ইতিহাসের ক খ

প্রথম পাঠ

১৯৪৭ সালে বৃটিশ সরকারের প্রতিনিধি যে ভাবে দেশ ভাগ করে ছিলেন তাকে অসংকোচে পাকিস্তানের প্রতি অবিচার বলা যায় । দেশ বিভাগে আসামে যে গণভোট হয় তাতে বিপুল সংখ্যক লোক বৃটিশ ষড়যন্ত্র পাকিস্তানের পক্ষে এবং পাঞ্জাবের বিপুল সংখ্যক ভোট পাকিস্তানের পক্ষে দেয়া সত্ত্বেও আসামের করিমগঞ্জ এবং পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলা ভারতের অংশে তুলে দেয়ায় একটা গুরুতর অবিচার করা হয়েছিল। কাশমীর ও ত্রিপুরা রাজ্যকে ভারতের সংগে সংযুক্ত রাখার মতলবেই যে এটা করা হয়েছিল তা বেশ বুঝতে পারা যায় । আর ভারতের প্রতি এই উদারতার অন্যতম কারণ ভারতের ন্যায় পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল পদে মাউন্টব্যাটেনকে নিযুক্ত না করে মিঃ জিন্নাহর স্বয়ং গভর্ণর জেনারেল পদ গ্ৰহণ ৷ কোন কোন রাজনীতিক বলেছেন যে, মিঃ জিন্নাহ যদি মাউন্টব্যাটেনকে বড়লাট হিসেবে গ্রহণ করতেন তাহলে পাকিস্তানের প্রতি মাউন্টব্যাটেনের এই ইচ্ছাকৃত অবিচার করা সম্ভব হতো না । কিন্তু মিঃ জিন্নার মনোভাব ছিল অন্যরূপ । তিনি মনে করেছিলেন যে, স্বাধীন পাকিস্তানে বিদেশী শাসকদের প্রতীক হিসাবে মাউন্টব্যাটেনকে বড়লাট করলে সেটা জাতীয় অবমাননার বিষয়বস্ত হয়ে থাকবে।

যাহোক, যে সব পক্ষপাতমূলক অবিচার করা হয়েছিল সে সব অবিচারের ধরণ-ধারণ এমন ছিল যে ভারতীয় নেতারা মনে করতেন পাকিস্তান টিকবে না । তা ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাবে।

র‍্যাডক্লিফ কোলকাতার উপর পাকিস্তানের দাবী অগ্রাহ্য করতে পারতেন না, কিন্তু স্বয়ং লীগ নেতারাই অগ্রাহ্য করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন । ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন তারিখে বৃটিশ সরকার একটা আন্দাজী দেশ বিভাগ ঘোষণা করলেন, তখন জনাব শহীদ সোহরাওয়াদী বাংলার প্রধানমন্ত্রী । তিনি ঢাকাকে রাজধানী করার ঘোষণা করলেন, আর ঢাকা শহরের ২০ মাইল এলাকা অধিগ্রহণের নোটিশ জারি করলেন কোলকাতা গেজেটে । এটা শহীদ সাহেবের প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম লীগ নেতা খাজা নাজিম উদীনের আনন্দের কারণ হল, কারণ কোলকাতা পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে পড়ুক, এটা তারা চাননি । কিন্তু শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক এবং সোহরাওয়াদী সাহেব এবং বাংলার মুসলিম ছাত্র সমাজ কোলকাতা পূর্ব পাকিস্তানের হাতে পাওয়ার আন্দোলন চালিয়ে যেতে লাগলেন । কিন্তু আজাদ, স্টার অফ ইণ্ডিয়া, মনিং নিউজ পত্রিকাগুলি তাদের সুর নরম করল । এর মধ্যে আর এক ষড়যন্ত্র দানা বেধে উঠলো, মওলানা আকরম খা ও খাজা নাজিমউদ্দীনের নেতৃত্বে । পুর্ব পাকিস্তান আইন সভার নেতা নির্বাচনে তারা শহীদ সাহেবকে হারিয়ে দিয়ে নাজিমউদ্দীনকে নেতা নির্বাচিত করেন ‘৪৭ সালের ৫ই আগস্ট তারিখে । নেতা নির্বাচিত হওয়ার সংগে সংগে নাজিমউদ্দীন সাহেব সোহরাওয়াদী সাহেবকে দেশ বিভাগ কাউন্সিলের সদস্য পদ থেকে সরিয়ে সেখানে হামিদুল হক চৌধুরীকে নিযুক্ত করলেন।(আঃ রাজনীতি)

দেশ বিভাগের সংগে সংগে পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা এবং সরকারী কর্মচারীবৃন্দ বন্যর স্রোতের মত কোলকাতা ত্যাগ করে ঢাকার দিকে ছুটলেন । তাদের পাওনা সম্পদ বুঝে নেওয়ারও তর সইলো না । খাজা নাজিমউদ্দীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ শাসন করতে লাগলেন, এবং মুসলিম লীগ সরকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে যথেচ্ছাচারের পথ গ্রহণ করলো । সহজ কথায় বলতে গেলে বলা যায় মুসলিম লীগ মন্ত্রীদের পকেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো ।

১৯৪৮ সালের গোড়া থেকেই পূর্ববঙ্গে বিপ্লব ধূমায়িত হতে শুরু করলো, এবং মিঃ জিন্নার ঢাকা সফর ও রাষ্ট্ৰভাষা সর্ম্পকে তার মন্তব্যে এই বিপ্লবের আগুন তীব্রভাবে জলে উঠলো। বাংলার ছাত্র সমাজ দ্ব্যথ্য হীন কন্ঠে ঘোষণা করলো যে তারা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্ৰভাষা হিসেবে দেখতে চায় । তাদের এই প্রতিজ্ঞা রূপ নিলো ‘৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী । রাষ্ট্ৰভাষার দাবীতে বিক্ষোভ করায় কয়েকজন তরুণ পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলো সত্য, তবে ৮ কোটি মানুষের মুখের ভাষা ও প্রাণ পেয়ে গেল তাদের এই আত্মত্যাগের ফলে ।

পূর্ববঙ্গ মন্ত্ৰীসভা তথা সরকার সোহরাওয়াদী সাহেবকে পুর্ববঙ্গে আসতে দেননি। কাজেই ভারতে তার অবস্থান শেষ করে শহীদ সাহেব পশ্চিম পাকিস্তানে গমন করেন । এবং লাহোর হাইকোটে আইন ব্যবসা শুরু করেন । তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান । মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন মিঃ জিন্নাহ । কিন্তু তার ইন্তেকালের পর চৌধুরী খালেকুজ্জামান যখন ১৯৪৮ সালে ভারত থেকে পাকিস্তানে পালিয়ে এলেন তখন তাকেই মুসলিম লীগ পূনর্গঠনের ভার দেয়া হয় । কিন্তু তিনি উদ্বাস্তুদের বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করে রেহাই পান ।

পাকিস্তানে মুসলিন লীগের মৃত্যু ঘন্টা বেজে উঠলো । লীগ নেতারা একদিনের গণপ্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগকে পকেটে পুরে যখন আত্মপ্রসাদ লাভ করছিলেন তখন সোহরাওয়াদী ও মামদোতের নবাব ইফতেখার হোসেন খান একত্রিত হয়ে জিন্নাহ আওয়ামী লীগ গঠন করলেন এবং সীমান্ত প্রদেশে গিয়েও তিনি মান কী শরীফের পীর সাহেবকে নিয়ে আওয়ামী লীগ গঠন করেন । সিন্ধুতে জিন্নাহ আওয়ামী লীগ, আওয়ামী জমাত ও সিন্ধু দস্তুর পাটি’র সহযোগিতায় শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করলেন । এদিকে পূব বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের দমননীতি এবং নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখার কুমতলবের ফলে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। ছাত্র, যুবক ও বামপন্থী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায় মওলানা ভাসানী যুব নেতা শামসুল হক ও ছাত্র নেতা শেখ মুজিবর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করলেন । বিভিন্ন প্রদেশের সরকার বিরোধী শক্তিগুলির সমন্বয় সাধিত হলো । ১৯৫২ সালে লাহোরে সোহরাওয়াদী সাহেব নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের এক সম্মেলন আহবান করলেন । এই সন্মেলনেই দেশের বিরোধী দলের শক্তিশালী বুনিয়াদ কায়েম হলো ।

১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে পূর্ববঙ্গে আওয়ামী মুসলিম লীগের ম্যানিফেসেটা প্রকাশিত হয় । এতে বিভিন্ন শিল্প জাতীয়করণ, বিনা খেসারতে জমিদারী উচ্ছেদ, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্ৰভাষার মর্যাদা দান প্রভূতি ওয়াদা করা হয়েছিল ।

” বাংলাদেশ বাঙ্গালীদের জন্য” এই শ্লোগান তুলে তারা বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটালেন । নির্বাচন আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না মনে করেই পূর্ব পাকিস্তানের নরুল আমিন সরকার ১৯৫৪ সালের প্রথম দিকে সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেন । সংগে সংগে মূসলিম লীগের মোকাবেলা করার জন্য আওয়ামী লীগ, কৃষক-শ্রমিক দল, নিজামে ইসলাম পাটি, ও গণতন্ত্রী দল নিয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো । এবং এই যুক্তফ্রন্টের শ্লোগান ছিল হক-ভাসানী-শহীদ এক হও ।

প্রত্যেকটি অঙ্গদল থেকে সম-সংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে যুক্তফ্রন্ট পালামেন্টারী বোড গঠন করা হয় । এবং স্থির করা হয় যে, ষে দলের প্রার্থী যে কেন্দ্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় তাকেই সেই কেন্দ্ৰে মনোনয়ন দান করা হবে। এই প্রার্থী বাছাই নিয়ে অনেক সময় অনেক বিতণ্ডা ও বচসা হয়েছে। হক সাহেব অনেক সময় ক্রুর্ধ হয়ে সভা ত্যাগ করে চলে গেছেন, আবার মানিক মিয়া ও সোহরাওয়াদী সাহেব তাকে তোষামোদ করে সভায় ফিরিয়ে এনেছেন । এই রকম নানারূপ অবাঞ্ছিত ঘটনার মধ্যে দিয়ে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসের সাধারণ নির্বাচন শেষ হলো, এবং মুসলিম লীগ পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল হিসেবে কেবলমাত্র ইতিহাসের পাতায় একটু স্থান পেল, কিন্তু দেশের মাটিতে তার আর অস্তিত্ত্ব থাকলো না ।

 

উপমহাদেশে দুইটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে দুই রাষ্ট্রের দুই মহান স্রষ্টার জীবনাবসান উপমহাদেশের জন্য নৈরাশ্যজনক ।  একজনের মৃত্যু হ’ল তার স্বধৰ্মী উগ্রপন্থীদের হতে, আর  একজনের মৃত্যু সহকর্মীদের অবহেলায়। এই দুইজনই ছিলেন দুই রাষ্ট্র পূর্ণ গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী । মহাত্মা গান্ধী শুধু যে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের উদগাতা ছিলেন তাই নয়, গণতন্ত্রের অগ্রপথিকও ছিলেন । আর মিঃ জিন্নাহ ছিলেন গণতন্ত্রের একজন একনিষ্ঠ সাধক, বৃটিশ গণতন্ত্রের ধাচে তিনি গড়ে উঠেছিলেন । তাই পাকিস্তানীরা মনে করত মিঃ জিন্নাহ যতই কঠোর মেজাজের মানুষ হোন না কেন, পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবেই। কিন্তু তার মৃত্যুর সংগে সংগে পাকিস্তানের জনগণের সে আশা ভঙ্গ হলো । ধীরে ধীরে পাকিস্তান স্বৈরতন্ত্রের পথে অগ্রসর হল।

ভারত ইউনিয়নেও গান্ধীজীর অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হতে থাকলো। প্রধান মন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু গান্ধীজীর মন্ত্রশিষ্য হ’লেও, তা”র সেই কালজয়ী প্রভাব ছিল না তার মধ্যে । ফলে, দেখা গেল যে নেহরুর গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের ধ্যানধারণার উপর প্রভাব বিস্তার করতে লাগলো রাষ্ট্ৰীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ও হিন্দু মহাসভার সম্প্রদায়ীক দুষ্ট প্রভাব । দেশ বিভাগের সময় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারা যে উচ্চ আশা পোষণ করেছিলেন, দেশ বিভাগের কুড়ি বছর পরেও তাদের সে আশা অন্ততঃ ভারতে ফলবতী হয় নি । তারা আশা করেছিলেন যে, ভারত ও পাকিস্তানে তাদের নাগরিকরা অতপর নিরূপদ্রব ও শঙ্কাবিহীন জীবন যাপন করতে পারবে কিন্তু ভারত ইউনিয়নে মুসলমানরা সে সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হল ।

০০০০লন্ডনের হিউম্যান রাইটস (মানবাধিকার কমিটি)” দেশ বিভাগের পর থেকে ১৯৬৮ সাল পয্যন্ত ভারতে মুসলিম গণহত্যা ও অন্যবিধ অমাণবিক অত্যাচারের যে বিবরণ ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসে গ্রস্থাকারে প্রকাশ ক’রেছিলেন তার কিছু অংশ ইতিহাসের বিষয়বস্তু হিসাবে এখানে উদ্ভূত হল ।)

 

পুস্তকের মূখবন্ধে বলা হয়েছে ঃ ভারতীয় গণতন্ত্রের বিচার করবার কষ্টিপাথর হচেছ কিভাবে এর সংখ্যালঘুদের প্রতি ব্যবহার করা হয়। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু গর্ব ক’রে বলেছিলেন “ আমাদের রাষ্ট্ৰ সাম্প্রদায়িক নয় । এই গণতন্ত্ৰীক দেশে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে ।” নেহরর এই দাবী সম্পকে ডক্টর জ্যোতিভূষণ দাশগুপত তীর “ইন্দোপাকিস্তান রিলেশানস্” — গ্রস্থে লিখেছেন ঃ ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি ধর্মনিরপেক্ষ ভারত রাস্ট্রের যে ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচেছ, তা কি মুসলমানদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের পরিচায়ক ? ( পৃষ্ঠা ২১৫- ২১৬ )

মানবাধিকার কমিটির রিপোটে শত শত বিভীষিকা পূর্ণ ঘটনার উল্লেখ আছে। এখানে তার মধ্যে থেকে মাত্র কয়েকটির উল্লেখ করা হল।  ভারতের সাধারণ মানুষেরা শান্তি প্রিয় । ওদের জনসংখ্যার মতই ওদের সমস্যারও অন্ত নেই। অশান্তি তাদের কাম্য নয়, হিন্দু মুসলমান পার্থক্য তারা অত বোঝেনা। কিন্তু একটা নগণ্য শ্রেণী এক একটি বিশেষ দলের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হ’য়ে অঘটন ঘটিয়ে থাকে । এমনি অঘটন ঘটিয়েছিলো রেীরকেল্লা, জামশেদপ-র ও রাচীর দাঙ্গাকারীরা । তারা শুধু মুসলিম গণহত্যা করেনি । নারী ও শিশুদের উপর যে অত্যাচার তারা চালিয়েছিল তা ইতিহাসের ঘূণ্যতম অপরাধকেও লজ্জা দেয়। এইসব হিন্দুরা মনে করে যে ভারত একমাত্র হিন্দুদেরই দেশ। এখানে মুসলমান, খৃস্টান বা অন্য কোন ধর্মাবলম্বীর ঠাই নেই। অবশ্য মুসলমানরাই ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালগঘু  সম্প্রদায়, সেহেতু সাম্প্রদায়ীক হিন্দুদের দৃস্টি প্রথমে তাদের উপরই পড়ে । অবশ্য খৃষ্ঠটান, শিখ এবং অন্য স্মপ্রদায়দের উপর এদের হামলা মাঝে মাঝে যে ভাবে চলছে তাতে সরকার যদি কঠোরতম ব্যবস্থ অবলম্বন না করেন, তাহলে আগামী দুই বা তিন দশকের মধ্যে অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে । ভারতের কংগ্রেস সরকার সাম্প্রদায়ীক হাঙ্গামা বন্ধ করার জন্য প্রধান মন্ত্রী নেহরুকে চেয়ারম্যান করে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতীয় ঐক্য পরিষদ গঠন করেছিলেন । এই কমিটির প্রধান কাজ ছিল যে সকল সংবাদপত্র সাম্প্রদায়ীক বিদ্বেষ ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। এর ফলে মুসলমান পরিচালিত সংবাদপত্র গুলি সরকারের কোপ দৃষ্টিতে পড়লো। কোন হিন্দু সংবাদপত্রকেই স্পর্শ করা হয়নি শুধু তাই নয়, হিন্দু মহাসভার নেতারা তাদের প্রচার পুস্তিকায় যে ধরণের উক্তি করতে লাগলেন তা সাম্প্রদায়ীক ঐক্য প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সূচিট করতে লাগলো জওয়াহেরলাল ও অন্যান্য সুস্থ মসিতস্ক কংগ্রেস নেতাদের শুভ প্রচেষ্টায়ও তা বাধা সৃচিট করে ছিল । আর, এস, এস নেতা গোলওয়ালকর তার পুস্তিকা “বাঞ্চ অফ থট স” এ লিখেছেন, “ যে সব কংগ্রেস নেতা বলেন যে, হিন্দু মুসলিম ঐক্য ব্যতীত স্বরাজ অথ হীন, তারা নিশ্চয়ই দেশ দ্রোহী । জওয়াহের লালজী ইসলামকে একটি ভারতীয় ধর্ম বলে মনে করেন, এবং যে সব মুসলমান ভারতে বাস করে তাদের ভারতীয় জাতি হিসেবে গণ্য করেন। এটা নেহরুঞ্জীর গ্রান্ত ধারণা । আজ ভারত যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুদধ ঘোষণা না করে তার কারণ ভারতে অবস্থিত পাচ কোটি মুসলমান । ১৯৪৭-৪৮ সালে ভারতীয় মুসলমানরা যখন পাকিস্তানে পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন নেহরুই প্রধান ব্যক্তি যিনি এই পলায়ন বন্ধ করেছিলেন । কাজেই দেখা যাচেছ যে, নেহরুজী

ভারতের নিরাপত্তা অপেক্ষ। পাচকোটি মুসলমানের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দান করেন ;

আর, এস, এস, নেতা গোলওয়ালকরের কার্য্যকলাপ লক্ষ্য করে প্রধানমন্ত্রী নেহরর সেক্রেটারী ১৯৪৮ সালের ২৭ শে আগস্ট তারিখে যে পত্ৰখানি লেখেন নীচে তার কিছু অংশ তুলে দেয়া হলো ঃ

*” প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আপনাকে জানাচ্ছি যে, আর, এস, এস, কোনরূপ দোষী নয়, এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ভিত্তিহীন, এসব

কথা প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করতে প্রস্তুত নন । গভর্ণমেন্টের হাতে অনেক প্রমাণ মওজুদ আছে। যুক্ত প্রদেশ সরকার এর আগে আপনাদের সাবধান করে দিয়েছে যে আপনাদের কার্য্যকলাপ সাম্প্রদায়ীক, আপনার মুখে এক কথা বলেন এবং কাজে অন্যরাপ করেন ॥**

সরকারের তরফ থেকে এ ধরনের অনেক সতকবাণী উচ্চারণ করার পর ও হিন্দু মহাসভার উপর হতে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হয় ।

প্রকৃতপক্ষে এ সময় ভারতে আইন ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে । অবস্থা এমন দাড়ায় যে, সামান্য কারনে দাঙ্গার সৃস্টি হয়, আর দাঙ্গার অর্থই এক তরফা ভাবে মুসলিম নিধন । এই দাঙ্গা প্রতিরোধের জন্য অন্য কথায় মুসলিম হত্যা বন্ধ করার জন্য “—- টাইমস্ অব ইন্ডিয়া ‘’

পত্রিকায় পাকিস্তানের সংগে ভারতের হিন্দু মুসলমান অধিবাসীদের আদান প্রদানের কথা বলে ছিলেন । যার জবাবে লাহ্মৌএর মুসলিম মজলিসের তরফ থেকে এক কড়া রকমের জবাব দেয়া হয় ।তাতে তারা বলেন যে,

“ পাকিস্তান কেন, কোন দেশই ভারতের এই আট কোটি মুসলমানকে জায়গা দিতে রাজী হবে না । তা ছাড়া, মুসলমানরা ভারতের নাগরিক । তারা বিক্রয় বা বিনিময় যোগ্য পন্য নয় । সংখ্যা শুরু সম্প্রদায়ের মত সংখ্যালঘু মুসলমানদের সমান অধিকার আছে এই দেশের উপর । মুসলমানরা এদেশেই থাকবে এবং এই সিন্ধান্তের কোনরূপ রদবদল হবে না । দেশের কল্যানের জন্যই আমরা সবাই কাজ করে যাব এবং সরকারের ও কর্তব্য হবে সবার প্রতি সুবিচার করা ।

০০০নিয়ে মুসলমানদের উপর অত্যাচারের কয়েকটি বিবরণ তুলে ধরা হল—

যাতে দেখা যাবে যে দাঙ্গাকারীদের সংগে সরকারী কর্মকর্তাদের কি রকম যোগসাজস ছিলঃ

পিপরা ও ঝারাওয়ান দাঙ্গা, থানা ডোমারিয়াগঞ্জ, জেলা বস্তি, তারিখ ৮ ই ও ৯ ই মার্চ ১৯৬৭ সাল ।

গ্রামে গুজব রটে গেল যে, মুসলমানরা গরু জবেহ করেছে। এ গুজবের সংগে সংগে হজার হাজার হিন্দু সমবেত হলো । তাদের নেতারা উত্তেজনা মুলক বক্তিতা করতে লাগলো । জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ অফিসাররাও সেই সভায় যোগদান ক’রে – হিন্দুদের উৎসাহিত করলো। সংগে সংগে মুসলমান বস্তীতে লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগ শুরু হলো ।

প্রধানমন্ত্রী সি, বি গুপতা এবং পরে প্রধানমন্ত্রী চরণ সিং দাঙ্গা দমনের চেষ্টা

করলেন এবং কম্বল, শাড়ী, শাট পাজামা, সোয়েটার এবং গম ও নগদ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা মুসলমান দাঙ্গ পীড়িতদের জন্য পাঠালেন ।

মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা ও ডাকাতির মামলা দায়ের করা হলো । বিচারে মামলা ফেসে গেল ।জাজ তাঁর রায়ে বললেন যে, “ এ মামলা মিথ্যার উপরে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাকরা হয়েছে।’

০০০আর একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা উচিত । ঘটনাস্থল বারানসী, তারিখ ২১ শে, এপ্রিল, ১৯৬৭ সাল ।

একটি তাজীয়া শোভাযাত্রা গোলা হনুমান ফটক দিয়ে যাচিছল । তখন হিন্দুরা তাজীয়ার উপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে । এবং ডেপুটি পুলিশ সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট শোভা যাত্রার উপর লাঠি চার্জ করে । গলির শেষ প্রান্তে একজন ম্যাজিস্ট্রেট শোভা যাত্রার উপর গুলি চালনার নিদেশ দেয় । ১৮ জন গুলি বিন্ধ হয় এবং একজন মারা যায়। এ ছাড়া ও কয়েকজন মুসলমানকে ছুরিকাঘাত করা হয় । পরে বহু সংখ্যক মুসলমানকে গ্রেফতার করে হজতে রাখা হয়। এই ঘটনার উপর কোনরূপ তদন্ত হয়নি এবং কোন পুলিশ কর্মচারীকে দণ্ডিত করা হয়নি ।

০০০মুসলিম মহিলাদের উপর অত্যাচারের ঘটনাঃ গ্রাম-পূথ, থানা-জানি, জেলা-মিরাট, তারিখ ২০ শে জুন ১৯৬৭ ।

এই গ্রামের হিন্দু বালিকা সুরেশী খালের পানিতে আত্মহত্যা করে । এই ঘটনাটা সম্প্রদায়ীক হিন্দুরা এমন ভাবে প্রচার করে যে, একটি মুসলমান যুবকের সহিত প্রেম ঘটিত ব্যাপার নিয়ে সুরেশী আত্মহত্যা করেছে । প্রায় দুই শত হিন্দু গুণ্ডা এবং কিছু পুলিশ কনস্টেবল গ্রামে দুকে কয়েকজন মহিলাকে জোর করে ধরে থানায় নিয়ে যায় এবং তাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার চালায় । অত্যাচারীত মেয়েদের মধ্যে একজন গর্ভবতী মহিলাও ছিল ।

০০০লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগঃ  গ্রাম—পাকড়ী থানা— সৌহা, জেলা—বস্থিত

তারিখ ২২ শে ডিসেম্বর ১৯৬৭ }

এই গ্রামে একটি ষাড় স্বাভাবিক ভাবেই মরে পড়েছিল । কিন্তু গুজব রটানো হয় যে, মুসলমানরা গো হত্যা করেছে । সংগে সংগে প্রায় দশ হাজার হিন্দু, পুলিশ সংগে নিয়ে মুসলমান বসতী আক্রমন করলো । ৮৫ টি মুসলমান বাড়ীর মধ্যে ৮২ টি বাড়ী এবং ৩০ টি গরুর গাড়ী পূড়িয়ে ছাই করে দিল। এখানে কাউকে গ্রেফতার ,করা হয় নি ।

এখানে মাত্র কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হলো । ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত সাম্প্রদায়ীক দাঙ্গার যে ইতিহাস মানবাধিকার কমিটি প্রকাশ করেছে তা এখানে দেয়া সম্ভব নয়। তবে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়ীক উত্তেজনা সৃষ্টি ও লুঠতরাজের সুযোগ করে নেয়ার এমন নজীর বোধ হয় আর কোন দেশেই পাওয়া যাবে না । তবে মাঝে মাঝে এ কথাই মনে হয় যে, মানুষের কল্যানব্ৰতী মহাত্মা গান্ধীকে যে হিন্দুরা হত্যা করতে পারে, তাদের দ্বারা যে কোন রকম জঘন্য নৃশংসতা অসম্ভব কাজ নয় ।

চলমান————

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ইতিহাসের ক খ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 + = 84