কিরণ। ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব – ১৫।

নির্বাসিত লেখক’কে – প্রিভিউ ও রিভিউ।

 

ভোরের দিকে ঠাণ্ডাটা একটু বেশি পড়তেই কিরণ জেগে ওঠে। বেশ শীত লাগছে। চোখ খুলে দেখে সে সৌম্যর কোলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর সৌম্য বসে বসে তখনও ঘুমোচ্ছে।

 

  • ইশ! ছেলেটিকে সারারাত শুতে দিইনি! নিশ্চয়ই ওর খুব অসুবিধা হয়েছে।
  • ঘড়িতে ভোর সাড়ে চারটে। নাহ! এখনও একটু সময় আছে। সৌম্য আরেকটু ঘুমিয়ে নিতে পারবে।

 

কিরণ আস্তে করে সৌম্যকে না জাগিয়ে, ওকে শুইয়ে দেয়। সৌম্যর কপালে, ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেয়ে কিরণ তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসে।

  • রাতে ঘুমটা ভালো হয়েছে। শরীরটা বেশ ফ্রেশ লাগছে।
  • কিন্তু আজ সৌম্যর খুব অস্বস্তি হবে। সারারাত বসে থেকে হয়তো শরীর ব্যথা হয়ে গেছে!

কিরণ তৈরি হতে যায়। কিন্তু ভোরের হিমাচল দেখে মুগ্ধতায় কিরণের চোখ ভোরে ওঠে। ঘন কুয়ায়াশায় ঘেরা পাহাড়, আকাশে একটু একটু করে আলো ফুটে উঠছে, কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া গা শিরশিরিয়ে যাচ্ছে, কিরণ বলে ওঠে, “ল্যান্ড অফ গডস ..”

 

হ্যাঁ, এমন পরিবেশকেই কিরণের দেবভূমি বলে মনে হয়। কিরণ দ্রুত নিজের তাঁবুতে ফেরে। জল নিয়ে চোখে – মুখে জল দিয়ে, ব্রাশ করে নেয়। এরপর জামা, পোশাক পাল্টে নতুন পোশাক পরে নেয়। নতুন শার্টে কালকের কেনা একটি বোতাম ক্যামেরা লাগিয়ে নেয়। হাতে রিষ্ট ওয়াচ ফোনটি পরে নেয়। বুকের পকেটে একটি পেন ক্যামেরা নিয়ে নেয়। ভিডিও সিডি প্লেয়ারটি একবার চালিয়ে ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নেয়। এরপর তাঁবুটি তুলে ফেলে।

 

  • সোয়া পাঁচটা বেজে গেছে। ভোরের দিকের গাড়ি ধরে যেতে গেলে সৌম্যকে এখনই জাগিয়ে দিতে হবে।
  • কিন্তু সৌম্যর তো একটু ভালো করে ঘুমের প্রয়োজন। সারারাত বেচারা ঠিকমতো ঘুমোতে পারে নি।
  • যতো যাই করি, পৌঁছবো তো সেই বিকালবেলায় চারটে, পাঁচটার দিকে! ওখানে গিয়ে আজ রাতে কাজ হবে বলে তো মনে হয় না। যদি সন্ধ্যার দিকেও পৌঁছাই অসুবিধা তো নেই। ঠিকই তো আছে। একটু বেলায় বেরিয়ে সন্ধ্যার দিকে পৌঁছবো। সৌম্য বরং এখন একটু ঘুমিয়ে নিক। তাতে ও ফ্রেশ হতে পারবে।
  • অতয়েব সৌম্য এখনও দুঘণ্টা ঘুমিয়ে নিক। আটটার দিকে বেরবো। সন্ধ্যা ছটার দিকে চিতকুলে পৌঁছে যাবো।
  • আমি বরং এখন ইনস্পেক্টরকে একটা ফোন করে জেনে নিই মালতির কথা। কাল রাতে তো মালতিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছিলাম।

 

ইনস্পেক্টরকে কিরণ একটি ফোন কল করে।

কিরণ – হ্যালো অফিসার। আমি কিরণ বলছি। শুভ সকাল।

ইনস্পেক্টর – শুভ সকাল ম্যাম। কাল রাতেই সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি হিমাচলের এসপিকে এবং কিন্নুরের ডিএসপিকে বলে। আপনার যখন যা সাহায্য লাগবে, আপনি পেয়ে যাবেন। আমি আপনার কাছে ওদের নম্বরগুলি হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।

কিরণ – আচ্ছা। করে দিন। আর অফিসার, বলছিলাম, মালতি, যে মেয়েটি আমার বাড়িতে থাকে, ওর এখন কি খবর! ও কি সুস্থ আছে!

ইনস্পেক্টর – ও স্যরি। বলতে ভুলেই গেছি। হ্যাঁ, মেয়েটি এখন বেশ সুস্থ। কাল ওকে জেনিত নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার থানার লেডি সাব ইনস্পেক্টর এবং দুজন কনস্টেবলকে পাঠিয়েছিলাম। ওরাই ওকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। একই সিম্পটম। পরে ডাক্তারকে সে বলে সন্ধ্যার দিকে বাইরে বেরিয়েছিল। আর বুঝতেই তো পারছেন বাইরের অবস্থা! দ্রুত রিয়াকশন শুরু হয়। তবে ডাক্তার অ্যান্টিডট দিয়েছে। দুঘণ্টা পর থেকেই সুস্থ হতে শুরু হয়। এবং ভোর চারটের সময় যখন অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠে, ওকে আবার আপনার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

কিরণ – অনেক ধন্যবাদ আপনাকে অফিসার। তাহলে তো সাধারন মানুষের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে!

ইনস্পেক্টর – তা এখনও বলা যায় না। যে পরিমাণে মানুষ অসুস্থ হয়েছে, সেই পরিমাণ অ্যান্টিডট মেডিক্যাল ক্যাম্পগুলিতে নেই, হাসপাতালে নেই। আমাদের অবস্থাই ধরুন। সারাদিন রাত যেখানে সেখানে ডিউটিতে যেতে হচ্ছে। শরীরের অবস্থা বুঝতে পারছি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উপায় দেখতে পারছি না। ডিউটি এমন, নিজে অসুস্থ হলেও সামনে অন্য কোনো অসুস্থ রোগীকে যদি দেখি, নিজের পরিবর্তে তাকেই অ্যান্টিডটটা দিতে হবে। অথচ আমরাও তো মানুষ!

 

কিরণ – এতো অ্যান্টিডট পাওয়া সম্ভবও না। আকাশ থেকে ওই কালো আস্তরণ সরাতে হবে। আর আসল ব্যাপারটি কি জানেন! যে বা যারা এই কাজটি করেছে, তারাই পারবে এটা সরাতেও। কারণ, ওদের লক্ষ্য কেবল সাধারন কিছু নিরীহ মানুষের জীবন হতে পারে না। ওতে ওদের কিছু এসে যায় না। এখানে খেলাটা অন্যকিছুই। আর এই খেলাটি খেলার জন্য ওরা সমাধানের পথও নিশ্চয়ই বার করে রেখেছে আগের থেকে।

 

ইনস্পেক্টর – তা হতে পারে! দেখুন কি হয়!

কিরণ – আচ্ছা অফিসার। আবারও ধন্যবাদ সবকিছুর জন্য। আপনি ও আপনারা সুস্থ থাকুন।

ইনস্পেক্টর – আপনিও সাবধানে থাকবেন। আমি নম্বরগুলি হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।

কিরণ – আচ্ছা।

 

যাক। কিরণ কিছুটা নিশ্চিন্ত হয় মালতির কথা শুনে। মালতি সুস্থ আছে। এখন হয়তো ঘুমোচ্ছে। এখন ওকে ফোন করা উচিৎ হবে না এই ভেবে কিরণ সৌম্যর তাঁবুর ভিতরে যায়।

 

  • সৌম্য বেশ আরামে গায়ে গরম কম্বল জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। পৌনে ছটা বাজে। এখনও দেড় ঘণ্টা ঘুমাক ও।

 

কিরণ সৌম্যর লেখা “নির্বাসিত লেখক’কে” বইটি খুলে পড়তে থাকে। একের পর এক – ‘মনুষ্যত্বের নির্বাসন’, ‘বাংলা তোমায় প্রণাম’, ‘রওডন ষ্ট্রীটের বাড়িটা’, ‘গেরন’, ‘সত্যের যোদ্ধা’, ‘অগ্নি উৎস তুমি তসলিমা নাসরিন’, ‘মনে আছে কলকাতা’, ‘বাংলা সেদিন লজ্জা নয়, বাংলা হবে অহংকার’, ‘দেশের প্রতি টান’ পর পর ন’টি কবিতা রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেললো।

  • কি চাবুক লেখা! আবেগ আর আগুনে জ্বলে ওঠা সব লেখা।
  • সৌম্য তসলিমা নাসরিনকে এতো শ্রদ্ধা করে, এতো ভালোবাসে!

 

বইটির মধ্যে কিছু কাগজ পড়ে আছে। সেখানে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন লেখা এই বইটি নিয়ে। বইটির প্রিভিউ এবং রিভিউ লেখা। সেগুলি এমন :

 

বইটির প্রিভিউতে সৌম্য লিখেছে, “মানববাদী লেখক তসলিমা নাসরিন নামটি শুনলেই যেটা সবার আগে মনে আসে, তা হল একজন নির্বাসিত লেখক, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যার নির্বাসন গোটা দেশের মানচিত্রে সেদিন কালিমালিপ্ত করেছিল। একজন লেখক যিনি কেবলমাত্র সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক ভোট ব্যাঙ্ক পলিসির সামনে একাকী মাথা উঁচু করে লড়াই করেও বিপরীতে তীব্র ক্ষমতায় থাকা সরকার ও প্রশাসনের সামনে অসহায় হয়ে উঠেছিলেন, এবং নির্বাসিত হয়ে যান। একজন লেখক যিনি ডানেরও খায় না, বামেরও খায় না, নিজের খায়, নিজের পরে, অন্যায়ের সামনে আপসহীন থেকেছেন প্রতিমুহূর্তে, সেই একজন লেখকের কলম কেড়ে নিতে, ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে, ফতোয়া জারি করে, লেখকের প্রতি মৌলবাদের হামলা চালিয়ে চিরতরে মুখ বন্ধ করে দিতে সর্বসচেষ্ট থেকেছে ক্ষমতার লালসায় লালায়িত, সুযোগ সন্ধানী বদমাইশেরা। যেখানে জনসমক্ষে কিছু বদমাইশ মাথার দাম ঘোষণা করে খুনের হুমকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে, মানুষ খুন করে পার পেয়ে যাচ্ছে, চুরি করে, ডাকাতি করে পার পেয়ে যাচ্ছে, সেখানে একজন লেখক, একজন মানুষ স্বাধীনতার প্রশ্ন তুললে, বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন তুললে, নারীর অধিকারের প্রশ্ন তুললে, নিজের মতকে পরিস্কার করে বইতে লিখলে তাঁকে নির্বাসিত হতে হয়! সরকার, প্রশাসন বদমাইশদের সুরক্ষার ঘেরাটোপে রাখতে পারে, রাজনৈতিক ছায়াতলে তেল দিয়ে চলা মানুষদের বাকস্বাধীনতার দাম দিতে পারে, অথচ একজন মানুষ যে একাকী বেঁচে থেকে, কারোর ছায়াতলে না থেকে নিজের মতো করে চলার ব্রত নিয়ে চলে, তাঁর কথা কিছু মানুষের ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত লাগলো বলে তাঁকে এমনভাবে নির্বাসনদণ্ড দেওয়া! তাহলে কি বাকস্বাধীনতা কেবল মৌলবাদীদের জন্য? আর কারোর জন্য নয়! আসলে সুযোগসন্ধানী ক্ষমতাসীন দলগুলির ক্ষমতা নেই সত্যের মূল্য দেওয়ার। ওরা শুধু ভোটব্যাঙ্ক চেনে।

৯ই আগস্ট, ২০০৭ হায়দ্রাবাদে লেখক তসলিমা নাসরিনের উপন্যাস “শোধ”এর তেলেগু ভার্সনের বইটির উদ্বোধনের দিন অল ইন্ডিয়া মজলিস – ই – ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM) সংগঠনের জনা বিশেক কর্মী এমএলএ আফসার খান, আহমেদ পাশা এবং মজুম খানের নেতৃত্বে উদ্বোধন পর্বের মুহূর্তে লেখক তসলিমা নাসরিন এবং সভার ওপর আক্রমণ করে এবং ভাঙচুর চালায়। ওনাদের বক্তব্য ছিল, “আমরা ইসলামের অবমাননা এবং ইসলামের প্রতি অসম্মান বরদাস্ত করবো না।”

ধর্মের নামে উগ্র স্লোগান দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক, শিরা, উপশিরাতে মত্ততা খুব সহজেই ছড়িয়ে দেওয়া যায়। তসলিমা নাসরিনের নামে একটি ট্যাবু ভীষণ প্রচলিত আছে যে তসলিমা নাসরিন মানেই ইসলাম বিদ্বেষী মন্তব্য করবেন, ইসলামকে কটাক্ষ করবেন। লেখক তসলিমা নাসরিন সেদিন হায়দ্রাবাদের সভাতে ইসলাম তো দূরের কথা, ধর্ম কথাটিও একটিবারের জন্য উচ্চারণ করেন নি। এরপরও হামলা হয় ধর্মবিদ্বেষী মন্তব্য করার অপরাধে। এই হামলার প্রভাব শুধু হায়দ্রাবাদেই সীমিত থাকে নি। ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গেও।

পশ্চিমবঙ্গ যে কালচারাল স্টেট হিসেবে পরিচিত, সেই রাজ্যেও তসলিমা নাসরিনের নামে ফতোয়া জারি হয়, মাথার দাম ঘোষণা করা হয়। সিকিউরিটি দেওয়ার নামে লেখক তসলিমা নাসরিনকে গৃহবন্দী করা হয়। বারে বারে বিভিন্নভাবে লেখক তসলিমা নাসরিনকে বোঝানো হতে থাকে যে এখানে বড়সড় ঝামেলা বা দাঙ্গা হতে চলেছে এবং তাঁকে হত্যা করার ছক তৈরি করে ফেলা হয়েছে। তাই লেখক তসলিমা নাসরিনের উচিৎ দ্রুত কিছুদিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার প্রসূন মুখার্জী বারে বারে নানান কৌশলে লেখককে শীতল হুমকি দিতে থাকেন। কবির সুমন (সুমন চট্টোপাধ্যায়) লেখককে অনস্ক্রিনে হুমকি দেন। এরই মধ্যে কলকাতায় একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে যায়। রিজয়ান খুনকে কেন্দ্র করে, সিঙ্গুর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যখন কলকাতার মৌলালি, পার্কসার্কাস এলাকা উত্তেজিত হয়ে ওঠে, সেই সুযোগে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নির্দেশে একদল ভাড়াটে গুন্ডা রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে নেমে পড়ে তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দাবি তুলে। ঘটনার প্রচার হয় “সংখ্যালঘুরা আওয়াজ তুলেছে তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে।” তাই তসলিমা নাসরিনকে বেরিয়ে যেতে হবে।

এবং একদিন লেখকের সাথে প্রতারণা করে, দুদিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থাকতে হবে বলে কলকাতা পুলিশের একটি দল জোর করে লেখক তসলিমা নাসরিনকে রাজস্থানের ফ্লাইটে তুলে দিয়ে আসে। নাটকের শেষ এখানেই নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কর্তৃক রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রীকে বলা হয় লেখক তসলিমা নাসরিন একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছেন। আদতে সেখানে এমন কোনো অনুষ্ঠান ছিলই না, লেখক তসলিমা নাসরিনও এই বিষয়ে কিছু জানতেন না। রাজস্থানে পৌঁছনর পর এই ঘটনা জানাজানি হতেই রাজস্থান সরকারের নির্দেশে পরের দিন ভোর রাতেই লেখক তসলিমা নাসরিনকে রাজস্থান ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

স্থলপথে রাজস্থান থেকে দিল্লিতে লেখককে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশবাহিনী গাড়ির নম্বর প্লেট খুলে, পুলিশি পোশাক পাল্টে অযথা লেখকের মনে ভীতি তৈরি করে। লেখক বারে বারে পুলিশের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেও ওরা একটিও উত্তর দেয় না। এবং লেখককে যে সাংবাদিকরা পেছনে একটি গাড়িতে করে অনুসরন করছিল, তাদেরকেও মাঝপথে গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি হোটেল রুমে আটকে রাখা হয়। লেখকের কাছে থাকা ফোনটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবং একসময় লেখকের মনে হতে থাকে যে এরা পুলিশের বেশে অন্য কেউ। হয়তো তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। হয়তো কোনো নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হবে। এরপর দিল্লির মাইলফলক থেকে যখন গাড়ি ঘুরিয়ে সম্পূর্ণ উল্টোদিকে একটি ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন লেখক সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে যান যে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। কিন্তু সে যে কারোর সাহায্য নেবে, এমন উপায় নেই। এরপর একটি জায়গায় গিয়ে লেখককে জানানো হয় যে ওরা চায় নি কেউ পেছন থেকে ওদের অনুসরণ করুক। তাই সিভিল পোশাকে এবং গাড়ির নম্বর প্লেট খুলে এই পথে আসা। এরপর দিল্লির রাজস্থান হাউজে অনেক ঘটনা ঘটে।

লেখককে সম্পূর্ণ প্রতারণা করে সেদিন পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বার করে দেওয়া হয়। লেখকের ওপর এরপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যায়। সম্পূর্ণ অনৈতিক, অসাংবিধানিকভাবে সমস্তটা করা হয়। এই সমস্তটার মধ্যে লেখকের যে রুদ্ধশ্বাস জীবন কেটেছে, সেই জীবনটা আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। “নির্বাসিত লেখক’কে” বইটি শুধুমাত্র একটি বই নয়, বইটিতে লেখক তসলিমা নাসরিনের বাংলার প্রতি, বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম, আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বাংলা ভাষার জন্য নির্বাসন জীবনে প্রতিমুহূর্তে হাহাকার, রওডন স্ট্রিটের বাড়িটা অনাথ হয়ে শহরের এক প্রান্তে একাকী পড়ে থাকা, সমস্ত কিছুর দলিল তুলে ধরা আছে। তুলে ধরা আছে “গেরন” কবিতাটির সেই বাচ্চা মেয়েটি থেকে একজন ডাক্তার হয়ে শেষে আদর্শের জন্য, মানবাধিকারের জন্য, নারীর অধিকারের জন্য কলমকে আপস না করে ডাক্তারির চাকরিতে পর্যন্ত ইস্তফা দিয়ে দেয়, এবং সেখান থেকে আবার পথ চলা শুরু করে একজন আন্তর্জাতিক লেখক হওয়া, ইউরোপের পার্লামেন্টে বাঙালির হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা এই এতোটা পথ চলা জীবনে বারে বারে কখনো নিজে নির্বাসিত হয়েছেন, কখনো তাঁর লেখা বই নির্বাসিত হয়ে গেছে, কখনো তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছে। লেখক তসলিমা নাসরিন নামটি আমার তীব্র আবেগ, আমার শ্রদ্ধা, আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম, আমার তীব্র সুখ।

 

সুভাষ চন্দ্র বসু বলেছিলেন,“Freedom is not given – it is taken.”

স্বাধীনতার ৭১ বছর পরও যদি আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, মত প্রকাশের জন্য, বাকস্বাধীনতার জন্য যদি এখনও লড়াই করতে হয়, নির্বাসিত হতে হয় তবে কিসের স্বাধীন দেশ! কিসের স্বাধীনতা!

 

কোন মানবিক আইনে তসলিমা নাসরিন আজও নির্বাসিত?

কোথায় গেলো ডেমোক্রেসি? কোথায় ফ্রি – টকিং রাইট?

কোথায় হিউম্যানিটি?

দোহাই দেখাও ডোমেস্টিক ভায়লেন্সের, আর –

তার আড়ালে চলে ভোট ভবিষ্যৎ!

লুটে যাক মানবতা, লুটে যাক লেখক,

লুটে যাক সত্যের পরিচয়,

চেয়ার বাঁচলেই মওকা মাত।

 

আমি সজ্ঞানে চাই লেখক তসলিমা নাসরিনের ওপর থেকে নির্বাসনদণ্ড প্রত্যাহার করা হোক, আমার দেশকে কলঙ্কের কালি থেকে মুক্ত করা হোক, প্রতিটা মানুষ নিজস্ব স্বাধীনতায় বেঁচে থাকুক, চলুক, ফিরুক, ভালোবাসায় বাঁচুক। আমি চাই আমার ভারত একদিন সকলের সেরা হয়ে উঠুক। ভারত আমার প্রাণ, আমার প্রশ্বাস, আমার আশ্বাস, আমার বেঁচে থাকার উপাদান। আমি চাই আমার ভারত সমস্ত গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হয়ে উঠুক, সকলকে সমানাধিকারে বেঁচে থাকার প্রেরণা দিক। আমি মুক্তকণ্ঠে চিৎকার করে বলতে চাই, “বন্দে মাতরম!”

 

“নির্বাসিত লেখক’কে” বইটির মাধ্যমে লেখক তসলিমা নাসরিনের প্রতি এই আবেগ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, প্রেম, সুখ আপনাদের সকলের সাথে ভাগ করে নিলাম। ভালো থাকুন, প্রেমে বাঁচুন। বইটিকে আপনারা ভালোবেসে আপন করে নিন। আপনাদের সমালোচনাও আমি মাথা পেতে নেবো চিন্তাভাবনার জন্য। নিজেদের মত প্রকাশ করুন মুক্তকণ্ঠে।

 

লেখক তসলিমা নাসরিন, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করে তোমায় প্রণাম জানালাম এই বইটির মাধ্যমে। আমার প্রণাম স্বীকার কোরো। সুস্থ, সুন্দর বেঁচে থেকো শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।”

 

লেখক তসলিমা নাসরিন লিখেছেন, “সৌম্যজিৎ একটা পাগল ছেলে। আমাকে নিয়ে একটা গোটা বই লিখে ফেলেছে। ভীষণ অস্থির ও। কিছু গদ্য বা পদ্য লিখেই পাবলিশারের কাছে দৌড়েছে। সেকালে আমরা বই বের করার জন্য এক যুগ অপেক্ষা করতাম। আমি লেখালেখি করছি ১৯৭৩ সাল থেকে, প্রথম বই বেরিয়েছে ১৯৮৬ সালে। সৌম্য প্রচণ্ড আবেগ দিয়ে লিখেছে বইটি। অদ্ভুত সব স্বপ্নও দেখেছে, বইটি নাকি বিপ্লব ঘটাবে, আমি নাকি কলকাতায় ফিরতে পারবো। স্বপ্নচারী ছেলেটি যদি লেখালেখি নিষ্ঠার সংগে চালিয়ে যায়, তবে নিশ্চয়ই লেখার মান আরো উন্নত হবে। সৌম্যর ব্যাপারে আমি আশাবাদী, কারণ ওর ভেতরে দুর্লভ কিছু গুণ আছে বলে আমি মনে করি, ও গভীর করে ভালোবাসতে জানে, অন্তহীন আবেগ নিয়ে উথাল-পাথাল হতে দ্বিধা করে না, যথাসম্ভব সৎ থাকে, আর যা বলতে চায়, তা চমৎকার বুঝিয়ে বলতে পারে । পুরুষোত্তম (স্টল ২৯৬) পাবলিশারকে ধন্যবাদ ঝুঁকি নিয়ে নতুন লেখকদের বই ছাপানোর জন্য। আজ যে নতুন লেখক, উৎসাহ পেলে একদিন সে অনেক বড় লেখক বনে যেতে পারে।”

 

সুরশ্রী পাল নামের রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশন বিদ্যাভবন, ব্যারাকপুরের একাদশ শ্রেণীর একটি মেয়ে লিখেছে, “এই বইটির রিভিউ দেওয়ার প্রসঙ্গে কোনো কিছু লেখার আগে যেটা বলা আমার কাছে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়, তা হল “তসলিমা নাসরিন” নামটা আমার হৃদয়ে শুধুমাত্র একজন লেখকের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে না, তুলে ধরে এক আদর্শের প্রতীককে। কয়েক বছর আগেও তার নাম অব্দি আমার জানা ছিল না, হয়তো ছোট ছিলাম বলেই। প্রথম তার ও তার লেখনীর সাথে পরিচয় হয় যখন আমি নবম শ্রেণী তে, “মায়ের কাছে চিঠি” পড়ে। বোধহয় সেটাই প্রথমবার যখন কোনো কবিতা পড়ে আমার চোখ দিয়ে গাল বেয়ে গড়গড় করে জল পরে বইয়ের পাতা ভিজিয়েছিল। সেই দিন, সেই মুহূর্তেই ওনার সাথে এক অদ্ভুত অদৃশ্য, নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম। তারপর কৌশিক গাঙ্গুলি নির্মিত “নির্বাসিত” ছবিটি দেখি, যা আমার ভিতরে অজান্তেই এক প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে দেয়।  এরপর থেকেই যাত্রা শুরু, নিজেকে ওনার মানবিকতা, শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা আর সর্বোপরি আদর্শে গড়ে তোলার।

 

“আমার বুকে বাংলা আজ বড় অসম্পূর্ণ –

তুমি ছাড়া,

প্রেম ছাড়া ..”

(রওডন স্ট্রিটের বাড়িটা – সৌম্যজিৎ দত্ত)

 

তবে সত্যি বলতে কখনো মাথায় আসেইনি যে ওনাকে ওনার মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরও কিছু করার আছে বা থাকতে পারে। সেই কারণেই হয়তো সৌম্যজিত দত্তের লেখা “নির্বাসিত লেখক কে” বইটি প্রকাশ পাচ্ছে জেনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা ও ভয় দুইই যেন সারা শরীরে বয়ে যায়। বইটি পড়ার পর আমার মনোভাবের কথায় যদি আসি, চল্লিশটি কবিতার এই সংকলনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় আমার কাছে যেটি লেগেছে তা হল লেখকের অকৃত্তিম ভঙ্গিমায় নিজের আবেগ ও উপলব্ধির প্রকাশ। যদিও প্রথম থেকে একনাগাড়ে পড়তে গিয়ে বেশ কিছু জায়গায় একঘেয়েমি এসেছে, থামতে হয়েছে; তবুও আবার করে পরের দিন পড়া শুরু করার তুমুল ইচ্ছাও জেগেছে বারবার, কারণ একটাই; উপলব্ধিগুলো বড়ই আপন! প্রত্যেকটি লেখার সূক্ষ বিশ্লেষণে বেশি শব্দব্যায় করব না, কারণ ওই কাজটি পাঠকের একান্ত নিজের। কিন্তু সারা বইটির মধ্যে যে অংশটি আমার এবং আমার মতো আরো সহস্র তসলিমা-প্রেমী, অনুগামীদের জন্য খুবই বিশেষ এবং তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমার মনে হয়, “অগ্নি উৎস তুমি তসলিমা নাসরিন” কবিতা থেকে সেই ছত্রগুলি উদ্ধৃত করলাম —

“আজ আর তোমার লড়াইকে ওরা থামাতে পারবেনা,

আজ তুমি সম্পূর্ণ ভিন্ন “তসলিমা নাসরিন”।

এই বাংলাতেও তোমার প্রত্যাবর্তন হবে,

বঙ্গকন্যা ফিরবেই,

আমি বাজপাখির দৃষ্টিতে সেইদিন দেখতে পাচ্ছি।

তোমার আবিষ্কার আমি,

তোমার আদর্শে গড়া অগ্নিদূত হয়ে ফেটে পড়বো,

ফিরিয়ে আনবো তোমাকে এই বাংলায়, –

সম্মানের সাথে,

নৈতিকতা দিয়ে।””

 

 

“মাই গুডনেস!” – কিরণের মুখ থেকে কথাটি বেরিয়ে আসে এসব পড়ে।

 

  • সৌম্য তো পুরো মশাল তুলে ধরেছে বইটিতে!
  • এতো সুন্দর সুন্দর সব কবিতা, এতো সুন্দর করে লেখা প্রিভিউ, এতো সুন্দর করে লেখা তসলিমা নাসরিনের রিভিউ, সুরশ্রী পালের রিভিউ!
  • কিন্তু এই সুরশ্রী পাল মেয়েটি কে! কিসের সম্পর্ক ওর সাথে সৌম্যর!
  • উল্টোপাল্টা কিছু হলে খবর আছে সৌম্যর। হুঃ!
শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.