জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-72

একবার মেঘনার ঘোলাজলে জেলেদের জালে একটা অদ্ভুৎ সুন্দর শিশুমাছ ধরা পড়লো। ওপরের দিকটি বেশ কালো, আর সারা শরীরে বাঘেরমত ডোরা-কাটা চমকপ্রদ সব দাগ। এমন মাছ কোনদিন দেখেনি তারা। জালে আটকানো সুন্দর মাছটি দেখে খুব মায়া হলো আমার। ১০-টাকা বখশিস দিয়ে ছোট মাছটিকে হাতে করে নিয়ে এলাম বাড়িতে, তখনো লাফাচ্ছিল মাছটি বাঁচার জন্যে। ওর নীল চোখের দিকে তাকিয়ে আমাদের ঘর সংলগ্ন পুকুরে ছেড়ে দিলাম মাছটি। ফুরুৎ করে মাছটি চলে গেল পুকুরের কালো জলে।
:
রাতে আমার স্বপ্নে দেখা দিলো মাছটি। বললো, “আমার প্রাণ বাঁচালে বন্ধু! কি চাও তুমি আমার কাছে”? হেসে বললাম, “ছোট মাছ তুমি, কি আর করতে পারবে তুমি”? মাছটি লাল ঠোঁট নেড়ে বললো, “আমার মা আর বাবার আছে অনেক অলৌকিক ক্ষমতা। আমারো হবে, যখন পূর্ণ হবে বয়স ১০-বছর আমার”। জানতে চাইলাম, “কি ক্ষমতা হবে তোমার তখন”? মাছটি বললো, “তোমার সব বিপদের সংবাদ আগাম বলতে পারবো আমি, ভবিষ্যতও বলতে পারবো”। মাছটির কথা শুনে অবাক বিস্ময়ে ঘুম ভাঙলো আমার অন্ধকার রাতেই।
:
ঘুম থেকে উঠেই পুকুরের পাকা ঘাটে মুখ ধুতে গিয়ে প্রথমেই নজরে পড়লো ছোট্ট শিশু মাছটিকে। তাকে ধরতে গেলেও সে পালালো না। প্রগাঢ় বিশ্বাসে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। জলহীন ওপরে মারা যেতে পারে নতুন মাছটি, তাই ছেড়ে দিলাম তাকে পুকুরে আবার। সারাদিন স্কুল, বাজার, মাঠ, বিল নিয়ে পড়ে রইলাম, মাছটির কথা আর মনে রইলো না। রাতে ঘুমের মধ্যে আবার এলো মাছটি। চোখে জল ঝরিয়ে বললো, “বন্ধু তুমি আমায় বাঁচিয়ে, তোমার পুকুরে ছাড়লে কিন্তু আমিতো সাগরের মাছ। এ পুকুরে আমারতো কোন খাবারই নেই। কাল থেকে কিছুই খাইনি আমি। আমাকে খেতে দেবেনা কিছু? না হলেতো আমি মারা যাবো বন্ধু” !” কি খাবে তুমি”? এমন কথা বললে মাছটি কাল বিলম্ব না করে বললো, “শৈবাল”!
:
সকালে উঠেই আবার ঘাটে দেখি সেই মাছ। কিন্তু শৈবাল কোথায় পাবো? মুরি দিলাম, ভাত দিলাম, রুটি দিলাম কিন্তু কিছু মুখে দিলোনা ছোট মাছটি। নদীর তীরে গিয়ে অনেক শৈবাল খুঁজলাম কিন্তু এ বর্ষায় কোথাও নেই শৈবাল। হঠাৎ বিলের ধানক্ষেতের জলে অনেক সবুজ জলজ শৈবালের কথা মনে পড়লো আমার। তার কিছু তুলে পুকুরে দিতেই দেখলাম, ছো্ট্ট মুখ দিয়ে খুটে খুটে খাচ্ছে শৈবালগুলো্। রাতে আবার আমার স্বপ্নে এসে বললো, “ধন্যবাদ বন্ধু তোমাকে। এটাই আমার খাদ্য”।
:
দুদিন পরেই দেখলাম ঐ শৈবাল সব শেষ। তাই ২-কামলা নিয়ে বিল থেকে প্রচুর শৈবাল এনে ছাড়লাম পুকুরে। পুরো পুকুর এবার শৈবালময় হলো। মা, ভাই বাড়ির সবাই আমার পাগলামো দেখে হাসলো। কারণ, সবাই পুকুর থেকে সবুজ শৈবাল পরিস্কার পরে, কেউ ছাড়ে না কখনো।
:
দেখতে দেখতে ৭/৮ বছর কেটে গেলো। বেশ বড় হলো আমার শিশু মাছটি। তার রূপ চেহারা চেকনাই আরো বাড়লো। আমি তার নাম রাখলাম “ধীবর টাইগার”। এ নামে ডাক দিলেই সে একদম ঘাটে আসতো। স্নান করতে নামলে আমার গায়ে গুতো দিতো মাথা বা শরীর দিয়ে। কখনো টাইগারকে ঝাপটে ধরলে, সে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করতো আমার নিয়ে জলের ভেতর।
:
আমার ছোটবোনের বিয়ে হয়েছিল পাশেই গাঁয়েই। গাঁয়ের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তাকে তুলে নেয়ার পরদিন লাঠিখেলা ও কাদাখেলা শেষে বরের বাড়ির তরুণরা কাদামাখা গায়ে এলো আমাদের বাড়ি। তারা প্রথমে আমাদের প্রায় সব গাছের ডাব পাড়লো, একটা ছাগল নিলো এবং সবাই পুকুরে নামলো বড় জাল নিয়ে। ১০/১২ জন জাল টেনে তুলে নানাবিধ মাছের সাথে ধরে আনলো প্রায় ৩০-কেজি ওজনের ‘ধীবর টাইগার’কে। ঐ মাছ দেখে উল্লসিত সবাই বললো, “সবচেয়ে বড় অদ্ভুৎ মাছ পেয়েছে তারা, তাই অন্য কোন রুই-কাতলা নেবেনা তারা, কেবল এ মাছটাই নেবে”। খবর পেয়ে দৌঁড়ে এসে জালে আটকানো ধীবর টাইগারকে ছেড়ে দিতে বললাম আমি। কিন্তু আমার বোনের দেবরসহ কেউই এ মাছকে ছাড়তে রাজি হলোনা। কারণ গ্রাম্য রীতি অনুযায়ী বিয়ের পরদিন কাদাখেলা লোকজন, কনের বাড়ির যে মাছ ধরতে পারবে সেটা তাদেরই। অনেক অনুরোধেও রাজি হলোনা তারা ধীবর টাইগারকে ছাড়তে। অনেকটা জোর করে ধীবরকেছেড়ে দিলাম আমি পুকুরে। শেষে ঝগড়া করে ডাব আর ছাগল রেখেই চলে গেলো তারা মাছ না দেয়ার কারণে। এ ঘটনা সামলাতে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল আমাকে পরবর্তীতে।
:
একবার আমি মেঘনায় প্রচণ্ড ঝড়ে নৌকোডুবিতে পড়েছিলাম। যাত্রার আগের রাতে ধীবর টাইগার আমার স্বপ্নে এসে বলেছিল, “কাল যেওনা কোথাও। তুমি পুকুরঘাটেই থেকো”। কিন্তু তার কথা শুনিনি আমি। তারপর মেঘনায় ডুবে অনেক কষ্টে ফিরে এসেছিলাম জীবন নিয়ে। ফেরার পর এক রাতে ধীবর কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমায় বললো, “যেতে না করেছিলাম না আমি! আমার মা আমাকে জানিয়েছিল, মেঘনায় তোমার বিপদ হবে”। “সমুদ্রে অবস্থানরত মা কিভাবে কথা বলে তোমার সাথে”? জানতে চাইলে ধীবর ঠোঁট উল্টে বলে, “আমাকে যা বলে, তা চলে আসে আমার মনে, সব বুঝতে পারি আমি”। আমি ধীবর টাইগারকে খুব যত্নে লালন করতে থাকি, যাতে দশ বছর পূর্ণ হলে সব বলতে পারে সে আমার জীবন বিপদ আর ভবিষ্যগুলো।
:
এর মধ্যে একদিন সমুদ্রে বিশাল সাইক্লোন শুরো হলো। প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসে আমাদের বিল-ঝিল-নদী সব পানিতে টইটুম্বুর হয়ে ডুবে যায়। ৩/৪ দিন আমরা কেবল ঘরের মধ্যে আটকে থাকি। রাস্তা-ঘাট বাজার সব জলমগ্ন থাকে। নৌকা ছাড়া যাতায়াত অসাধ্য হয়ে পড়ে। এতো জলে ধীবরের আর কোন খোঁজ নেয়া হয়না আমার। ৪-দিন পর পানি নেমে গেলেও, পুকুর পুরো ভরা থাকে জলে। পাকা ঘাটও ডুবে থাকে। তারপর ধীবরকে খুঁজতে থাকি আমি। ক্রমে পানি শুকিয়ে ঘাট জেগে উঠলেও, ধীবরকে আর খুঁজে পাইনা পুকুরে। পাক্কা ৮-দিন পর স্বপ্নে দেখা দেয় ধীবর। কান্নাজড়িত বেদনাদগ্ধ কণ্ঠে বলে, “আমায় ভুলে গেলে বন্ধু”! আমি জাগ্রত স্বরে বলি, “না ভুলিনি তোমায়। কিন্তু পুকুরে দেখছি না কেন তোমায়? কই গেলে তুমি”? রাতের নিঃসঙ্গতায় মৃত কপোতি জীবনের স্বাদে ধীবর বলে, “সমুদ্রে মায়ের কাছে ফিরতে জলোচ্ছ্বাসের সময় পালিয়েছিলাম আমি। ৫-দিন ক্রমাগত সাঁতরে সমুদ্র মোহনার কাছাকাছি এলে, বড় জালে ধরা পড়ি আমি। তখন অনেক কেঁদেছি তোমার জন্যে। কেন তোমায় ছেড়ে পালালাম তার জন্যেও অনেক আফসোস করেছি। কিন্তু বাঁচতে পারিনি আমি। জেলেরা মেরে ফেলে আমায়”।
:
ধীবরকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আমার। আমার সব বিপদে পাশে থাকতো সে, বলে দিতো সব ভবিষ্যত কথা। কিন্তু সে এখন মৃত আমার কাছে এ চিন্তনে এক অনুপম দুখের বাতাস উড়ে যায় আমার ঘনচুল ছুঁয়ে। আমার দুখাতুর জীবন বোধের অপেক্ষার ধীবর সময় ধরে কতকাল বসে থেকেছি আমি ঐ ধীবরের জন্যে, তার হিসেব নিকেষে যন্ত্রণাময় কষ্ট-হৃদয়ে জেগে থাকি আমি এক পুরণো দিনে। বোবা ধীবরের ভালবাসার যে শব্দ জন্ম নিয়েছিল দুখ পাখির শাবক হয়ে আমার জীবনে, তা কিভাবে যেন বেদনা-মাধুর্যে উড়ে উড়ে সুখ আকাশে দোল খায় ঘোলাটে মেঘ হয়ে। একদিন স্বপ্ন থেকেও হারিয়ে যায় ধীবর, তখন এক সমুদ্র ধীবর প্রেমের বিস্বাদ বিপন্নতায় কেবল রঙহীনতায় জেগে থাকি আমি আমাদের শূন্য শান বাঁধানো ঘাটে।
:
[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 73]
 
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 + = 36