জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-58

কদিন আগে আমার দ্বীপগাঁয়ের পাচঁ কিশোর নানা পথ ভেঙে অবশেষে এলো আমার ঢাকার ফ্লাটে। না চেনার পরও পরিচয় দিলো তারা আমার এলাকায় তাদের ‘বাবা’ কিংবা ‘দাদা’ বাড়ির, যাতে চিনতে কষ্ট হলোনা আমার তেমনটা। তাদের আবদার, “গ্রামে একটা “ব্যান্ড-গ্রুপ” করেছে তারা ১০/১২ জনে মিলে। নতুন অনুষ্ঠানে আমাকে যোগ দিতেই হবে”। নচিকেতা শ্রেয়া ঘোষাল কিংবা ফরিদা পারভীনপ্রেমি আমি ‘ব্যান্ড’ পছন্দ করিনা খুব একটা। তারপরো ঢাকা পর্যন্ত ওরা এলো আমায় নিমন্ত্রণ করতে, তাই এক বন্ধের দিন সত্যিই হাজির হলাম দ্বীপগাঁয়ে। কিন্তু ঘণ্টাখানেক এ নব্য গায়েন কিশোরদের বেসুরো গান তথা চিৎকার শুনে, কৈশোরে মায়ের কাছে শোনা একটা গল্প মনে পড়ে গেলো আমার। ঐ গল্পটা শুনে হাসতাম খুব আমি বন্ধুদের নিয়ে ছোটবেলায়। তাই ফেসবুক বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে চাই অনেক আগে শোনা সে পুরণো গানের দলের গল্প!

:

এ ব্যান্ড দলের মত কোন এক গাঁয়ের কিশোর-যুবকরা মিলে অনেক পরিশ্রমে তৈরি করলো একটা “গানের দল”। কিন্তু ২/৪ দিন এ বেসুরো বেঢপ গান শোনার পর গাঁয়ের লোকেরা বিরক্ত হয়ে ঐ যুবকদের তাড়িয়ে দিলো গাঁয়ের বাইরে বাগানের কাছে একদম খালি মাঠে। যেখানে সারাদিন গান গাইলেও কারো কানেই ঐ বিরক্তিকর গানের সুর পৌঁছবে না। কিন্তু স্রোতা দর্শকহীন গান আর কাহাতক গাওয়া যায়! তাই স্রোতাশূন্য গায়েনরা বসে বসে ঢোল মালিশ করতে থাকলো কদিন। বাগানের ঐ পথি যাচ্ছিল এক বুড়ো ভিক্ষুক। গানের দলের ছোকরারা তাকেই প্রস্তাব দিলো গান শোনার। কিন্তু বসে বসে গান শুনলে তার পেটে ভাত জুটবে? তাই গায়েনরা ভিক্ষুককে সারাদিন ভিক্ষার সমপরিমাণ টাকা দিতে রাজি হলো, বিনিময়ে খোড়া ভিক্ষুক বসে বসে কেবল গান শুনবে।

:

চমৎকার এ প্রস্তাবে ১-দিন ভিক্ষাতে না গিয়ে, সারাদিন গান শুনে বিকেলে টাকা নিয়ে ঘরে ফিরলো ভিক্ষুক। কিন্তু আর তো এ বেসুরা গান সহ্য করতে পারছে না তার কানদুটো। তাই পরদিন গান না শুনেই ঐ পথ এড়িয়ে ভিক্ষা করতে চলে যাচ্ছিল ভিক্ষুক। কিন্তু নাছোড়বান্দা গায়েনরা দৌঁড়ে তাকে ধরতে চাইলো গান শোনাতে। ভিক্ষুক গানাতঙ্কে পাশের বনে আশ্রয় নিলো ঘন জঙ্গলে। গায়েনরা এবার ভিক্ষুককে না পেয়ে জঙ্গল ঘেরাও দিয়ে শুরু করে দিলো তাদের সমবেত গান। ঘটনাক্রমে এক ভুত থাকতো ঐ বনে। সেও অতীষ্ঠ হলো এ তীব্র গান যন্ত্রণায়। ভিক্ষুককে ভুত বললো, “বাবা তোমার কারণে গানের দল এসেছে এখানে। তুমি চলে যাও এ জঙ্গল থেকে, তাহলে তোমায় এমন পানিপড়া দেবো যে, উজিরের মেয়েকে ভুতে পেলে এ পানিপড়া দিয়ে ভুত ছাড়াতে পারবে তুমি, তাতে উজির দেবে তোমায় অনেক মোহর “। এমন মিনতিতে পাতায় করে পানিপড়া নিয়ে রাতে কেটে পড়লো ভিক্ষুক।

:

আর এ পথে এলোনা সে। পানিপড়া নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো, কখন উজিরকন্যার ঘাড়ে চাপে ঐ মামদো ভুত। অপেক্ষার পর একদিন উজির ঘোষণা করলো, “তার মেয়ের ভুত নামাতে পারবে যে লোক, সে পাবে নগদ ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা”। ভিক্ষুক কথামত ভুতের গায়ে পাতার জলটুকু ছিটাতেই ভুত পলকেই পালালো উজিরকন্যাকে ছেড়ে। ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে হাসতে হাসতে বাড়ি এলো খোড়া ভিক্ষুক। কিন্তু পরদিন রাজার কোতোয়াল হাজির ভিক্ষুকের দরজায়। বললো, “রাজার মেয়েকে ভুতে পেয়েছে এবার। তাই তোমার ছাড়াতে হবে ভুত”। ভিক্ষুককে দেখে রাজকন্যার কাঁধে বসা ভুত হাসতে হাসতে বললো, “আমাকে আর নামাতে পারবে না রে খোড়া ভিক্ষুক। কারণ তোর পাতার পানিটুকুতো শেষ”। ভুত ছাড়াতে পারছে না দেখে রাজা ঘোষণা করলেন, “উজির কন্যার মত যদি ১-ঘন্টার মধ্যে তার কন্যার ঘাড় থেকে ভুত না নামায় ভিক্ষুক, তবে এখনই গর্দান কাটবে তার”।

:

উপায়ান্তর না দেখে বুদ্ধিমান ভিক্ষুক এবার ভুতকে শুনিয়ে বললো –

– “তবে যাই গানের দলকে ডেকে আনি”।

এ কথা শোনামাত্র ভুত কড়জোড়ে বললো, “নারে বাবা আর ডাকতে হবেনা ঐ হেড়েগলার গানের দল, আমি এখনই কেবল রাজকন্যার ঘাড় নয়, এ রাজ্য ছেড়েই পালিয়ে যাচ্ছি”!

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 59]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

78 − = 74