অস্থির হংকং

হংকং এর রাজনীতিতে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি বিগত প্রায় এক দশক থেকেই বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে। হংকং এবং চীনা শাসকদের মধ্যকার দড়ি টানাটানির ইতিহাস আরো পুরনো। চলতি সময়ে হংকংয়ের একজন নাগরিককের বিরুদ্ধে তাইওয়ানের অধিবাসী এক অন্তঃস্বত্তা বান্ধবীকে হত্যার অভিযোগ উঠে। সমস্যা হচ্ছে, তাইওয়ানের সঙ্গে হংকং এর কোন ধরনের বন্দীবিনিময় চুক্তি বা আসামী বিনিময়/সমর্পণ সংক্রান্ত কোন চুক্তি নেই। অভিযুক্ত হংকংয়ের নাগরিককে বিচারের জন্য তাইওয়ানে পাঠানোর জন্য হংকং এর পার্লামেন্টে আসামী প্রাত্যার্পণ সংক্রান্ত একটি বিল আনে যার মাধ্যমে হংকং কর্তৃপক্ষ তাইওয়ানের কাছে অভিযুক্তকে তুলে দিতে পারবে বিচারের জন্য। কিন্তু হংকংবাসী মনে করছে পার্লামেন্টে উথথাপিত বিলের যে সারবত্তা তার মাধ্যমে যেকোন রাজনৈতিক অভিযুক্তকে বা প্রতিপক্ষকে হংকংয়ের চীনা প্রভাবিত শাসকগোষ্ঠী চীনের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ হবে। আর এটাই বহুল বিতর্কিত ‘এক্সট্রাডিশন বিল’ যার বিরুদ্ধে রাজপথ কাপাচ্ছে হংকংয়ের জনগণ। হংকংয়ের পরিস্থিতি নিয়ে বিগত সপ্তাহে সিংগাপুর ভিত্তিক গণমাধ্যম সিএনবিসি’র এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিবেদক চেরি ক্যাং এবং ভূরাজনীতি-অর্থনীতি প্রতিবেদক গ্যারি শাঁ হংকংয়ের পুরো পরিস্থিতিকে খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। বিগত ক’দিনের টালমাটাল পরিস্থিত কতটা উত্তপ্ত তা আঁচ করা গেছে তাদের পর্যবেক্ষন থেকে।
সরকারী সদর দপ্তরের পাশে রাস্তায় বিক্ষোভরত মানুষের উপর রায়ট গিয়ারে টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ছে পুলিশ, বিক্ষোভকারীদের রোষে সরকারি ভবনের স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির ছাপ স্পষ্ট। পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের লড়াই সেখানে থামছেই না। বিক্ষোভকারীদের রুখে দিতে পুলিশ ব্যারিকেডের উপর উঠে চড়াও হচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করছে।
?v=1561997994&w=740&h=493?v=1561997994&w=740&h=493″ alt=”পুলিশের এ্যাকশন” />
মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিক্ষভকারীরা পার্লামেন্ট ভবনের সামনে এবং ভেতরে অবস্থান নিয়ে তাদের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে। হংকংয়ের আইনসভার দুজন সদস্য আল্ভিন ইয়াং এবং রয় কোয়াং মধ্যরাত শেষে জানান যে ভেতরে আর কেউ অবশিষ্ট নেই। পুলিশ মুলত বিক্ষোভকারীদের ভবন্ থেকে হটাতে হেন কোন পথ নেই যা অবলম্বন করে নি। সেখানকার স্থানীয় সময় ৪ টায় পুলিশ হেডকোয়ার্টারে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ প্রধান স্টিফেন লো বলছিলেন, সরকারি ভবনের ভেতরে সহিংসতায় জড়িত সকলকে বের করে সেখানে শান্তি ফেরানো হয়েছে। আর কোন বিক্ষোভকারী সেখানে অবশিষ্ট নেই। পুলিশ ঘন্টাব্যাপী সরকারি ভবনের ভেতরে অবস্থা নিয়ে সেখানে উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়েছে বলে মিস্টার লো দাবি করেন। পুলিশ প্রধান বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে এক প্রস্থ অভিযোগ এনে বলেন; ভেতরে বিশেষ ধোয়া তৈরি করা হয়, লাইট-বৈদ্যুতিক সার্কিট এর ক্ষতিসাধন করা হয়। পুলিশের পদক্ষেপের সাফাই গেয়ে পুলিশ প্রশাসনের ভাষায় দাবি করা হয় “no choice but to temporarily retreat” । বলপ্রয়োগের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই বলে যে- বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তার জন্যই নাকি দরকার ছিলো তাদের।
?v=1561997562&w=740&h=493?v=1561997562&w=740&h=493″ alt=”গণতন্ত্রপন্থীদের বিক্ষোভ” />
অন্যদিকে হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী যার পদত্যাগেও সমানতালে আওয়াজ উঠছে তিনি অভিযোগ করছেন বিক্ষোভকারীরা নাকি ‘extreme use of violence’ করছেন। লেডি ক্যারি ল্যাম মন্তব্য করেন যে সোমবারের সহিংস ভূমিকা এবং বিগত সময়ের প্রতিবাদের মধ্যকার পার্থক্য তিনি প্রত্যক্ষ করছেন। তার মতে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এখন আর নেই। তিনি হংকংয়ের বাসিন্দাদের ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান জানান।
এদিকে, ১ জুলাই হলো সেইদিন যেদিন হংকং কে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ চীনের কাছে হস্তান্তর করে। বিক্ষোভের আঁচ যেন তাতে আরো বেড়ে যাচ্ছিলো। হংকংয়ের মানুষ এদিনটিকে প্রতিবছর উদযাপন করে। এবারের উদযাপনে বিদ্রোহের খৈ ফুটছে। প্রতিবছর হংকংবাসী গণতন্ত্রের দাবিতে এদিনটিকে পালন করে। বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, এবারের ১ জুলাইয়ে আরো অধিক সংখ্যক মানুষ গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভে নেমেছে এবং আরো নামবে। এক্সট্রাডিশন বিলের বিতর্কিত উথথাপন মানুষকে আরো আকর্ষন করবে এই বিক্ষোভের দিকে। সোমবারে বিক্ষোভের চিত্র সেরকমই ছিলো। হাজার হাজার গণতন্ত্রকামী মানুষের অভিযাত্রা দেখা গেছে হংকংয়ের পার্লামেন্ট ভবনের আশেপাশের রাস্তায়। পুলিশ সরকারি ভবনের পাশে যেখানে অবস্থান নিয়েছে সেখানে আনুমানিক ১৫০০০ বিক্ষোভকারী একত্রিত হয়েছে। ১০০ জনের দাঙ্গা পুলিশ দল এবং ব্যাটন,পিপার স্প্রে নিয়ে গণতন্ত্রপন্থীদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে যাতে সরকার নির্ধারিত হংকং হস্তান্তরের ‘সরকার পরিকল্পিত অনুষ্ঠান’ ব্যাহত না হয়। হংকং লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সরকারি ভবনে হামলার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ইঙ্গিত দেন কিন্তু বিক্ষোভকারীরা তাদের নিজেদের হাতে স্টিলের দ্বন্ড দিয়ে অবস্থান থেকে সরছেই না। হংকং মূলত দুই রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত। এর সকল কিছুতেই দুটি বিভক্তি লক্ষ্য করা যায়। বেইজিং পন্থা আর গণতন্ত্রপন্থা বলে চর্চিত এই দুই ধারার দ্বন্দে মাঝেমাঝেই হংকং উত্তপ্ত হয়। তবে হংকংয়ে গনতন্ত্রপন্থীদের সবচেয়ে বড় জমায়েত সর্বশেষ এটাই। উত্তাল হংকংয়ে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে বেইজিংপন্থীরা। ক্যারি লাম যেন বোধোদয় হয়েছে। বিগত বিক্ষোভ অসন্তোষের পর লেডি ল্যাম বলছেন, ‘তিনি এই বিক্ষভে মানুষের কাছ থেকে অনেককিছু শিখেছেন। জনগনের ইচ্ছা, আবেদন এবং মনোভাবকে মূল্যায়ন করে তিনি পরবর্তী সময়ে হংকংয়ের জন্য সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি রাজনীতিক হিসাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন জনগনের সেন্টিমেন্টকে সঠিক এবং পূর্ণরূপে আমলে নেয়া উচিত’। বিক্ষোভকারীদের উদেশ্যে সর্বশেষ যে বার্তা ক্যারি ল্যাম দিয়েছেন তাতে তিনি বলছেন, বিক্ষোভকারীদের সকল দাবিতে ইতিবাচক না হওয়ার ‘ভালো কারন’ রয়েছে আবার তাদের অনেক দাবিতে কর্তৃপক্ষ ‘খুব ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া’ দেখিয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের ছেড়ে দেবার বিষয়ে বলেন যে আইনত সেটা ঠিক হয় না বরং যথাযথ তদন্তের পর তারা মুক্তি পাবেন। বর্তমানে যা পরিস্থিতি তাতে গণতন্ত্রপন্থীদের অংশ যে জায়গায় অনড় তা হচ্ছে বিতর্কিত বিলকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে এবং চিফ এক্সিকিউটিভ ক্যারি ল্যামকে সরে যেতে হবে। কিন্তু অন্য পক্ষ বলছেন বিলটিকে আংশিক মাত্রায় সরালেই চলবে এবং তাদের প্রতিনিধিই ক্যারি ল্যাম। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে যে ক্যারি ল্যামের বেইজিংয়ের দিকে অতিমাত্রার ঝুঁকে পড়া তার পাড় সমর্থকদেরও অস্বস্তিতে ফেলেছে। লেডি ল্যামের তুমুল সমালোচনার এটাও একটা বড় কারন। অনেকের মতে, বিক্ষোভ দমনে ল্যামের পদ্ধতি এবং পুলিশি ব্যাবহার চীনা কর্তৃপক্ষের প্রতি অতি আনুগত্যের প্রভাবে এবং তিনি এক্ষেত্রে চীনা শাসকদের মতোই নির্দয়। তবে সব কিছু সামলে ক্যারি ল্যাম হংকংকে নতুন শুরু এনে দেবার কথা বলছেন। হংকং এর সকল পক্ষকে তাদের ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির কথা স্মরণ করাচ্ছেন। একজন ইউরেশিয়া বিশ্লেষক এন্ড্রু কফ্লান বলছেন, ‘ইতিমধ্যেই হংকং বেইজিংয়ের কাছে অনেককিছুই হারিয়েছে’। গনতন্ত্রপন্থীদের অভিযোগ এবং রাগটাও ঠিক এখানেই। সেকারনেই বেইজিংপন্থী শাসকদের প্রত্যার্পণ বার্ষিকীতে গণতন্ত্রপন্থীদের ঠেকাতে তাই হংকং কর্তৃপক্ষ যতই পদক্ষেপ নিচ্ছে তাতে যেন কোন কাজ হচ্ছে না।
?v=1561970109&w=740&h=493?v=1561970109&w=740&h=493″ alt=”হংকংয়ের বিশাল বাণিজ্য স্থাপনা” />
প্রকৃতপক্ষে হংকং এবং চায়না কর্তৃপক্ষের সম্পর্কটা অনেক জটিল। হংকং এর অধিবাসীদের অনেকেই আছেন যাদের মনেই করেন না যে তারা চিনের অংশ। তারা নিজেদের স্বশাসনকে স্বাধীনতাই মনে করে। মনে করার যথেষ্ট কারনও আছে। চিন হংকং এর উপর নিজেদের ব্যাবসায়িক বা রাজনৈতিক নীতির পুরোটা বাস্তবায়ন তো করেই নি বরং তারা সেখানে একটা বিশেষ টেরিটরির মর্যাদা পায় যা সার্বভৌম রাষ্ট্রের চেয়ে কম কিসে! চিন মূলত হংকং কে একটি চাতুর্যপূর্ণ নীতির অংশ হিসাবেই ব্যাবহার করে। যেমন ধরুন নিজের দেশে তারা ‘একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমাজতন্ত্র’ বা তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির লাগু করেছেন কিন্তু হংকংয়ে অন্য নীতি। এটাই এক দেশ দুই নীতি। আর হংকং ভূখন্ডে জারিকৃত নীতি দিয়েই বিশ্বের বড় বড় বাজারে প্রবেশের ‘চিনা গেটওয়ে’ গড়ে তুলেছে চিন। যার ভেতরের কথা হচ্ছে এমন যে চিনা পণ্যকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতে হংকংয়ের মাধ্যমেই মুক্ত বাজার অর্থনীতির ষোলআনা সম্ভোগ করে থাকে চিন। হংকং সে কারনেই বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছে। চিনের মূল ভূখন্ড এবং হংকংয়ের মধ্যকার Closer Economic Partnership Arrangement —CEPA চুক্তি মূলত এমন অদ্ভূত সম্পর্কের অবতারণা ঘটিয়েছে। হংকংয়ের আকশচুম্বী দালান, ট্রেড সেন্টার মূলত চিনা বাণিজ্যের চারণভূমি। মূলত গণতন্ত্রের জন্য লড়াই আসলে হংকং বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্ককে ঠিক কতখানি কোথায় নেবে তা বলা খুব মুশকিল তবে কিছু অনুমান করা যায়। এই যেমন ধরুন, আর বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিনের আরো বিনিয়োগ হংকং পরিস্থিতিকে খুব সহজেই খুশি করার মাধ্যমে হালকা করতে পারে।
আবার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অন্য বিশ্লেষকরা বলছেন পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে পুলিশ ইতিমধ্যেই আক্রান্ত হওয়া শুরু করেছেন। বলপ্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরো খারাপের দিকেই নিয়ে যাবে। আর এসকল আন্দোলোন মূল ভুখন্ডের সাথে সম্পর্ককে আরো হালকা করবে বলেই ধারনা।

ভাষান্তর- মুজাহিদ অনিক
মূল প্রতিবেদন- চেরি ক্যাং এবং গ্যারি শাঁ, সিএনবিসি, সিঙ্গাপুর

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =