একজন অয়নি

”মা , বাবা কখন আসবে? বাবা কি ভুলে গেছে আজকে একটা বিশেষ দিন !!! বাবা যদি আজ ভুলে যায়, তাহলে বাবার আজ বারোটা বাজাবো আমি ,”
মা এর উত্তরের পরোয়া না করে মেকি রাগ করে নিজের ঘরমুখো হলো অয়ন্তিকা , বাবা মা , এমনকি চৌধুরী পরিবার এর মধ্যমণি , সকলের আদরের অয়ন্তিকা সংক্ষেপে অয়নি।

###
আজ অয়নির বাবা মায়ের ৩০ তম বিবাহ বার্ষিকী । সেই এক সপ্তাহ আগে থেকে কত কিছুই না ভাবছে অয়নি । কিভাবে বাবা আর মাকে সারপ্রাইজ দিবে এই নিয়ে হাজারো জল্পনা আর কল্পনা আকছে ও । ওর প্লান অনুযায়ী আজ বাবা আসবে রাত ৭ টার পর । সারা বাড়িতে তখন কোন লাইট জ্বলবে নাহ!! আজ শুধু মোমবাতি জ্বলবে । আজ গেট এ দারোয়ান চাচা এর বদলে মা দাড়িয়ে থাকবে , হাত এ থাকবে একতোড়া লাল গোলাপ তার উপর থাকবে একটি সাদা গোলাপ । মা একটা লাল বেনারশি এর সাথে খোপায় গোলাপ ফুল পরবে । । ভাবতেই কেমন যেন রোম্যান্টিক লাগছে । এমনি ভাবনার কথা মা কে বলেছে , মা প্রথমে রাজি হয় নি । কিন্তু অয়নির প্রত্যেকটা ইচ্ছা এ বাড়িতে পূরণ করা হয় । তার কোন ইচ্ছা অপূর্ণ থাকে না কখনো ।

###
ঘরের পানে ছুটছে শায়ন । আজ আড্ডা দিবে না ও । শায়ন সবে মাত্র এস এস সি পরীক্ষা দিল । সারাটা দিন আড্ডার মধ্যে কখন যে অস্তমিত হয় , শায়ন বুঝে ওঠে না । পরিবার এর কারোর শাসন ও মানে না । একমাত্র বুবুর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে শায়ন । একটু আগে বুবু ফোন দিয়েছিল , ২০ টা লাল গোলাপ আর ৫ টা সাদা গোলাপ নিয়ে যেতে বলেছে । সেগুলা কিনেছে ঠিকঠাক মত ,সাথে এক্সট্রা নিয়েছে একডালা বেলিফুল, বুবু বেলিফুল খুব পছন্দ করে । ঘরের পানে ছুটছে শায়ন ।

আড্ডার পিছুটান আজ তেমন একটা প্রভাবিত করছে না ওকে ।

###
সাফায়েত চৌধুরী অফিসে কর্মরত । খুব দ্রুত হাতের কাজ গুলা শেষ করছেন আর মিনিটের ব্যবধানে দেওয়ালে টাঙ্গানো ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন । ফোন বাজছে অনেকক্ষণ থেকে । ফোন ধরছেন না উনি , কারন সাফায়েত সাহেব ভাল করেই জানেন এখন ফোন ধরলে অনেক গুলা আদুরে গলার ধমক সহ্য করতে হবে তার । নাহ ! অনেক হয়েছে এবার বাসায় যাবে , ম্যানেজার কে ডেকে অফিস এর বাকি কাজ গুলা শেষ করতে বলে বেরিয়ে পড়লেন । পথের বাতাস কে আলিঙ্গন করে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে , আনমনে অয়নির কথা ভাবছেন উনি । নীরবে কাঁদছেন সাফায়েত চৌধুরী ।

###
রাতের আকাশ টা আজ কেমন যেন বিষন্নতায় ঘেরা । বাবার বিবাহ বার্ষিকী টা খুব সুন্দর ভাবেই পালিত হয়েছে । সেটা ভেবেই হাজারো কষ্টের আড়ালে একচিলতে হাসি ফুটল হটাত আয়নির মুখে । হাসলে অনেক সুন্দর লাগে ওকে । রাত ১ টা বেজে ২৪ মিনিট । আয়নি জানালার গ্রিলে মুখ লুকিয়ে আকাশ দেখছে । মাঝে মাঝে গুন গুন করে গান গাইছে । নাহ বারান্দায় যাবে ও । বাবা ওর জন্য বিশেষ ভাবে অনেক জায়গা নিয়ে সুন্দর এই বারান্দা টা করে দিয়েছে । ২৪ টা বছর এর অধিকাংশ সময় এই বারান্দায় পার করেছে অয়নি । বিষণ্ণ আকাশের তলে মৃদু বাতাস টা আজ কেন জানি ওকে চোখ এর অশ্রু এর সাথে সখ্যতা করছে ।
”ঐ আকাশ তুই এমন কেন?, সেই কবে থেকে ডাকছি তোকে শুনতে পাস না? এই যে দেখ তোর প্রেমিকা বাতাস আমাকে কাদাচ্ছে , তুই ওকে একটু বকে দে তো !!”
নির্লিপ্ত বেদনাগুলা অনেক বেশি ছন্নছাড়া লাগছে ।। ডালা থেকে বেলি ফুল মুঠো ভরে নিয়ে একটু ঘ্রাণ নিল , মুহূর্তে ওর চোখ টা জ্বল জ্বল করে উঠল।এক মুহূর্তের প্রশান্তি । শায়ন এনে দিয়েছিল আজ। ”একটা কবিতা লিখলে কেমন হয়!! নাহ থাক , আজ আর কবিতা লিখবে নাহ অয়নি !! আকাশ এর সাথে ঝগড়া করবে , বাতাস এর স্পর্শে কাদবে , ওর স্বপ্নের সাথে খেলবে , কষ্ট নামক বস্তুটিকে নতুন করে ভালবাসবে । এভাবেই ঘুম দেশে হারিয়ে যাবে সে । অয়নি জানে একটু পর মা আসবে , তাকে বিছানাই নিয়ে যাবে , ঘুম পাড়িয়ে , ছোট্ট একটি চুমু দিবে অয়নির কপাল এ । তারপর নীরবে কাদবে অয়নির দিকে তাকিয়ে ।

###
প্রতিটা সকালে চৌধুরী পরিবার এর সবার ঘুম ভাঙ্গায় অয়নি । মানুষ গুলা কেমন জানি বদভ্যাস এ পর্যবসিত রয়েছে । অয়নি না ডাকলে তাদের ঘুম ভাঙ্গে না। খুব সকাল এ অয়নি একবার বাগান এ যাবে , আস্তে আস্তে মালি চাচা কে ডেকে তুলে নিজের হাত এ গাছে পানি দিবে , শায়ন এর মুখে পানি দিবে (এটা না করলে মহারাজের ঘুম ভাঙতে চায় না ) , বাবা মায়ের ঘর এর সামনে যেয়ে দরজায় টোকা দিতে থাকবে আর আদুরে ভঙ্গিতে চিল্লাবে আর বলবে , ”এই বাবা উঠবে না , অনেক ঘুমিয়েছ , অফিস এ যাবে না হুহ !! , মা মা আমার ক্ষুধা লেগেছে ওঠো ওঠো !! ”
খাবার টেবিল এ প্রতিনিয়ত নানান সব তালবাহানা করে অয়নি । কখনো শায়ন এর প্লেট থেকে খাবার কেড়ে খাই , কখনো শায়ন এর কান টা ধরে বলে , ”মা তোমার ছেলে কে টাকা কম করে দিবে , সারাদিন খালি আড্ডা আর আড্ডা !! ”

###
আজ অয়নি বেড়াতে যাবে । অয়নি খুব সুন্দর করে একটি শাড়ি পরেছে । বাবা ওকে দেখেই ওকে জড়িয়ে ধরে কেদে ফেললো । অয়নি বাবার মুখে ছোট্ট একটি চুমু দিয়ে বলল ”বাবা আমি তোমার অয়নি , তোমাদের অয়নি ” ।
আজ বড় চাচা এসেছে পরিবার নিয়ে । ওরা একসঙ্গে বেড়াতে যাবে । গন্তব্য দার্জিলিং । প্লান টা অয়নির । সবার
জীবনের একঘেয়েমি দূর করতেই ওর এই সিদ্ধান্ত । শায়ন কে অয়নি চুপে চুপে ডেকে বলল ” শোন বদ , তুই যে চিগারেট ধরেছিস সেটা কিন্তু আমি জানি !! । শোন
বেড়াতে যাচ্ছি এই কয়দিন যেন মোটেও ওটা না ছোঁয়া হয় , বুঝলি বাদর চাঁদ !!! আমার কথা শুনলে বখশিস পাবি অনেক ” শায়ন হাসি মুখে বুবু কে কথা দিল ।

বড়চাচি এবং মা কে একটি করে গোলাপ দিল খোঁপাতে পরতে , আর ওর নিজের হাত এ তৈরি বেলি ফুলের মালা । ওদের সবার বেড়াতে যাওয়ার পোশাক টাও অয়নির পছন্দে কেনা হয়েছে । বের হওয়ার সময় ও মালি চাচা কে ডেকে বলল , ”চাচা আমার গাছ গুলাকে দেখে রেখ কিন্তু , নাহলে তোমাকে এসে বকা দিব চাচা” – একটু মিষ্টি হেসে চাচাকে মেকি বকা দিয়ে বের হল অয়নি ।

###
দার্জিলিং থেকে ফিরেছে মাস খানেক হয়ে গেল। আজ সকাল থেকে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। অয়নি বৃষ্টি দেখছে , হটাত একটা গান মনে পড়ে গেল,নাহ শিল্পির নাম মনে পড়ছে নাহ । অয়নি গায়ছে –

”যদি মন কাঁদে,
তুমি চলে এসো, চলে এসো, এক
বরষায়…
এসো ঝর ঝর বৃষ্টিতে, জল
ভরা দৃষ্টিতে
যদি কোমলও শ্যামলও ছায় চলে এসো,
তুমি চলে এসো এক
বরষায়
যদি মন কাদে, তুমি চলে এসো, এক
বরষায়…
যদিও তখন আকাশ থাকবে বৈরী,
কদমও গুচ্ছ হাতে নিয়ে আমি তৈরি
উতলা আকাশ
মেঘে মেঘে হবে কালো
ঝলকে ঝলকে নাচিবে বিজলি আলো
তুমি চলে এসো এক বরষায় যদি মন
কাদে তুমি চলে এসো এক
বরষায় ।
নামিবে আঁধার বেলা ফুরাবার
ক্ষণে
মেঘমল্লো বৃষ্টিরও মনে মনে
কদমও গুচ্ছ খোপায় জরায়ে দিয়ে
জলভরা মাঠে নাচিবো তোমায়
নিয়ে.. চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়
যদি মন কাদে, তুমি চলে এসো,
চলে এসো এক বরষায়………”

নিঃসঙ্গ জীবনে অয়নি কাকে ডাকছে এমন আকুলতাই’!!! । ও নিজের অস্তিত্বকে কে ডাকছে , নিজের আজীবনের লালিত স্বপ্নকে ডাকছে ।
অয়নির খুব বৃষ্টি তে ভিজতে ইচ্ছা করছে , অপারগতা অপ্রকাশ্য !!!! । ইচ্ছা বিষয় টা অয়নির জীবনের একমাত্র সঙ্গী । আর কতকাল একাকী কাটবে জীবন টা ?

অর্থহীন প্রশ্ন !! অয়নি নিজেও জানে সেটা ।
তবুও কষ্ট , অসমাপ্ত বেদনা , সইতে পারে না অয়নি ।

কিভাবে এমন কষ্টের বুকে হাসির বন্যা আনবে ও !!! কিভাবে সম্ভব !!!

অয়ন্তিকা চৌধুরী (অয়নি) আসলে পঙ্গু একটি মেয়ে , তার দুটি পা নেই । খুব ছোট বেলাতে মারাত্মক এক দুর্ঘটনার দরুন তার দুটি পায়ের হাঁটুর নিচে থেকে কেটে ফেলা হয়েছিল । আমাদের সমাজ এ এমন হাজারো অয়নি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । এরা এভাবেই হইত নিজের কান্নার আড়ালে অন্যকে হাসাতে হয়ত এরা ব্যস্ত থাকে ,

হয়তোবা একলা বসে নিজের সাথে গল্প করে , চরম নিঃসঙ্গতায় নিজের অশ্রু বিসর্জন দেয় । অশ্রুর মাঝেও নতুন দিন এর কল্প আকে , একটু খানি স্বপ্ন দেখে । নিঃসঙ্গ জীবনে একটু খানি সঙ্গতা চায় ।

-সমাপ্ত-

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৪ thoughts on “একজন অয়নি

  1. কাহিনী ভালোই লাগল।
    কাহিনী ভালোই লাগল। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: কিন্তু গল্পের শেষে এভাবে ম্যাসেজ আকারে কথাগুলো না দিয়ে গল্পের মাঝেই যদি বুঝিয়ে দিতে পারতেন অয়নির অবস্থা, তাহলে ভালো হতো বোধ হয়। আর আপনার “য়” আর “ই” সংক্রান্ত সমস্যা কিন্তু এখনও গেলো না। :ভেংচি:

    1. আতিক ভাই “য়” আর “ই”
      আতিক ভাই “য়” আর “ই” সংক্রান্ত সমস্যা তো থেকেই যাচ্ছে !! কি করমু ভাই :মনখারাপ: বাই দা ওয়ে একটু খানি মেসেজ ত্যাগ করলাম 🙂

  2. গল্পটি পড়তে আরও ভালো লাগতো
    গল্পটি পড়তে আরও ভালো লাগতো যদি আপনি এমন প্যারা করে না লিখতেন । লাইন শেষ হওয়ার আগে প্যারা করে দেওয়ার কি কারণ, বুঝতে পারলাম না।
    কিছু কিছু লাইন খুব চমৎকার লাগলো।

    1. আসলে ভাই এটা ১ম এ পিসি এর নোট
      আসলে ভাই এটা ১ম এ পিসি এর নোট প্যাড এ লিখেছিলাম । কপি করেছি অখান থেকে তাই এই অবস্থা । ধন্যবাদ দিকনির্দেশনা এর জন্য । 🙂

  3. অনর্থক দেয়া প্যারাগ্রাফ এবং
    অনর্থক দেয়া প্যারাগ্রাফ এবং বানান ভুল গুলোর কারণে অসাধারণ একটা গল্পের সুরটা বারবার কেটে যাচ্ছিল…

    1. হুম। প্যারা টা মোটামুটি ঠিক
      হুম। প্যারা টা মোটামুটি ঠিক করেছি । আর কিছু ত্রুটি ধরিয়ে দেন ,যাতে করে সম্পাদনা করতে পারি । :খুশি:

  4. বাহ, বেশ সুন্দর আরেকটু
    বাহ, বেশ সুন্দর 🙂 আরেকটু গোছানো বোধয় হতে পারতো। আমার কাছে খুব ভাল লেগেছে :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

37 − = 27