আল্লাহুআকবর বল্লে জঙ্গী !  জয় শ্রীরাম বল্লে কী ?

কোন সন্ত্রাসী আল্লাহুআকবর বলে কাউকে আক্রমণ করলে তাকে জঙ্গি বা তালেবান বলা হয় । জঙ্গি বা  তালেবান শব্দটির  আন্তর্জাতিক ইতিহাস রয়েছে।  এ শব্দটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি পায় নয়/এগারোর পরে। একদল সন্ত্রাসী ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে, মঙ্গলবার সকালে টুইন টাওয়ারে আক্রমণ করে। এ সন্ত্রাসীদের বলা হলো এরা ইসলামিক টেররিস্ট বা আলকায়দা। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টেররিস্ট শব্দের আগে ইসলামিক শব্দটি যুক্ত হলো। পূর্ণাঙ্গ শব্দটি হলো ইসলামিক টেররিস্ট।কারণ সন্ত্রাসীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল ইসলাম। অপরাধ বিজ্ঞান অনুযায়ী, একজন সন্ত্রাসীর পরিচয় ধর্মে নয় তার অপরাধে।

ফিরে যাই ইতিহাসে, টুইন টাওয়ার আক্রমণের নয় বছর আগে বাবরি মসজিদ আক্রমণ করা হয়েছিল।  ছয় ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ আক্রমণ করা হয়। আক্রমণকারীদের মুখে ছিল জয় শ্রীরাম ধ্বনি।  ইতিহাস তার সাক্ষী। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় দাঙ্গা বহু পুরানো। এ উপমহাদেশে  যদি জঙ্গির ইতিহাস লিখতে হয় বা মৌলবাদের তবে বাবরি মসজিদে  জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে  যে ভয়ানক আক্রম, জীবননাশ, রক্তপাত  ও খয়ক্ষতি হয়েছিল সেখানেই রেখা টেনে লিখতে হবে।

২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ইন্ডিয়ায় ৭৯.৮০ শতাংশ হিন্দু এবং ১৪.২ শতাংশ মুসলিম সংখ্যালুঘু। মহাত্মা গান্দীর অহিংস ভারতে ১৯৯২ সালের পর থাকে ধর্মীয় হিংসা ক্রমশ বাড়ছেই।  এ পেছনে ধর্মীয় রাজনীতি অন্যতম নিয়ামক। সংখ্যালুঘু মুসলিম, দলিত ও নিন্মবর্ণের হিন্দু এ হিংসার শিকার। তবে সম্প্রতি সংখ্যালুঘু মুসলিমদের উপর হিংসা, অত্যাচার ও বৈষম্য লক্ষণীয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদের আগ্রাসন বাড়ছে বহুজাতির দেশ ভারতে। গো-রক্ষার নেমে মুসলিম নির্যাতন পরোক্ষ স্বীকৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গো-রক্ষক বাহিনীর তান্ডব হিন্দু মৌলবাদকে উস্কিয়ে দিচ্ছে।

মন্ত্রী হান্সরাজ অহীর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে  সংসদকে অবহিত করেছিলেন  ২০১৭ সালে ৮২২ টি সাম্প্রদায়িক  দাঙ্গায় ১১১ জনকে হত্যা করা হয় , আহত হয় ২,৩৮৪ জন। ২০১৬ সালে ৭০৩ টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ৮৬ জনকে হত্যা করা হয় এবং ২,৩২১ জন আহত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সংসদকে অবহিত করেন  2০১৭ সালের তুলনায়  ২০১৮ সালে  ১২ শতাংশ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায কম হয়েছে  । ইন্ডিপেন্ডেন্ট হেইট ক্রাইম মনিটরিং সার্ভিস এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৮ সালে ৯০ অধিক ধর্ম ভিত্তিক হেইট ক্রাইম হয়, ৩০ জন মারা যায় এবং অনেকে আহত হয়।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন জয় শ্রীরাম নিয়ে মুখ খুলেছেন কারণ জয় শ্রীরাম বলে ভারতের  মুসলিমদের শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীদের বাধ্য  করা  হচ্ছে  জয় শ্রীরাম, জয় হনুমান কিংবা  জয় মা কালী বলতে । ধর্ম বিশ্বাস মানুষের বাক্তিগত বিশ্বাস।  জয় শ্রীরাম বলাতে  বলাতে  অনেককে হত্যা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিবেকবান মানুষেরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে ধর্মের নামে এ অন্যায় ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে। ভারত  একটি ধর্ম নিরেপক্ষ রাষ্ট ও এ রাষ্টের কোনো রাষ্ট্র ধর্ম নাই, কিন্তু সংখ্যালুগুদের ধর্মীয় অধিকার হুমকির মুখে। গো-মাংস ভক্ষণ ও বহনের কারণে অনেক সংখ্যালঘুকে জীবন দিতে হয়েছে গো-রক্ষক বাহিনীর হাতে, অনেকে মারাত্মক আহত হয়েছেন গো-সন্তানের হাতে। উগ্র-হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ ক্রমশ বেড়েই চলছে এতে অন্নান্য সংখ্যালঘুর ধর্মীয় স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্টের কতৃক আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা রিপোর্ট ২০০৯ অনুযায়ী, ইন্ডিয়ায় ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্রমশ কমছে। এবং তাদের অবস্থান টিয়ার – ২ তে (হলুদ তালিকায়)। ২০১৫ সাল থেকে  গো-রক্ষক বাহিনী ১০০ অধিক আক্রমণ করেছে এবং ৪৪ জনকে হত্যা করেছে। বিশেষভাবে ২০১৮ সালে গো-রক্ষক বাহিনী ৩১টি আক্রমণ করেছে, ১৩ জনকে হত্যা করেছে এবং আহত হয়েছে ৫৭ জনকে। দলিত, নিন্ম বর্ণের হিন্দু ও খৃস্টানরাও উগ্র-হিন্দুত্ববাদের শিকার।

হিন্দু মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ অথবা মুসলিম মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদ এ তত্ত্ব থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। একজন সন্ত্রাসীর পরিচয় ধর্মে নয় তার অপরাধের ভিত্তিতে। মহাকালের কোনো ধর্ম অপরাধকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেয়না। ধর্মে বিশ্বাসের কারণে কোন মানুষের প্রতি বৈষম্য, অত্যাচার কিংবা হত্যা করা ফৌজদারি অপরাধ ও মানবধিকার বিরোধী।

 

 

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

51 + = 57