সাম্প্রদায়িকতা ও বাঙালি : পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ

ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে গত একশো বছর ধরে সাম্প্রদায়িকতা একটা স্থায়ী ও জটিল সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে। যে সাম্প্রদায়িকতার পাপে পাকিস্তানের জন্ম, দুর্ভাগ্যবশত বাঙালিরাই সেই পাপের নেশায় মত্ত হয়ে ব্রিটিশ – ভারত ভেঙে অখন্ড ভারতের পরিবর্তে খণ্ডিত ভারত তথা মুসলমানদের জন্য এক টুকরো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল। পাকিস্তানের মূল ভূখন্ড থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও তাই পূর্ববঙ্গের ভাগ্য জড়িয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে। সেই পাকিস্তান আমাদেরকে কলোনি করে রেখেছিল চব্বিশ বছর। একাত্তরে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে সেই কলোনিয়াল শাসন শোষণ থেকে স্বাধীন হয়েছি। সে আমাদের বিরাট সৌভাগ্য, বিরাট অর্জন।

বাংলার হিন্দুপ্রধান পশ্চিম অংশ স্বাধীন ভারতের অংশ হয়েই থেকে যায় সাতচল্লিশ সালে। তাদের সাথে আমাদের ভাষার টান, ইতিহাসের টান, সাহিত্য সংস্কৃতির টান। ভারতের একটা রাজ্য হিসেবে তারা সুখেই ছিলো। তারা রাজ্যে টানা তিরিশ বছর ধরে বামপন্থী সরকারকে ক্ষমতায় রেখেছিল। সেটা বিশাল ব্যাপার। কিন্তু তাদের যে হঠাৎ কী হল বামপন্থী থেকে একেবারে রামপন্থীতে রূপান্তরিত হলো। বিজেপি শাসনাধীন পশ্চিমবঙ্গ এখন ভারতের একটা কলোনি হওয়ার উপক্রম।

উত্তর বা পশ্চিম ভারতীয়দের একটা বাঙালি বিরোধী মনোভাব সবসময়ই ছিলো। ভারতকে বাঙালিরা তো কম দেয়নি। তারপরও বাঙালিদের প্রতি তাদের কেমন যেন একটা নেতিবাচক মনোভাব। এ কি বাঙালির এককালের শিক্ষায়, সমাজচেতনায়, রাজনীতিতে অগ্রসরতার প্রতি ঈর্ষা থেকে সঞ্জাত? কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং উমেশচন্দ্র ব্যানার্জীর। ১৮৮৫ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত কংগ্রেসের নির্বাচিত ৪৫ জন সভাপতির মধ্যে ১১ জন বাঙালি। সুভাষ বসু ১৯৩৮ সালে প্রথমবার এবং পরবর্তী বছরে আবারও সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু এবার তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। ১৯৩৯ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত কংগ্রেসে আরো বিশজন সভাপতি হয়েছেন। একজনও বাঙালি নেই। অবশ্য ১৯৯৮ সাল থেকে পদটা একটানা সোনিয়া গান্ধী এবং গত তিন বছর রাহুল গান্ধী দখল করে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি অর্থনীতি কোনোখানে আর সেই অগ্রসর ভূমিকা নেই। তবুও কেন বাঙালির প্রতি হিংসা যায়না?

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাই ভোট দিয়ে লোকসভার বিজেপি সদস্যদের নির্বাচিত করেছে। এই বিজেপির বাঙালি নেতারাই এখন পশ্চিমবঙ্গে অবাঙালি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছে। এমন আত্মঘাতী কাজ কেন ভাই?

বাঙালি বিদ্বেষ পাকিস্তানীদেরও ছিলো। জিন্না পছন্দ করেননি শতভাগ বাঙালি শেরেবাংলা ফজলুল হককে। তার পছন্দ বরং শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং নবাব পরিবারের খাজা নাজিমুদ্দিন। জন্মসূত্রে তারা বাঙালিই বটে। তবে এই দুজনই সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান হওয়ায় সাধারণ বাঙালির সাথে একটু দূরত্ব বজায় রাখতেন, যে দূরত্ব ছিলোনা ফজলুল হকের। কিন্তু ক্ষমতার মোহে ফজলুল হকের মতিভ্রম হল। তিনি ছুটে গেলেন মুসলিম লীগে। সোহরাওয়ার্দীও একসময় তার নিজের দলবল নিয়ে যোগ দেন মুসলিম লীগে। বাংলায় সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগের পাল্লা ভারি হয় এই দুজনের কল্যাণে। ফলে ১৯৩৭ এর নির্বাচনে যে মুসলিম লীগকে ৩৯ টি আসন নিয়ে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হয়, ১৯৪৬ এর নির্বাচনে এসে সেই মুসলিম লীগ মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত বা নির্ধারিত ১১৯ আসনের মধ্যে ১১৩ টি আসন নিয়ে এককভাবে সরকার গঠন করে। এরপর তো ভারত ভেঙে পাকিস্তান হলো। সেই পাকিস্তানে বাঙালিদের কী হাল হয়েছিল সে তো অজানা নেই কারো। তবে এটাও বলে রাখা দরকার বাঙালি জাতীয়তাবাদের মুখে পড়ে অচিরেই পূর্ববঙ্গ থেকে মুসলিম লীগ দলটাই প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। একসময় হারিয়ে যায় সোহরাওয়ার্দী নাজিমউদ্দীনরা। কী পরিনতি হয়েছিল যোগেন মণ্ডলের?

আজকের বিজেপি কী মনে রেখেছে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে? তারা তো এখন প্যাটেলের মূর্তি নির্মাণ করছে। কিন্তু সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল তো কখনো হিন্দু মহাসভা বা আরএসএস করেননি। কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন তিনি। ভারত ভাগের কালে নেহেরু ও প্যাটেলই সর্বেসর্বা। কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার বাসনা ছিলো তার। সেটাও হতে পারেননি। হয়েছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মহাত্মা গান্ধীর হত্যা মামলায় সাভারকার গ্রেফতার হলেও প্রমাণ না থাকায় আদালত তাকে মুক্তি দেয়। কিন্তু প্যাটেল আরএসএসের প্রতি কঠোর হোন এবং তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তাহলে প্যাটেল বন্দনা কেন বিজেপির? কংগ্রেসের ভেতরে ডানপন্থী বলে পরিচিত ছিলেন প্যাটেল। এই কারণেই হয়তো। আসলে বিজেপির কোন আইকনিক ফিগার নেই। যারা আছে তারা সব তাত্ত্বিক, রাজনীতিবিদ হিসেবে অবদান কম।

গত বিজেপি সরকার আন্দামান বিমানবন্দরের নাম দিয়েছে সাভারকারের নামে। হেডগেওয়ার, গোলওয়ালকারের নামেও হয়তো কিছু বিরাট স্থাপনার নামকরণ করবে তারা। মুসলিমদেরকে যারা ভারতীয় বলে মানেনা, মুসলমানদেরকে যারা ভিন্ন জাতি বলে মনে করে বই লেখে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে দলের ভূমিকা নেতিবাচক এবং ব্রিটিশবান্ধব, তারা এখন জাতীয়তাবাদের এবং দেশপ্রেমের সোল এজেন্ট হয়েছে।

একটুখানি ইতিহাস কচলালাম। শুধু এটুকু মনে করিয়ে দিতে যে বাঙালিরা চুপচাপ অনেক অত্যাচার সহ্য করে, তারপর একদিন জেগে ওঠে। তাদের বোধোদয় হলে তারা অসাধ্য সাধন করতে পারে। প্রমাণ একাত্তর। না, ভারত ভেঙে খানখান হয়ে যাবে, পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হবে বা বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হবে সেই স্বপ্ন আমি দেখিনা। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা সম্মান নিয়ে, আত্মমর্যাদা নিয়ে সুখে থাক সেইটা চাই শুধু। সেই শুভকামনা জানানোর জন্য এই লেখা। মোদীকে যখন আটকাতে পারলোনা, তখন অন্তত নিজেদের মর্যাদাহীন অবস্থায় পতনটা আটকানোর চেষ্টা করুক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 + = 46