অক্টোপাস নয় অষ্টভূজা নারী !

সরকারি চাকুরী জীবনে জেন্ডার ও মহিলাদের ক্ষমতায়ন বিষয়ে অন্তত দুটো উন্নত দেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছি আমি। তাছাড়া ঢাকাতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, বিয়াম, বৃটিশ কাউন্সিল আয়োজিত এ বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কসপেও যোগদান করেছি বেশ কবার। তাই ‘জেন্ডার এন্ড ফিমেল এ্যামপাওয়ারমেন্ট’ বিষয়ক প্রশিক্ষণে মাঝে মধ্যে ডাক পড়ে আমার দুচার কথা বলতে। এসব অনুষ্ঠানে বক্তা বা ট্রেনার হিসেবে গেলে দুচার পয়সাও জুটে যায় কখনো কখনো। তাই দেশের নানাস্থানে অনেকবার এসব বিষয়ে ঘুরেছি তথা বক্ততা দিয়েছি আমি। একবার দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে মাধ্যমিক স্কুল ও উচ্চমাধ্যমিক কলেজ অধ্যক্ষদের পনের দিন ব্যাপী প্রশিক্ষণে ডাক পড়লো আমার, যেন জেন্ডার ও মহিলাদের ক্ষমতায়ন বিষয়ে একদিনের সচেতনামূলক ওয়ার্কসপ পরিচালনা করি আমি!

:

অনুষ্ঠান শুরুর প্রাক্কালে প্রথমে অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকেই আমি জানতে চাইলাম, এখানে উপস্থিত সকলে কে কি করেন? ৯৯% যোগদানকারী শিক্ষক হাত তুলে উত্তর দিলেন তারা শিক্ষক হিসেবে চাকুরী করেন তথা প্রতিষ্ঠান প্রধান। এরপর জানতে চাওয়া হলো, তাদের স্ত্রীরা কে কি করেন? অংশগ্রহণকারী ৫০-জনের মধ্যে কেবল দুজন হাত তুলে বললো তাদের স্ত্রীরা শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে সরকারি চাকুরী করেন, বাকি ৪৭-জন অবলীলায় জানালো যে, তাদের স্ত্রীরা কিছুই করেন না। একমাত্র উপস্থিত মহিলা শিক্ষক জানালেন, তার স্বামী কৃষিকাজ তথা ঘর সংসারের যাবতীয় কাজ করেন!

:

অনুষ্ঠানে লেকচারের অনুসঙ্গ হিসেবে একটা বড় পোস্টার প্রদর্শন করি আমি। যাতে দেখানো হয়েছে ১০-হাতি এক নারী। যে একই সময়ে গাঁয়ের চুলায় রান্না করছে, চুলোতে লাকড়ি দিচ্ছে, পুকুর থেকে পানি তুলছে, বাটনা বাটছে, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে, শুকোতে দেয়া ধান থেকে পাখি তাড়াচ্ছে, হাঁস-মুরগিকে খাবার দিচ্ছে, গরু দোহন করছে, ঘর ঝাট দিচ্ছে, শাঁক তুলছে, ছোট শিশুকে পড়াচ্ছে ইত্যাদি। এ ছবিটা দিয়ে আমি বোঝাতে চাইছি, একই সাথে একজন নারী ঘরে বাইরে অনেকগুলো কাজ করে। এবং এ সকল কাজ করতে গিয়ে একজন নারী ঘরে উঠুনে ঘাটেবাটে প্রত্যহ অন্তত ১০-কিমি হাঁটেন, যা উপস্থিত প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকদের হাঁটার থেকে বেশি। এবং নিক্তি বা দাড়িঁপাল্লায় স্বামী-স্ত্রী দুজনের কাজকে ওজন করলে, অবশ্যই স্ত্রীর কাজের ওজন বেশি হবে। অথচ আমরা সবাই বলে যাচ্ছি, আমার স্ত্রী প্রফেশনালি কিছুই করেনা! প্রশিক্ষণে উপস্থিত নারী শিক্ষক যুথিকার মুখ উজ্জ্বল হলো এ বিশ্লেষণে। তিনি কিছু বলতে যাবেন এর আগেই জনৈক পুরুষ শিক্ষক হাত তুললের নিজে কিছু বলতে!

:

আলোচনা বেশ জমে উঠলে পিরোজপুরের হিন্দুপ্রধান নাজিরপুর উপজেলার একটা মাধ্যমিক স্কুলের টিচার হেমচন্দ্র মন্ডল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন –

– স্যার আমাকে সুযোগ দিলে এ বিষয়টা আমি আমাদের ধর্মীয় দৃষ্টিতে উদাহরণসহ উপস্থাপন করতে পারি। তাতে বেশ মজা পাবে সবাই!

তাকে সুযোগ দেয়া হলো। তখন হেমচন্দ্র যেভাবে তার ধর্মীয় দৃষ্টিকোনে বিষয়টাকে বিশ্লেষণ করলেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো!

:

– স্যার, একজন মহিলা বা নারী খুব ভোরে উঠেই ঘরের নানাবিধ কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাই তিনি আমাদের দেবী অষ্টভূজার মত!

– ঐ মহিলাই তার শিশুদের পড়ান, তাই তিনি দেবী সরস্বতী!

– এ নারী সংসারের বিবিধ খরচ থেকে দুচার পয়সা করে করে টাকা জমিয়ে রাখেন, এমনকি রান্নার চাল থেকে মুষ্টি মুষ্টি করে জমা করে চাল রাখেন, যা পরবর্তীতে কাজে লাগে তাই তিনি মহালক্ষ্মী!

– বাড়ির সবার জন্য রান্না করেন ও খাওয়ান তাই তিনি অন্নপূর্ণা!

– সংসারের বিপদ আপদে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান, এমনকি নিজের অলঙ্কার পর্যন্ত বিক্রি করে দেন তাই ঐ স্ত্রী দেবী পার্বতী।

– স্বামী ইটিশ পিটিশ করলে এমনকি ভেজা গামছা বিছানায় রাখলে স্ত্রী দেবী দূর্গা!

– স্বামীর বাজার করা জিনিস খারাপ তথা মাছ পচা হলে স্ত্রী তখন রুদ্র কালী দেবী!

– স্বামী স্ত্রীর বাপের বাড়ি সম্পর্কে খারাপ কিছু বললে তখন স্ত্রী ধারণ করে মহিষাসুরমর্দিনী রূপ!

– আর স্বামী নিজ স্ত্রীর সামনে অন্য নারীর প্রশংসা করলে তখন সে হয় রণচণ্ডী!

– সুতরাং নারীকে অক্টোপাসও বলা যেতে পারে, স্যার! একমাত্র বিবাহিত পুরুষরাই নারীর একসাথে এতো রূপ দেখতে পারার সৌভাগ্য অর্জন করে, সবাই নয় স্যার!

:

হেমচন্দ্রের কথা শেষে না হতেই ৪৯-জন অংশগ্রহণকারী হো হো করে হেসে উঠলো হল কাঁপিয়ে কেবল নারী বিথীকা ছাড়া। বিথীকার চোখে তখন চিক চিক করছে সাদা মুক্তোর মত অশ্রুদানা। স্বাতী নক্ষত্রমন্ডলের মহাকাশীয় অষ্টভূজ তারার তিমিরে আটকে থাকা কষ্টের মত, নারী যুথীকা দাসের কষ্ট অনুভব করতে পারি আমি হৃদয় দিয়ে একজন পুরুষ হয়েও। পুরুষশাসিত ধর্মীয় আবেষ্টনিতে নিমজ্জিত বাংলাদেশের নারীদের কষ্টদহন ভেসে ওঠে টিচার যুথীকার চোখেমুখে। সমুদ্রের শোঁ শোঁ শব্দের করুণ বেদনার্থ আর্তনাদের মাঝে তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করি আমি। টিচার হেমচন্দ্রের হাসির ছলে বলা জীবন কথনে আসলে লুকায়িত থাকে গভীর রাতের দূরদেশীয় কালপুরুষ নক্ষত্রের দুখবাতাস। যা শোঁ শোঁ শব্দের কষ্টদহনে ধুয়ে দেয় যুথীকা তথা পুরো নারী সমাজের প্রতিভূকে। অংশগ্রহণকারী সকল পুরুষদের তাকাতে বলি যুথীকার দিকে। হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে বলি যুথীকারূপী তাদের স্ত্রী, কন্যা আর মায়েদের দিকে। অনুভব করতে বলি তাদের শ্রমঘন দিন আর রাত্রির কথা! যারা মূলত অক্টোপাস নয় অষ্টভূজা!

:

৪৯-পুরুষ টিচারের ৯৮-টি চোখ নিমজ্জিত হয় তাদের একমাত্র নারী সহকারী যুথীকার দিকে। এবার তারা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে চেষ্টা করে নারী, তার কর্ম ও পেশাকে। বিকেল ৫-টায় শেষ হয় সারাদিনের ওয়ার্কসপ। অনুষ্ঠান শেষে মকর-ক্রান্তি কিংবা শকুন্ত-ক্রান্তির কলরোলের কান্নার শব্দের মত সকল পুরুষদের হৃদয়েও আঘাত করতে থাকে যুথীকার কান্না। তারকাখচিত নাক্ষত্রিক অন্ধকারে অগণন ভালবাসার মৃত্যু হৃদয়কে ধারণ করে টিচাররা ঘরে ফেরে তাদের স্ত্রী, কন্যা আর তাদের মায়েদের কাছে। ঘরে নারী ও তাদের কর্মঘন্টার সূর্যপাখিরা দুখের কোরাস গাইতে গাইতে হারিয়ে যায় দূরবনে। আমরা কেউ যুথীকাদের চোখের জলকে মনে রাখি জেগে থাকা নক্ষত্রমালার রাত্রি করোজ্জ্বল আলোকমালার মত, কেউবা ভুলে থাকি চারদিকের বসন্ত বাতাসের দিকে তাকিয়ে। এবং এভাবেই এসব অন্তত দুখ দিন দুখ রাতের বহতা বাতাস বইতে থাকে আমাদের চারপাশে, আমাদের দুখদিন দুখরাতে!

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − 91 =