পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া আগ্রাসন

ভারতীয় জনতা পার্টি, পশ্চিমবঙ্গের একজন নেতা শমিক ভট্টাচার্য। দারুণ প্রজ্ঞা আর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষ। বেশ সুবক্তা। হলফ করে বলা যায়, কট্টর বিজেপিবিরোধী হলেও শমীক ভট্টাচার্যের বক্তৃতার মনোযোগী একজন শ্রোতা হবেন-সত্যিই হবেন। শমিক ভট্টাচার্য তার প্রায় সকল বক্তৃতায় সহাবস্থানের জয়গান গান, হিন্দু-মুসলিমের সদ্ভাবের কথা বলেন। মমতা ব্যানার্জী একবার দুর্গা পূজা বিসর্জন পিছিয়ে দিয়ে মহরমের মিছিল বের করার অনুমতি দিয়েছিলেন মুসলমানদের। শমীক সে কথা টেনে বারে বারেই বলেন, ‘পশ্চিমবাংলায় মহরম আর দুর্গা পুজোর মিছিল একসাথে বের হবে যেদিন সেদিনই বাংলা হবে অসাম্প্রদায়িক’। বিজেপি নাকি সে লক্ষ্যেই লড়াই করছে। পশ্চিমবাংলা তো বটেই সারা ভারতেও নাকি বিজেপি সেই লড়াইকে এগিয়ে নিচ্ছে। শমীক ভট্টাচার্য ব্যাক্তিগতভাবে এ কথা মানলেও বিজেপি কতটা তা মান্যতা দেয় সে বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু ব্যাক্তি শমীকের কথার গুরুত্ব কিন্তু আছে। মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সংখ্যালঘু মুসলিমদের তোষণের রাজনীতি করছেন বলে বিরোধীশিবির অভিযোগ করছে। সদ্য লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবাংলায় বিজেপি ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফল করেছে। বিজেপি এক ধাক্কায় আসনসংখ্যা ২ থেকে ১৯ এ নিয়ে গেলো। বিজ্ঞজন কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলতেন আর যাই হোক বাংলায় পদ্ম ফুটবে না। বাংলায় ৩২ শতাংশ মুসলিম ভোটার, অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক ঔদার্য- সব মিলিয়ে সবাই বলতেন পদ্মের প্রজনন বাংলায় হওয়া নাকি সম্ভব না। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারাও বাংলা নিয়ে অতো মাথা ঘামাতেন না কোনোদিনই। এই তো সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনেও এরকমই বলতেন লোকে। কিন্তু সেসব হিসেব নিকেষ চুলোয় যাক। সব ওলট-পালট করে দিয়ে পদ্ম ফুটলোই অবশেষে। চারদিকে সবার চোখ যখন কপালে তখন অনেকের চোখ কপালে ছিলো না। বরং অনেকে অনুমান করেই নিয়েছিলো, কিছু একটা হচ্ছে পশ্চিমবাংলায়। বিজেপির মহীরূহ উথথানের বেশ কারন যে ছিলো সেটা বুঝা গিয়েছিলো। মমতা ব্যানার্জি আওয়াজ তুলেছিলো-এবার ৪২ এ ৪২! কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি যা করেছেন তার দুই মেয়াদের শাসনে সে হিসেব কি কেউ রেখেছে? না, অনেকেই সে হিসেব রাখেন নি। বিশেষত দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে এসে পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ধুলোয় মিশিয়ে ছেড়েছেন। তিন দশকের বামফ্রন্ট শাসনকে হটিয়ে দিয়ে যখন এসেছিলেন ক্ষমতায় তখন মানুষ আশায় বুক বেধেছিলো। বামফ্রন্টের অগণতান্ত্রিক, অনিয়ন্ত্রিত শাসনের গর্ভে জন্ম নেয় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম। সে গর্ভের অগ্নিস্ফূলিঙ্গ থেকে জন্ম নেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চারদিকে মানুষের কাছে বামবিরধী লড়াই আর গণতন্ত্রের, কল্যাণের কাণ্ডারি হিসাবে জ্ঞাত হতে থাকেন মমতা। লোকে দুহাত ভরে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসায় মমতাকে। তিন দশকের বাম জামানার পতন ঘটে। কিন্তু মমতা এসে যা শুরু করেছেন সে খেলা হাস্যকর, অপরিণামদর্শী। মমতা ক্ষমতায় এসেই সিপিএম কিংবা কংগ্রেসের হাতে থাকা পঞ্চায়েতগুলোকে একে একে দখল করে নিয়েছিলেন কোনরকম ভোট ছাড়াই। কংগ্রেস, সিপিএমের ওজনদার নেতাদেরকে দল থেকে ভাগিয়ে এনে দল ভারি করেছিলেন। বিধায়কদের পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকাতলে আসতে বাধ্য করা হয়েছিলো।
এই যেমন ধরুন, প্রদেশ কংগ্রেসের বেশ দাপুটে নেতা মানস ভূঁইয়ার কথা। সবং এর বিধায়ক ছিলেন মানস ভূঁইয়া। সবং কলেজে জনৈক তৃনমূল ছাত্র পরিষদ নেতা জয়দেব জানাকে খুনের মামলায় মানসকে ফাসিয়ে দেবার হুমকি-ধামকির মধ্যেই শোনা গেল মানস ভূঁইয়া তৃনমূলে ভিড়েছেন। ব্যস, জয়দেব জানার হত্যা মামলা থেকে মানসের সংযুক্তি সেখানেই শেষ।
এরকম প্রক্রিয়াতে বহু নেতাকর্মীকে গ্রামে-গঞ্জে অন্য দল থেকে এনে দল কে আপাত অর্থে চরম ক্ষমতাশালী করেছেন। সিপিএম-কংগ্রেসের পার্টি অফিস দখল করে তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা উড়িয়েছিলেন গায়ের জোরে। চারদিকে তখন ঘাসফুলের জয়ঢাক বাজছে তো বাজছেই। ক্ষমতায় বসেই একসময়ের সহযোগী ছত্রধর মাহাতোকে জেলে পুড়েছেন, যিনি ছিলেন লালগড় বিদ্রোহের কৃষক-আদিবাসীদের লড়াকু নেতা। এনকাউন্টারে হত্যা করেছিলেন মাওবাদী নেতা কিষেনজিকে। জঙ্গলমহালের যাদের উপর ভর করে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কাপিয়েছিলেন তাদের কাওকেই আর আশপাশে ঘেষতে দেন নি মমতা। রাজ্যে সিপিএম-কংগ্রেসকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার সাথে সাথে আদিবাসী-কৃষক-মজদুর; সকল শ্রেণীর বিরোধীতাকে শূলে চড়িয়েছেন, দমন করেছেন অনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে। আর উল্টোদিকে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের হাতে তুলে দিয়েছেন সিন্ডিকেট, বালি খাদান, পাথর খাদান। অন্যদিকে ছাত্র পরিষদের কলেজে-ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি বাণিজ্য-তোলাবাজিতে মত্ত। সকল ক্যাম্পাসের ছাত্রসংসদে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ জোর করে ছাত্র সংসদ দখল করে নিয়েছে। বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩০ শতাংশ আসনে কোন বিরোধীকে মনোনয়ন ফরম তুলতে দেয় নি মমতার দল। যেসব পঞ্চায়েতে ভোট হয়েছে সেসবও হিংসা, হানাহানি,দখলবাজি, ছাপ্পা ভোটের জয় হয়েছে। এসবেই শেষ নয়, তৃনমূলের বহু নেতা সারদা-নারদা-রোজ ভ্যালী চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়েছে। মমতার বিরুদ্ধে মানুষের নাখোশ হওয়ার শুরু সেখান থেকে। কিন্তু বিজেপির পকেটে সেই জয়ের ফসল গেলো কি করে-কোটি টাকার প্রশ্ন এটাই। তৃনমূলের বিরোধী ভোট কেন বিজেপি পকেটস্থ করতে পারলো-বেশ আলাপের ব্যাপার। রাজনীতির পাঠ এই হিসেব মেলাতে পারে, বেশ ভালোভাবেই পারে। সারা রাজ্যে মমতা, কংগ্রেস বলতে কিচ্ছুই রাখেন নি। সিপিএম বলতে কিচ্ছু রাখেন নি। সবাইকেই বাধ্য করেছেন দলে ভিড়তে। সাড়াশি আক্রমনে নিচুস্তরের মানুষের টিকে থাকা দায় ছিলো। তৃণমূলি গুণ্ডাদের অত্যাচারে, তোলাবাজিতে মানুষ নিরাপত্তা চাইছিলো। পশ্চিমবঙ্গে ক্লাব পলিটিক্সের খুব চল আছে, এখনো আছে। সেসব ক্লাব তৃণমূলের একেকটি ক্যাম্পে পরিণত হয়েছে। লোকের তো নিরাপত্তা দরকার, বাঁচা দরকার, কথা বলা দরকার। মানুষ যখন দেখেছে রাজ্যে সিপিএম বা কংগ্রেসের শক্তি ক্ষয়িষ্ণু। মানুষ তখন বেছে নিয়েছে-তৃণমূলকে শায়েস্তা করতে মারদাঙ্গা বিজেপিকেই দরকার। কেন্দ্রের শাসনভার যাদের হাতে সেই তাদেরকেই মনে করেছে উপযুক্ত কারন শায়েস্তা হওয়া দরকার অথবা শিক্ষা হওয়া দরকার তৃণমূলের। একদম উচিত শিক্ষাটা দিয়েও দিয়েছে। ৪২ এ ৪২ এর আহ্লাদি আবদারে জল ঢেলে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ। এ কেমন আবদার বিরোধী থাকবে না রাজ্যে! কোন সমাজ হয় বিরোধীমত ছাড়া! কিন্তু আদর্শহীন নৌকার নাবিক মমতা সে স্বপ্নই দেখেছে। কিন্তু মমতার দলই বা অদ্ভূত বিরোধীশূন্যতার সবক দিচ্ছিলো কেন? দিচ্ছিলো এ কারনেই- মমতার দলের ভিত্তি আসলে কোন আদর্শ না। দলটির জন্ম সিপিএমের বিরোধিতা করে। না আছে রণনীতি, না আছে নিখিল ভারতের পরিকল্পনা, না আছে কর্মীস্তরে আদর্শিক আলাপ- এ সকল কারনে এখানে সবাই ভিড়তে পারে আবার সবাই হৈ হৈ করে চলে যেতেও পারে। তৃণমূলে কে নেই, সব আছে। নকশাল,সিপিএম,কংগ্রেস,আরএসপি,ফরোয়ার্ড ব্লক, হিন্দুত্ববাদী,সেলিব্রেটি; সবার সমাহার মমতার দলে। নিজেদের প্রডাক্ট নেহায়েত নেই বললেই চলে। দেখা যাক- তৃণমূল ছাত্র পরিষদ যদি সেরকম প্রডাক্ট হয়!
নির্বাচনের আগ মুহুর্তেও মমতা রাষ্ট্রীয় দপ্তরে বসে দল ভাঙানোয় মদদ দিয়েছেন। মালদা উত্তরের কংগ্রেসের এমপি মৌসম বেনজির নূরকে দলত্যাগ করিয়ে এনে লোকসভায় তৃনমূলের টিকেট দিয়েছেন। মুর্শিদাবাদে আলোচিত কংগ্রেস এমপি অধীর রঞ্জন চৌধুরীর (২০১৯ এ বাংলায় কংগ্রেসের দুজন এমপির একজন তিনি,টানা তিনবারের এমপি) বিরুদ্ধে দাড় করিয়েছিলেন অধীরেরই একসময়ের সহযোগী অপূর্ব সরকারকে। তৃণমূলের দল ভাঙ্গানোর এহেনও ইতিহাস নির্বাচনের আগমুহুর্তে মানুষ ভালোভাবে নেয় নি। তৃনমূলের পার্টি কালচার কেমন তা প্রার্থী তালিকায় নজর দিলে দেখা যায়। মমতা যাদপুপুরে এবার প্রার্থী করেছিলেন অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তীকে-একবার ভাবুন তো কমার্শিয়াল হিরোইন মিমি লোকসভায় ভারতের জনগণেরর জন্য কি আইন প্রণয়ন করবে? মমতা জানে আর তার ভগবান জানে।
বশিরহাটে প্রার্থী অভিনেত্রী নুসরাত। নির্বাচনের সময় যা বক্তৃতা দিয়েছেন তাতে বুঝা গেছে উনি কদ্দুর কি বলবেন। আসানসোলে মুনমুন সেন, ঘাটালে দেব। দেখা যাক, আগামী বিধানসভা বা লোকসভায় আরো কত চাঁদের হাট বসে। হ্যা,এটাই দৃশ্যমান বাস্তবতা যে- তৃণমূল রাজনীতিকে এমন জায়গায়ই নিয়ে গেছে। ভারতবর্ষের আইন প্রনয়ণ করবেন এই একঝাক পঙ্গপাল। লজ্জা!!
পশ্চিমবাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মমতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবার এটাও বেশ বড় কারন। এ তো গেলো মমতা ব্যানার্জির কথা তবে বিজেপি কি ফর্মুলা দিলো যে এতো এতো বাড়-বাড়ন্ত? ভিন্ন কিচ্ছুই নয়। মমতা যা করেছেন বিজেপি ঠিক তাই এপ্লাই করেছেন বঙ্গে। নির্বাচনের এক বছর আগে বিজেপি পাশার বড় দানটিতে চাল দেয়। এক সময়ের তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মুকুল রায়কে দলে ভেড়ান বিজেপি। সারা ভারতে তুলকালাম পরে যায়। মুকুল দলে ইন করার পর পরই যেন মমতার দলের অন্দরের খবর বিজেপি পেয়ে যায়। একে একে বহু এমএলএ-নেতা-এমপিকে দল ভাগিয়ে বিজেপিতে নিয়ে আসেন এবং সদ্য শেষ হওয়া লোকসভায় জিতিয়ে আনেন। তৃণমূলের লোকসভার এমপি সৌমিত্র খাঁ প্রথমে দলত্যাগ করেন। দলত্যাগ করে দলের মনোনয়ন নিয়ে জিতেও গেছেন ইতিমধ্যে অথচ এই সৌমিত্র খাঁকে এলাকায় ঢুকতেই দেয় নি তৃণমূল সরকার। কোচবিহারে তৃনমূলের যুবনেতা ছিলেন নিশীথ প্রামাণিক। নির্বাচনের ঠিক আগে বিজেপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন নিয়ে বিজেপির এমপি হয়ে গেছেন ইতিমধ্যে।
তৃনমূলের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিলো যেদিন ভাটপাড়ার বিধায়ক অর্জুন সিংহ দল ত্যাগ করে বিজেপির মনোনয়ন নেন কারন অর্জুন সিং তৃণমূলের এডামেন্ট নেতাদের একজন। যার হাতে ব্যারাকপুরের নিয়ন্ত্রন একচ্ছত্র। শেষমেশ অর্জুন সিং জিতেও গেছেন। তৃনমূলের জন্য আরেক ধাক্কা ছিলো, যে এমএলএ আসন ছেড়ে দিয়ে লোকসভায় লড়েছেন সেই ভাটপাড়া বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে ছেলেকে জিতিয়ে এনেছেন তৃনমূলের ডাকসাইটের নেতা মদন মিত্রকে হারিয়ে। মানে ব্যারাকপুর থেকে ধুয়েমুছে সাফ তৃণমূল। এর মধ্যে তৃণমূল ছেড়েছিলেন বোলপুরের বিধায়ক অনুপম হাজরা। বিজেপি থেকে মিমি চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে যাদপপুর থেকে যিনি লড়েছিলেন। সিপিএম থেকে খগেন মুর্মুকে ভাগিয়ে এনে বিজেপি প্রার্থী করেছিলেন কংগ্রেসের শক্ত গড় বলে খ্যাত মালদা থেকে এবং জিতিয়ে এনেছেন। খগেন মুর্মু জিতেছেন কংগ্রেস থেকে ভাগানো সেই মৌসম বেনজির নূরকে হারিয়ে। মমতার রাজনীতি যেখানে পুনর্জন্ম লাভ করেছিলো সেই সিঙ্গুরে বিজেপি প্রার্থী অভিনেত্রী লকেট চ্যাটার্জির কাছে তৃণমূল হেরে গিয়েছে। যে সিঙ্গুর মমতাকে মমতা বানিয়েছে সেই সিঙ্গুর মমতার গালে সপাটে চড় মেরেছে। পুরুলিয়া থেকে বিজেপির সুভাষ সরকারের কাছে হেরেছেন তৃনমূলের প্রথম সারির নেতা সুব্রত মুখার্জি। আর বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ মেদিনীপুর থেকে জিতে এসেছেন ‘একদা কংগ্রেসি’ মানস ভূঁইয়াকে হারিয়ে। বিজেপির আসানসোলের প্রার্থী ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী বাবুল সুপ্রিয়। তিনি হারিয়ে দিয়েছেন অভিনেত্রী মুনমুন সেনকে। আর যে দার্জিলিং নিয়ে এতো হুলুস্থুল সেই দার্জিলিং এ মমতার প্রার্থী হালে পানি পায় নি। জিতে গেছে জনমুক্তি মোর্চা আর বিজেপি সমর্থিত রাজু বিস্ত। মোটাদাগে এই হলো তৃণমূল বিজেপির জয়ের খতিয়ান। বিজেপির দল ভাঙানোর হিড়িকে যিনি চাণক্য সেই মুকুল রায় নিজে লড়েন নি কিন্তু সদ্যদলের সাফল্য এনে দিয়েছেন পূর্বতন তৃণমূল স্টাইলে। মমতা আর তার দল এখন কপাল চাপড়াচ্ছে। এখন তৃণমূলের নেতাদের নীতির কথা ফুটেছে, নৈতিকতার কথা ফুটেছে। রাজনীতির বিজ্ঞান এটাই – রাজনীতির মাঠ কখনো শূন্য হয় না। গনতান্ত্রিক শক্তির অনুপস্থিতি বা সুস্থ গনতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে চপেটাঘাত করলে প্রতিক্রিয়ার শক্তি আসবেই। বিজেপিও তাই এসেছে।
শেষমেষ যা দাঁড়ালো তা হলো তৃনমূল কংগ্রেস-২২, বিজেপি-১৮, কংগ্রেস-২ আর সিপিএম কোন আসনই পেলো না । ৪২ এ ৪২ এর ডাক দিয়ে মমতা এখন মুখ দেখাচ্ছেন কিভাবে কে জানে! মমতা পশ্চিমবাংলায় এখন জয় শ্রীরাম স্লোগান শুনলেই ক্ষেপে যাচ্ছেন, গাড়ি থেকে নেমে যাচ্ছেন। তেড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু জয় শ্রী রাম স্লোগানে এভাবে তেড়ে আসলে পাবলিক সাইকোলজি তো বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ে। মমতা কি তা জানেন না? জানেন কিন্তু নিজের একগুঁয়েমি থেকে বের হয়ে আসতে পারছেন না- এটাই বাস্তব। বিজেপির এমন উথথানের পেছনে দায় তো তারই। সিপিএম-কংগ্রেস দুঃশাসন তো অজানা নয় কিন্তু তাদেরকে অপেক্ষাকৃত সেক্যুলার ফোর্স হিসাবে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু তাদের দল ভেঙ্গে,পিটিয়ে,নাঙ্গা করে শূন্যের কোঠায় কে নামিয়ে এনেছে? গ্রাম-গঞ্জে সিপিএমের নিচুতলার কর্মীদের কারা অত্যাচার করেছে? কংগ্রেস কে ভেঙ্গে খান খান করেছে কে? সোজা উত্তর- মমতার দল। তাহলে পাবলিক রিএ্যাকশন ধারন করবে কারা? শূন্যস্থানে বিজেপি এসেছে, ব্যস। আর বিজেপির প্রতি এতো গোস্যা মমতার কেন, ঠিক বুঝা গেলো না। অটল বিহার বাজপেয়ির নেতৃত্বে বিজেপি সরকারের রেলমন্ত্রী কে ছিলেন? মমতা কি ভুলে গেছেন, তিনি নিজেই বিজেপির সরকারে মন্ত্রী ছিলেন। সুতরাং মমতার দলতন্ত্র আর একচ্ছত্র অনৈতিক শাসনের দায় রয়েছে পশ্চিমবাংলায় গেরুয়া আগ্রাসনের পেছনে। মমতা এই নির্বাচনের পরে বিভিন্ন আলোচনায় বলেছেন সিপিএমের ভোট নাকি শিফট করেছে বিজেপিতে। কি সাংঘাতিক চালাকি। মমতা জানেন সিপিএমের কর্মীদের ভোট প্রায় ফিক্সড এবং ইডিওলজিকেলি স্ট্রং তাই সেসব শিফট না করলে যতই বিজেপি হাকডাক দিক তাদের জয়ের রাস্তা নেই। কিন্তু নির্বাচনের পরে হিসেব উলটো। মানুষের ভোট পড়ল বিজেপির দিকে। কারন, ঐ যে পূর্বেই বলা হয়েছে-বিকল্পের উপর ভর করে মানুষের হাফ ছেড়ে বাঁচতে চাওয়া যেখানে সিপিএম-কংগ্রেস ব্যার্থ। বিশ্বনাথ চক্রবর্তী, একজন বিশ্লেষক, খুব সাদাসিধে একটা কথা বলেছেন- ‘তৃণমূল কংগ্রেস পঞ্চায়েতে ভোটলুটের জবাব পেলো’। পশ্চিমবাংলায় বিজেপি সর্বাগ্রে যে আওয়াজ তুলছে সেটি হলো এনআরসি/ নাগরিক পঞ্জীকরণ। এনআরসি ইস্যুতে অসমে ধুন্ধুমার হয়ে গেলো। বিজেপি বাংলাতেও এনআরসি’র আওয়াজ দিচ্ছে। এই ইস্যুতে ধর্মীয় মেরুকরণ হয়েছে বেশ প্রবল। যেমন ধরুন বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্র। বনগাঁতে মোট ভোটারের ৪০ শতাংশ এপার বাংলা থেকে দেশান্তরি মতুয়া সম্প্রদায় যারা এদেশের গোপালগঞ্জ,ফরিদপুর,যশোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। সেখানে বিখ্যাত মতুয়া ঠাকুরবাড়ির সন্তান শান্তনু ঠাকুর এনআরসি প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারই জেঠিমা তৃনমূলের মমতাবালা ঠাকুরকে হারিয়ে দিয়েছেন। স্রেফ হিন্দু মুসলিম ট্রাম্পকার্ড খেলে জিতেছে সেখানে। মুসলিম জনগনের অনেকেই তাই আতঙ্কে আছে- পাছে তাদের আবার অনাগরিক বানিয়ে দেয়া হয়। আর মতুয়ারা চায় ভারতের পূর্ণ নাগরিকত্ব সনদ, তারা যে সময়েই আসুক না কেন। দেখা গেছে নব্বই এর দশকেও যারা বাংলাদেশ ছেড়েছেন এমন মতুয়ারা সেখানে অনেক, তারাই দুহাত ভরে ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। অনুরূপে, দেশান্তরি হিন্দু বাঙালীদের একটা বিরাট অংশ বিজেপির দিকে ভিড়েছে। ধর্মীয় মেরুকরণের খেল এখানেই সফল। আর মুসলিমরা নিরাপত্তার আশায় ভোট দিয়েছে মমতাকে যারা একসময় সিপিএম কংগ্রেসের ভাগাভাগি ফিক্সড ভোটার ছিলো। মমতা তোষণের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়কে এভাবেই মেরুকরণের অন্য মেরু তৈরি করছেন। যার অর্থ এমন- মমতার গলায় মুসলিম আর বিজেপির গলায় হিন্দু। কিন্তু এই মেরুকরণ কতটা ভয়ানক তা কি ভেবে দেখেছে কেউ?
কিন্তু সিপিএম এর কি হবে। সংসদীয় সিপিএম এর কীর্তিকলাপ জনগন তো দেখেছে। কংগ্রেসের হিসাব বাদ। সিপিএম কে ঠেংগিয়ে ঠেংগিয়ে যাদের হাত রক্তে রঞ্জিত সেই তারা আর সিপিএম একসাথে সহবাসের জিকির তুলছে- আহ! কি রাজনীতি। কথা হচ্ছে সিপিএম আসলে কি টাইপের পার্টি? হ্যা জানতে চাওয়া উচিত কি টাইপের? বামপন্থার শক্তি? তা যদি হয় তাহলে মার্ক্স-লেনিন-মাও এর কেতাবগুচ্ছ তাদের আবার পড়তে হবে। মাঝে মাঝে অবাক হতে হয় ত্রিশ বছরের বামফ্রন্ট গেলো বাংলা থেকে, ত্রিপুরা থেকে গেলো, আছে শুধু কেরলে। সেটাও কবে যায় কে জানে!! পশ্চিমবাংলায় তিন দশক ক্ষমতায় থেকে সংসদের রাস্তায় এবার শূন্য হাতে ফেরি করছে সিপিএম। বলছি যে, নীতি ঠিকঠাক অনুসন্ধান দরকার। শক্ত-পোক্তভাবে লাল ঝান্ড ধরা দরকার। সিঙ্গুর-নন্দিগ্রামের মতো কর্পোরেট দালাল দাওয়াত দিয়ে আনার মতো কাজ যে একটা বামপন্থী পার্টি করতে পারে সে কথা ইতিহাসে আরো বহুদিন চর্চা হবে। লজ্জা কি লাগে তাদের? মনে হয় না।
পশ্চিমবাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় যদি আসে আগামী একুশের বিধানসভায় তাহলে পরিস্থিতি কি দাড়াবে আমাদের বাংলাদেশে-সে হিসেব কষা উচিত। অনুমেয় যে, বিজেপি আসলে এনআরসিতে জোর দেবে। মুসলিমদের একটা বড় অংশ কে তাড়ানোর হুজুগ তুলবে। কতটুকু কি করবে সেটা পরের ব্যাপার কিন্তু আওয়াজ তো দিবে। আবার সেখানে সংঘাত সংঘর্ষ বাধবে-আশঙ্কা করা যায়। ঠিক সেখানকার প্রভাবে এখানে মৌলবাদী মুসলিমদের দাপট বাড়বে। মৌলবাদী হিন্দু বনাম মৌলবাদী মুসলিমদের এই দ্বৈরথ কোন স্বস্তির বার্তা দেবে না। ভারতের বাংলাদেশ লাগোয়া অংশে যেকোন সংঘাত সংঘর্ষ নৈকট্যের কারনে অনেক বেশি প্রভাবিত করবে এখানে যতটা বাবরি মসজিদ বা গুজরাটকান্ডে প্রভাবিত হয়েছিলো তার থেকে বেশি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি একবার বলেছিলেন, ঘাড় ধরে বাংলাদেশে পাঠাবেন অনুপ্রবেশকারীদের। মানে মুসলিমদের।
কথাটার কার্যকারিতার থেকেও উস্কানিটা খেয়াল করুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − 12 =