ধর্ম প্রশ্ন দর্শন ও প্রগতি

ব্যক্তিগতভাবে কেউ ধর্ম বা সর্বশক্তিমান কোন স্রষ্টাতে বিশ্বাসী হোন বা না হোন, এটা ঐতিহাসিক সত্য যে ধর্ম বলতে একটা জিনিস অতীতে ছিলো এবং এখনো টিকে আছে। মানুষ ছাড়া তো ধর্মের অস্তিত্ব থাকতে পারেনা, আবার মানুষ ছাড়া সমাজও হয়না। সেইসূত্রে বলতে হয় যে সমাজকে আবেষ্টন করে এবং মানুষকে আশ্রয় করে ধর্ম টিকে ছিলো এবং আছে। কতদিন থাকবে সেইটা অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন।

ধর্ম ও ধার্মিকেরা ঈশ্বর, আত্মা, পরলোক, পুনর্জন্ম, স্বর্গ, নরক, জগতের সৃষ্টি, উদ্দেশ্য প্রভৃতি বিষয়ে ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত ব্যাখ্যা বিনাবাক্যে মেনে নেয়। তারা ঈশ্বরকেই বিনাপ্রশ্নে, পরম বিশ্বাসে সর্বশক্তিমান, সবকিছুর স্রষ্টা, নিয়ন্তা, সকল কার্যের কারণ বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু দার্শনিক বা দর্শন বিনা প্রশ্নে কিছুই মানেনা। দর্শনের প্রাণই প্রশ্ন। বিশ্বাসের মূল্য দর্শনে নেই। দর্শন যা কিছু স্বীকার করে, তার সেসব স্বীকৃতির পেছনে কারণ থাকে, প্রমাণ থাকে। কোথাও কোথাও সে কিছু বিষয়কে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেয় বটে। এটা দর্শনের দুর্বলতা। কিন্তু ধার্মিক যেমন বলে পবিত্র গ্রন্থ বলছে ঈশ্বর আছে, সুতরাং ঈশ্বর আছে। গ্রন্থে আছে, সুতরাং ওতেই প্রমাণিত হয় যে ঈশ্বর বিদ্যমান। কিন্তু ধর্মভিত্তিক বা ধর্মজাত যে দর্শন, তার ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ত্ব সম্পকে বক্তব্য ওরকম সরল বিশ্বাসভিত্তিক নয়, বরং প্রমাণ ভিত্তিক। এখন দর্শন যাকে বা যে উপায়কে প্রামান বলে স্বীকার করেছে, আমি বা আপনি সেটাকে প্রমাণ বলে নাও মানতে পারি। কিন্তু এটা বলতেই হবে যে দর্শনে প্রমাণ বা অপ্রমাণের একটা চেষ্টা আছে।

এই উপমহাদেশ মূলত যে তিনটি বড় ধর্ম এবং ধর্মকে কেন্দ্র করে যে তিনটি দর্শন জন্ম দিয়েছে সেগুলো হলো হিন্দু ধর্ম ও দর্শন, বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন এবং জৈন ধর্ম ও দর্শন। এই তিনটিরই জন্ম খ্রিস্টপূর্বাব্দে। খ্রিষ্টের জন্মেরও দেড় হাজার বছর আগ থেকে হিন্দু (প্রচলিত অর্থে। হিন্দু শব্দটা এসেছে অনেক পরে। এমনকি হিন্দু ধর্মকে অন্য ধর্মের সাথে বৈশিষ্ট্যের বিচারে ধর্ম বলা যায়না। যাহোক এখানে হিন্দু বলতে যে প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় রীতি বা সংস্কৃতির কথা বলছি, আজকের হিন্দুরা সেই রীতি ও সংস্কৃতিরই উত্তরাধিকার। সেই অর্থে আমি ওটাকে হিন্দু ধর্ম বলছি। চাইলে কেউ ওটাকে ব্রাহ্মন্যবাদ, বা আর্য সংস্কৃতিও বলতে পারেন) ধর্ম এবং ধর্মীয় সাহিত্য বা দর্শনের হদিস পাওয়া যায়। খ্রিষ্টের জন্মের ছয়শো বছর অর্থাৎ আজ থেকে দুই হাজার ছয়শো বছর আগে জন্মেছিলেন জৈন ধর্মের প্রচারক মহাবীর (ধরা হয় মহাবীরের আগেও জৈন ধর্মের পঁচিশ জন প্রচারক ছিলেন। তবে ঐতিহাসিকভাবে মহাবীরকেই প্রামাণ্য মনে করা হয়) এবং তাঁরই কিছু পরে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ। হিন্দু, জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন একে অপরের সাথে ইতিহাসের বহু সময় ধরে একে অপরের সাথে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত থেকেছে। সেইসব তর্ক থেকে জন্ম নিয়েছে দর্শন। নানা প্রকার ব্যাখ্যা। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনে ঈশ্বর নেই। এই দুই ধর্ম ও দর্শন তাই প্রচন্ড দার্শনিক বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে বৈদিক দর্শন, যাকে এখানে হিন্দু দর্শন বলছি, তার সাথে।

বেদের একাংশে দেবতাদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যজ্ঞের বিধিবিধান আলোচিত হলেও বেদের আরেক অংশে অর্থাৎ উপনিষদে আলোচিত হয়েছে কিছু দার্শনিক প্রত্যয়। জগতের সৃষ্টি, স্রষ্টা, স্রষ্টার স্বরূপ, সৃষ্টির উদ্দেশ্য, মানুষের মুক্তি বা মোক্ষলাভের উপায় প্রভৃতি। বেদকে কেন্দ্র করেই ভারতীয় দর্শনে জন্ম নিয়েছে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক ধারা। এদের ভেতর কিছু মিল এবং কিছু অমিল আছে। এই ছয়টি দর্শনকে, যাকে ষড় দর্শন বলা হয়, যথা : মীমাংসা, বেদান্ত, সাংখ্য, যোগ, ন্যায় ও বৈশেষিক। এদের সকলেই যে ঈশ্বরকে স্বীকার করে তেমন নয়। একমাত্র বেদান্ত দর্শনই বেদ ও ব্রহ্মকে অভ্রান্ত বলে মেনে নেয়। সাংখ্য দর্শন বেদ মানলেও ঈশ্বর মানে না। তার বক্তব্য হচ্ছে ঈশ্বর অপ্রমাণিত। যোগ, বৈশেষিক, ন্যায় দর্শন ঈশ্বর স্বীকার করছে, বেদকেও কিছু মাত্রায় মান্য করেছে। এবং মান্য করেও বেদের চিন্তার বাইরেও ভিন্ন চিন্তা করেছে। মীমাংসা দর্শন বেদকে ঈশ্বরের মুখনিসৃত বাণী মনে করেনা, কারণ এই দর্শনে ঈশ্বর নাই।

এই ষড় দর্শনের প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সাথে নানা বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে, একটি দার্শনিক ধারা অন্য দার্শনিক ধারার বিষয়বস্তুুর ব্যাখ্যাকে খন্ডন বা ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে, সেই সাথে নিজেদের ব্যাখ্যাটাও উপস্থাপন করেছে। এছাড়া আছে বেদবিরোধী বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম ও দর্শন। আর আছে চার্বাকের নাস্তিক্য দর্শন যা লোকায়ত দর্শন নামেও পরিচিত । যারা বেদ, ঈশ্বর এবং পরলোক এ তিনটির কোনটিই বা যে কোন একটি বা দুটি মানে না তারাই নাস্তিক বলে স্বীকৃত। সেই অর্থে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম নাস্তিক্যবাদী ধর্ম এবং দর্শন। চার্বাক দর্শন বেদকে আক্রমণ করেছে, বেদের পশুহত্যা, যজ্ঞ, নানান বিধিবিধান, দেবতাদের ক্ষমতা প্রভৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সে ঈশ্বর মানেনা, দেহাতিরিক্ত কোন আত্মার অস্তিত্ব মানেনা। পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে জ্ঞান লাভ হয় তাহাই সত্য, এর বাইরে জ্ঞান লাভের আর কোন উপায় সে স্বীকার করেনা। চার্বাকের এই দর্শন আবার বৌদ্ধ, জৈন এবং অন্যান্য বৈদিক দর্শন কতৃর্ক সমালোচিত হয়েছে।

এইসব ব্যাখ্যা, প্রতিব্যাখ্যা সবসময়ই যে শান্তিপূর্ণ অহিংস উপায়ে হয়েছে তা হয়তো নয়। মুখোমুখি দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ হয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু একটা বিষয় উপলব্ধি করা যায় এখান থেকে যে সমাজে সবসময়ই ভিন্ন ভিন্ন মত প্রচলিত ছিলো। কোন একটা সময়ে কোন একটা মত অপেক্ষাকৃত প্রভাবশালী অবস্থায় থাকে, কিন্তু তার পাশাপাশি আরো কতকগুলো ভিন্ন মতও বিরাজ করে। সমাজের চিন্তাশীল মানুষ কখনো গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যায়না। প্রচলিত মতকে প্রশ্ন করে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, এরই ফলে তৈরী হয় দর্শন। নতুন মত পথের জন্ম নেয়। এভাবে সমাজ এগোয়। যদি প্রশ্ন করা থেমে যায়, তাহলে সমাজের বিকাশও স্তব্ধ হয়ে যায়। এইটা ইতিহাসের শিক্ষা।

আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা এই মুহূর্তে প্রাসঙ্গিক। বৈদিক ষড় দর্শন, বিশেষ করে বেদান্ত ( ষড় দর্শনের মধ্যে বেদান্ত দর্শনই সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং এখন এটাই সবচেয়ে বেশী মান্যতা পায়), বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন তিনটিই গুরুত্ব দিয়েছে অহিংসার উপর। আর গুরুত্ব দিয়েছে ত্যাগের উপর। সেই জন্য বেদান্ত দর্শনে গৃহীর চেয়ে অরণ্যনিবাসী সন্ন্যাসীর মর্যাদা অধিক। জৈন তীর্থংকর, আর বৌদ্ধ ভিক্ষু ত্যাগের প্রতিমূর্তি। আর উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তার হয়েছে জাতপাতহীন, সাম্য ও ভালোবাসার আদর্শে।

তাহলে আজ এই উপমহাদেশে এতো বিদ্বেষ, এতো হিংসা, এতো ভোগলিপ্সা কেন? ভিন্নমতকে দমনের এমন সর্বগ্রাসী চেষ্টা কেন? নিয়মের প্রতি, প্রতিষ্ঠানের প্রতি, শাসনযন্ত্রের প্রতি এই শর্তহীন, প্রশ্নহীন আনুগত্য কেন? কোথায় গেল আমাদের জিজ্ঞাসা, কোথায় তিরোহিত হলো আমাদের জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা (যাকে নাকি বলে দর্শন)? ধর্ম তাহলে কী ভূমিকা রাখছে মানুষের জীবনে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 52 = 54