পলিনেশিয় দ্বীপদেশ ও ডাইনি তুকাতিয়া পর্ব : ১

২০১২ সনে নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াতে লং টার্ম প্রশিক্ষণের অংশ ছিল দক্ষিণ প্যাসিফিকের পলিনেশিও কোন একটা দেশ ভ্রমণ। সে হিসেবে ডিসেম্বরের ৬-তারিখ আমাদেরকে নেয়া হয় পলিনেশিয়ান দেশ টোঙ্গাতে। টোঙ্গা ভাষায় যার নাম Puleʻanga Fakatuʻi ʻo Tonga মানে পুলেʻআঙা ফাকাটুʻই ও টোঙা। আর ইংরেজিতে Kingdom of Tonga। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র এটি। যা ফিজির প্রায় ৬৫০-কিমি দক্ষিণ-পূর্বে এবং নিউজিল্যান্ডের প্রায় ১,৮৫০ কিমি উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। পলিনেশীয় দ্বীপগুলির মধ্যে একমাত্র টোঙ্গাতেই রাজতন্ত্র টিকে আছে। নুকুয়ালোফা এটির রাজধানী এবং বলা যায় প্রধান কিংবা একমাত্র শহর। প্রতিবেশী আরেক দ্বীপরাষ্ট্র কুক আইল্যান্ড। দেশটির জনসংখ্যা ১,০০,৬৫১ জন এবং আয়তন ৭৪৮ বর্গ কিলোমিটার। দেশটির প্রধান নিউজ পেপারের নাম “কালোনিকালি”! সিডনি থেকে বিমানযোগে টোঙ্গাতে পৌছেই আবার প্লান করলাম, টোঙ্গার মূল শহর থেকে ১৭১-কিমি দূরের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ‘নুকুনুকুমোতু’-তে যাওয়ার। কারণ কবছর আগে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, এমন একটা দ্বীপে একাকি ঘুরে বেড়াচ্ছি। সঙ্গীদের কেউ আমার সাথে বিচ্ছিন্ন জনমানবহীন দ্বীপ ‘নুকুনুকুমোতু’-তে যেতে রাজি হলোনা। সুতরাং একাই পরিকল্পনা করলাম ওখানে যেতে। ইঞ্জিনচালিত একটি দেশি বোট ভাড়া করলাম ‘নুকুনুকুমোতু’-তে যেতে। যা বেশ গতিময়। পথে খুব সমস্যা না হলে ৪-ঘন্টায় পৌঁছতে পারবো ‘নুকুনুকুমোতু’ দ্বীপে।
:
৭-ডিসেম্বর সকাল ৮-টায় বোট স্টার্ট করলাম ‘নুকুনুকুমোতু’র দিকে তাক করে। প্যাসিফিকের কাকচোখের মত শান্ত স্বচ্ছজল কেটে ৪-ঘন্টার বেশি লাগলো না কাঙ্খিত দ্বীপে পৌছতে। মাটি শুকনো হলেও নারকেল, পামজাতীয় গাছ আর বৃষ্টিস্নাত নানাবিধ বৃক্ষে পূর্ণ পেলাম ভূখন্ডটি। বোটটি এক বাঁশের শেকড়ে বেঁধে ক্রমশ ঢুকতে থাকলাম বনের ভেতর। ইচ্ছে সন্ধ্যে নামার আগেই দ্বীপ ঘোরা শেষ করবো। এবং যদি ভাল না লাগে তবে সূর্যডোবার পর পরই ছেড়ে যাবো এ দ্বীপ। আর যদি ভাল লাগে এর পরিবেশ, তবে দুয়েকদিন থেকে যেতেও পারি এ দ্বীপে। বিস্ময়করভাবে কোন পাখি বা জনমানবের কোনই শব্দ শুনতে পেলাম না। চারদিকে কেবল সামুদ্রিক শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ। ছোট তৃণঘাসগুলো দুপায়ে দুমড়ে মুচড়ে আমি প্রবেশ করতে থাকি পুরো বনের ভেতর। ইচ্ছে যদি কোন ফল বা খাবার জোগার করতে পারি। বাহ! একটা বড় গাছে আপেল জাতীয় কি এক ফল ঝুলছে। কোন মানুষ বা পাখি নেই এ ফল খেতে!
:
কৈশোর থেকেই গাছে চড়াতে পাক্কা আমি। তাই দুতিন লাফেই উঠে বসলাম গাছটাতে। লালচে রঙিন ফলগুলো কচকচে মিষ্টি। বেশ পছন্দ হলো আমার। একটা খেলাম গাছে বসে। বাকি ১০/১২টি ছোটডালসহ পেরে নিলাম সাথে। নিচে ডালহীন গাছটাতে পিছলা খেয়ে নামতে গিয়ে উচু একটা কিসে যে আটকে গেলাম। অনেক কষ্টে নামতেই চমকে উঠলাম গাছের ভেতরে এক কদাকার বৃদ্ধার ছবি দেখে। বৃদ্ধা কথা বললো আমার সাথে আমার বোধগম্য বাংলা ভাষাতে। চোখে মুখে করুণ মিনতি নিয়ে বললো
– বাবা, অনেকদিন ক্ষুধার্থ আমি। একটা আপেল দেবে আমাকে?
– কে তুমি? এভাবে গাছের ফোকড়ে আটকে কেন?
– সে অনেক কথা! একটা আপেল দাও আমাকে! তা খেলেই সব বলতে পারবো আমার জীবন ইতিহাস! ভীষণ ক্ষুধার্থ আমি!
একটা আপেল দিতেই তা ১ সেকেন্ডে গলাধকরণ করে মূহূর্তে বেড়িয়ে এলো গাছ থেকে সে। মারাত্মক ডাইনিরূপি এ বৃদ্ধার হাতে আমার দেয়া আপেলটি। আমার সামনে এসে দাঁড়ালো সে। তার নাক মুখ দাঁত আর কোচকানো চামড়ার চেহারা দেখে ভয়ে সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার দিলাম আমি। সম্ভবত কেউ শুনলো না আমার চিৎকার এ জনমানবহীন দ্বীপে। ডাইনিরূপি বৃদ্ধা বললো
– আমার নাম “তুকাতিয়া”! পাশের দ্বীপের যাদুকর আমাকে যাদু করে এভাবে গাছের সাথে আটকে রেখেছে। এ দ্বীপের পরীদেরও সে বৃক্ষরূপে অহল্যা করে রেখেছে। কেবল কোন মানুষ আমাকে আপেল খাওয়ালেই আবার নিজরূপে ফিরে আসবো আমি এমন কথাই ছিল। ৯৯-বছর পর আজ এ গাছের আপেল খাওয়ালে তুমি আমাকে। এখন এ দ্বীপে আমার সাথে থাকবে তুমি। টালটি বালটি করলে তোমাকে বৃক্ষ বানিয়ে রেখে দেব এ দ্বীপে!
:
ডাইনি “তুকাতিয়া”র ইশারামত তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকলাম আমি। “তুকাতিয়া” প্রথমের আমার বোটের কাছে গেল। চোখ রাঙিয়ে বলল
– তোমার বোট এ পাথরটা দিয়ে ছিদ্র করে জলে ভাসিয়ে দাও। যাতে আর তুমি ফিরতে না পারো মূল দ্বীপে।
তা না করে বোটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকলে ডাইনি “তুকাতিয়া” আমার গলায় তার নখের আচড় দিয়ে বললো
– আমার নখ খুব ধারালো। তুমি আমার কথা না শুনলে এ নখ দিয়ে তোমার গলা চিড়ে সব রক্ত পান করে সাগরে ছুড়ে দেব তোমাকে।
ভয়ে ডুবিতে দিলাম বোট। তা আর ভেসে গেল সাউথ প্যাসিফিকের নীল জলরাশির মাঝে।
[পরের অংশ আগামিকাল]
:
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1