পলিনেশিয় দ্বীপদেশ ও ডাইনি তুকাতিয়া পর্ব : ৪ (শেষ পর্ব)

পাথর খুঁজে পেতে সময় লাগলো না পরী রিয়ার! বাকি একুশ জনের কপালে ছুঁইয়ে প্রাণতায় ফেরাতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম
– রিয়া, আমি এখন কি করবো! ডাইনি “তুকাতিয়া”র ঘুম ভাঙলে সে ধরে ফেলবে আমাকে। তাই এ রাতেই পালাতে চাই আমি!
– তুমি গাছ বাইতে পারো? তাহলে এ বার্চ গাছটার একদম ওপরে চলে যাও! ডাইনি গাছে উঠতে পারে না!
রিয়া একটা উঁচুৃ গাছে আমাকে বসিয়ে পরামর্শ করতে গেলো সদ্য প্রাণতায় ফিরে আসা তার স্বজনদের সাথে। এর মধ্যে ডাইনি “তুকাতিয়া”র ঘুম পুরো হলে সে আমার ঘ্রাণে খুঁজতে খুঁজতে একদম চলে এল ঐ গাছটার নিচে, যেটাতে রিয়া বসিয়ে গেছে আমায়। নিচে এসেই খিনখিনে গলায় বললো
– গাছে উঠেছিস কেন? নেমে আয় বলছি! আমার ঘুমের মাঝে বাদরামি!
কিন্তু আমি নামলাম না। অপেক্ষা করতে থাকলাম রিয়ার জন্যে। ডাইনি “তুকাতিয়া” কি চিন্তা করে একটা বড় বাঁশ এনে খোঁচাতে লাগলো আমাকে যেন পড়ে যাই আমি গাছ থেকে। কিন্তু আমি আরো উঁচু মগডালে গিয়ে বসে রইলাম ডাইনি “তুকাতিয়া”র আক্রমণ থেকে বাঁচতে। কোন বল্লম বা অন্য কোন অস্ত্র আনতে ডাইনি গেল তার ঘরে এই ফাঁকে রিয়া এসো বললো
– তুমি আমার পাখার উপর উঠে বসো। দেখি তোমাকে নিয়ে উড়তে পারি কিনা। আমি রিয়ার ২-পাখার মাঝে পা রাখতেই সে ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়া শুরু করলো! গাছের ডাল ধরে নিজেকে সেযাত্রা রক্ষা করলাম কোনরকমে আমি।
:
প্রায় একশ বছর বৃক্ষনারী হয়ে নির্জিব থাকার কারণে রিয়া ও তার স্বজনরা খুবই দুর্বল এখন। উড়তেও অনেকটা ভুলে গেছে। তাই আমার জন্য একটা কাপড় খুঁজছে ওরা, যার মাঝে আমাকে বসিয়ে সবাই উড়িয়ে নিয়ে যাবে এ দ্বীপের বাইরে। কিন্তু কাপড়ও আছে ডাইনি “তুকাতিয়া”র ঘরেই কেবল। কোন এক নৌকোর পাল নিয়ে রেখেছে ডাইনি তার ঘরে বৃষ্টির জল থেকে বাঁচতে। শেষে রিয়ার বোন থ্রিয়া একদম আমার অবয়বে ডাইনি “তুকাতিয়া”র ঘরের সামনে গিয়ে আমার কণ্ঠস্বর নকল করে ডাক দিলো “তুকাতিয়া”! যেইনা ডাইনি “তুকাতিয়া” বাইরে এলো আমাকে অনুসরণ করতে, এই ফাঁকে রিয়া আর তার বোনেরা ফুড়ুৎ করে ঘরে ঢুকে নিয়ে পালালো পাল তোলার কাপড়ের টুকরোটি। ডাইনি “তুকাতিয়া” খুঁজতে থাকলো চাদেঁর আলোতে আমায় পেছনে পেছনে! আমার রূপধরা ছদ্মবেশী থ্রিয়া চলে গেল একদম সমুদ্রের কাছে। ডাইনি “তুকাতিয়া”ও পিছু নিলো তার। এই ফাঁকে বৃক্ষের নিচে বিছানো হলো বড় ছেঁড়া পালটি। আমি গিয়ে তাৎক্ষণিক বসে পড়লাম তাতে। কেবল থ্রিয়া ছাড়া সকল পরীরা পালটি ধরে উড়তে থাকলো এক যোগে। অনেক কষ্টে তারা বৃক্ষমাথায় উঠাতে পারলো পাল। চাঁদ জ্যোৎস্নায় ভরা ফর্সা আকাশে এবার আমাকে দেখে ফেললো ডাইনি “তুকাতিয়া”। নাকি স্বরে গজ গজ করতে করতে ঢুকলো নিজ ঘরে! ফিরে এসে চিৎকার করে বললো
– দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা!
বলেই সজোরে নিক্ষেপ করলে বর্ষা আমার বুক লক্ষ্য করে। আমার ডানহাতে বিদ্ধ হলো ধারালো ডাইনি বর্ষা। পালটাও বেশ কিছুটা ছিঁড়ে গেলো। রক্তে ভিজে যাচ্ছে পুরো পাল। যন্ত্রণায় চিৎকার করছি আমি পালের ভেতরে বসেই। কাতর স্বরে বললাম
– রিয়া আমাকে নিচে নামাও। সম্ভবত বিষ মাখানো বল্লম। আমি যে যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি। তা ছাড়া রক্তও থামছে না।
– কিন্তু তোমাকে মাটিতে রাখলেই ডাইনি “তুকাতিয়া” চলে আসবে। ধরে ফেলবে তোমাকে। সম্ভবত মেরেই ফেলবে! পান করবে তোমার রক্ত! রক্ত ওদের খুব প্রিয় খাবার!
– তখন তোমরা আমাকে রক্ষা করতে পারবে না?
– না! ডাইনির মত অত ক্ষমতা নেই আমাদের। আমরা কেবল ফুলে ফুলে উড়তে পারি। কাউকে মারতে বা যুদ্ধ করতে পারিনা!
– তাহলে কি আমি এ পালের মধ্যেই মরে যাবো?
:
দ্বীপের সবচয়েে বড় বার্চ গাছের ওপর পালটি নিল ওরা। কোন রকমে একটা ডালে বসতে পারলাম আমি। ওদের মধ্যে একজনে গেল বিষনাশক পাতা আনতে। অন্যজনে রক্ত থামানোর গুল্ম। রিয়া পালের কিছু অংশ ছিঁড়ে বেঁধে দিল হাত, যাতে রক্ষ প্রবাহ বন্ধ হয়! রাতের চাঁদের আলোতে বিষনাশক ও রক্তপ্রবাহ বন্ধ করার পাতা খুঁজতে ঘন্টা খানেক হয়ে গেল। এই ফাঁকে ডাইনি “তুকাতিয়া” বার বার চেষ্টা করতে থাকলো বার্চ গাছটিতে উঠতে। আমার ঝরে পড়া রক্ত চাটতে থাকলো সে! কিন্তু বুড়ো হওয়ার কারণে উঠতে পারলোনা বৃক্ষের ডালে সে। খবর পেয়ে থ্রিয়াও একগাদা লতাপাতা নিয়ে এলো আমার জন্য। একটা পাতা চিবুতেই ব্যথা কমে গেল অনেকটা আমার। কিছু পাতা দিয়ে কেটে যাওয়া অংশ বেধে দিলে রক্ত পড়াও পুরো বন্ধ হলো। এসব করতে করতে রাত প্রায় ভোরের দিকে গেলে আবার পরীরা উড়াল দিলো পাল সমেত। যার মাঝে আমি শুয়ে রইলাম। চারদিকে সমুদ্রের অথৈ পানি। চাঁদ ডুবে গেছে। তাই পরীরা কিংবা আমিও বুঝতে পারলাম না কোন দিকে যাচ্ছে। কোথায় টোংগা। সাগরের কিনারে দাঁড়িয়ে বেশ কবার পাথর, তীর আর বর্ষা নিক্ষেপ করলো ডাইনি! তাই পরীরা সমুদ্রের বেশ দূরে গিয়ে একই স্থানে একা আমাকে উড়িয়ে রাখলো ভোর পর্যন্ত।
:
সমুদ্রের ভেতর থেকে রাজহাঁসের ডিমের কুসুমের মত সূর্য উঠলে পরীরা ঠিক করতে পারলো কোন দিকে যাবে তারা। প্যাসিফিকের নীল জলরাশির উপর দিয়ে উড়ে চললো একঝাঁক পরী আমাকে নিয়ে। অনেকক্ষণ পর ওরা সাউথ টোংগার হা আলুমা বিচে নামালো আমাকেসহ। সমুদ্র বাতাসে জ্বর এলো আমার হয়তো হাতে বল্লমের আঘাতের কারণে। নিচে নামিয়ে রিয়া সারাক্ষণ বসে রইল আমাকে নিয়ে। অন্য পরীরা গেল খাবার ও ঔষধির সন্ধ্যানে। দুদিন হা আলুমাতে কাটালাম একঝাঁক পরীর সাহচর্যে। ওরা নানাবিধ খাবার সংগ্রহ করলো বন থেকে। আর বনজ পাতা ও ফল। রিয়া সারাক্ষণ থাকতো আমার সাথে। আর সে ছিল প্যাসিফিক ওসেনের জলপরী। তাকে বললাম
– রিয়া তুমি কি যাবে আমার সাথে বাংলাদেশে! ওখানেও জল আর সমুদ্র আছে। নাম বঙ্গোপসাগর।
– আমার যেতে ইচ্ছে করছে খুব। কিন্তু আমাদের জলপরীদের মানুষের সাথে সম্পর্ক করার নিয়ম নেই। করলে আমার সকল স্বজনকে শাস্তি পেতে হবে কঠিন। তা ছাড়া আর কখনো ফিরতে পারবো না এ সমাজে আমি!
– তাহলে কি একাকি ফিরবো আমি!
কষ্ট ধূলোপথের পাখপাখালি কিংবা বৃষ্টিস্নাত মৃত্তিকার জ্যামিতিক ঢেউ খেলিয়ে রিয়া বলে – হয়তো তাই করতে হবে তোমাকে!
চোখ অশ্রুময় হলো তার। কারণ পরীরা মানুষদের ভালবাসে খুব। বিশে করে পুরুষ মানুষদের! আবার রাত নামে প্যাসিফিক আকাশে। রিয়া চোখে জল নিয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আকাশে নক্ষত্রমালারা উড়ে যায আমাদের রোদকষ্টকে মুছে দিয়ে।একদিন সময় হয় আমার ঘরে ফেরার। পুরো সুস্থ হই আমি। বিদায় চাই সকল পরীদের কাছে! চাই রিয়ার কাছেও! কৃতজ্ঞতা জানাই ওদের প্রতি।
:
এক রাতে আবার ওরা ওদের পাখার বাতাসে পাল ভাসিয়ে পৌঁছে দেয় আমায় টোংগা মূল ভূখন্ডে। যেখানে অপেক্ষা করছে আমাদের ট্রেনি গ্রুপের অপর সাথীরা! এবং বিদায় দিতে হয় ওদেরকে আমাকে এক করুণ ক্লান্ত ক্ষণে! আমায় বিদায় দিতে সজল হয় ওদের সকলের চোখ। বিদায়কালে আত্মিক বেদনার দিন রাত্রি কেড়ে নেয় আমাদের জীবনানন্দগুলো। এবং সত্যি সত্যি অন্ধকার লীন কোন দূর নক্ষত্রমালার দেশে উড়ে যায় ওরা! টোংগা দ্বীপের এইসব জীবন আলোকের বিশুষ্কতা রোদ হৃদয়ের তাপে গলে গিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি আমি প্যাসিফিক আকাশে উড়ন্ত পরীর ঝাঁকের দিকে। ওদের ভালবাসার ঘ্রাণে পুড়তে পড়ুতে এগুতে থাকি থাকি আমার গন্তব্য পথে! ওরা উড়ে যাওয়ার পরও মৃতবৎসা’ মাতালের মত চেয়ে থাকি আমি একাকি ধূসর চোখে ওদের আকাশে! ওদের ফনিল সমুদ্র জলরাশির দিকে!
[৪ পর্বে সমাপ্ত]
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 2 =