এক নি:সঙ্গ যাত্রীর জন্যে ভালোবাসা

মহাশূণ্যে ভ্রমণ করা প্রথম জীবন্ত সত্তা ছিল ’লাইকা’ নামের একটি কুকুর।

পৃথিবীর অভিকর্ষজ বলকে অতিক্রম করে ওজনহীনতা অনুভূত হয় যে অঞ্চলে, সেখানে একটি প্রাণীর পক্ষে আদৌ টিকে থাকা সম্ভব কি-না এবং সেখানে প্রাণীর ফিজিওলজিক্যাল কি কি সমস্যা তৈরি হতে পারে, মূলত এসবই দেখতে চেয়েছিলেন রাশিয়ান স্পেইস বিজ্ঞানীরা।

আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার মহাশূণ্য দখলের স্নায়ুযুদ্ধে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে লিড দিচ্ছিলেন ’নিকিতা ক্রুশ্চেভ’। তাঁর নেতৃত্বেই রাশিয়ার মহাশূণ্য বিজ্ঞানীরা ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবরে কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক-১ কে সফলভাবে প্রেরণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

অক্টোবরের সেই সফল পরীক্ষা শেষে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ছুটি দেয়া হল।

কিন্তু  রুশ বিপ্লবের জাতীয় উদযাপনের দিনকে (৭ই নভেম্বর) সামনে রেখে রাশিয়ান স্পেইস টিমের দলনেতা ‘নিকিতা ক্রুশ্চেভ’ হুট করে এক নতুন পরিকল্পনা করলেন। স্পুটনিক-১ এর চিফ ডিজাইনার ‘সার্গেই করোলভকে’ ডেকে তিনি জানালেন, ৭ ই নভেম্বরকে সামনে রেখে স্পুটনিক-২ পাঠাতে চান মহাশূণ্যে।

অল্প সময়ের নোটিশে সকল বিজ্ঞানী-ইঞ্জিনিয়ার-কর্মকর্তা-কর্মচারীগনকে ছুটি ক্যানসেল করে পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা হল এবং স্পুটনিক-২ নির্মাণের কাজে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়া হল। স্পুটনিক-২ তৈরিতে খুব বেশি রকমের তাড়াহুড়ো করেছিল রাশিয়ানরা।

স্পুটনিক-২ কে বলা যাবে স্পুটনিক-১ এর কপি-পেস্ট, যেখানে নতুনত্ব বলতে কেবল জুড়ে দেয়া হয়েছিল একটি কুকুরকে বহন করার মতো ’এয়ার-টাইট কেবিন’। কিন্তু ফিরতি পথের প্রযুক্তি না থাকার দরুণ স্পুটনিক-২ এর সাথে সংযুক্ত এই কেবিনটিকে ফিরিয়ে আনার কোন পরিকল্পনা তাদের ছিল না।

লম্বায় ১৩ ফিট আর চওড়ায় ৭ ফিট স্পুটনিক-২ এর নিচের দিকে রাখা হল লাইকার জন্যে ছোট্ট-কেবিন। অ্যালুমিনিয়াম এলয়ের তৈরি কেবিনটির দৈর্ঘ্য ছিল ৩১.৫ ইঞ্চি এবং ব্যাস ছিল ২৫ ইঞ্চি; যেখানে এক্স রশ্মি, কসমিক বিকিরণ, সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি থেকে লাইকাকে সুরক্ষার ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। কেবিনের ভেতরে ইলেক্ট্রিক্যালি নিয়ন্ত্রিত ৭ দিনের খাবারযুক্ত বক্স ও পানির পাশাপাশি কেবিনের তাপমাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থাও রাখা হল। বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেন এবং লাইকার নি:শ্বাসের সাথে বের হওয়া কার্বন ডাই অক্সাইডকে শোষিত করার বন্দোবস্ত করা সহ যা কিছুই করা হল, সবই লাইকার ৭ দিন বেঁচে থাকার প্রয়োজনে।

কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক-১ এর সাথে স্পুটনিক-২ এর খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্যাকনিক্যাল পার্থক্য ছিল। প্রথমবার অরবিটে পৌঁছুনোর পর স্পুটনিক-১ কে বহনকারী রকেটটিকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু অরবিটে পৌঁছুনোর পর স্পুটনিক-২ এর ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে নি। বরং যুক্তি দাঁড় করানো হল যে, অপেক্ষাকৃত বেশি ওজনের স্পুটনিক-২ এর সাথে রকেটটি যুক্ত থাকলে  গতিজনিত কারণে পুরো সিস্টেমের ওজন কম থাকবে এবং ‘ভিজুয়াল ট্রেকিং’ করা সহজ হবে। তবে যুক্তির বিপরীতে আছে অভিযোগ: লাইকাকে বহন করা রকেটটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দরকারি সময়ে স্পুটনিক-২ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে সক্ষম হয় নি এবং এই ব্যর্থতাকে ধামাচাপা দিতে অগ্রহণযোগ্য যুক্তি দেখিয়েছিলেন চিফ ডিজাইনার ‘সার্গেই করোলভ’।

প্রথম জীবসত্তা হিসেবে মহাকাশচারী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নির্বাচন করা হয়েছিল লাইকা সহ মোট ১০ টি কুকুর। এরা প্রত্যেকেই সিমুলেশন ট্রেইনিং এ অংশগ্রহণ করেছিল এবং ট্রেইনিং চলাকালীন সময়ে তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ফিজিওলজিক্যাল রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছিল।

সংকীর্ণ আবদ্ধ স্থানে দীর্ঘসময় পার করে দিতে পারাটা ছিল অন্যতম যোগ্যতা। তাই অপেক্ষাকৃত শান্ত-সহনশীল কুকুরটিকে বেছে নেয়ার প্রক্রিয়ায় লাইকা ছিল প্রথম দিকে।

মূলত স্পুটনিক-২ এর জন্যে নির্বাচিত হওয়ার পর কুকুরটিকে অফিসিয়ালি “লাইকা” নাম দেয়া হয়েছিল । অব্যশ, ইতিহাসের পাতায় নাম লিখানোর আগে লাইকার প্রকৃত নাম ছিল ”কিদরিয়েভকা”। সোভিয়েত সোর্সগুলির দাবি অনুযায়ী, কিদরিয়েভকা নামের কুকুরটি অফিসিয়ালি নির্বাচিত হওয়ার পর এর নামকরণ করা হয় “লিমনচিক” বা “লিটল লেমন”। আর মহাশূণ্যে উড্ডয়নের আগে, প্রেস ও মিডিয়ায় ঝড় তোলা শিরোনামগুলি ”লিটল লেমন” কে পরিচয় করিয়ে দেয় “লাইকা” নামে।

অক্টোবরের ৩১ তারিখ সকাল ১০ টায় লাইকাকে চূড়ান্তভাবে মহাশূণ্য ভ্রমণের জন্যে প্রস্তুত করা শুরু হয়। দিনের শুরুতেই তাকে স্পঞ্জ গোসল করানো হয়, দুপুরে লাইকার সাথে যুক্ত করা হয় প্রয়োজনীয় সেনসর ও সেনিটেশন ডিভাইস এবং পরিয়ে দেয়া হয় মহাশূণ্যে ভ্রমণের জন্যে বিশেষ ভেস্ট। লাইকার কেবিন পুনরায় চেক করে রেকর্ডিং যন্ত্রের সাথে যুক্ত করা হয়, দুপুর ২ টায়। এরপর কেবিনটিকে যুক্ত করা R-7 নামের বহনকারী রকেটের সাথে।

সবকিছু ঠিকঠাকভাবে কাজ করছে কি-না তা পর্যবেক্ষণের জন্যে লাইকাকে রাখা হল সেই একলা কেবিনে। দরকারি ফিজিওলজিক্যাল রিপোর্ট ঠিকভাবে দূরে বসে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে কি-না তাও একাধিকবার চেক করা হল।

কেবিনের বাইরে থেকে লাইকাকে দেখার সুযোগ ছিল। মানুষের উপস্থিতিতে কেবিনের ভেতর থেকে সাড়া দিত লাইকা। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে লাইকা ছিল, তার স্বভাবসুলভ শান্ত ঢঙে। টানা তিনদিন ছোট্ট কেবিনে পর্যবেক্ষণে থাকার পর, এবার লাইকার ইতিহাস গড়ার পালা।

১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর, রবিবার, মস্কো সময় সকাল ৫টায় R-7 নামের রকেটটি প্রথমবারের মতো এক জীবন্ত প্রাণকে সাথে করে রওয়ানা দিল মহাশূণ্যের পথে।

স্পুটনিক-২ এর সাথে সংযুক্ত কেবিনে বসে একলা অন্ধকার মহাশূণ্যের পথে ছুটে চলতে শুরু করেছে আমাদের লাইকা . . .

রকেট লঞ্চিং এর গর্জন আর কাঁপুনিতে সে কিছুটা ভীত হয়ে পড়ে। ফলে, স্বাভাবিক এর চেয়ে হার্টবিট বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় তিনগুণ, মিনিটে ২৬০ বিট! তবে এটাও সত্যি যে, মহাশূণ্য উড্ডয়নের অবস্থাকে মানিয়ে নেয়ার জন্যে পৃথিবীর বুকে ট্রেইনিং নিয়েছিল সে।

১০৩ মিনিটের যাত্রা শেষে, স্পুটনিক-২ কে স্থাপন করা গেল পৃথিবীর ১৪০ X ১০৩৯ মাইল ইলিপটিক্যাল অরবিটে। পৃথিবী থেকে আসা জীবন্ত এলিয়েনকে প্রথমবারের মতো গ্রহণ করলো মহাশূণ্য । কিন্তু লাইকার কাছে যে সম্পূর্ণ নতুন এক কনফিউজিং জগত! যেখানে লাইকা তার জীবনে প্রথমবারের মতো অনুভব করতে শুরু করেছে ওজনহীনতা! এদিকে পৃথিবীর মানুষেরা নিশ্চিত হয়ে গেল যে, পৃথিবীর শক্তিশালী অভিকর্ষজ আকর্ষণকে অতিক্রম করে মানুষও মহাশূণ্যে গমন করতে সক্ষম হবে একদিন। সফল পরীক্ষার এই খবর নভেম্বরের চার তারিখে সমুদ্র জোয়ারের মতো ছড়িয়ে গেল দেশ হতে দেশান্তরে। খুশির সেই খবরের সাথে তবুও মিশে থাকলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে মানব সভ্যতা পৌঁছে গেল এক অন্যরকম উচ্চতায়, আর অন্যদিকে নিরীহ এক প্রাণের প্রতি হয়ে গেল দারুণ নিষ্ঠুরতা। স্লোগান শোনা গেল, “ Be Fair to Our Fellow Dogs”

প্রাণীকে ভালবাসেন যারা, তারা অবশ্যই প্রশ্ন রাখতে পারেন, কেন ফিরে আসার ব্যবস্থা না করেই লাইকাকে ঠেলে দেয়া হল নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে? এর উত্তর একটাই, স্পুটনিক-২ নিয়ে খুব বেশি তাড়াহুড়ো করেছিল রাশিয়ান স্পেইস টিম। কাজেই, চাপা এক দীর্ঘশ্বাসকে পেছনে ফেলে লাইকার জন্যে ভালবাসা প্রকাশ করা ছাড়া আর কী বা করার আছে।

পৃথিবীর অরবিটে স্থাপন করার পর স্পুটনিক-২ এ সংযুক্ত লাইকার কেবিনে প্রাথমিকভাবে পর্যাপ্ত অক্সিজেন, অভ্যন্তরীণ বায়ুরচাপ সবকিছু প্রায় ঠিকই ছিল; শুধু অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়তে শুরু করেছিল ছোট্ট কেবিনটার অভ্যন্তরের তাপমাত্রা। আতংকিত লাইকা এলোমেলোভাবে চিৎকার করতে শুরু করল। পৃথিবীতে বসে লাইকার সেই চিৎকারে সাড়া দিয়ে কেবিনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সেদিন আমরা সমর্থ হই নি।

৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পর স্পুটনিক-২ এর সাথে সংযুক্ত ছোট্ট কেবিনে সুনশান নিরবতা। চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে গেছে লাইকা। কিন্তু নি:সঙ্গ সে যাত্রী চিরতরে ঘুমিয়ে যাবার আগে মানব জাতির জন্যে রেখে গেল স্বপ্ন সত্যি হওয়ার হাতছানি।

চোখের কোণে চলে আসা অশ্রুকে আড়াল করে মানবজাতি লাইকার জীবনের মূল্যকে শোধ করতে এরপর বারবার ছুটে গিয়েছে মহাশূণ্যে এবং বাস্তবিক অর্থে, লাইকার উৎসর্গ করা জীবনকে বৃথা যেতে দেয় নি তারা।

আজকের জুলাই মাসের মতোই ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসের ২০ তারিখে চাঁদের বুকে প্রথমবারের মতো পা রেখেছিল মানবজাতি। সে আলোচনা হবে অন্য কোনদিন। আজ বরং চন্দ্র অভিযানের আরো একটি বছর-পূর্তিকে সামনে রেখে গভীর কৃতজ্ঞতা আর ভালবাসা জানাই, মহাশূণ্যের প্রথম নি:সঙ্গ যাত্রী, প্রিয় লাইকার জন্যে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of