সুদানে গণতন্ত্রের লড়াই

‘আমাদের বিপ্লবকে চুরি করা হচ্ছে’, সুদানের ত্রিশ বছরের সামরিক শাসক ওমর আল বশিরকে হটিয়ে যখন ট্রানজিশনাল মিলিটারি কাউন্সিল(TMC) সুদানের শাসনভার গ্রহন করে তখন সুদানিজরা এভাবেই তাদের অভিব্যাক্তি ব্যাক্ত করেছিলো। সুদানিজদের গণতন্ত্রের স্বপ্নকে ফেরি করে যে নারীটি গান গেয়ে, স্লোগান দিয়ে, আবৃত্তি করে মাতিয়ে রেখেছে আন্দোলনকে সেই তরুণী যাকে আদর করে সুদানিজরা বলে ‘নুবাই কুইন’ বা ‘কান্দাকা’। সেই নুবাই কুইন আল সালাহ আর তার তরুণ সহযোগীরা খেয়াল করেছিলো একটি অর্থবহ এবং ন্যায্যতর বিপ্লবকে সামরিক উর্দিধারীরা ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছিলো। গত ১০ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট বশিরকে সেনাবাহিনী গৃহবন্দী করে TMC গঠন করার পরই তরুণ-যুবারা বুঝতে পেরেছিলো তাদের গণতন্ত্রের সুখস্বপ্ন, একটি অর্থবহ নির্বাচনের স্বপ্নকে ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। সুদানে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে শ’খানেক এর উপরে বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে সামরিক,আধা-সামরিক বাহিনী। সুদানিজদেরকে ধোকা দিতে TMC র প্রধান থেকে সরে দাঁড়িয়ে নতুন প্রধান হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছেন আব্দেল ফাত্তাহ আব্দেল রহমান বুরহান। কিন্তু এসব ব্যাক্তি ভাবমূর্তির পরিবর্তন যে সুদানিজদের মন ভোলাতে পারবে না তা বিগত দিনগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায়। সুদানে এতো বড় বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছে যে সংগঠনটি সেটি সবচেয়ে আশ্চর্যের একটি নাম। বিক্ষোভ-ধর্মঘটগুলোর ডাক দিচ্ছে সুদানিজ প্রফেশনালস এ্যাসোসিয়েশন। SPA নামের গ্রুপটিতে কে নেই; আইনজীবী,ডাক্তার, পেশাজীবি, তরুণ যুব-সবাই আছে এবং প্রবল উৎসাহে যোগ দিচ্ছে বিক্ষোভে। মূলত TMC র সাথে সংলাপ বা আলোচনা এদের সাথেই হচ্ছে বা হওয়ার প্রক্রিয়াতে আছে। বিক্ষুব্ধ জনগন স্পষ্টত জানাচ্ছে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সুদানে তিন দশক ধরে যা চলছে তা সামরিক উর্দির শাসন বলতে যা বুঝায় তার বাইরে আদতে কিছুই না। প্রেসিডেন্ট বশির কিছুদিন আগে সরকারি ভর্তুকি কমানো, ব্যায় সংকোচন, সুদানি মুদ্রার অবমূল্যায়ন- এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেন। যার প্রেক্ষিতে চটে যায় দেশবাসী। ফলশ্রুতিতে এক ঝাটকায় সেনাবাহিনীর আরেক অংশ ক্ষমতা থেকে বশিরকে সরিয়ে দেয় মিস্টার বশিরকে । সুদানে দারফুরে গৃহযুদ্ধ কিংবা জাতিগত সংঘাতে ওমর আল বশির এর নাম বেশ জানাশোনা সবার। সুদানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উপর আক্রমন, লাঞ্চনা,নির্যাতন,খুন,ধর্ষনে এক সময় যারা সহযোগী ছিলেন সেই তারাই আজকের দৃশ্যপটে হাজির। ব্যাক্তি ওমরের সাথে স্বার্থের দ্বন্দে বা একটি ব্যাক্তি শাসনের ইতি টানতে শুধুমাত্র মুখচ্ছবির পরিবর্তন। কার্যত সুদানের জনগনের কাছে সেনা কাউন্সিলের সবগুলো মুখই চেনা। ওমর আল বশির যাদেরকে দিয়ে সকল অপকর্ম করাতেন তারাই এখন হাজির নয়া ফর্মুলা নিয়ে। সুদানের বিশাল বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজে একসময় মানুষ ভাবতো ওমর আল বশিরের কোন বিকল্প সুদানে তৈরি হয় নি এখনো। কিন্তু কথাটা যে সর্বৈব ভুল তা প্রমাণিত হয়েছে। সুদানিজরা প্রত্যক্ষ করেছে যে-
বর্তমান যারা ক্ষমতায় এসেছে এদের প্রত্যেকেই প্রেসিডেন্ট বশিরের এক সময়ের বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন। সুতরাং ট্রানজিশনাল মিলিটারি কাউন্সিলের ক্ষমতা প্রলম্বিত করা কিংবা নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাহবাহানা করতে চাইছে এমনটা প্রতিভাত হওয়া খুব স্বাভাবিক। জনগনের সচেতনতা আর গনতন্ত্রের লড়াই তাই যেকোন সময়ের তুলনায় বেগবান। জনগনই ভুল প্রমান করেছে যে প্রেসিডেন্ট ওমর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জমেই ছিলো। সুদানে বর্তমানে বেকারত্ব, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি চরম আকার ধারন করেছে। সে কারনেই চারদিকে হতাশার দরুণ দেশের তরুন সমাজ বিক্ষোভে এতো মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে। সুদানের বিক্ষোভ অনন্য হয়ে উঠেছে এই কারনে যে সকল পেশাজীবিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহনে উৎসাহিত হচ্ছে বাকি জনগন। সুদানে চলমান সহিংসতায় যারা নেতৃত্বে আছেন তারা প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই পূর্বে সহিংসতার অভিযোগ আছে এবং সুদানের মানুষ একজন ব্যাক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুসছে অধিকতর। সুদানের দারফুরে ঘটে যাওয়া সহিংসতার খলনায়ক মোহাম্মেদ হামাদান দাগালো রয়েছেন TMC র ডেপুটি হিসাবে। নিহত মানুষজনের উপর আক্রমন চালানোতে যাদের নাম উঠে আসছে সেই র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের প্রধানও তিনিই।

ইথিওপিয়ার মধ্যস্ততায় একটি শান্তি আলোচনা/মধ্যস্ততা বৈঠক হয়েছিলো কিন্তু সেনা কাউন্সিলই সেই বৈঠকের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে বিরোধীনেতাদের গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সেনা কাউন্সিল বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এসেছে। জনগনের বিশ্বাসের সীমারেখা সে কারনেই থমকে গেছে- এ কথা পরিষ্কার। ইতিমধ্যে আফ্রিকান ইউনিয়নও সুদানের সদস্যপদ শগিত করেছে বেসামরিক নাগরিকদের উপর হামলার অভিযোগে। SPA আহুত ধর্মঘট নিয়ে সুদান ট্রিবিউন সংবাদ ছেপেছে ৯ তারিখে। তাঁর সারবত্তা এমন যে সুদানে ধর্মঘট সর্বোতভাবে সফল। সুদানের খার্তুম থেকে প্রায় ২০ টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে কর্মচারী-কর্তারা দপ্তরে না আসার কারনে। সেনা কাউন্সিল ইন্টারনেটের উপর কয়াড়কড়ি আরোপ করায় SPA প্রায় ৯ লক্ষ ক্ষুদে বার্তা ছাপিয়ে বিতরন করেছে সাড়া শহরে। ক্ষুদে বার্তায় লেখা ‘All the streets are full of blood, all the homes are saddened, and the whole country is sorrowful’ । আবার উল্টোপিঠে লেখা, “Tasgot Bas”, যার অর্থ “just fall, that’s all”। খার্তুম এবং অমদুরবান শহরে ব্যারিকেড আর জনতা মুখোমুখি। সেনাসদর, RSF দপ্তর এর সাথে মুখোমুখি জনতা। সেনা দপ্তর এবং আরএসএফ এর দপ্তরের বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। সেনা দপ্তর এবং সরকারি দপ্তরগুলোতে গ্রাফিতি আকা হয়েছে, স্লোগান লেখা হয়েছে, প্ল্যাকার্ড সেটে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কায়দায়।
খার্তুম ইউনিভার্সিটির একজন ছাত্র মুওফাক রঙ তুলি তুলে নিয়ে সরকারি বাহিনীর দপ্তরের পাশে দেয়ালে একে দিয়েছে-

 

 

মুওফাক বলছেন, এই চিত্রকর্মটি বোঝাচ্ছে যে, সুদানিজরা শোষণের শৃঙ্খল ভাঙছে, তাদের সামনে সকল বাধা ছিন্ন করে তারা কথা বলছে। সুদানের বিভিন্ন রাস্তায় দেয়ালে আন্দোলনে যেসব ছবি আকা হচ্ছে তাঁর মর্মে মর্মে বুঝাচ্ছে সুদান যেন ঐক্যবদ্ধ থাকে। গণতন্ত্রের লড়াইয়ে এবং সুদানের জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধতার বিকল্প নেই।

খার্তুমের পাশে একটি আর্ট কলেজের শিক্ষার্থী মুঘিরা এঁকেছে-

 

 

মুঘিরা বলছে, সুদানের পপুলেশন ডায়ভার্সিটিকে তিনি শ্রদ্ধা করেন, ভালবাসেন এবং তিনি খুশি যে সুদানজদের সকল বৈচিত্র্যগত অংশই প্রতিবাদ করছে। মুঘিরা এই চিত্রকর্মে সেরকম বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগনের ছবি অংকন করেছেন। আফ্রিকার মানুষ কলনিয়াল এটাচমেন্টের বাইরে গিয়ে এখনো চিন্তা করতেই শেখে নি। নিজেদের জাতিগত সংঘাতের বলি নিজেরাই হচ্ছে। নিজেদের শাসকদের পশ্চিমামুখী নীতি কিং পরাশক্তিমুখিতা এখনো স্বাবলম্বী করে তুলতেই পারে নি। সুদান সেই ক্ষতে ফুল ফোটাবে। গণতন্ত্রপ্রেমী লড়াকু জনগণ সে লক্ষ্যেই এগুচ্ছে। বিপুল সংখ্যক জাতিগোষ্ঠীর সমাহার নিয়ে সুদান। খনিজ সম্পদ, কৃষিজ উৎপাদন- সব দিক দিয়েই সুদান আফ্রিকার অন্যতম সম্পদশালী একটি দেশ। তবে নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান যে খুব উন্নত সে কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। দেশটির গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো এবং অভ্যন্তরীন শৃঙ্খলা যাচ্ছেতাই। দীর্ঘ সময়ের বশিরযুগে রাজনীতি বলতে কার্যত কিছু ছিলই না। তবে আসন্ন বিক্ষোভ যদি কিছু দেয় দেশটিক, মনে হয় তা দেবেও।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 45 = 47