আরেক দু:খযন্ত্রণার হাঁটে একদিন

আরেক দু:খযন্ত্রণার হাঁটে একদিন
:
কৈশোরে আমি একাকি কিংবা গ্রুপে বনবাদারে ঘুরে বেড়াতাম সারাক্ষণ। প্রকৃতি আর বৃক্ষের সাথে নিবিঢ় এক মানবিক বন্ধুত্ব ছিল আমার। কখনো একাকি গহিন বৃক্ষমাঝে ঘুরতে গিয়ে ভয় যে পেতাম না তা নয়! একদিন এক অচেনা গাঁয়ে ঘুরতে গিয়ে সব মানুষকে কেমন যেন অচেনা, অপরিচিত আর হিংস্র মনে হলে আমার। আমি ঐ গাঁয়ের লোক নই বলে একদল ভয়ঙ্কর লোক তাড়া করলো আমায়। হয়তো ধরতে কিংবা হত্যা করতে। জীবন বাঁচাতে একাকি দৌঁড়ুতে থাকলাম রাস্তা, জলকাদা, মেঠোপথ আর বনবাদার পেরিয়ে। দৌঁড়ুতে দৌঁড়ুতে বিশাল জনশূন্য এক কবরস্থানের মাঝে পড়লাম আমি। যার অধিকাংশ কবরই ছিল ভাঙা। যতই দৌঁড়াচ্ছি, ততই সামনে সব ভাঙা কবর পড়তে থাকলো আমার। নরম মাটির কবর পা রাখলেই ভেঙে পড়ে। ভয়ে আতঙ্কে ঐসব কবরে পড়তে পড়তে কোন রকমে ছুটতে ছুটতে এক অজানা বনের ভেতর চলে গেলাম। গহীন বন! চারদিকে সব ভয়ঙ্কর অদেখা অদ্ভুৎদর্শন বৃক্ষ। আমাদের গাঁয়ে এমন বৃক্ষ কখনো দেখিনি আমি।
:
দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। তাই একটা বিশাল বৃক্ষছায়াতে বসলাম বিশ্রাম নিতে। একটু পরই শুনলাল শ্বাস নেয়ার মত দীর্ঘশ্বাসের হিস হিস আওয়াজ। ওপরে তাকিয়ে দেখি, যে বৃক্ষের নিচে আমি আশ্রয় নিয়েছি সেটাই মানুষ খেকো বৃক্ষের মত বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। আমি চিৎকার দিতে যাবো, এমন সময় কদাকার বৃক্ষ মুখ খুলে বললো
– বাছা! বাঁচতে চাইলে আমার ভেতর আশ্রয় নাও। না হলে ভাগো যত তাড়াতাড়ি পারো। না হলে মারা পড়বে এখানে! ভয়ে আবার দৌঁড়ানো শুরু করলাম। কত পাহাড়, জঙ্গল, জল, বন্ধুর পথ তার শেষ নেই। ঘন্টা খানেক দৌঁড়ানোর পর আর পারছিনা। আবার বিশ্রাম নিতে বসলাম কটা ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে। যেখানে বেশ ঠান্ডা বাতাস বইছে। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে আমার। আমি কি ঘুমিয়ে যাবো? কিন্তু মাথায় ঠান্ডা কি যেন পড়ার শব্দে জেগে উঠলাম। ওমা! জল পড়ছে ওপর থেকে। বৃষ্টি দেখছিনা। তবে জল এলো কোত্থেকে! একটা বড় পাখির বাসার মত দেখা যাচ্ছে নিচ থেকে। তবে কি বড় কোন পাখির বাসা? ভাল করে দেখতে চেষ্টা করলাম একটু দূরে গিয়ে! ওমা! এটা কি দেখছি!
:
বাসার মাঝে এক দাড়িযুক্ত বুড়ো বসে রয়েছে? চোখ পিট পিট করে বললো
– তুমি এ বনে কি করতে এসেছো বাছা! বাঁচতে চাইলে আমার বাসাতে এসো, না হলে পালাও না হলে মারা পড়বে। আমার বাসাতে এলে তোমাকে বাচ্চার মত পালবো আমি!
বলে কি বুড়ো? মানুষের বাচ্চাকে পালবে সে পাখির বাসায়! ভয়ে আঁৎকে উঠলাম আমি। আবার প্রাণপণে ছুটতে থাকলাম। প্রাণ বাঁচাতে ঝড়ের মত ছুটছি। আবার এক বৃক্ষ। আবার এক বড় বাসা। আল্লাহ জানে, এ বাসাতে আবার কোন অজগর বসে রয়েছে। একটা ঝুলন্ত সিঁড়ির মত ঝুলে রয়েছে। আস্তে আস্তে সিঁড়ির কাছে গিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম। ওরে বাবা! এ বাসাতে অনিন্দসুন্দর এক কন্যা ভেতর থেকে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। চোখ খুলে বেণী দুলিয়ে হেসে বললো
– তুমি এ গহীন বনে কোত্থেকে এসেছো বন্ধু! কখনো কোন মানুষতো এ বনে আসতে পারেনি। তুমি কিভাবে এলে?
– আমি বাংলাদেশের মানুষ! স্কুলে পড়ি! কিভাবে এসেছি তাও জানিনা! আমাকে কি আমার গাঁয়ে ফেরার পথ বলে দেবে? কি নাম তোমার? তুমি কি মানুষ?
– কোথায় তোমার গাঁ বন্ধু! আমার নাম প্রজাকুইন! আমি অশরীরি পরী! এ বনে মানুষ ছাড়া সব অন্য অশরীরি প্রাণির বাস!
– আমার গ্রামের নাম জলদাস গাঁ! বাংলাদেশের নদীঘেরা একটা দ্বীপ! চারদিকে বড় বড় নদী! জেলে পল্লী সেটা!
– আমিতো সে গাঁ চিনিনা বন্ধু! জেলেও চিনিনা! এ বৃক্ষবনতো বাংলাদেশ থেকে বহু বহু বছরের পথ! এর মাঝে আছে মৃতদের কবরস্থান! তুমি তা পার হয়ে এলে কিভাবে!
– তা জানিনা আমি! তবে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হাজারো কবর ভেঙে এ জগতে এসেছি আমি! এটি কি পরকাল?
– তুমি কি থাকবে আমার বন্ধু হয়ে এ জগতে! পরকাল কিনা জানিনা। তবে এটা আরেক জগত! ন মানুষদের জগত!
– নাহ! আমার মাকে খুব ভালবাসি আমি! ফিরে না গেলে মা কাঁদতে কাঁদতে মারা যাবে! তার কাছে ফিরে যেতে চাই আমি! মায়ের কোলে!
– কিন্তু তোমাকে ফিরে যেতে দিলে, পথ দেখালে আমার যে মরতে হবে বন্ধু!
– কেন তোমার মরতে হবে কেন? তাহলে তুমিও চলো আমার গাঁয়ে! মা দেখলে খুব খুশি হবে!
– কিন্তু এ জগত থেকে কেউ তো বের হতে পারেনা বন্ধু!
– তাহলে আমি কি আর ফিরে যেতে পারবো না?
মানবিকতায় চোখে জল আর বুকে ভালবাসার মহাপ্লাবন এনে প্রজাকুইন বললো
– তোমাকে ফিরে যেতে সর্বাত্মক চেষ্টা করবো আমি, যদি তাতে আমার মৃত্যু হয় তবুও!
:
আমার হাত ধরে দৌঁড়াতে থাকলো প্রজাকুইন। আবার সেই পথ! যে পথে এখানে এসেছি আমি একাকি। সেই পাখির বাসা। সেই বুড়ো। অবশেষে কবরস্থানে ঢুকে পড়লাম আমরা। সিঁড়ি ছাড়া মানব জমিনের না খোলা পত্রখামে ভরা চিঠির মত বুকে আগলে দৌঁড়ুতে থাকলো প্রজাকুইন আমায়। আমরা জানিনা চারদিকের এ ভয়ার্ত কবরের পথ কখন শেষ হবে। আমরা দুজনে কবরের মাঝে হেঁটে বেড়াই দুখযন্ত্রণার নিমজ্জমান হাড়ের পাহাড়ে যেন। মৃতদের আর্তনাদ আর কষ্টে ব্যথা জাগানো বোধ পরিস্ফুট রোদের ভেতর নেচে যায় যেন। আমরা হেঁটে যাই জীবন পৃথিবীর ছিদ্রে ছিদ্রে আটকে থাকা ব্যথাতুর ধুলোদের মাঝে! প্রজাকুইনকে টেনে নিতে চায় মৃতরা তাদের কবরে। তারপরো আমাদের দুখের পাটীগণিত বীজগণিত কখন শেষ হবে সে প্রতিক্ষায় আমরা অবলীলায় হাঁটতে থাকি দুকবরের মাঝ দিয়ে। একটা গলিত শব প্রজাকুইনকে টেনে ধরে, প্রকুইন ধরে রাখে আমাকে। আমরা ডুবে যেতে থাকি কবরের নরম মাটিতে। এবার প্রাণপণ চিৎকার দেই আমি বাঁচতে সর্বশক্তি দিয়ে আমি।
:
মা জড়িয়ে ধরে আমায়। ভয়ার্ত গলায় বলে – “বাবা দু:স্বপ্ন দেখেছিল। জল খাবি”? কথা বলতে পারিনা আমি! তাকিয়ে থাকি মার দিকে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

78 + = 87