ইসলামের পুনর্গঠন, ইউরোপিয়ান ইসলাম ও রাজা অষ্টম হেনরি: একটি কিস্সা

১.

ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি’র মোট ছয়টা বৌ ছিলো। ঈশ! ১৫২৮ সালের দিকে তিনি ক্যাথেরিন অফ অ্যরোগান নামের এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু রাজা বলে কথা। এক বৌ আর কতদিন ভালো লাগে! দাসী এ্যান বার্লিনের দিকে তাকালে চোখ ফেরাতে কষ্ট হয়। কিন্তু রাজ পরিবারের তো একটা ব্যাপার স্যাপার আছে। চাইলেই সবকিছু তো আর করা যায় না। ক্যাথেরিনকে তালাক দিয়ে এ্যানকে ঘরে আনা তো সহজ কাজ না। এর জন্য চার্চের অনুমতি নিতে হবে। সারা দুনিয়ার চার্চ সে সময় রোমে পোপের কথামতো চলতো । তো ক্যাথেরিনকে তালাক দেয়ার জন্য রোমের পোপের কাছে অনুমতি চাওয়া হলো। পোপ তা সরাসরি নাকচ করলো। কিন্তু কথায় আছে না, প্রেমের মরা জলে ডোবে না। রাজা হেনরি খালি টেনশন করে, ক্যামনে একটা কাবজাব করা যায়।

এসব ক্ষেত্রে যা হয়। উপায় আসলো দাসীরূপী প্রেমিকা অ্যানের কাছ থেকে। সে একদিন একখান নিষিদ্ধ বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো: পড়ো। বইটা ছিলো উইলিয়াম টিনড্যালের গ্রীক ভাষায় লেখা নিউ টেস্টামেন্টের অনুবাদ। একজন সাধারণ ইংরেজ যেন ইংরেজীতে বাইবেল পড়তে পারে, তার জন্য সরল সুন্দর মানবিক করে লেখা। পুরাতন টেস্টামেন্টে পোপ ভায়া হয়ে গডের সাথে কনটাক্ট করতে হতো। আদি কালে টেলিফোন এক্সেঞ্জের মতো। টিনড্যাল তার বইতে একটু ডিজিটাল আকারে, মানে ডাইরেক্ট গডের সাথে বান্দার যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিতে চাইলো। পড়তে গিয়ে হেনরি’র মাথার ভিতরে টঙ করে উঠলো! যদি পোপের খবরদারী না থাকে, তাহলে তো তালাক দেয়া তার জন্য ডালভাতের ব্যাপার। যা ভাবনা তাই। রিফর্মেশন (পুনর্গঠন) নাম দিয়ে চার্চ অফ রোম থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন চার্চ অফ ইংল্যান্ড ডিক্লিয়ার দিলো। ক্ষমতা আর জমির লোভে পার্লামেন্টের মন্ত্রীরাও হেনরীর সাথে তাল মেলালো। সাকা লাকা বুম বুম অবস্থা।

পুরোনো ক্যাথলিক চার্চের ভিতরে রুড স্কৃন (rood screen) বা চইর স্কৃন বলে একটা দেয়ালমতো ছিলো। সাধারণ মানুষের বসার জায়গা এক দিকে আর “অল্টার” মানে যেখানে গড বা তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের মূর্তি থাকে, এই দুইয়ের মাঝখানে রুড স্কৃন নামের সেই দেয়াল থাকতো। রুড স্কৃন পেরিয়ে অল্টারে ঢুকতে পারতো শুধু চার্চের ঈমাম। সাধারণ মানুষ যেতে পারতো না। অথচ নতুন বাইবেলে সেই দেয়াল আর থাকলো না। মানুষ সরাসরি গডকে দেখতে পেলো। কৃষ্চান ইংরেজদের ভিতরে নতুন প্রানের সঞ্চার হলো। তারপর ইংরেজিতে লেখা বাইবেল আর কামান এই দুই বস্তু দিয়ে ইংরেজ তামাম দুনিয়া হাতের তালুতে তুলে লাটিমের মতো ঘুরালো মিলেঝিলে তিনশ বছর। ইতোমধ্যেই ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে ফেলেছি খানিকটা। বাদ দিয়ে কামের কথায় আসি।

২.

গত পরশু ইউরোপিয়ান ইলেকশান হয়ে গেলো। সেই উপলক্ষে ইউরোপ ঠিক কেমন আছে, কেমন তার হওয়া উচিত সে সব বিষয় নিয়ে জার্মান দুই প্রবীন রাজনীতিবিদ মজার  কিছু কথা বলেছে। তারা আলেনব্যাস সার্ভের কথা উল্লেখ করে বলেছে মাত্র ৯% জার্মান মনে করে, ইউরোপ ঠিক যেমন হওয়া উচিত তেমন আছে। এই হতাশাজনক অবস্থার কারণ হিসাবে বলেছে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী, যারা অধিকাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এরা স্কুল কলেজ, রাস্তাঘাট অনিরাপদ করে তুলছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ দুর্ঘটনার খবরে ভরে উঠছে। মানুষের স্মৃতি দঃখময় ঘটনা দিয়ে পূর্ণ হচ্ছে। তার উপর ব্রেক্সিট সমস্ত ইউরোপের এই প্রজন্মের কাছে দুঃখের স্মৃতি হয়ে থাকতে যাচ্ছে। লেখক দু’জনের ভাষায়, “আমাদের ইউরোপকে আরও স্থানীয় এবং আরও নিরেট বানাতে হবে”। এটাই এবারের ইউরোপিও নির্বাচনের সংকেত।

রাইনিশে পোস্ট নামের এক পত্রিকায় তাঁরা ইউরোপের জীবন যাত্রার সাথে যায় এমন করে ইসলামেরও একটা রিফর্মেশন বা পুনর্গঠন করা যায় কিনা তার উপর মনোযোগ দিতে বলেছে। যেটার নাম হতে পারে ইউরোপিয়ান ইসলাম। তাঁরা বলছে, প্রতিক্রিয়াশীল নারীবিদ্বেষী ইসলামের অংশটুকু এদিক সেদিক করে ইউরোপিও মূল্যবোধ, স্বাধীনতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার সাথে যায় এমন ভাবে পুনর্গঠন করে ইসলামের বিকাশকে ত্বরাণ্বিত করা দরকার।

৩.

কেমন হবে সেই ইউরোপিয়ান ইসলাম? কেমন হবে ইউরোপিয়ান ইসলামের কুরআন? চার্চ অফ ইংল্যান্ডের বাইবেলের মতোন? বর্তামান কুরআন হাদিসে যে নারী বিদ্বেষ, সংকীর্ণতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা, জিহাদের মতো বিষাক্ত বিষয়গুলো আছে বলা হয়, সেগুলো ছেঁটে ফেলে প্রগতিশীল, ইউরোপিয়ান আত্মপরিচয়ের সাথে যায় এমন ভাবে ইসলামকে পুনর্গঠন করতে চাইছে? দিন শেষে ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্র এবং চিনের সাথে পাল্রা দিতে হবে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, মস্ত পরিসংখ্যানের ব্যবহার এমনসব খুরধার গবেষণায় ওদের চেয়ে উপরে থাকতে গেলে এই লক্ষ লক্ষ অভিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আগাতে হবে। তার জন্য এই মানুষগুলোকে ইউরোপীয় চিন্তা, ইউরোপীয় পরিচয়ের সাথে উপযুক্ত করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

ইসলামের সেই অবসম্ভাবী গতি প্রকৃতি নিয়ে আর বেশী কিছু লেখা যাবে না। মা’র নিষেধ আছে। বাপ মা দু’জন চাঞ্চ পেলে এক ফোনের উপর ফেসবুক বা ইউটিউবে চূর হয়ে থাকে। উল্টাপাল্টা লিখলে সকাল বিকাল রুটিন করে ধমকায়। না লিখলেও আগাম ধমকিয়ে রাখে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 73 = 78