে দিতে পারে চারপাশ তা আগে জানা ছিলো না।বারবার যেন সে চুম্বন নতুন করে রঙ নিচ্ছে। সকল কিছুকে ভুলে গিয়ে যেন মুখমন্ডলের সর্বাংশে চুমুর স্ফূরন ঘটছে। টাংস্টেন আলো এখানে পৌছাতে পারে নি বলে কারো দৃষ্টিগোচর হয় না দূর থেকে। এমন নির্জনে দীর্ঘতম চুমুর প্রতিশ্রুতি রক্ষে হলো তবে। গনতন্ত্র মুক্তি পেলো বলেই তো। ঢাকায় রিক্সার আনাগোনা কম। ঠায় বসে আছে রিক্সাগুলো অথবা রিক্সাওয়ালারাও যোগ দিয়েছে জনতার অংশ হয়ে। নিশি আর এডি সেদিন আর রিক্সায় উঠে নি। পাশাপাশি হাটছিলো দুজন। চারদিকের সতেজ নিঃশ্বাস কে প্রাণ খুলে আত্ত্বীকরন করছিলো দুজনে।
………

অঙ্কিতা কে নিয়ে যখন দেশ থেকে এসেছেন ঠিকই তবে দেশ এখনো তাকে টানে। বাবা মারা গিয়েছেন, মাও নেই। এখন ময়মনসিংহের বাড়িতে বলতে গেলে এক বড়দাদা আর ছাড়া আর কেউ থাকেন না। তার সংসার নিয়ে সেও ব্যাস্ত। নিশি বড় দিদিও আছে তার মতো করেই। মোহিতের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়াটা কেউ মেনে নেন নি। বড় দাদা, বড় দিদি, নিশির বাবা-মা কেউ ভালোভাবে মেনে ণেণ নি। নিশির বাবার দুঃখ ছিল বেশ। সনাতন মানুষ। ভেবেছিলো মেয়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো। লোকে কি বলবে অথবা মেয়ের জীবনই বা কেমন করে চলবে। নিশির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন বাবা। তবে নাতনী অঙ্কিতাকে খুব ভালবাসতেন তিনি। মেয়েকে ডেকে একবার বলেছিলেন, ‘মা রে, মেয়েটার জন্য অন্তত মোহিতের সঙ্গটা ছাড়িস না’
-কেন বাবা, তোমার মেয়েই তোমার নাতনীকে দেখবে। আমি যথেষ্ট ওর জন্য।
নিশির বাবা মেয়ের কথার উপরে আর কোন কথা বলতে পারেন নি। সব কিছু ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে কানাডা চলে যাবার সময়েও নিশিকে কাছে ডেকে অনেকবার বলেছে, ‘ভেবে দেখ মা। যা করছিস আবার ভাব’। শেষমেষ যাই হোক। দেশ ছাড়তে অন্তত নিষেধ করেছিলেন বাবা। চাকরিটা ছাড়তেও একটু মায়া লাগে নিশির। এতদিন পরেও মোহিত মেয়ের খোজ নেয় না। এতো বড় হয়েছে মেয়ে তারপরেও কোন খোঁজ নেবার দরকার বোধ করেন না। শুধু মাঝেমাঝে মোহিতের একজন বন্ধুর মাধ্যমে খবর পাঠায় মেয়ের জন্য টাকা পয়সা লাগবে কি না। লাগলে নাকি মোহিতবাবু পাঠাবে। তবে নিশি সেসবের কোন উত্তর দেন না। শুধু বলে দেন, তাকে ভালো থাকতে বলো। ওসবের দরকার নেই।
পূর্বা বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, সর্বহারা পার্টি সারসংকলন করে পার্টিকে নতুন করে এগুনোর উদ্যম শোনা যায় আশির দশক থেকেই। দক্ষিণবঙ্গে, উত্তরবঙ্গ কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গে সারসংকলিত পার্টি দাপট দেখিয়ে চলছে। বিভিন্ন গ্রুপ, উপগ্রুপগুলো কে কার নিয়ন্ত্রনে আর কে কোন পার্টির অংশ তা বুঝা সাধারনের পক্ষে মুশকিল। মালেমা,লাল পতাকা,এমএল,এমএলএম আরো অনেক। অনিক কুষ্টিয়া বা ঝিনাইদহ এলাকার মাঝামাঝি কোন এক গ্রামে প্রধানত থাকে। সেখানে নাকি তাদের মুক্তাঞ্চল। সেই আশির দশকে ছিয়াশির নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহন করার সময়ে পার্টির সঙ্গে মতদ্বৈততা শুরু। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় জাহিদ এর সঙ্গে পরিচয়। গোপন পার্টি কেন দরকার, বিপ্লবের স্তর কি, সংসদীয় রাজনীতিতে বামপন্থার প্রকৃতার্থে কি প্রাপ্তি, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের পতাকা কিভাবে উর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে- বুয়েটের হলে ছামিউলের কক্ষে বসে ভোররাত অব্দি পাঠচক্র অনিককে বুঝিয়েছে সেসব। জাহিদের সঙ্গে তখনি বেশ জানাশোনা। তখন থেকে শ্রেণী শত্রু খতমের লাইনে অগ্রসর হবার তেজ উপলব্ধি করতে থাকেন অনিক। মাওবাদের নির্যাস উপলব্ধি করেই বুঝতে থাকেন শত্রুর বুলেটই শত্রুর মুখোমুখি হবে। নয়া গনতান্ত্রিক বিপ্লব,সমাজতন্ত্র,কমিউনিজম-এই তো স্তর; সেটাই রীতিমতো আত্নস্থ করেছেন অনিক তখন। বিপ্লবী পার্টির অভ্যন্তরে থেকে রণনীতি ত্তখন গণযুদ্ধ। ভারত, নেপালের মাওযুদ্ধ তখন পার্টির অনুপ্রেরণা। নকশাল আন্দোলনের আগুন যে এখনো এই বাংলায় জ্বলছে আর তারাই যে তার ঝান্ডাধারী- এ কথা উপলব্ধি করার মাধ্যমেই এই ব্যাবস্থা উৎখাতের স্বপ্ন বুনেন তারা। অনিকের চোখে তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অনেকেই শোধনবাদী। অনেকেই শ্রেণী শত্রু। গ্রাম থেকে শহরে গিয়ে এদের বিরুদ্ধেই লড়তে হবে। বন্দুকের নলে রঞ্জিত হবে সেসব, পদানত হবে অঞ্চলগুলো। কিন্তু নিশি নন্দীকে তো তখনো মনে পরে। একটি পেটি বুর্জোয়া সংগঠনের নিশির থেকেও ভালবাসার নিশি এখনো অনেক বড়। নারীকে স্পর্শের বৃত্ত পুরন হয়েছে যাকে ঘিরে তাকে ভুলতে পারবে কি করে অনিক। নিশি এখনো তাকে আলোড়িত করে। তবে অনিক যে পথে আছে সে পথ তো নিশির নয়। নিশির সঙ্গে ঘর বাধার ইচ্ছে কি কোনদিন হয়েছিল- মনে করতে পারেন না অনিক। তবে হ্যাঁ, গণতন্ত্রের সংগ্রাম করার দিনগুলো যদি শেষ লড়াই হতো তবে নিশির সঙ্গে ঘর বাধাতে দোষ ছিল না কিন্তু অনিকের শ্রেনীসংগ্রামে এখন আগুন ঝরে,গুলি ফোটে,রক্ত ঝরে তাহলে শ্রেণীসংগ্রামের দিনে কি করে ঘর বাধে অনিক? অনিক তাই ঘর বাধার স্বপ্ন ত্যাগ করেছেন। মৃত্যু অব্দি লড়াই জারি থাকুক।
অনিক একটা চিঠি পাঠিয়েছে নিশিকে। চানখাঁরপুলে বৌদির ঠিনানায়। কারন অনিক জানে হলে এখন আর থাকেন না নিশি। হয় বৌদি’র বাসায় উঠেছেন অথবা অন্য কোথাও থাকলেও বৌদি নিশ্চিত চিঠি পৌছে দেবে নিশিকে।

আমার ডাবল এন,
আমি জানি তুমি দুশ্চিন্তায় আছো এই ভেবে যে, আমি কোথায় আছি। আমি ভালই আছি,মানুষের সাথেই আছি। তুমি কেমন আছো? তোমার হাসিটা আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে। এখানে যখন নদীতীরে বসে থাকি তখন তোমার কথা মনে হয়। এখানে একদিন যদি তুমি আর আমি বসে বসে বিকেলটা কাটাতে পারতাম-ব্যাপারটা অন্যরকম হতো। তুমি এখন কি করবে?চাকরি করবে, তাই না? হ্যা, তাই করো। তুমি নিশ্চয় জানতে চাচ্ছো আমি কি করছি, কোথায় আছি?
আমি যখন বুঝেছি এই সংগ্রামের এখনো অনেক পথ বাকি। অনেক দূর যেতে হবে মানুষকে সাথে নিয়ে। তখন আমাকে আমি স্থির রাখতে পারি নি নিজেকে। আমি পেটি বুর্জোয়া শোধনবাদী লাইন কে বয়কট করে একটি সত্যিকারের সংগ্রামে অবতীর্ণ। সংসদীয় কায়দায় বিপ্লব আসে না, আসবেও না। সোভিয়েত থেকে চীন-কোথায় এসেছে এমন করে, বলতে পারো? আসে নি কোথাও। নৈরাজ্যবাদের ধোয়া তুলে জনগণের ন্যায্য সংগ্রাম কখনো দমিয়ে রাখা যায় না। যে রাষ্ট্র দমনমূলক, যে রাষ্ট্রকে ভাঙতে চাই আমরা। রাষ্ট্রের চোখের সামনে রাষ্ট্রকে ভাঙ্গার ডাক দিয়ে নিরাপদে থাকা যায় না। যাদেরকে চোখের সামনে দেখো তারা তাদেরই অংশ যারা শোষক-শাসক। আমি ভাঙ্গবার ডাকে শামিল হয়েছি। তুমি জেনে রাখো, আমাদের সাধের গণতন্ত্রের বিজয়ের হাসি জনগনের হবে না,ছিনতাই হবে। নিশি,আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি- এ কথাটা আমার কখনো বলতে ইচ্ছে করে না কিন্তু আমি তোমাকে নিয়ে জীবন সায়াহ্ন কাটাতে চেয়েছিলাম। আমার কাছে এটাই ভালবাসা। তুমি আমি একসাথে রিক্সায় ঘুরবো। বৃষ্টিতে ভিজবো। আমাদের কালিহাতিতে তোমাকে হলুদ শাড়ি পড়িয়ে নিয়ে যাবো। অনেক দূর অব্দি মেঠোপথে হাটবো। তোমার জন্য জবাফুলের চাষ করবো বাড়িতে। সরিষা ফুলের মধ্যে কুয়াশায় হাত মেলাবো। কিন্তু আমার নিজের ইচ্ছের জন্যে শুধু এতোকিছু কিভাবে করব? এখনো নিরন্ন মানুষ, এখনো অনাহারি মানুষ, এখনো বিভক্ত শ্রেণি; তাহলে আমি কি করে তোমায় নিয়ে সুখে থাকি! এতোগুলো মানুষের সুখ তবে কখন হবে? ‘ডাবল এন’ আর বহুজনের সমষ্টি- আমি বহুজনকে বেছে নিলাম। তোমার সঙ্গে মিছিলের দিনগুলো মনে পড়বে।
ভালো থাকো।

তোমার এডি

মোহিতের সঙ্গে বিয়েটা মনের বিরুদ্ধে। তবে নিশি মানিয়ে নিতে চেয়েছিলো। অনিককে শ্রদ্ধার একটি গহীন এবং গভীর অতল তলে রেখে দিয়ে মোহিতের কাছে থাকতে চেয়েছিলো। কিন্তু সেটা তো আর হয়ে উঠে নি। দাম্পত্যের অসহনীয় স্রোতে বারবার গোপনে ফিরে এসেছে এডি। বারবার চোখে জল এসেছে। মাঝেমাঝে আক্ষেপ হয়েছে অনিকের প্রতি। কিন্তু নিশি জানেন, অনিকেরও মন পোড়ে। তবে সেসব চেপে রাখেন। আরো অনেক বড় দায় নিয়ে হাঁটছে যে অনিক তাই ভুলে থাকেন। অনেক লোকের ভালোবাসায় ভুলে থাকেন একজন মানবীকে।
মোহিতের সঙ্গে ডিভোর্স হয় নি তখনো। তবে একসাথে থাকা হয় না আর। প্রেসক্লাবে একটি প্রোগ্রামে গেছেন। হঠ্যাৎ করে চোখে পড়লো অনিক। নিশির চিনতে একদম বেগ পেতে হয় নি। প্রেসক্লাব ক্রস করে ধীরগতিতে পা ফেলছিলেন অনিক। পেছন থেকে ডাকতেই ফিরে তাকালেন।
দেড় দশক পর মানুষটির দেখা পেয়েছেন নিশি। চুলে পাক ধরেছে কিছুটা। তবে বোঝা যায় কলপ দিয়ে সেগুলোকে রাঙিয়ে নেন। চামড়াই ভাজ পড়ে নি আবার পড়েছেও কিছুটা। চেহাড়া দেখলে বুঝা যায় যে, রোদে রোদে ঘুরে বেড়ান। গায়ে ফুল শার্ট, জিন্স পড়েছেন। কাধের ব্যাগ এখনো ঝোলানো। পরিবর্তন আরেকটা এসেছে-চশমা নেন চোখে।
নিশি কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে ছিলেন। চোখের কোণে একটু অশ্রু জমেছিলো। অশ্রুর অর্থ কি অনিক তা জানে। নিশি জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছো এডি?
অনিক চুপচাপ। এতোদিন পর একজন মানুষ এডি বলে ডাকলো। চিরচেনা তবুও বহুদিনের বিরতিতে। ঘটনার বিহ্বলতায় দ্বিধান্বিত এবং আশ্চর্য। এতো বছর পর দেখা। তাও আবার এই মানুষটির সাথে। অনিকের ভেতর থেকে একটা ঈষৎ হাসি আসছিলো। হাসিটা ঠিক উচ্ছ্বাসের নয়, পুলকের নয়। একদম নিপাট আশ্চর্যের হাসি। হতভম্ব হয়ে যাবার হাসি। আবার হতে পারে এমন যে, এতো আকাঙ্ক্ষিত একজনের আগমনের মন্ত্রমুগ্ধতার হাসি।
অনিক জবাব দিলো, আমি ভালোই আছি। তুমি ভালো আছো?
-এতোদিন পর, এদিকে? কই থাকো এখন?
-আমি থাকি অনেক জায়গায়। সে তুমি চিনবে না। তুমি থাকো কোথায়?
-আমি থাকি এখন মোহাম্মদপুরে। তোমার আজ কোন কাজ নেই তো?
-কাজ তো…, বলতেই নিশি বলছিলো, ‘প্লিজ আর না’
-আমার কিছু সমস্যা আছে। আমি ফ্রিকুয়েন্টলি ঘুরতে পারব না।
-ঠিক আছে সমস্যা নেই। আমি জানি তোমার রাজনৈতিক মামলা আছে অনেক। তাই তো?
-হ্যা, তাই।
-সমস্যা নেই চলো। ট্যাক্সিতে উঠলে সমস্যা হবে না।
দুজনে মোহাম্মদপুরের দিকে গিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে আলাপ করছিলো। নিশির একটা মেয়ে হয়েছে শুনে বেশ খুশি হয়েছে অনিক। এসএসসি পাস করেছে। তবে স্বামীর সঙ্গে বিবাদের কথাটা বলে নি নিশি। তবে নিশি জিজ্ঞেস করে নি, এডি বিয়ে করেছে কি না। শুধু জানতে চাইলো-শরীর ভালো কি না, খাওয়া দাওয়া করে ঠিকমতো, কালিহাতি গিয়েছে কবে শেষবার। কানাডা চলে যাবার আয়োজন চলছে সে কথাও গোপন করেছেন নিশি। নিশি আর এডির আলাপে গণতন্ত্রও উঠে এলো। যারা গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিলো তাদের পাশেই এখন গণতন্ত্রের হন্তারক ব্যাক্তিটি ক্রুর হাসি হাসে। ক্ষমতার রফা করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের নিশ্চয়তা তৈরি করতে সেই পতিত শাসক আবারও অধিষ্ঠিত। আহ! কি নিরাপদ। বিকট সুন্দর গণতন্ত্র! অনিকের দীর্ঘশ্বাস আসতে চায় ভেতর থেকে। গনতন্ত্র এলো বলে যিনি শ্রেণীসংগ্রামের বাকি কাজ করবেন বলে চলে গিয়েছিলেন সেই সাধের গণতন্ত্রেরও স্বপ্নভঙ্গ। স্বপ্নভঙ্গ হৃদয় নিয়েই অনিক বলছে, আজ উঠি
-চলে যাবে?
-হ্যা। যেতে হবে।
-তুমি তো কিচ্ছু বললে না।
-কি বলব, বলার নেই তো কিছু। তোমার কথা শুনলাম। তোমার মেয়েকে দেখতে পারলে খুশি হতাম।
নিশির চোখের কোণে আবারো জল। অনিকের মুখে স্পর্শ করে গালে হাত দিলো আলতো করে। ‘এডি, শেভ করিও নিয়ম করে। কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছো’।
অনিক কোন কথা বলছে না। অনেকদিন পর এখনো আপন মানুষের মতো করে অভয় দিলো, যত্ন নিতে বললো শরীরের। আগুন নিভলেও প্রণয় আসলে নেভে না। তাই বুঝি এমন হয়।
……………
অঙ্কিতা মাকে জিজ্ঞেস করে
মা, পল্টনে আওয়ামী লীগের সমাবেশে এরশাদ কেন মা, কিভাবে?
-জোট করেছে, মহাজোট
কেউ কিচ্ছু বলে না, যাকে পদর্যুস্ত করলো তাকেই কিভাবে আলিঙ্গন করে দলীয় কর্মীরা?
-করে। ক্ষমতায় থাকতে হবে যে
আচ্ছা মা, বিএনপির চারদলীয় জোটেও তো গিয়েছিলো। কিভাবে মা? শিশু জিহাদ কে মেরেছিলো। ওদের মনে নেই?
-ভোটের অঙ্ক
মা, বসুনিয়ার রক্তের দাম নেই?
-না নেই।
জাফর, জয়নাল, দিপালি?
-না, কোন দাম নেই
তোমার বান্ধবী, রোকেয়া হলে পাশের রুমে থাকতো যে, ছাত্রলীগের। এরশাদ যে সংসদে, তিনিও সেখানে। কিভাবে মা?
-সেভাবেই। অঙ্ক কষে
তাহলে গনতন্ত্র?
-স্বপ্নভঙ্গ
মা, নূর হোসেন?
-জিরো পয়েন্টে
মা, ডেমরার শ্রমিকরা কি পরে মজুরি পেয়েছিলো?
-না, এখনো পায় নি। বিক্ষোভে এখনো উত্তাল হয়।
কারখানা বন্ধ হয় নি আর?
-এখনো বন্ধ অনেক। আদমজী বন্ধ।
মা, মজুরী?
-গার্মেন্টসে নতুন শিল্প। মজুরির বিক্ষোভ হয়। কখনো পুড়ে মরে, ধসে যায়।
মা, নাটক-কবিতা-গানের শিল্পীদের তুলি,কন্ঠ,ছন্দ?
-স্তব্ধ অথবা অঙ্ক কষছে
অঙ্কিতা দুহাত দিয়ে কান বন্ধ করে চিৎকার দিতে চায়। উফ! মার আর কত? তাহলের সেসবের মূল্য কি থাকলো!
ক্রসফায়ারের খবর কি জানে নিশি নন্দী? কুষ্টিয়ায় গড়াই এর চরে একটি নিথর দেহের খবর কি জানে নিশি নন্দী? মনে হয় জানে না। কানাডাতে বসে একটি অসম্ভব প্রত্যাশা নিয়ে বসে আছে, অবাস্তব প্রদীপ জ্বালাবার সলতে খুঁজছে
আবার দেখা হবে শেষবারের মতো করে।
কিন্তু সে আশা তো মিথ্যে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

62 − = 61