জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-71

সম্প্রতি একটি বিভাগীয় শহরে চাকুরিসূত্রে যেতে হয় আমাকে একটা কাজে। ঐ শহরের অদুরে চারদিকে নদীঘেরা একটা দ্বীপে আমি জন্মেছিলাম এবং কলেজে ভর্তির্ আগ পর্যন্ত ওখানেই বড় হয়েছি ঝড় জলোচ্ছাসের সাথে যুদ্ধ করে। তাই নিজ দ্বীপগ্রামে না গিয়ে ফিরতে পারিনি আমি ইট পাথরের ঢাকায়। শহর থেকে ২-ঘন্টা ট্রলারে যেতে হয় আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। আগে ঘুটঘুটে অন্ধকার দ্বীপে পথ চলতে রাতে গা ছমছম করতেো আমার কিন্তু এখন মধ্যবিত্ত, দরিদ্র, হতদরিদ্র প্রায় সব ঘরেই সন্ধ্যার পর জ্বলে উঠে জোনাকির মত হাজারো সোলার লাইট, যা দেখে খুশিতে নেচে উঠি আমি। এ এক বিস্ময়কর উন্নয়ন গ্রামীণ জেলে, কৃষাণ আর হতদরিদ্র মানুষের জীবনে।
 
আমি ঘটনাচক্রে বিশ্বের উ্ন্নত অনেক দেশ আর শহর দেখেছি। তাই আমার দ্বীপগ্রামের অতিদরিদ্র মানুষদের সাথে তাদের তুলনা করে নানাবিধ মনোকষ্টে ভুুগি আমি। স্বপ্ন আমার- কখন এদের জীবনে একটু আলো আসবে, সুখের নাগাল পাবে এরা।
 
বেলা না বাড়তেই সদ্য ধান কাটা মাঠে কৃষকের বিবিধ ফসলের বীজ বোনা দেখতে থাকি তাদের সাথী হয়ে গভীর নিবিড়তায়। এখনো আমার দ্বীপগাঁয়ে কত রবি ফসলের চাষ করে নিরক্ষর গ্রামীণ কিষাণ কিষাণিরা! তিল, তিষি, কাউন, সরিষা নানাবিধ ফসলের বপন চলছে এখন নদীতীরের বেলে জমিতে। গত মাসে তাইওয়ানে খুব মিষ্টি আর কচকচে ফুটি (বাংগি) খেয়ে তার বীজ নিয়ে আসি আমি গভীর যত্নে, তা লাগাতে বলি কৃষকদের তাদের জমিতে। পরম আগ্রহে কৃষকরা পরখ করে লাগাতে থাকে ঐ চৈনিক বীজ।
 
এক সময় “বথুয়া শাক” ফলতো আমাদের নদীতীরের সকল মাঠে অনেক কিন্তু এক অবোধ্য কারণে এ শাকটি বীজসহ হারিয়ে গেছে আামার দ্বীপ গ্রাম থেকে। এটি খুব পছন্দ করি আমি, মাঝে মাঝে মেলে ঢাকা শহরে। ঘটনাক্রমে ক’মাস আগে মনপুরা দ্বীপ ভ্রমণে গেলে সেখানে অফুরন্ত “বথুয়া গাছ” দেখে পরিচিত জনৈক হেডটিচারকে অনুরোধ করি, কমপক্ষে ১ কেজি বথুয়ার বিচি যেন দেয় আমায়। ভদ্রলোক কমপক্ষে ৫-কেজি বীজ সংগ্রহ করে পাঠিয়েছেন আমার জন্যে। বাড়ি গিয়ে ব্যাগ ভর্তি বথুয়ার বীজ নিয়ে সবার জমিতে ছিটাতে থাকি, আমার পাগলামো দেখে কেউ হাসে। কেউবা “অতি শিক্ষিত পাগল” বলে আমায়। খুব পরিচিত এক কৃষককে অনুরোধ করি তার জমিতে যেন “জয় বাংলা” অক্ষরের মত করে বথুয়ার বিচি ঘন করে বুনতে দেয় আমায়। আমার চিহ্নিত দাগে কোদাল দিয়ে দাগ কাটে কৃষক, আমি “জয় বাংলা” লিখে তাতে বুনে দেই স্বপ্নের বথুয়া বিচি।
 
সন্ধ্যার প্রাক্কালে নদীতীরে কিষাণ কিষাণীর ধানের উৎসব দেখি আমি মন ভরে। কত রং আর জাতের ধান। কোনটি লাল, কাল, সোনালী, আবার হলদে। ছোট, মাঝারি, মোটা আবার লম্বাটে। ঘ্রাণযুক্ত ধানও চাষ করে আমার দ্বীপের কৃষকরা। কত নাম ধানের কালিজিরা, সোনামুখি, ঘনচি, রাজদিঘা, লক্ষ্মীদিঘা, বাঁশফুল, চিনিবিলাস, হনুমানজটা, নরই, রাতুল, কলমিলতা, নাতোল, ষাইটা, ঠাকুরভোগ, নয়নতারা, কালিঝলি, বুড়িমুরলি, বউরোশ, কালামাছি, দুধমাছি, সূর্যমণি, বকরমিঠা, চৈতনদুমা, দুমরা, বৌমাইল, অলিরাজ, চম্পাকলি, লক্ষ্মীবিরালি, ইন্দুশাইল, ভাদনিয়া, ফুলকড়ই, ইছাআমন, খামা, গুয়ারশাইল, কড়ি আমন, লক্ষ্মীবিলাস, লালগোটক, আশমিতা, কিরণ, পানিকাওরি, খিরণী, গাবুরা, হিলবোরাগ, বাগদাইর, গোলাপবেরি, বাঁশাবোরো, কালামুখি, কালাগোরা আরো কত কত নাম, সব কি জানি আমি?
 
এ যেন নবান্নের উৎসব গরিব কৃষকের ঘরে। তারা মাঠে চাতাল করে তা গোবর দিয়ে লেপে তাতে কেউ ধান শুকায়, কেউ ঝাড়ে, আবার কেউ গোল দিয়ে শুকিয়ে রাখে। কেউবা সদ্য কাটা ধান বিশালাকার স্তুপ করে রেখেছে নাড়া থেকে আলাদা করার অপেক্ষায়। প্রচণ্ড শ্রমের মাঝেও্র সবার মুখেই হাসি ধান উৎসবের।
 
সন্ধ্যা হলে কৃষাণিরা ধান ঢেকে চলে যায় তাদের ছোট কুড়েতে। কেউবা পাহারার জন্যে ধানের স্তুপের কাছে ঘুমায়। আমি আমার চিরচেনা নদীর পাড়ে গিয়ে ঘাসের উপর বসি। ঝুপ ঝুপ করে বেলে মাটির নদীর পাড় খসে পড়ে। নদী ভাঙন আমার দ্বীপগ্রামের প্রধানতম সমস্যা। কিন্তু দরিদ্র ধর্মভীরু মানুষ ভাঙনরোধে গডের কাছে সকাল সন্ধ্যা প্রার্থনা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।
 
বিশাল মেঘনায় এ কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের রাতেও গরিব জেলেরা তাদের স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে নিয়ে ছোট নৌকায় ইলিশ মাছ ধরে। ধোয়াশার মাঝেও তাদের সকলের নৌকোর উজ্জ্বল প্রদ্বীপ গুণতে থাকি আমি। হয়তো কেউ দুয়েকটি মাছ পেয়ে বাজারে বিক্রি করে চাল ডাল কিনবে রাতের জন্যে, আবার যারা ৪/৫ ঘন্টা জাল টেনেও কোন মাছ পাবে না, তারা হয়তো ছোট শিশুদের নিয়ে খালি হাতেই ফিরবে নিজ কুড়েতে, হয়তো অভুক্ত থাকবে তারা রাতে কিংবা বাকিতে কিনবে রাতের জন্যে তেল নুন।
 
রাতের প্যাঁচারা ছো মেরে নদী থেকে মাছ নিয়ে আমার সামনে দিয়েই উড়ে যায়। অপূর্ব দক্ষতায় জলের ভেতর থেকে মাছ তোলার দৃশ্য উপভোগ করি আমি অবাক বিস্ময়ে। ক্ষীয়মান চাঁদের আলোয় কুয়াশায় ঢাকা লাউ মাচার পাশে বসে অনেকক্ষণ শান্ত নদী আর জেলেদের মাছধরা দেখতে থাকি আমি। গ্রামে রাত নটা মানে গভীর রাত। স্বজনরা টর্চ নিয়ে খুঁজতে আসে আমায় নদীতীরের চায়ের দোকানে। তাদের কথা ষ্পষ্ট শুনি আমি কিন্তু লাউয়ের মাচার পাশে কারা যেন আমায় আটকে রাখে, ফিরতে দেয়না ঘরে, নদীর অমোঘ টান আমায় ধরে রাখে পলাতকা প্রেমিকার মতো। অষ্পষ্ট আলোয় তার ঝুপ ঝাপ ভেঙে পড়া দেখি আমি, আর বিস্ময়করভাবে প্রত্যেক পাড় ভাঙার শব্দে আমার দুখগুলো গলে গলে ঝরতে থাকে নদীর মতই। আমার স্বজনরা আমায় খুঁজে ফিরে যায় বাড়ির দিকে, আমি বিশাল মেঘনার তীরে বসেই অষ্পষ্ট চাঁদ আর অনন্ত আকাশের নক্ষত্রমালার মাঝে হারিয়ে যাই, ঘরে ফেরার কথা আমার মনে থাকে না, রাত গভীর থেকে গভীর হতে থাকে!
:
[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 72]
 
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

32 − = 27