বিষাদময় বরিশাল

রাত ১০ টা বেজে ৪০ মিনিট। বরিশাল যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলাম আমি আর অর্ক। বাসার সামনে হাইওয়ে রোড, চারিদিকে দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে রমজানের কারণে। এমনিতে এ রাস্তার পাশে থাকা অন্তত চায়ের দোকানগুলো রাত ১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রাস্তায় কিছুক্ষণ পরপর দূরপাল্লার বাস যাচ্ছে ব্যাপক গতিতে, দুই একটা অটোরিক্সাও চলছে। বাসা থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত বেশ ভালোই দূর। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একটি অটোরিক্সা পাওয়া গেল। এমনিতে দিনের বেলা এখান থেকে বাসস্ট্যান্ডের ভাড়া ত্রিশ টাকা হলেও রিক্সার স্বল্পতার সুযোগে দিব্যি রিক্সাওয়ালা সত্তর টাকা চেয়ে বসল। অর্ক এখানে নতুন, গতকালই এসেছে আমার এখানে। অবশ্য এর আগেও কয়েকবার আমার এখানে এসেছে তবে ভাড়া সম্পর্কে তার ধারণা নেই। তাই আমিই রিক্সাওয়ালাকে অনেকটা বিস্মিত হওয়ার স্বরে বললাম,

– সত্তর টাকা! মামা কি রিক্সা নতুন চালান?

– নতুন চালামু ক্যা!

– তাহলে ত্রিশ টাকার ভাড়া সত্তর টাকা চাইলেন কিভাবে!

– রাইতের বেলার সাথে দিনের ভাড়া তুলনা করলে অইব! (সামান্য কর্কশ স্বরে বলল সে)

– তাই বলে এত বেশি চাইবেন? চল্লিশ টাকা দিব, যাবেন?

– পঞ্চাশ টাকায় যাইবেন? না অইলে গেলাম।

কিছু না বলে আমি আর অর্ক উঠে পড়লাম রিক্সায়। সময় বেশী হাতে নেই— রাত ১১ টা ৪০ মিনিট এ বাস ছাড়বে। বাসের টিকিট আগের দিনই কেটে রেখেছিল অর্ক— সাকুরা পরিবহনের বাস। আমি অবশ্য সাকুরা পরিবহনের বাস শুনে একটু মনক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম, হয়তো টের পায় নি অর্ক। এই বাসের সাথে আমার বরিশাল যাত্রার কিছু স্মৃতি আছে। পুরো বরিশাল যাত্রা নিয়েই আমার বেশ কিছু স্মৃতি আছে। আমার জীবনের একটা অধ্যায়ের একটা ছোট খণ্ড যা এই ব্যস্ত জীবনেও আমার প্রতিদিন অন্তত দশ বার দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গত প্রায় সাত মাসে ঠিকমত খাবার সময়টুকু ব্যস্ততার দরুন না পেলেও এই দীর্ঘশ্বাসগুলো ঠিকই জায়গা করে নিয়েছে। আমার জীবনের একটা অন্য রকম অধ্যায়— কিছুটা সাদা-কালো, কিছুটা রঙিন আর সব মিলিয়ে পুরোটা একটা ব্যর্থতার অধ্যায়।

 

এইতো বছর এক আগের কথা। বরিশালে একদিন বেশী থাকায় অতসী সে কি রাগ আমার সাথে! পরের দিন রাতের শিপে ফিরতেও নারাজ সে। সকাল হওয়ার সাথে সাথেই বাসে রওনা দিতে হবে নতুবা সে চলে যাবে একা। বরিশালে মূলত যার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম— নিশাত, সকালের বাসে দুটো টিকিটও কেটে ফেলেছে সে অতসীর কথা মত।  কারণ তার রাগের সামনে সবাই যেন নেহাত শিশু হয়ে গিয়েছিলাম। হিন্দু ধর্মীয় গল্পের দেবী শ্যামার চাইতেও বিধ্বংসী সে রাগ যেন মুহূর্তেই তছনছ করে দেবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। চোখে চোখে এখনো ভাসছে অতসীর সেদিনের রাগান্বিত মুখটা। বাসে আমাদের সিট ছিল একদম সামনে এ-৩ এবং এ-৪। যাত্রাপথে সারা রাস্তা সে আমার সাথে একটা কথাও বলেছিল না— পুরোটা সময় জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। বার কয়েক কথা বলার চেষ্টা করে শেষে আমিই চুপ মেরে গিয়েছিলাম কোন উত্তর না পেয়ে— ভীষণ অসহায় লাগছিল নিজেকে। সারাটা রাস্তা যেন মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করছিলাম। আচ্ছা অতসীরও কি খুব খারাপ লাগছিল তখন? ওর কি একটুও ইচ্ছে করছিল না অন্তত আমাকে কয়েকটি খোঁচা দেয়া কথা বলে সব মিটমাট করে নিতে!  হয়তো ইচ্ছাটা ছিল কিংবা ছিল না— কি যেন, বলতে পারি না। জগতের যত অসাধ্য কাজ তার মাঝে একটি হলো নারীর মন বুঝা। আমি এখনো এতটা মহাপুরুষ হয়ে উঠি নি যে এই অসাধ্য সাধন করতে পারব।

 

১১ টা ৩০ মিনিটে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালাম আমি আর অর্ক। দশ মিনিট আছে বাস আসার। কাউন্টারে গিয়ে বাস কখন আসবে জিজ্ঞাসা করতেই একজন বয়স্ক লোক পান চিবাতে চিবাতে চেয়ারে নড়েচড়ে আরাম করে বসে বলল,

– অপেক্ষা করেন, বাস আসতে ১২টা বাজবে।

– কিন্তু বাস তো ছিল ১১ টা ৪০ মিনিটের, ১২টা বলছেন যে!

– ধুর, ঈদের বাজার বাস আসতে ২০ মিনিট দেরি হতেই পারে। এটা নিয়ে কথা না বাড়িয়ে যান একটু চা-বিড়ি খান, গাড়ি চলে আসবে।

সামান্য বিরক্ত হয়ে প্রস্থান করলাম কাউন্টারের সামনে থেকে। ঈদের এখনো প্রায় ১০ দিন বাকি, এখনই ঈদের যাত্রা শুরু হয়ে গেছে! আশপাশের কাউন্টারগুলোতেও মানুষের উপচে পড়া ভিড়। অর্ক পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে এগিয়ে দিতে দিতে বলল,

– বুঝলে অনুক্ত, বাংলাদেশে নির্দিষ্ট সময় বলতে কিছু নেই। সবসময় সব কাজের ক্ষেত্রেই বিশ ত্রিশ মিনিট অতিরিক্ত ধরে রাখতে হয়। সময়ের শুরুতে একটা প্লাস (+) বসিয়ে রাখতে হবে। ( ±)  প্লাস মাইনাস বসানোর কোন সুযোগ নেই, সময়ের আগে কিছু কখনোই পাবে না— পরে পাবে। বুঝলে কিছু?

আমি কিছু বললাম না, সিগারেটে হালকা টান দিতে দিতে শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালাম। অর্ক ছেলেটা ইকোনমিক্স নিয়ে পড়াশোনা করেছে, হিসাবপত্র বেশ ভালো জানে বলে মনে হয়। সিগারেটটা এগিয়ে দিলাম ওর দিকে, কেন জানি না ভালো লাগছে না এই মুহূর্তে সিগারেট খেতে।

অতশী আমার জীবন থেকে চলে যাবার পর আর কোনদিন বরিশাল যাব না বলে ঠিক করেছিলাম। কিন্তু অর্কের প্রেমিকা পড়াশোনা করে বরিশাল— শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে। তাকে আনতে যাবে অর্ক এবং আমাকেও যেতে হবে তার সাথে— দুই মাস আগেই এজন্য এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছিল সে। অর্ক আমার খুব কাছের একজন বন্ধু যে এখন পর্যন্ত আমার সাথে কোন কারণে বেইমানি করে নি। অর্কের মত হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন আছে এই লিস্টে যারা বন্ধু হয়ে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে নি— বাকী সবাই আমার সাথে স্বার্থ উদ্ধারের নিমিত্তে ভয়াবহ  রকম বিশ্বাসঘাতকতা করতেও দ্বিধা করে নি। এই অল্প কিছু বিশ্বাসী বন্ধুর তালিকায় অবশ্য নিশাতও আছে— সেও আজ অবধি ভয়াবহ রকম কোন বিশ্বাসঘাতকতা করে নি। কে জানে, হয়তো সুযোগের অভাবে! আমার কেন যেন মনে হয় বিশ্বাসঘাতকতা করাটা মানুষের আদি কালের স্বভাব— সুযোগ পেলেই এটার সৎ ব্যবহার মানুষ করে। ধর্মীয় গ্রন্থের গল্পগুলোতেও এমনই দেখা যায়, বাইবেলের যিশুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিরোধীদের কাছে তাকে ধরিয়ে দেয় তার নিজের দলের লোক কিংবা ইসলামের মুহাম্মদের সাথে সময়ে অসময়ে কত জনের কত বিশ্বাসঘাতকতার গল্প! যুগ যুগ ধরে গল্পগুলো মানব স্বভাবের এই দিকগুলো বয়ে বেড়াচ্ছে।

নিশাত ছেলেটা অবশ্য তথাকথিত নাস্তিক ছিল। এমনিতে যতটা চলেছি ছেলেটাকে সবসময় ভালোই মনে হয়েছে— তবে নেশা করতো ছেলেটা। বিশেষ করে সুরার নেশা তার এতটাই প্রবল ছিল যে মেডিকেল জীবনের শেষ প্রফের কিছুদিন আগে ভুল ভাল অ্যালকোহল গিলে চোখ দুটো নষ্ট করে নিয়েছে। চোখ নষ্ট হবার পরই তার নাস্তিকতা হঠাৎ কেমন যেন বদলে গিয়ে কিঞ্চিত ধর্মীয় ভূত মাথায় চেপেছে। সরাসরি না বললেও কথাবার্তায় বুঝা যায়। অবশ্য একদিক থেকে স্বাভাবিকও বটে। মানুষ ভীষণ রকম বিপদে থাকলে আর কোন আশা না পেয়ে লেগে যায় অদৃশ্য অস্তিত্বের কাছে প্রার্থনা করতে— কে জানে যদি বিপদ থেকে তবু নিস্তার পায়!  নিশাতের চোখ ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকার পরও তার চোখ যখন সামান্য ভালো হয়, তখন এই রেয়ার কেইস বা সম্ভাব্যতার সাথে সে মনে মনে যোগসূত্র তৈরি করে নেয় সেই প্রার্থনার— বিশ্বাস জন্মে অদৃশ্য আত্মার প্রতি। এটাও স্বাভাবিক বটে, আমি এমন বহু মানুষ দেখেছি যারা ধর্মীয় ব্যাপারগুলো এড়িয়ে চললেও নিজে কিংবা কাছের কেউ বিপদে পড়লে রাতারাতি ধার্মিক হয়ে যায়। এই যেমন ধরুন একজনের বাবা রোড এক্সিডেন্টে ঘোরতর জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, সে দেখা যায় মনে প্রাণে প্রার্থনা করতে থাকে সৃষ্টিকর্তার কাছে আরোগ্য লাভের আশায়। অথচ একটা বারও ভাবে না যে যদি সৃষ্টিকর্তাই থাকে, যদি তার ইশারায়ই জগৎ চলে তবে এক্সিডেন্ট বা বিপদটা ঘটল কার ইশারায়! ব্যাপারটা অনেকটা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, একজন আমার বাবাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চাকু মারল আর আমি তার কাছেই আমার বাবার সুস্থতা ভিক্ষা চাচ্ছি! থাক সেসব কথা, বিশ্বাস অবিশ্বাসের লড়াইয়ে আমি যেতে চাই না— কল্লার ভয় আমারও আছে। কি দরকার বাপু কয়েক লাইন লিখে দশ জনের রোষানলে পড়ার!

 

বাস আসতে আসতে ১২ টা ১০ মিনিট বাজলো। বাসে উঠেই এক রকম বিষন্নতা আক্রে ধরল। যদিও গাড়ি ভিন্ন তবে এবারও সিট সেই এ-৩ এবং এ-৪। সুযোগ থাকলে সিটটা পাল্টে নিতাম কিন্তু পুরো বাস ভরা, সিটগুলো সব বুকড্। অনিচ্ছা স্বত্বেও বসলাম সিটে। গাড়ি ছাড়তেই অর্ক বিড়বিড় করে পড়তে লাগল,

“কুল্ হুওয়াল্লা-হু আহাদ্। আল্লা-হুচ্ছমাদ্ । লাম্ ইয়ালিদ্ অলাম্ ইয়ূলাদ্। অলাম্ ইয়া কুল্লাহূ কুফুওয়ান্ আহাদ্।”

প্রায় বার তিনেক পড়ে যেন নিস্তার পেলো কোন এক অজানা ভয় থেকে। আমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। তারপর আস্তে আস্তে বলল,

– কিছু বলবে, অনুক্ত?

আমি না সূচক মাথা নাড়ালাম। অর্ক তারপর চুপচাপ বাসের সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। আমি তখনও তাকিয়ে আছি ওর দিকে। হঠাৎ কেমন যেন একটা খারাপ লাগা অনুভূত হচ্ছে আমার— একটা শূন্যতা যেন গ্রাস করছে আমায়। মুহূর্তেই চোখটা ঘোলা হয়ে এল। ঘোলাটে চোখে আমি ঈষৎ অস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার পাশে  অতসী বসা। সে ভীষণ আবেগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি অবাক হয়ে কয়েকবার উচ্চারণ করলাম,

– তুমি! তুমি!

– হ্যাঁ আমি। কোন সমস্যা? চিনতে পারছ না?

কথাটা শুনে আমার চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। যে চেহারাটা আমার শত নির্ঘুম রাতের কারণ,  আমার শত ব্যস্ততা যে মুখটিকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলাতে পারে নি, তাকে আজ সামনে পেয়ে আমি চিনতে পারব না!

– তুমি কি করে এলে?

– তোমার এত প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।

–  আচ্ছা, আর কোন প্রশ্ন করব না।

–  কি করবে তাহলে?

–  তোমার হাতটা একটু দিবে, ধরবো। আচ্ছা তোমার কাঁধে একটু মাথা রাখি? তুমি কি খুব বিরক্ত হবে?

অতসী চুপ করে আমার হাতটা ধরল। আমি তার কাঁধে মাথা রাখলাম। আমার খুব ইচ্ছে করছে ওর কাঁধে মাথা রেখে একটা দীর্ঘ ঘুম দিতে। সে ঘুম যদি আর কোনদিন না ভাঙে তাতেও আফসোস নেই— আমি যেন এক স্বর্গে ঠাঁই পেয়েছি। অতসী ফিসফিস করে বলল,

– শোনো, আমার কিছু টাকা দরকার।

– কত টাকা?

– হাজার সাতেক হলেই চলবে।

– এত টাকা তো আমার কাছে নেই। তুমি আমার মানিব্যাগটা দেখবে?

আমি মানিব্যাগটা বের করে ওর সামনে রাখলাম— সেখানে পাঁচশ টাকার একটা নোট আর কয়েকটি দশ টাকার নোট আছে।

অতসী কর্কশ কন্ঠে বলল,

– তোমার কাছে কি থাকে শুনি? কি করো টাকা? সামান্য এই কটা টাকা দিতে পারো না!

মিনিট এক চুপ করে থেকে বললাম,

– কি করবে এই টাকা দিয়ে?

– দিতে যখন পারবে না তখন জেনে কি করবে?

কথাটা বলেই অতসী অনেকটা বেগের সহিত আমার হাতটা ছেড়ে দিল। সামান্য সরে বসল— এক রকম ধাক্কা দিয়ে মাথা সরিয়ে দিল কাঁধ থেকে।

গল্পের আদমের মত এক মুহূর্তে যেন আমি স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পতিত হলাম। ইচ্ছে করছে যে করেই হোক এখনই টাকাটা এনে ওর হাতে তুলে দিই, বিনিময়ে আবার ওর হাতটা ধরি— কাঁধে মাথা রাখি। ইচ্ছে করছে বাংলা সিনেমার মত রক্ত বিক্রি করে হলেও টাকাটা দিই। আমি চট করে বললাম,

– আচ্ছা অতসী, তুমি তো ডাক্তার, রক্তের দাম কত করে প্রতি ব্যাগ?

সে অবাক হয়ে বলল,

– হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?

– নাহ, এমনি। আচ্ছা তুমি বাংলা সিনেমা দেখেছ কখনো?— জসিম শাবানার সিনেমা! জসিম টাকার জন্য রক্ত বিক্রি করে। দেখেছ তুমি? আমি অনেক ছোটবেলায় দেখেছি। কি যেন নাম সিনেমাটার?

– আমি তোমার মত ক্ষ্যাত মার্কা পাবলিক না, আমি বাংলা সিনেমা দেখি না। কি বলতে চাও এত না প্যাঁচিয়ে সোজাসুজি বলো।

– নাহ, ইয়ে মানে যদি রক্ত বিক্রি করে টাকাটা দিই? আচ্ছা, সাত হাজার টাকার জন্য কয় ব্যাগ রক্ত বিক্রি করতে হবে?

নিমেষেই একটা নরম হাত আমার গালে প্রচণ্ড বেগে তার অস্তিত্বের জানান দিল। গালে হয়তো দাগ পড়ে গেছে হাতের পাঁচটি আঙুলের॥

 

ঘুম ভেঙে গেছে আমার। লক্ষ্য করলাম গাড়ি ব্রেক করেছে, অর্কও জেগে গেছে— এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। ফেরি পার হতে গাড়ি লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে। অর্ক বলল নিচে নামবে সে। আমিও নেমে গেলাম ওর সাথে। রাস্তার পাশে থাকা দোকান থেকে দুটো ব্যানসন সিগারেট কিনে ফুঁকতে লাগলাম দুজনে। সিগারেটটা এই মুহূর্তে বেশ ভালো লাগছে। স্বপ্নের ঘটনাটা তখনও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাবছি অর্ককে বলবো ঘটনাটা? আচ্ছা ও কি ভাববে শুনে? ছেলেমানুষী! সম্ভবতঃ ও আমার স্মৃতি, অনুভূতির গভীরতাটা ঠিক বুঝতে পারবে না। থাক নাই বলি।

রাত ২টা বেজে ৩০ মিনিট। চারিদিকে সবাই সেহেরি করছে, বাস ফেরিতে উঠে গেছে। আমি অর্ককে নিয়ে ফেরির একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভীষণ বাতাসে রীতিমত শীত করছে অথচ সারাদিন ৩৭° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ঘামতে ঘামতে একাকার অবস্থা ছিল। ফেরি চলছে, চারিদিকে শুধু পানি— বহু দূরে সামান্য আলো চোখে পড়ে। দূর থেকে দেখে আকাশের নক্ষত্রের মত লাগছে। ইশ! এই মুহূর্তে যদি অতসী পাশে থাকতো! যদি মাস সাতেক আগে ফিরে যাওয়া যেত, আমাদের বিচ্ছেদ তখনও হয় নি— অন্তত এটিএম কার্ড হিসেবেও থাকতাম তার পাশে। তার কোমল হাতের স্পর্শটাকে বড্ড বেশী মিস করছি এই মুহূর্তে। কিন্তু কিছু করার নেই, সে এখন আমার অতীত— একরাশ স্মৃতি। আসলে মানুষের জীবনে অনেক বড় একটা সীমাবদ্ধতা হল তার স্মৃতি। কম্পিউটারের মত ডিলিট করার অপশনটা থাকলে বড্ড ভালো হত, যে স্মৃতিগুলো কষ্টের কারণ হয় সেগুলোকে মুহূর্তেই মুছে ফেলা যেত।

 

সকাল ১০ টা ৩০ মিনিটে বাস বরিশাল পৌঁছে গেল। বাস থেকে নামতেই একটা বড় সাইনবোর্ডের দিকে চোখ পড়ল আমার। আমি থমকে দাঁড়ালাম, “বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল” , তার সামনেই একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ভীষণ চিন্তিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে তারা সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। যত কাছে আসছে ততই মনে হচ্ছে এ আমার আর অতসীর ছায়ামূর্তি। অর্ক ততক্ষণে আমার  থেকে বেশ সামনে হেঁটে চলে গেছে। দূর থেকে সে বেশ উচ্চস্বরে আমার নাম ধরে ডাকল।

আমি অর্কের দিকে একবার তাকিয়ে ইশারায় বললাম আসছি, বলেই আবার আগের দৃশ্যে ফিরে তাকালাম। কিন্তু এবার আর কেউ নেই। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, কোথাও আর সেই ছায়ামূর্তি নেই— অতীত হয়ে গেছে।

 

আমাদের সারাদিন থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে অর্কের এক বন্ধুর বাসায়। ছেলেটাকে অবশ্য আমিও চিনি, বার দুয়েক ঢাকা দেখা হয়েছিল— নাম আশিশ। গায়ের রং কালো, উচ্চতা হবে ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি, কথা শুনে বুঝা যায় গ্রামে বড় হয়েছে— ভাষার শহুরে সংস্করণ তার মাঝে বিন্দুমাত্র নেই, একেবারে যাকে বলে মাটির মানুষ। ছেলেটা আমাকে দেখেই চিনতে পারল, তার সাথে আমরা রওনা হলাম তার বাসার উদ্দেশ্যে। বাসস্ট্যান্ড থেকে ওর বাসায় পায়ে হেঁটে যেতে লাগে মিনিট পাঁচেক। আমার হাঁটতে একদমই ইচ্ছে করছে না তবু অনেকটা জোর করে তাদের পিছু পিছু হাঁটছি। আমাদের প্লান ওখানে গিয়ে গোসল করে কিছুক্ষণ ঘুমাবো, তারপর বিকেল ৩ টার দিকে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে যাব অর্কের প্রেমিকাকে আনতে। বাসায় পৌঁছে গোসল শেষ করেই দিব্যি অর্ক এক গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছি তবে কিছুতেই ঘুম আসছে না। ঠিক এই সময়টাতে আমার ভীষণ অসহ্য লাগে যখন দেখি আমার পাশের মানুষটি দিব্যি শান্তিতে ঘুমাচ্ছে অথচ আমার দু চোখে ঘুম নেই। কিছুক্ষণ একাত ওকাত হয়ে শেষে ফোনটা হাতে তুলে নিলাম। গ্যালারিতে ঢুকলাম, স্ক্রোল করে নিচের দিকে যেতেই একটা ছবি চোখে পড়ল। আমার আর অতসীর একটা ছবি— ছবিটা পিছন থেকে তোলা, আমরা দুজনে নদীর তীরে বসে আছি। ছবিটা বরিশালে তোলা, পিছন থেকে তুলেছিল নিশাত। ছবিটা দেখে যে কারও মনে হবে ভীষণ প্রেমময় একটি ছবি। অথচ কেউ জানতেও পারবে না ছবিটা যখন তোলা হয় তখনও আমরা রীতিমত ঝগড়া করতে ব্যস্ত। আসলে মানুষ শুধু ছবিটাই দেখে, দেখে আন্দাজ করে— ছবির আড়ালের ঘটনাটা থেকে যায় সকলের অজানা। বেশ অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। একসময় আমারও চোখ ভার হয়ে এল, ঘুম পাচ্ছে।

ঘুমের মধ্যে আমার যেন বেশ কিছু ঘটনা মনে পড়ছে। আচ্ছা ঘুমের মধ্যেও কি স্মৃতিরা আক্রে ধরতে পারে? ঘুমের সময় তো মানুষ স্বপ্ন দেখে, নতুন কিছু দৃশ্য অবলোকন করে— পুরনো কিছু দেখা বা মনে পড়া কি সম্ভব? আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে,

অতসী, আমি আর নিশাত হোটেল রুমে। তখন আন্দাজ সকাল ১০ টার মতো বাজে। বরিশাল এসে আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছি। সকালের নাস্তা করা হয় নি। নিশাত যাবে আমাদের জন্য নাস্তা আনতে, কিন্তু অতসী তৈরি হয়ে বসে আছে সে নিশাতের সাথে যাবে। আমার ভীষণ রাগ লাগছিল, মুখে শুধু বলতে পারছি না— বড্ড জেলাস আমি। অতসীর সাথে অন্য কাউকে আমি কখনো সহ্য করতে পারতাম না অথচ অতসী এমন একটা মানুষ যার পদে পদে তথাকথিত জাস্ট ফ্রেন্ড ছাড়া চলেই না। কেন যাবে ও নিশাতের সাথে? তাছাড়া আমার উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু নেই, এরকম অসুস্থ একটা মানুষকে হোটেল রুমে একা রেখে কি করে ও যাওয়ার চিন্তা করে নিশাতের সাথে। যে করেই হোক, থামাতে হবে ব্যাপারটা। আমি আস্তে আস্তে উঠে বসার চেষ্টা করলাম। নিশাত বলল,

– কি, করছেন কি? আপনি শুয়ে থাকুন।

–  নাহ, অতসী গেলে আমিও যাব আপনাদের সাথে।

তাদের আর বুঝতে বাকী রইলো না কিছু। শেষে নিশাত অনেক বুঝিয়ে অতসীকে রেখে গেল আমার কাছে— সে নাস্তা নিয়ে আসবে। বাইরে যেতে না পারায় অতসী বিছানায় আমার পাশে বসে রাগে গদগদ করতে লাগল। তা করুক, অন্তত পাশে তো আছে, চোখের সামনে! আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ওর দিকে। অতিরিক্ত সুন্দরী মেয়েদের রাগের মাঝেও একটা সৌন্দর্য থাকে। রাগলে অতসীকে যেন আরও মিষ্টি লাগে। আমি খুব নরম স্বরে অতসীকে বললাম,

– রাগ করেছ? তুমি কি জানো, জানো রাগলে তোমায় আরও সুন্দর লাগে?

– থাক আর মিথ্যে ভাব জমাতে হবে না। আমি রাগ করি নি।

– কিন্তু তোমার মুখ তো বলছে রাগ করেছ!

– এহ! এসেছে আমার মুখ পড়া সাধু! এতোই যখন বুঝো তো ছাড়ছো না কেন আমাকে? বুঝো না আমি আর থাকতে চাই না তোমার সাথে?

– পারলে ছেড়ে দিতাম। মুক্তি দিতাম তোমাকে আমার এই সাদা-কালো পৃথিবী থেকে।

– তুমি যখন পারছ না তাহলে আমি ছেড়ে যাই!

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,

– সত্যি পারবে আমাকে ছেড়ে যেতে।

– অবশ্যই পারবো। দেখবে একদিন সত্যি ছেড়ে যাব— কথা দিলাম।

আমি ওর এই কথাটা কখনো বিশ্বাস করি নি, করতে পারতাম না। আমার ধারণা ছিল একটা পোষা প্রাণীর সাথেও তো এতগুলো বছর থাকলে অন্তত এতটুকু মায়া জন্মে যে ছেড়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কি যায় আসে, মানুষ যে বড্ড বিচিত্র প্রাণী আর এই বৈচিত্র্যতা জনে জনে আরও ভিন্ন। সে তার সেদিনের কথা রেখেছে, সত্যি চলে গেছে। যাবার আগে একবারও ভাবে নি, চলে গেছে।

 

বিকেল ৩ টা ৩০ মিনিটের দিকে অর্কের চিৎকারে আমার ঘুম ভাঙল। ভীষণ রাগান্বিত স্বরে সে বলল,

– কি হলো অনুক্ত! কয়টা বাজে দেখেছ! আমাদের ৩ টায় যাবার কথা মিতুর কাছে, এখন ৩ টা ৩০ বাজছে! তুমি কি আবার ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছ!

আমি কোন উত্তর না দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। ভালো একটা ঘুম হয়েছে। মুখটা ধুয়ে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। অটোরিক্সায় উঠলাম, এ পথের চারপাশটাই আমার পরিচিত। শেষবার যখন এসেছিলাম চার রাস্তার মোড়ের সাথে থাকা লেকের পাশে বসেছিলাম অতসীর সাথে বহুক্ষণ। আজ অবশ্য সেখানে কোন কাপল চোখে পড়ল না। ভালোই হয়েছে— ইদানীং কাপল দেখলে কেমন যেন বিরক্ত লাগে। বিরক্তির কারণ আমি বুঝি, অতসীর সাথে বিচ্ছেদের পর এটা একটা মানসিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি হাত ধরা কাপল দেখলেই ভীষণ শূন্যতা কাজ করে, ইভান সাহেবের একটা গান মনে বাজতে থাকে,

“আমার একটা মানুষ হইল না,

যে আগা গোড়া জানবে আমারে”

 

অটোরিক্সা আমাদের নামিয়ে দিল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগের সামনে। দু কদম এগিয়েই ক্যান্টিন— বসলাম সেখানে। এই ক্যান্টিনে শেষবার যখন এসেছিলাম তখনো আমার পাশে ছিল অতসী আর নিশাত। নিশাত অসুস্থতার জন্য বাড়ি চলে গেছে আর অতসী গেছে চিরতরে। শেষবার এই ক্যান্টিনের যেখানটাতে বসেছিলাম ওদের সাথে সেখানেই আজ বসে আছি অর্ক আর তার প্রেমিকার সাথে। জায়গাটা একই আছে শুধু মানুষগুলো ভিন্ন। সেদিন থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার ছিল নিশাত, আর আজ ওদের মাঝে আমি। ভাবতেই কেমন যেন একটা শূন্যতা কাজ করছিল। সত্যি, ফুল ঝড়ে যায় রেখে যায় প্রীতি আর মানুষ চলে যায় রেখে যায় স্মৃতি।

রোযার মাঝেও দিনের বেলায় এই ক্যান্টিনে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে । বরিশালে অবশ্য রোযা নিয়ে এতটা ভয়াবহতা কোথাও দেখি নি যতটা সিলেটে থাকে। একটা শহরের সব মানুষ যে মুসলিম হবে না, এই সেন্সটা সম্ভবতঃ এদের ভালো আছে।

যাহোক, খাওয়া শেষ করে আমরা রওনা হলাম বরিশাল নদী বন্দরের দিকে। সেখানে আশিশ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য শিপের টিকিট নিয়ে। সুন্দরবন-১১ এর টিকিট কেটেছে— দুটো এসি কেবিন, একটা অর্ক আর মিতুর জন্য আর একটা আমার জন্য। এই শিপেই অতসীর সাথে এসেছিলাম বরিশাল— যাতায়াতের সবকিছু কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে। বন্দরে পৌঁছে মিতুকে আমার কাছে রেখে অর্ক আর আশিশ বের হলো কেক কেনার উদ্দেশ্যে— গত দুই দিন আগে মিতুর জন্মদিন ছিল। যাবার আগে লক্ষ্য করলাম অর্ক মিতুর কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে— তার কাছে টাকা নেই। তবে কি মিতুর টাকায় মিতুর জন্য বার্থডে কেক কিনবে অর্ক! ব্যাপারটা ভাবতেই একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল আমার গত জন্মদিনের যা আমার পক্ষে পরিষ্কার করে লিখা সম্ভব না— আমি চাইলেও লিখতে পারব না, ভীষণ কষ্ট হবে। ওরা চলে যাবার পর মিতুকে বসিয়ে রেখে আমি চট করে গিয়ে বিকাশ থেকে টাকা ক্যাশ আউট করে নিয়ে এলাম। ঠিক করলাম মিতুর কেকের টাকা আমি দিব, তবু এরকম একটা কাজ আমি করতে দিব না অর্ককে।

 

বিকেল ৫ টা বেজে গেল ওদের কেক নিয়ে আসতে আসতে। রাত ৯ টায় শিপ ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। কিন্তু অর্ক আগেই শিপে উঠবে— কেক কাটাকাটি শেষ করবে তাড়াতাড়ি, তারপর কেবিনে চলে যাবে। প্রেমিকার সাথে প্রচুর একান্ত সময় দরকার তার। একান্ত সময়ের উদ্দেশ্যে দুজনে আজ রোযা পর্যন্ত রাখে নি। ভাবতেই অবাক লাগে, ধর্ম নিয়ে কখনো কথা হলে অর্ক আমার উপর ভীষণ রাগ করে এমনকি বন্ধুত্ব নষ্টের প্রশ্ন পর্যন্ত উঠে অথচ নিষিদ্ধ মাসে দুজনের সঙ্গমের জন্য এত আয়োজন, তাতে সমস্যা নেই! হায় মুসলিম, হায় ইমান!

যাহোক কেক কেটে আশিশকে বিদায় দিতে দিতে ৬টা বেজে গেল। ওকে বিদায় জানিয়ে শিপে উঠে আমি অর্ককে জিজ্ঞাসা করলাম,

– আচ্ছা অর্ক, কেক কেনার টাকা তুমি মিতুর কাছ থেকে নিয়েছ?

– হ্যাঁ।

– কেন নিলে? তুমি কি আমার কাছে টাকাটা চাইতে পারতে না?

– সমস্যা কি! আরেহ মিয়া প্যারা নিও না, ওর কাছে অনেক টাকা আছে।

– তাই বলে তুমি ওর জন্মদিনের কেক ওর টাকায় কিনবে? তুমি জানো না অর্ক আমার জন্মদিনে আমার সাথে কি হয়েছিল?

– ধুর, তোমার ব্যাপার আর আমাদের ব্যাপার সম্পূর্ণ আলাদা।

– যতই আলাদা হোক অর্ক, এটা ঠিক না। আমি বার্থডে কেকটার টাকা দিব এবং তুমি না করতে পারবে না। আমি এতদূর তোমাদের জন্য এসেছি আশা করি আমার অনুরোধ ফেলবে না।

অর্ক মিনিট দুয়েক চুপ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

– আচ্ছা। তবে তুমি খুব অদ্ভুত একটা মানুষ অনুক্ত।

আমি কোন উত্তর না দিয়ে ওদের কেবিনের সামনে গেলাম। মেয়েটির হাতে টাকাটা তুলে দিয়ে বললাম,

– বার্থডে কেকটা আমার পক্ষ থেকে গিফট্। তখন আমার কাছে ক্যাশ ছিল না বলে অর্ক তোমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল।

মেয়েটা সামান্য লজ্জাভরা চোখে তাকিয়ে রইলো— হয়তো সে বুঝল কিছু। জটিল এবং না বলা বিষয়গুলো সচরাচর মেয়েরা ছেলেদের চাইতে অনেক তাড়াতাড়ি বুঝে ফেলে। নারীর অনেক বিশেষ ক্ষমতার মাঝে এটাও একটি।

 

আন্দাজ ৬ টা ৩০ মিনিটের দিকে ওরা কেবিনে ঢুকল। আমি শিপ থেকে নামলাম সিগারেট আর কোক কিনতে। এগুলোই আমার রাতের খাবার, পথের সঙ্গী। মিতু অবশ্য আমার জন্যও রাতের খাবার রেঁধে আনতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি না করেছি।

বন্দরের ভেতরে থাকা দোকানগুলোতে সবকিছুর দাম অনেক বেশী বাইরের তুলনায়। এক প্যাকেট ব্যানসনের দামে এক প্যাকেট গোল্ডলিফ সুইচ আর কোক কিনে আমার কেবিনে চলে এলাম। কাপড় বদলে এসির ঠাণ্ডা হওয়ায় বসলাম। কিন্তু কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে আমার। আমি অবশ্য এরকম লাগবে আগে থেকেই জানতাম। আমার কেবিনের দুই কেবিনের পর অর্ক আর মিতু মহা আহ্লাদে ব্যস্ত অথচ আমি এখানে একাকিত্বে ভুগছি। কোন এক সময় এমনি এক কেবিনে আমার পাশে ছিল অতসী। যদিও অর্ক-মিতুর মত অতসীর সাথে আমার যৌন সম্পর্ক কখনোই ছিল না। যে আজ বাদে কাল আমার হবে তার সাথে সোহাগ সম্পর্কে অপেক্ষা করতে আমার কখনোই সমস্যা ছিল না। এ ব্যাপারে কখনো ভাবতামও না। জৈবিকতার ঊর্ধ্বে উঠা সম্ভব কি না জানি না, তবে আমি যথেষ্ট রকম একজন ইমোশনাল ফুল টাইপ মানুষ। প্রেম মানে পাশে থাকাটাকেই অনেক কিছু মনে হয়। মাঝে মাঝে তো এমনও মনে হতো, যদি পারতাম অতসীকে মূর্তি করে আজীবন চোখের সামনে বসিয়ে রেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। কি যেন, হয়তো পাগল গোছের মানুষ আমি, তাই অদ্ভুত সব চিন্তা ভাবনা।

কোন কাজ নেই, কিছুক্ষণ বসে থেকে হঠাৎ একটা বুদ্ধি এল মাথায়। আমি কেবিনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে লাগলাম। বিভিন্ন ভঙ্গিতে হাসছি আবার কখনো রাগান্বিত হয়ে তাকাচ্ছি, নানা রকম অভিনয় করছি আয়নার সামনে— দেখছি কেমন দেখায় নিজেকে।  সম্ভবতঃ পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছি বলে বোধ করছি। বেশ অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পর একটা বেশ জোরে ধাক্কা অনুভব করলাম।

সম্ভবতঃ শিপ চলতে শুরু করেছে। আমি স্থির হয়ে বসলাম এবার। ইতিমধ্যে একটা কল আসলো আমার ফোনে। ফোনটা বিছানায় উল্টা করে রাখা ছিল। রিংটোন বাজার সাথে সাথে আমার বুক ধরফর করতে লাগল। কোন এক অজানা বাসনা পেয়ে বসল আমাকে। কেন জানি না মনে হচ্ছে কলটা অতসীর। কিন্তু এই দীর্ঘ সাত মাস পর ও কেন কল করবে। তাছাড়া এই মুহূর্তেই কেন? এটাও কি সম্ভব? আচ্ছা এখন যদি অতসী কল করে বলে ও ফিরে আসতে চায় আমার জীবনে? কি বলবো আমি? ভাবতে ভাবতে কলটা কেটে যাওয়ার আগেই ফোনটা হাতে তুলে নিলাম। নাহ, অতসীর কল না— ঐন্দ্রিলার কল। ঐন্দ্রিলা মেয়েটা ভীষণ পছন্দ করে আমাকে, আমি বুঝতে পারি তবে কিছু বলি না। একটা জীবন্মৃত মানুষের জীবনে নতুন করে আবার প্রেম কি! তাই নিরবতাই এক্ষেত্রে আমি বেশী সমীচীন মনে করি।

অনিচ্ছা সত্যেও রিসিভ করলাম কলটা। ওপাশ থেকে একটা সামান্য ভারী কন্ঠের কথা ভেসে আসলো,

– কেমন আছেন?

– হ্যাঁ, বরাবরের মতই বেঁচে আছি।

– আপনি লঞ্চে?

– নাহ, শিপে।

– বরিশালের ওগুলো শিপ?

– হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে। একেকটার সাইজ দেখেছ? এগুলোকে লঞ্চ ডাকলে অপমান করা হবে।

– ওহ আচ্ছা। আপনি কি অ্যালকোহল নিয়েছেন।

– নাহ।

– বাহ হঠাৎ এত উন্নতি?

– প্লান ছিল কিন্তু গতকাল মত পাল্টেছি— প্রয়োজন নেই।

– শুনে খুবই খুশি হলাম। তো কি করবেন সারা রাত?

– নাচবো। তুমি নাচবে আমার সাথে?

– আমি আপনার সাথে থাকলে অবশ্যই যোগ দিতাম। সমস্যা নেই তাতে, আপনি নেচে ভিডিও করে পাঠান।

– থাকো তুমি, ভালো লাগছে না— পরে কথা হবে।

– আরেকটু কথা বলি, প্লীজ?

– বললাম তো পরে, ভালো লাগছে না কিছু।

– আচ্ছা, জোর করব না। তবে শুনুন, মন খারাপ করে বসে থাকবেন না বেশীক্ষণ। শিপের কিনারায় যাবেন না। বেশী খারাপ লাগলে আমাকে কল করবেন।

আমি কোন উত্তর না দিয়ে কলটা কেটে দিলাম। কেবিনের বাইরে থাকা চেয়ারটাতে এসে বসলাম— ভীষণ বাতাস। বসে চারপাশটা দেখছি, ঘুটঘুটে অন্ধকার আর পানির কলকল ধ্বনি। দেখে যেন মনে হচ্ছে কোথাও কেউ নেই।

এই তো সেদিনের কথা, মনে পড়লেই এখনো চোখে চোখে ভাসে সব। কত তাড়াতাড়ি বদলে গেছে সবকিছু, হারিয়ে গেছে পাশে থাকা মানুষটি। পরিবর্তনের স্রোতে ভাসতে ভাসতে বদলে গেছে সব। এই পরিবর্তনের স্রোতে প্রিয়জন হারিয়ে দুঃখ-বেদনা বয়ে তবু জীবন চলতে থাকে তার আপন গতিতে।

মাঝে মাঝে কেন যেন মনে হয় অতসীর সাথে আবার কোন একদিন ভুল করে আমার দেখা হয়ে যাবে। মনে হলেই ভাবি কি বলবো ওকে? আমি কি ওর চোখে চোখ রাখতে পারব? আরেকবার কথা হবে আমাদের? ও কি আমাকে চিনতে পারবে? হয়তো না, তবুও একটা আশায় থাকে মন। বারবার মনে পড়ে যায় জীবনানন্দের কবিতার দুটো লাইন,

 

“জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার-

তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 + = 15