জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-73

নদীবেষ্টিত আমাদের দ্বীপটিতে অনেক ভাসমান বেদে নৌকো ছিল আমার কৈশোরে। যাদের কেউ নদীতে মাছ ধরে বিক্রি করতো স্থানীয় বাজারে বা নদী-তীরে। কেউ সাপ ধরতো আর সাপের খেলা দেখাতো জেলে-কিষাণ ঝি-বৌদের। অন্য একটা বেদে গ্রুপ চুড়ি-ফিতা বিক্রি করতো গাঁয়ের মেয়ে বধুঁদের কাছে। এবং বিস্ময়করভাবে বেদে পরিবারগুলো ছিল নারী কেন্দ্রিক। মানে প্রতিটি নৌকোর প্রধান ছিল ‘একজন নারী’। মাছ ধরা, সাপের খেলা কিংবা চুড়ি বিক্রি সব কাজগুলোই করতো মুলত নারীরা। পুরুষরা কেবল তাদের সহযোগি ছিল। হাজারো বেদে নৌকো আজ যান্ত্রিক জীবন তাড়নায় বিলুপ্ত হলেও, এখনো শ’পাঁচেক বেদে বহর ঘুরে বেড়ায় মেঘনা অববাহিকায়। যারা প্রায়ই আমাদের দ্বীপগাঁয়ে নৌকো ভেড়ায় জীবনের সপ্তপদি চাহনিতে এখনো।
:
বেদে নারীরা খুব সেজেগুজে থাকতো সব সময় এবং বেশ খোলামেলা ছিল রঙ ঝলমলে পোশাকে। আমাদের গাঁয়ের হিন্দু-মুসলমান সকল নারীরাই যখন মাথায় ঘোমটা দিয়ে রাস্তা চলতো কিংবা বোরখা পরতো কেউ কেউ, বেদে নারীরা তখন টকটকে লাল রঙ ঠোঁটে লাগিয়ে, কোমর আর পেট দৃশ্যমান রেখে, গাঁয়ের পথে পথে হেঁটে বেড়াতো যখন তখন। স্কুলে যাওয়ার পথে এক ছিপছিটে কিশোরি বেদেকন্যার সাথে আমাদের প্রায় প্রতিদিন দেখা হতো। ‘জুলেখা’ নামের ১৪/১৫ বছরের এ কফি রঙা ছোট মেয়েটি একই সাথে সাপের খেলা দেখাতো, আর বিক্রি করতেো সাপে ‘না কামড়ানোর তাবিজ’। কখনো তার মা থাকতো সাথে, কখনো একাই দেখা মিলতো তার। একা পেলে আমাদের কিশোর বন্ধু-গ্রুপ নানা হাসিঠাট্টা করতাম তার সাথে। কখনো লজেন্স কিংবা বিস্কিট জাতীয় কিছু কিনে দিতাম তাকে, তাতে গল্পে সময় দিতো জুলেখা। সম্ভবত আমরা ১১-বন্ধু তার ‘গ্রুপ-প্রেমে’ পরে যাই একদিন। সেও খুব হাসি তামাশা করতো আমাদের সব কজনের সাথে। ভালবাসার টানে বিনে পয়সায় সে তার নিজ হাতে আমাদের ১১-বন্ধুর বাহুতে ‘তাবিজ’ বেঁধে দিয়েছিল একদিন। নিজ ‘তাবিজ’ টেস্ট করাতে গোখড়ো ঘষে দিয়েছিল আমাদের প্রত্যেকের শরীরে কিন্তু কোন সাপ ভুলেও কামড় দেয়নি আমাদের কাউকে। বরং জিভ বের করে আদর করেছিল এই ১১-জনকে সম্ভবত জুলেখার পক্ষে কিংবা তার নির্দেশে।
:
একদিন আমাদের ১১-বন্ধুকে শোক সাগরে ভাসিয়ে জুলেয়া বিয়ে করলো অন্য নৌকার বেদে পুরুষ ‘বসন্ত’কে। সাঁওতাল-মুখো বসন্ত তার নিজের বেদে নৌকোয় মাছ ধরে সারাদিন। জুলেখার মা নগদ ৫,০০০ টাকা পেয়ে ঐ বেঢপ বসন্তের কাছে বিয়ে দেয় জুলেখাকে মুসলিম রীতিতে। এবং বিয়ের পরদিন যথারীতি মায়ের নৌকো ছেড়ে বসন্তের নৌকোতে স্থানান্তরিত হয় জুলেখা। ৩/৪ দিন জুলেখাকে না দেখে বুকের ব্যথা চেপে ১১-বন্ধু মিলে যাই জুলেখার মায়ের নৌকোতে। তিনি জিভ উল্টে তাচ্ছিল্য ভরে বলেন, “সোয়ামির সাথে জুলেখা চইলা গেছে ভাটির চরে মাছ ধরতে, সাপ-টাপ সব দিয়া গেছে আমারে। সাপের খেলা দেখাইবো না আর। তোমরা তার চিন্তা বাদ দিয়া স্কুলে যাও”। রাগে ইচ্ছে করে জুলেখার বেঁধে দেয়া তাবিজ ছুড়ে ফেলি মেঘনার ভরা জলে কিন্তু এক অবুজ প্রেমের ঘ্রাণতায় তাবিজ ফেলতে পারিনা আমরা কেউই জুলেখার।
:
প্রায় ৭/৮ মাস পর আকস্মিক একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে মাছের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে চলতে দেখি জুলেখাকে। আমাদের দেখে থমকে দাঁড়ায় সে। লজ্জায় কিছুটা বিব্রত হয় জুলেখা। আগের সামান্য হালকা একটা সাপের ঝুড়ির বদলে, এখন ১৫/২০ কেজি ওজনের মাছ বহন করছে জুলেখা। তার মুখের লাল রঙের বদলে দুপুরের রোদে পোড়া ক্লান্তির ছাপ ষ্পষ্টতর। সম্মিলিতভাবে সবাই ধরে মাছের ঝুড়ি নামাই আমরা মাটিতে। বলি, “এতো মাছ নিয়া কই যাও তুমি, কেমন আছো জুলেখা”? মুখ কালো করে তামাটে রঙা জুলেখা বলে, “তোমরাতো আমারে কেউ বিয়া করলা না। কেবল মিথথা প্রেমের কতা কইলা। হের লাইগা বসন্তের লগে বিয়া বইলাম আমি। এখন মাছ ধরতে ধরতে, আর বাজারে বেঁচতে বেঁচতে জানডা ত্যাজপাতা আমার”। কথা বললে বলতে জুলেখার কপাল বেয়ে রক্ত পড়তে দেখলাম আমরা। চুলে হাত দিয়ে দেখি বড় রিটা জাতীয় মাছের কাটা ঢুকেছে আমাদের প্রাক্তন প্রেমিকা জুলেখার মাথায় বাঁশের ঝুড়ি ভেদ করে। হারিয়ে যাওয়া ভালবাসার প্রগাঢ়তায় জুলেখার মাছের ঝুড়ি বহন করি আমরা ভাগ করে বাজার পর্যন্ত। মাছ বিক্রি শেষে জুলেখাকে নিয়ে কলাপাতায় গুড়ের জিলাপি খেতে খেতে জানতে চাই আমি, “জুলেখা তোমার পেট ফুলা কেন? তোমার কি কোন রোগ হয়েছে”? ১৫ বছরের কিশোর প্রাক্তন গ্রুপ-প্রেমিকদের জবাবে লজ্জিত হয়ে জুলেখা বলে, “আমার বাচ্চা অইবো”। আমাদের বয়সি এ ১৫ বছরের মেয়েটির কিভাবে এখন বাচ্চা হবে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাইনা ১১-জনের আমাদের কেউ-ই।
:
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে নদীর পারে নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে এগিয়ে যাই আমরা। জুলেখার মাকে দেখি তার ঘাটে লাগানো নৌকার গলুইয়ে বসা। ভেতরে তার মেয়ে জুলেখার আকাশ ফাটানো চিৎকার। গত রাত থেকেই নাকি মানব শিশু জন্মদানের কসরত করছে ১৫-বছরের ছিপছিপে ছোট খাটো আমাদের জুলেখা। বসন্ত শাশুড়ির নৌকোয় জুলেখাকে তুলে দিয়ে খুব ভোরেই চলে গেছে দুরের চরে মাছ আ্হরণে নিজ নৌকো নিয়ে। কি করবো বুঝতে না পেরে কালো মুখ করে ফিরে আসি আমরা আমাদের যার যার ঘরে। পরদিন স্কুলে যাওয়ার পথে আবার জুলেখার চিৎকার শুনি আমরা। মানে ২-রাত ২-দিন থেকে কাতরাচ্ছে ছোট এ মেয়েটি সন্তান প্রসবের জন্যে। মা তাকে গ্রাম্য বেত-পড়া, পানি-পড়া, জুতা-পড়া, মরিয়ম ফুল সবই দিয়েছে। গ্রাম্য “দাই” সাহস দিয়ে বলেছে, “আল্লাহ আল্লাহ করেন। এ ছাড়া কুনু উপায় নাই আর”। তাই জুলেখা আর তার মা কেবল “আল্লা আল্লা করতে থাক এ বিপদে”। আর বসন্ত ফেরেনি এখনো চর থেকে তার জরুরি মাছ ধরা ফেলে।
:
সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রা্প্ত একটা “প্রাথমিক চিকিৎসার বই” ছিল আমার। তাতে ছবিসহ সন্তান প্রসবের নানাবিধ কথা বলা ছিল। কিন্তু আমাদের মত কিশোরদের পক্ষে জুলেখার উপর তার প্রয়োগ সম্ভব ছিলনা। ১১-বন্ধু মিলে তার মাকে বইটি দেখাই আমরা আর হাসপাতালে নেয়ার কথা বলাতে অসহায় মা সম্মত হয় তাতে। এবং স্কুল বাদ দিয়ে কারো অনুমতি ছাড়াই একটা মাছ ধরার ছোট নৌকোয় জুলেখা আর তার মাকে নিয়ে শহরে যাই আমরা। পথে ক্রমাগত খিঁচুনি দিতে থাকে আর বার বার অচেতন জুলেখা। আমরা খুব ভয়ে পেয়ে যাই তার এ অবস্থায়। প্রবল বৃষ্টি নামে আকাশ ভেঙে বর্ষার নদীতে। আমরা ন’জনে ক্রমাগত বৈঠা আর দাঁড় টানতে থাকি তীব্র উজান স্রোতে। একজনে নৌকোর পানি ফেলতে থাকি, যাতে বৃষ্টির পানিতে ঢুবে না যায় নৌকোটি। আর একজনে ওর মায়ের সাথে খিঁচুনি দিয়ে বাঁকা হয়ে যাওয়া জুলেখাকে ধরে রাখি চেপে নৌকোর পাটাতনে। অবশেষে জবজবে বৃষ্টিতে ভিজে জুলেখাকে পলিথিনে ঢেকে পায়ে চালানো রিক্সাভ্যানে করে উপস্থিত হই আমরা সদর হাসপাতালে।
:
ইমারজেন্সিতে চোখ উল্টানো মুখ বাঁকানো জুলেখার মুখে ফ্যানা দেখে সবার চোখে জল আসে আমাদের এই ভেবে যে, “জুলেখা বোধহয় এই মরেই গেল”। ডাক্তারটা বললো, “গ্রাম্য মহিলাদের পেটের বাচ্চা ধরে টানাটানি করাতে শিশুটি মারা গিয়ে ‘একলামসিয়া’ হয়েছে তার। হাসপাতালে এখনই পেট কেটে অপারেশন করতে হবে জুলেখার। লাগবে কিছু ঔষধ আর রক্ত”। ঘটনাক্রমে আমাদের ৩-জনের রক্তের গ্রুপ মিললো জুলেখার সাথে। আমাদের কিশোর বন্ধুদের জুলেখার প্রতি এ দরদ থেকে আপ্লুত হলো ডাক্তাররা সবাই। বললো, “হাসপাতাল থেকেই বেশিরভাগ ঔষধ দেবে সে”। এবং তাই করলো। মাত্র ৩০০ টাকার ঔষধপত্র কিনতে হলো জুলেখার জন্যে। আমাদের ৩-জনের ৩-ব্যাগ রক্ত নিলো জুলেখাকে দিতে। প্রায় ২-ঘন্টা পর জুলেখার মৃত সন্তানকে টুকরো করে বের করা হলো তার পেট থেকে। ৩-ডাক্তারের সবাই বললো, “তোমরা এভাবে না আনলে অবশ্যই মারা যেত জুলেখা! ব্রেভ ইলেভন বয়েজ”।
:
আমাদের ১১-বন্ধুর প্রাক্তন প্রেমিক জুলেখাকে হাসপাতালে রেখে নৌকো নিয়ে ফিরে আসি আমরা গাঁয়ে। ক্রোধে গাঁয়ে ফিরে বসন্তকে নদীতে আটকে মার দেই আমরা খুব। তার নৌকোটি কেড়ে নিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম সবাই মিলে একরাতে। এ কারণে গাঁয়ের কেউ মন্দ বলেনি আমাদের। ৮-দিন পর মায়ের সাথে এক বিকেলে মোটর লঞ্চে ফিরে আসে আমাদের গাঁয়ে আমাদের জুলেখা। তা দেখে পুরাকৃতি সায়াহ্নের মতো ভাললাগার বিস্মরণে ভেসে যাই আমরা ১১-বন্ধু। জ্বলন্ত উনুনের তাপদাহে পুড়ে অঙ্গার হয়ে জুলেখা আর ফিরতে চায়না বসন্তের নৌকোয়। নিজ নিজ ঘরের ডাব, ডিম, পাকা পেঁপেঁসহ প্রত্যহ জুলেখার নৌকোতে যাই আমরা ১১-বন্ধু। আবার আমাদের পুরণো প্রেম জাগ্রত হয় আদিম বুনো দমকা বাতাসের মত। কিন্তু আমরা কি পঞ্চ-পাণ্ডব? যারা একসাথে বিয়ে করতে পারি জুলেখাকে ১১-জনে? এবং একদিন আমাদের উদারতায় বসন্তের নৌকোয় ফিরে যায় জুলেখা আবার। জুলেখাকে হারিয়ে পুরণো প্রেমের আত্মহননের শোঁকগান কোরাসে গাইতে গাইতে প্রেমিক পাখি হয়ে আমরা উড়তে থাকি জুলেখার চারদিকে জল নদী আর কৈশোরিক ভাললাগার আকাশে!
:
[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 74]
 
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =