হাকিনী part1


পয়সাঅলা বাঙালি পরিবারগুলোর ব্যাপারে একটি প্রবাদ আছে। সেটি হলো এদের প্রথম পুরুষ কেনারাম, দ্বিতীয় পুরু ষ ভোগারাম, আর তৃতীয় পুরুষ বেচারাম। সোজা কথায় প্রথম পুরুষ টাকা বানাতে, জমিজমা কিনতেই জীবন হারাম করে ফেলে। দ্বিতীয় পুরুষ শুধু বসে বসে খায় আর ঘোরে। তৃতীয় পুরুষ সব বেচেকিনে শেষ করে। চতুর্থ পুরুষের বেলায় কী হয় তা অবশ্য বলা নেই। তবে সে যে বস্তিরাম হবে তা নিশ্চিত। আমাদের পরিবারে অবশ্য কেনারাম যে বেচারাম সেই-ই। এক পুরু ষেই সব উড়েপুড়ে শেষ। আমার বাবার ছিল তেজারতির ব্যবসা, যাকে বলে সুদের কারবার। জমিজমা-গয়না বন্ধক রেখে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়াই ছিল তার কাজ। প্রথম দিকে বাবা ছিলেন খুলনা শহরের এক মাড়োয়ারির দোকানের হিসাব লেখক। ৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর সেই মাড়োয়ারি ব্যবসাপাতি গুটিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেল। সেই সাথে গেল বাবার চাকরিও। বেকার হয়ে পথে পথে ঘুরতে লাগলেন। একদিন দুপুরে চার আনার বাদাম কিনে হাদিস পার্কের এক বেঞ্চের ওপর বসে কীভাবে আগামী মাসের ঘরভাড়া দেবেন ভাবতে লাগলেন সেই কথা। বাবা ভাড়ার কথা যখন ভাবছেন এবং মাঝেমধ্যেই উদাস হয়ে পার্কের গেটের সামনে রাস্তার দিকে তাকাচ্ছেন তখন হঠাৎ তার চোখ পড়ল গেটের পাশে বটগাছের নিচে বসা এক জ্যোতিষীর ওপর। জ্যোতিষীর পাশে পার্কের রেলিংয়ে লাল সালুতে রুপালি রঙে লেখা :

জ্যোতিষ সাগর নেতাই নাথ
হাত দেখিয়া ভাগ্য গণনা করা হয়
দর্শনী ১২ আনা মাত্র।

মাঝবয়সী ঘোর সংসারী মানুষ অর্থকষ্টে পড়লে তার মাথার ঠিক থাকে না। চার আনার বাদাম কেনার পর বাবার সম্বল তখন একুনে বারো আনা। তিনি জ্যোতিষ সাগরকে দিয়ে ভাগ্য গণনা করালেন। নেতাই নাথ বাবাকে বললেন, ব্যবসার লাইনে বৃহস্পতি তুঙ্গে। চাকরির ক্ষেত্রে শনির বলয়ে কেতুর আনাগোনা। আগামী পঁচিশ বছরে শনির বলয় ছেড়ে কেতুর অন্য কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা জিরো পার্সেন্ট। জ্যোতিষ সাগরকে হাত দেখানোর আগে বারো আনাই অ্যাডভান্স করতে হয়েছে। বাবার দুবছরের পুরোনো রংজ্বলা ক্রিজভাঙা প্যান্টের পকেট তখন গ্যাস বেলুনের মতো হালকা। বাসায় শ’খানেক টাকা মা’র কাছে আছে। শেষ সম্বল। ব্যবসা কীভাবে হবে বুঝতে পারছেন না। তিনি জ্যোতিষ সাগরকে জিজ্ঞেস করলেন, কিসের ব্যবসায় উন্নতির সম্ভাবনা। জ্যোতিষ তাঁকে তেজারতির ব্যবসা ধরতে বলল। সাফল্যের পরিমাণ শতভাগ। আগেই বলেছি, ছাপোষা মানুষ বিপদে পড়লে মাথার ঠিক থাকে না। বাবা চলে গেলেন ঘোরের ভেতর। বাস করতে লাগলেন এক মানসিক কোমায়। বাসায় ফিরে মাকে বললেন,
‘বিমলা, চাকরি তো অনেক দিন করলাম। এবার ভাবছি ব্যবসা-বাণিজ্য করব।’
মা বললেন, ‘আচ্ছা, তা না হয় করবেন। কিন্তু আপনার পুঁজি কোথায়?’
‘তোমার বড় ভাইয়ের তো বিরাট অবস্থা। তার কাছ থেকে হাজার দশেক এনে দাও। এক বছরের ভেতর শোধ হয়ে যাবে।’
‘আর যদি শোধ দিতে না পারেন, তখন?’
‘না পারলে তোমার বাবার সম্পত্তির যে অংশ তুমি পাবে ওটা তার হবে।’
‘ওইটুকুই তো সম্পত্তি। হাতের পাঁচ। ওটা গেলে আর থাকল কী? পথে পথে ভিক্ষে করে খেতে হবে।’
‘অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে পথে পথে ভিক্ষে তো মনে হয় কাল থেকেই করতে হবে। যা বলি মন দিয়ে শোনো। তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে টাকাটা এনে দাও। মাড়োয়ারির দোকানটা এখনো খালিই আছে। আপাতত ওখানেই বসা যাবে। নতুন মালিককে মাঝে মাঝে কিছু ভাড়া দিলেই হলো।’

প্রথম প্রকাশ-নভেম্বর ২০১০,রহস্যপত্রিকা

send the feedbacks direct to facebook.it is unfortunately not possible for the writer to view or reply in blog because of being very busy.
feel free to send any kind of feedback in fb http://www.facebook.com/muhammad.toimoor

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 − 88 =