ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে পতিতালয়

যারা গত কয়েকদিন ধরে ‘আরও বেশি করে পতিতালয়’ বানানোর পরামর্শ দিয়ে কুরুচিপূর্ণ লেখা প্রসব করেছেন তারা মূলত পুরুষতন্ত্রের দাস ও দাসী। তাদের সবিনয়ে জানাচ্ছি যে, ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে পুরো দেশটি একটি জলজান্ত পতিতালয়। সুতরাং নতুন করে পতিতালয় বানানোর কোন প্রয়োজন নেই। এই দেশে জন্ম নেওয়া প্রতিটি নারীই কোন না কোন পুরুষের লক্ষ্যবস্তু। নারীরা আক্রমণের বস্তু, ভোগের বস্তু, পৈশাচিক বিনোদনের বস্তু, নিপীড়নের বস্তু; যে দেশে কোন নারীই নিরাপদ নয়, সেই ভূখণ্ড পুরুষের নির্মিত পতিতালয় ছাড়া আর কী হতে পারে?

ধর্ষণ সংগঠিত হলেই একদল সাময়িক চিন্তকের আবির্ভাব ঘটে। নারীপুরুষ নির্বিশেষে পতিতালয় নির্মাণের দাবি তুলে মূলত পুরুষতন্ত্রের, ধর্ষকের, সম্ভাব্য ধর্ষকের পক্ষেই অবস্থান নেয়। যেহেতু এরা সাময়িক চিন্তক, গভীরে যেতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ। পুরুষেরাই নিজেদের সুবিধার্থে পতিতালয় নির্মাণ করেছে। নারীদের পতিতা, বেশ্যা, মাগী শব্দে জর্জরিত, ভীত, আতংকিত করে রেখেছে।

এইসকল অশিক্ষিত মূর্খেরা এটাও জানে না যে পতিতালয়ে যে সকল নারীকে ভোগ্যবস্তু হিশেবে ব্যবহার করা হয় তারা নিজেদের ইচ্ছাতে এই জগতে প্রবেশ করে নি। পতিতালয় বানানোর অর্থ হচ্ছে শিশুপাচার, মানবপাচার, অপহরণে বৈধতা দেওয়া। আমরা তৃতীয় বিশ্বের একটি ক্ষুদ্র, দুর্নীতিপরায়ণ, অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠী। অর্থাৎ, এখানে যে-কোন অপরাধ সংগঠিত এবং বিচারব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো সংস্কৃতিস্বরূপ। এমন অবস্থায় এ-ধরনের ব্যাকালাপ চালানোর মানে হচ্ছে নতুন করে ধর্ষক উৎপাদন, অপরাধী উৎপাদন এবং ক্ষতিগ্রস্থের বিপক্ষে অবস্থান।

ধর্ষণের শিকার হলেই আমরা সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, বিনোদনের অভাব, পতিতাপল্লির সংকট, পাশ্চাত্যমুখী সংস্কৃতির প্রভাব, পর্নো আসক্তি, পশ্চাতমুখী ধর্মীয় শিক্ষা, নারীর পোশাক, নারীর চালচলন, নারীর স্বভাব, নারীর চরিত্র, নারীর শরীরকে মূল সমস্যার কারণ হিশেবে চিহ্নিত করি।

কিন্তু, যে ব্যক্তি বা যেই লিঙ্গের মানুষ এই জঘন্য অপরাধটি সংগঠিত ও পরবর্তীতে বৈধতা ঘোষণায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে, তাদের নিয়ে আমাদের কোন বক্তব্য নেই। এটি একটি বিশাল সমস্যা। পুরুষেরা ধর্ষণ করবে এবং নারীরা ধর্ষিত হতেই থাকবে আর আমরা আজীবন নারীর দিকে আঙুল তুলেই যাবো এবং আশেপাশের নৈতিকতা নিয়ে বিজ্ঞবিজ্ঞ আলাপ করেই যাবো তা আর হতে পারে না।

মূল সমস্যা পুরুষের। যতোই আমরা সাংস্কৃতিক, নৈতিক, পারিবারিক, বিনোদন, পাশ্চাত্যমুখী, পর্নো, মাদক প্রভৃতি নিয়ে উচ্চস্বরে চিৎকার করে নারীদের দোষারোপ করি না কেনো- দোষ শুধুমাত্র পুরুষের। এবং এটা পুরুষদের শিকার করতে হবেই। শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা কোথাও যেখানে নারীরা নিরাপদ নয়, সেখানে ধর্মীয় নৈতিকতার অভাব, সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসহ প্রভৃতির ভণিতা না দেখিয়ে সরাসরি পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা স্বীকার ও চিহ্নিত করা বাঞ্ছনীয়।

হাজার বছর ধরে নারীদের অত্যাচার, নিপীড়ন, ধর্ষণ করেও পুরুষেরা নির্লজ্জের মতন শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে আসছে, যেই শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষদের নিপীড়ক হিশেবে চিহ্নিত করে, সেই শ্রেষ্ঠত্ব একদিন ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

50 − 48 =