পলিনেশিয় দ্বীপদেশ ও ডাইনি তুকাতিয়া পর্ব : ৩

ফল খোঁজার সুযোগে প্রথমেই মন যেতে চাইলো ঐ নারীমূর্তিগুলোর কাছে। আমার ধারণা জন্মেছে আমার মুক্তি হয়তো ঐ পরীদের মাধ্যমেই হতে পারে। তারপরো ডাইনি “তুকাতিয়া”র বিরাগভাজন হতে চাইনা আমি। তাহলে হয়তো সে হত্যা করবে আমাকে! তারপর খাবে রক্তমাংসগুলো কাঁচাই! পথে এক বুড়ো বৃক্ষফোঁকড়ে এক বৃদ্ধের মুখচ্ছবির দেখা পেলাম বৃক্ষমাঝে। মনে হলো লোকটি অবশ্যই ডাইনি প্রকৃতির নয়। তার কপালে হাত রাখতেই কথা বললো সে
– তুমি মুক্তি চাও! তবে ঐ নারীমূর্তিদের উদ্ধার করো। তারাই তোমাকে বাঁচাতে পারবে!
– কিন্তু কিভাবে বাঁচাবো তাদের?
– ডাইনি “তুকাতিয়া”র ঘরে আছে যে কালো সিন্দুক, তার ভেতরে আছে ২২টি রঙিন পাথর। একেকটি পাথর ছোঁয়ালে একেকজনের প্রাণ ফিরে আসবে। ঐ পাথর চুরি করে তোমাকে তা প্রত্যেক নারীর শরীরে ছোঁয়াতে হবে, তখন তারা সজীব হবে!
– কিন্তু ঐ সিন্দুক কই?
– তার ঘরের চালের ওপরে ছোট্ট আর একটা ঘর আছে। সেখানে রয়েছে ঐ সিন্দুক!
– ওপরে উঠলে টের পাবেনা?
– পাবে! তবে তাকে কৌশলে খাওয়াতে হবে “হিরাত” পাতার রস!
– হিরাত পাতা আবার কি? তার রস খেলে কি হবে?
– নেশার পাতা! ওটা খেলে ৩/৪ ঘন্টা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হবে ডাইনি “তুকাতিয়া”। সেই ফাঁকে তুমি সিন্দুক থেকে পাথর তুলে নারীদের ছোঁয়াতে পারবে।
– কিন্তু “হিরাত” পাতা চিনবো কিভাবে?
এক বোটায় ৬-পাতা। প্রতিটি পাতায় ৬-টা খাঁজ কাটা আর ২৮ শিরা, এমন পাতাই হিরাত পাতা!
আর সময় নষ্ট না করে খাবার আর হিরাত পাতার খোঁজে পা চালালাম দ্রুত।
:
গরু খোঁজার পরও হিরাত পাতা কোথাও চোখে পড়লো না। শেষে আপেল জাতীয় কটা ফল পেরে হাজির হলাম ডাইনি “তুকাতিয়া”র ভোজনস্থানে। আমার দিকে লাল চোখ তুলে তাকিয়ে বললো
– ঠিক আছে। এইতো অনুগত ব্যাটার মত কাজ করলে। আবার বলছি, চালাকি করলে মারা পড়বে ঘোৎ করে!
আরেকটি গোসাপ শিকার করতে হলো ডাইনি “তুকাতিয়া”র রাতের খাবারের জন্য। সেটার মাংস আর নারীভুড়ি বহন করতে হলো আমাকে তার বাড়ি পর্যন্ত। নিজের মাথার কাছে রেখে দিনেই ঘুমিয়ে পড়লো ডাইনি “তুকাতিয়া”। এই সুযোগে একটু বের হলাম আমি। চারদিকে কোন পাতা গাছ বা কিছুই পেলামনা এ কুঁড়ের। শেষে বাইরে গেলাম একটু দূরে। হিরাত পাতার খোঁজে! আরে যেমন পাতার কথা বললো, ঠিক তেমন পাতাই যে পেলাম অনেকগুলো। দুটো পাতা ছিড়ে এনে তাড়াতাড়ি ঢুকলাম ডাইনি “তুকাতিয়া”র ঘরে। তখনো নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে ডাইনি। পাতাদুটো হাতে ডলে তার রস মেশালাম গোসাপের রক্ত আর মাংসে। বেশ রসালো পাতা এই হিরাত লতা। সব কাজ সমাধা করে ওপরে ওঠার সিঁড়ির খোজঁ করতে থাকলাম এদিক ওদিক তাকিয়ে। মাকড়শার জালবোনা ধুলোময় ঘরে দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। তাই বাইরে গিয়ে বসে রইলাম ওঠা নামার সিঁড়িতে।
:
ঘন্টা দুয়েক পর ডাইনি “তুকাতিয়া” উঠলো ঘুম ভেঙে আমাকে না দেখেই দৌঁড়ে এলো বাইরে। সিড়েতে বসা দেখে নিশ্চিত হয়ে বললো
– মাংসগুলো কেটে দাও, আবার ক্ষুধা লেগেছে আমার!
ওর কথামত মাংস টুকরো করে কেটে দিলাম রক্তে ভিজিয়ে। ছোট ছোট টুকরো পেয়ে পেট পুরে খেলো ডাইনি “তুকাতিয়া”। এবং ঘুমে ঢলে পড়তে সময় লাগলোনা তার। সম্ভবত হিরাত পাতার রসের ক্রিয়া। দুতিনবার ছোট শব্দ করলাম পরীক্ষা করতে। না জাগছে না সে। মাকরসার জাল ছিঁড়ে তড়িৎ চলে গেলাম ওপরের ছোট ঘরে। জঞ্জালের মাঝে খুঁজে পেলাম সিন্দুক। কত বছরের পুরনো সিন্দুক কে জানে। অনেক কষ্টেও খুলতে পারলাম না তা। তাই সিন্দুক মাথায় করে নেমে এলাম নিচে। ঘরের বাইরে একটু দূরে এসে পাথরে প্রচন্ড আঘাত করতেই খুলে গেলো তা। পাথরগুলো ছিটকে গেলো এদিক ওদিক। মাত্র ৬টা পাথর পেলাম খুঁজে খুঁজে। জঙ্গলের মধ্যে সিন্দুকটা নিক্ষেপ করে এগিয়ে গেলাম বৃক্ষবুড়োর কাছে। আমায়ে দেখে হেসে বললো
– তাড়াতাড়ি গিয়ে ঐ নারীদের কপালে পাথর ছোঁয়া!
প্রথমেই দৌঁড়ে গেলাম দৌঁড়ের ভঙ্গীতে দাঁড়ানো পাথরবৃক্ষ রমণীর কাছে। কপালটা তার গাছের ডালে কিংবা চুলে ঢাকা। তাতেই ছোঁয়ালাম গোলাপি পাথরটি। না কিছু হলোনা। এবার ছোঁয়ালাম কালো পাথর। না! সজাগ হলোনা সে। ৪র্থ পাথর সবুজটা ছোঁয়াতেই পূর্ণ নারীর প্রাণময়তায় ফিরে এলো সে বৃক্ষের ভেতর থেকে!
:
আমি বিস্ময়ে বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম ঐ মানবীর দিকে। তার শরীর থেকে যেন রূপের স্বর্ণাভ জ্যোতি ছিটকে বেরুচ্ছে! সেই কথা বললো প্রথম আমার সাথে-
– কে মানব তুমি? আমায় প্রাণময়তায় ফিরিয়ে আনলে!
– আমি বাংলাদেশি একজন পর্যটক। অস্ট্রেলিয়া থেকে ঘুরতে এসেছি এ দ্বীপে। কিন্তু ডাইনি “তুকাতিয়া”র কারাগারে বন্দী আমি এখন!
– ডাইনি “তুকাতিয়া”র ষড়যন্ত্রে বৃক্ষরূপে আমি প্রায় একশ বছর। তুমিই আমার প্রাণদাতা, জীবনদাতা!
– আমি কিভাবে ফিরে যাবো অস্ট্রেলিয়া কিংবা বাংলাদেশে!
– ফিরে যেতে পারবে! কিন্তু একাকি উড়িয়ে নিতে পারবোনা তোমায় আমি! অন্তত ৪-জন লাগবে। তাই আরো অন্তত ৩-জনকে জীবিত করতে হবে, যারা আমার জ্ঞাতি আর ভাইবোন এখানে আছে বৃক্ষরূপে!
-আমার কাছে পাথর আছে আরো ৫-টি। তুমি কি এ পাথরে জীবিত করতে পারবে তাদের? কি নাম তোমার?
– রিয়া আমার নাম! হ্যা পারবো! তবে অন্তত ২২-টি পাথর থাকার কথা। আর পাথর কই? আর পাথর ছোঁয়াতে হবে তোমার নিজ হাতে!
– সিন্দুক খুলতে গিয়ে জঙ্গলে হারিয়ে গেছে সব!
সব কথা শুনে রিয়া আমার সাথে চললো পাথর খুঁজতে!
[পরের ৪র্থ তথা শেষ পর্ব আগামিকাল]
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 − 25 =