হামিদঃ না ফেরা অসংখ্য মানুষদের গল্প

“আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে…“

উপরের উদ্ধৃতিযুক্ত আর্তনাদ নিশ্চয়ই আমাদের মনে থাকার কথা। প্রায় এক বছর আগে এমনই এক সময়ে এই ফোনালাপটি সারা দেশে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলো। টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের মেয়ের মেয়ের আর্তনাদ এটি। একরামুল হক তার মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে এক পর্যায় আর তার বোবা কান্না চেপে রাখতে পারে নি। ওদিকে ফোনের ওপ্রান্তে আদরের মেয়েটি তা বুঝতে পেরেই বারবার বলেছিল, ‘তুমি কখন বাসায় ফিরবে…!‘ না, একরামুল হক আর তার মেয়েদের কাছে স্ত্রীর কাছে কখনোই ফিরে আসে নি। এই ফোনালাপ রেকর্ডরত অবস্থায়ই মিনিট দশেকের মধ্যে র‍্যাবের গুলিতে একরামুল লুটিয়ে পড়ে। ফোনের ওপ্রান্তে তার মেয়েদের তার স্ত্রীর গগনবিদারী আর্তনাদ আর কান্না তখন ইথারে ভেসে ভেসে কীভাবে জানি সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছিল। সারা দেশের মানুষ এই নিয়ম করা র‍্যাবের হত্যাকাণ্ড নিয়ে এতোদিন ধরে কিছু না বললেও সেদিন যেনো কিছুটা ভয়ে শিউরে, নিজেদের অজানা পরিণাম চিন্তায় আঁতকে উঠেছিল। প্রতিবাদ বলতে সোস্যাল মিডিয়া আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বেশ কিছুদিন এ নিয়ে হইছই হয়েছিলো কিংবা একে এক ধরণের প্রতিবাদও বললে বলা যায়! তারপর যেইসেই। দেশের প্রেক্ষিতে আমাদের পাহাড়ে তো রোজই এসব কোনো না কোনোভাবে আদিবাসী পাহাড়িদের দেশের সেনাবাহিনি, সেটেলাররা মিলে নির্যাতন করছে আর নিয়মিত বিরতিতে গুম, খুনের জন্য তো দেশের সেনাবাহিনি তো আর আছেই। সারা দেশে র‍্যাবের নির্বিচার ক্রসফায়ার, সাদা পোশাকে পুলিশের গুম, খুন তো দেশে এখন রীতিমত জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে!
বিচারহীনতার এই চিত্র আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। বলা যায় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ অবধি তা বহাল তবিয়তে চলমান আছে। আমাদের দেশে ক্রসফায়ারের সূচনা বলা যায় স্বাধীনতার পর পরেই। মূলত সিরাজ শিকদারকে ক্রসফায়ার করে হত্যার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে ক্রসফায়ারের সূচনা হয়। সেই আমল থেকেই পুলিশের পোশাকে কিংবা সাদা পোশাকে এই ক্রসফায়ারের শুরু।

তেমনি প্রতিবেশি ভারতে সত্তরের দশকে নকশালদের ঠেকাতে এই ক্রসফায়ারের প্রচলন হয়। যদিও এর ইতিহাস আরও আগের। ইংরেজরা ভারতবর্ষের স্বদেশী বিপ্লবীদের আঁচ পেলেই এভাবে পাখির মতো গুলি করে মারতো, নয়তো ধরতে পারলে বিচারের নাম করে ফাঁসিতে লটকাতো। তো এই পদ্ধতিই পরে ভারত-বাংলাদেশে বহাল থাকে। যা আজও আছে। ভারতে এই পাখির মতো গুলি করে নকশালদের লাশ ফেলে উল্লাস করা পুলিশেরা তখন ভারতের অনেকের কাছেই হিরোর আসনে ছিলো। এই পুলিশেরা কেউ কেউ আজও বেঁচেবর্তে আছে। এরপর আশির দশকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সারা বিশ্বে তথাকথিত গণতন্ত্র, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের নানান রূপ দেখা দেয়। রাশিয়া-চিন কেন্দ্রিক যে মার্কস-লেনিনবাদ তা ভারতে এসে নানানভাবে নানারকম মতপথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। ‘মাওবাদ’ নামে ভারতে এখনকার যে তরিকা তা নকশালদের থেকে বিরাট ফারাক আছে। এরপর ভারতের ভেতরকার সন্ত্রাসবাদ, নানান ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ মিলে এই বিরাট জনসংখ্যার, বিরাট আয়তন, নানান জাতি ও নানান ভাষাভাষী মানুষের এই দেশে এই সন্ত্রাসবাদ এখন নিয়মিত চিত্র বটে। এসবের ফলে সংক্ষেপে বললে বলা যায় ভারতে বিচারহীনতার এই আকালে এই ‘অনার কিলিং’ যেনো সব সমস্যার রাতারাতি সমাধান! ফলে ভালোমন্দ শেষে জনসাধারণের জন্য গড় চিন্তা হলো নির্বিচার ‘ক্রসফায়ার’ বেশ স্বস্তির এক নিঃশ্বাস। প্রশাসনের জন্য তো তা আশীর্বাদস্বরূপ!

‘হামিদ’ সিনেমার মূল আখ্যানটি মুহম্মদ আমিন ভাটের গল্প “প্লে ফোন নাম্বার সেভেনএইটসিক্স (৭৮৬)“ গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে। সমস্যা সঙ্কুল জম্মু-কাশ্মিরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের এক অতি সাধারণ এক চিত্র নিয়ে এই ‘হামিদ’ সিনেমার কাহিনি। যেখানে হাজার হাজার পরিবারের গল্প হলো এই সিনেমা। একজন দিন আনে, দিন খায় এমন লোকের গল্প নিয়েই বিস্তৃত হয়েছে এই সিনেমাটি। যার প্রধান ভূমিকায় হামিদ। তার বয়স এখন সাত। যে দুনিয়ার এই কুটিল রাজনীতি কিছুই বুঝে না। যে মানুষ হয়ে মানুষকে নিজ হাতে হত্যা করার তরিকাকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে। তার ভাষ্যে-

„মানুষ হয়ে মানুষকে হত্যা করার অধিকার পৃথিবীর কারুইই নাই। তা একমাত্র আল্লার!”

এইরকম এক আত্মপ্রত্যয়ী ছেলে হামিদ। বাবা-মা আর সে। এই তাদের পরিবার। তার বাবা পেশায় একজন নৌকার কারিগর। কাঠের নৌকা বানানোই তার পেশা। শুধু নৌকা বানানোই নয়, নৌকায় সুন্দর করে রঙ করে সেই নৌকাকে অত্যন্ত নজরকাড়া করে তোলাও তার একটি শখ। পেশা হিসেবে এটি তার কাছে যেমন রুটিরুজির, তেমনি শখের। আরেকটি শখ হলো শায়েরি রচনা করে। চমৎকার পদ্য ছন্দে উর্দুতে শায়ের রচনা করে সে। আধ্যাত্মিক সূফি ঘরানার একেকটি শায়ের। হামিদ মূলত তার বাবাকে কেন্দ্র করেই তার সাত বছরের পৃথিবী গড়ে তোলে। চারদিকে আদিগন্ত পাহাড় আর পাহাড়ি নদী আর জলাদার ঘেরা এক পরিবেশে সে তার বাবার আদর্শে নিজেকে নিজে এই সাত বছরে পুরো পাহাড়ি জম্মু-কাশ্মিরকে যেনো ধারণ করে নিয়েছে! এই হামিদই যেনো পুরো জম্মু-কাশ্মির। হামিদ স্কুলে যায়। যেতে যেতে বাবাকে চিন্তা করেই রওয়ানা হয়। ফেরেও একইরকম চিন্তা মাথায় রেখে। মোদ্দাকথা আট দশটা জম্মু-কাশ্মিরের কিশোর-বালকদের মতো হামিদ নয়। এই বয়সেই কেমন যেনো ভাবুক। কেমন যেনো পরিণত। পর্দায় হামিদরূপী এই শিশু অভিনেতাকে দেখে মোটেও অতিরঞ্জিত কিছু মনে হয় না। মনে হয় এ যেনো বাস্তব দেখছি। মোটেও সে বাড়িয়ে কিছু করছে না। একদম স্বাভাবিক!

বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ এক ছোটগল্প ‘জিবরাইলের ডানা’। গল্পকার শাহেদ আলীর নানান গল্পের মধ্যে অন্যতম এই গল্পটি। সেই গল্পের প্রধান চরিত্র নবী। যে বিড়ি কারখানার শ্রমিক। যে সামান্য মজুরি পায়। মা ভিক্ষুক। মা-ছেলের জোড়াতালির সংসার। খেয়ে না খেয়ে আধপেটা তাদের চলে। অভাব, দারিদ্র আর অনটনের মধ্যে দিয়ে এই কিশোর নবী নিজেকে নিয়ে এক সুন্দর স্বপ্ন দ্যাখে। স্বপ্নের জাল বুনে চলে। সেই স্বপ্নের প্রহেলিকায় সে রোজ চিঠি লেখে। জিবরাইলের মাধ্যমে সে চিঠি পাঠায় আল্লার কাছে। যাতে তার অভাব অনটন দূর হয়ে যায়। সে রোজ ঘুড়ির নাটাইয়ে চিঠি বেঁধে উড়িয়ে দেয়। আর প্রতীক্ষায় থাকে কখন সেই চিঠির জবাব আসবে! সত্যিই কী জবাব আসবে? সত্যিই কী তার এই দুঃখ, এই আজন্ম দারিদ্র দূর হবে…? তার এতোসব জবাব কে দেবে…? তাই সারাক্ষণ নবীর মাথায় এইসব চিন্তা…

„কিন্তু খোদা তো পয়দা করেছেন সবাইকে। তিনি কেন তার রহমত একতরফা বিলিয়ে দেবেন মালদারদের মধ্যে? কোনোদিন কি ঘুমের ঘোরেও দরিদ্র বান্দার দুঃখে অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে না তার চোখ? সত্যি কি গরিবরা ঘুম ভাঙাতে পারে না তার?“

আমরা জানি সেই স্বপ্নের মোহভঙ্গ এই সমাজ-রাষ্ট্রে কী নির্মমভাবে হয়। নবীর মতো কোটি কোটি লোকেদের ভাগ্যে কী বিধি-বিধান লেখা আছে তা এই রাষ্ট্র থেকে পাশের দেশ ভারতেরও চিত্র প্রায় একই। সব একই। শুধু সীমান্ত, কাঁটাতার বাদে সবকিছু প্রায় এক। ধর্ম, জাতি ও ভাষা বাদ দিয়ে ভাবলে দেখবো, চিত্র সে এক আছে। সবই এক খোপে, একই মাপে আঁকা!
গল্পকার শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’র নবীর কৌতূহল, প্রশ্ন-উত্তর আপাতত ঢাকা দিয়ে আসুন ফের ফিরে যাই ‘হামিদ’ সিনেমার জম্মু-কাশ্মিরের সাত বছরের হামিদের কাছে। তার কী অবস্থা তাও তো জানতে হবে। এই হামিদও কিন্তু অনেকটা শাহেদ আলীর গল্পের নবী ছেলেটার মতো। হামিদ অবশ্য নবী’র মতো চিঠি লেখে না। সে আল্লার কাছে ফোন করে। সে আল্লার কাছে তার অবস্থা জানিয়ে বিশেষ কিছু চায়ও না। অভাব নিয়ে খুব একটা কিছু বলে না। তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বলে। ন্যায় বিচার নিয়ে কথা বলে। নিজেদের ন্যায্য পাওনাগণ্ডা নিয়ে বলে। সে আল্লার কাছে এভাবেই ফোনে কথা বলে। আল্লার ফোন নাম্বার, ঠিকানা অন্যকারো কাছে না থাকলেও এই নবী, হামিদদের কাছে আছে। থাকে! হামিদ জম্মু-কাশ্মিরের উত্থাল রাজনৈতিক স্লোগানময় সবকিছুকে তার আশ্চর্য হিম শীতল আচরণে নিজের মধ্যে গিলে নিয়ে সূফি ব্যক্ত্বিতে ধারণ করে চলে।

গল্পের এই পটভূমিকায় জম্মু-কাশ্মির ইস্যুতে অনেকের নানান রাজনৈতিক ইচ্ছের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখলে পরে হামিদের এই চরিত্র অনেকটা আরোপিত মনে হতে পারে। শুধু মনে হতেই পারে তা না কেউ কেউ বলতে পারেন এরকম হতেই পারে না। এ স্রেফ বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এক কল্পিত চরিত্র রূপদান করা হয়েছে। এ স্রেফ কল্পিত বয়ান। বানোয়াট। যা মোদ্দাকথা দাঁড়ায় হয় তাকে ভারতীয় গড় চিন্তায় উগ্রবাদী রূপে হাজিরা দিতেই হবে না হয় হামিদকে ভারতীয় সমাজের হয়ে নিজেকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এক ধরণের আফসরফা করে বসবাস করতে হবে। এর বাইরে আর বিকল্প কোনো পথ নেই। আর কোনো তরিকা নেই। এই ভেদ-বিভেদের মানভঞ্জন নিয়েই হামিদ তার লড়াই জারি রাখে। আশ্চর্য এক শান্তি নিয়েই সে পাহাড় ঘেরা জম্মু-কাশ্মিরের পাহাড়ি নদীতে বাবার মতো নৌকা বানিয়ে ভেসে বেড়ায়! নৌকায় সুন্দর করে রঙ করে সে আর তার মা নৌকা নিয়ে পাহাড়ি নদীতে ছুটে চলে। তাদের সম্মুখে আদিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়। সম্মুখে নীল আকাশ। নৌকার রঙ লাল। টকটকে লাল। এই আশ্চর্য, অপার্থিব সুন্দর সময়ে আমাদের মাথায় খালি প্রশ্ন জাগে এতো ঘটনা ঘটার পর এখন তাহলে হামিদের বাবা কই…? আর নৌকার রঙইবা এতো লাল কেনো? কেমন তাজা লাল টকটকে নৌকার রঙ। মানুষের রক্তে রঞ্জিত যেনো এই নৌকার রঙ। এ তো যেনো রঙ নয়, যেনো টাটকা রক্ত। মানুষের রক্তে রঞ্জিত এই নৌকার রঙ। রক্ত রাঙা তাজা লাল রঙ…!

বিঃদ্রঃ আজ বিশ্ব বাবা দিবস। পৃথিবীর সব বাবারা ভালো থাকুক। সব সন্তানেরাও ভালো থাকুক। সব পিতারা তার সন্তানদেরকে নির্বিঘ্নে আগলে রাখুক। সন্তানরাও তাদের বাবা-মাকে বুকে আগলে রাখুক। পৃথিবীটা সবার জন্য এক শান্তিময় হোক, মানবিক হয়ে উঠুক। আর কেউ এভাবে যেনো একরামুলের মেয়েদের মতো না হয়, আর কেউ যেনো এভাবে নবী-হামিদের মতো নাম না জানা হাজার হাজার শিশু-কিশোরেরদের মতো বাবা বিহীন, মা বিহীন জীবন নিয়ে বেড়ে না ওঠে!

Hamid
Directed by Aijaz Khan
Starringঃ Rasika Dugal, Vikas Kumar, Talha Arshad Reshi.

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 + = 39