জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-75

আমার গাঁ ও বিদেশ গমন পর্ব : ২

:

সেভ শেষ হলে ১০ টাকার বদলে একটা ৫০ টাকার নোট দেয় আমাকে পাশের বাড়ির দেলোয়ার। যে ৩ বছর ওমানে থেকে অনেক টাকার মালিক এখন। হেসে বলে

– ৫০ টাকাই রাখ, বাকিডা বখশিশ!

বিনয়ে মাথা নত করি আমি। হেসে বলি

– বড়ই ভাল মানুষ আপনে দেলোয়ার ভাই।

বিকেলে আবার সেলুনে ঢোকে দেলোয়ার। পাসপোর্টের একটা ফরম আমার সামনে দিয়ে বলে

– ধর এইডা পুরণ কইরা চেয়ারম্যান সাবের কাছে যা, সে ছিল মাইরা দিলে শহরে ব্যাংকে গিয়ে সাড়ে তিন হাজার জমা দিবি, তাতেই পাসপোর্ট অইবো!

– কি কন ভাই? আমি বিদেশ যামু?

– মাসে লাখ টাকা কামাবি। যাবি না ক্যান?

বিস্ময়ে শুনি দেলোয়ারের কথা! দুমাস পর ছুটি শেষে ওমান ফিরে যায় দেলোয়ার। সাথে নেয় আমার পাসপোর্ট কপি। ফোন করে মাঝে মাঝে ওমান থেকে আমাকে। বলে এক ওমানি আরবকে পাসপোর্টের কপি দিয়েছি। সে বলেছে স্যালুনের ভিসা করে দেবে ২/৩ মাসের মধ্যে! এবং সত্যি একদিন রেজি: ডাকযোগে ভিসা পাঠায় দেলোয়ার ওমান থেকে। বলে ষাট হাজার টাকা মাসিক বেতন। ভিসার দাম ২-লাখ। টিকেট ইত্যাদিতে আরো খরচ প্রায় ১-লাখ। মোট ৩-লাখ টাকা লাগবে। আমাকে টাকা জোগার করতে বলে। কিন্তু ৪/৫ হাজার টাকা মালিক আমি কই পাবো ৩ লাখ?

:

শেষে কথা হয় আমার বাবার পৈত্রিক ভিটা, যেখানে আশপাশের জমি মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে ৩২ শতক, যার দাম সর্বোচ্চ হতে পারে ২-লাখ। জমির বিনিময়ে ২-লাখ দেবে দেলোয়ার, বাকি ১-লাখ জোগার করতে হবে আমাকে যে কোনভাবে হোক। মায়ের অনিচ্ছা সত্বেও দেলোয়ারের স্ত্রীর নামে সাফ কবলা দলিল করে দেই আমি আর মা। কথা দেয় দেলোয়ার, আমার মা এখন এ বাড়িতেই থাকবে, যতদিন আমি পুরো টাকাটা ফেরত দিতে পারবো দেলোয়ারকে। ওমান গিয়ে ষাট হাজার বেতন পেয়ে প্রতিমাসে ত্রিশ হাজার পরিশোধ করবো আমি দেলোয়ারকে। টাকা শোধ হলে এ বাড়ি ফিরিয়ে দেবে দেলোয়ার আমাকে। কোন লাভ নয়, কেবল গ্রামের একটা লোকের উপকার হবে, মাসে ষাট হাজার ইনকাম করবে, এ জন্যই দেলোয়ার এ কাজে নেমেছে। অন্য কোন স্বার্থ নেই তার! এতোদিন দেলোয়ারের কাজ কর্মে খারাপ কিছু দেখিনি আমি আর মা। তাই দেলোয়ারের কথামত কাজ করি মা-ছেলে। বাকি এক লাখ জোগার করতে হণ্যে হয়ে ঘুরতে থাকি পথে পথে। বোনের জামাই থেকে ধার আনি ৩০-হাজার টাকা। সব শুনে গোপনে ফিরোজা খুলে দেয় তার হাতের চুড়ি দুটো। তা উত্তরাধিকারসূত্রে মার মৃত্যুর পর পেয়েছে ফিরোজা। ফিরোজার বিয়ের জন্য এ চুরি রেখেছে তার পরিবার। স্বর্ণ বিক্রি করে জোগার হয় পুরো এক লাখের। দেলোয়ারের বউর হাতে জমির দলিল আর নগদ একলাখ টাকা দিয়ে ওমানের পথে প্লেনে উঠে বসি আমি। চোখে মাসে ষাট হাজার টাকার স্বপ্ন।

:

মাসকাট এয়ারপোর্টে নেমেই দেখা হয় দেলোয়ারের সাথে। সেই হাসি সেই উষ্ণতা। বিমানবন্দরে কোলাকুলি করে দেলোয়ার আমার সাথে। নিয়ে যায় মাসকাটে তাদের এক মেসে আমাকে। যেখানে একরুমে ৮-জন থাকে তারা। সে রাতে দেলোয়ারের সাথে ঐ রুমে ফ্লোরিং করি আমি। একটা জিনিস ভাল লাগে দেলোয়ারের। দেশে থাকতে কিংবা এখানে কোনদিন হিন্দু বলে আমাকে অবজ্ঞা করেনি দেলোয়ার বড়ই ভাল মানুষ। পরদিন কাজে যাওয়ার আগে ভিসা প্রদানকারী আরব আবদাল্লার কাছে দেলোয়ার নিয়ে যায় আমাকে। সে জানায় মাসকাট নয়, দক্ষিণপূর্ব ওমানের সালালাহ শহরে কাজ করতে হবে আমার। সেখানে নতুন সেলুন খুলেছে সে। দেলোয়ারকে ছেড়ে অন্য শহরে যেতে মন টানছিলোনা আমার। কিন্তু করার কিছু নেই। এসেছি বিদেশে, তাই যেতে হবে যে কোন গ্রামে বা শহরে।

:

সকাল ৮টায় দিকে আরবের বড় জিএমসি জিপ গাড়িতে উঠে বসলাম আবদাল্লাহর সঙ্গে। সে আমাকে নিয়ে যাবে এখন সালালাহ শহরে। মন খারাপ করে দেলোয়ার থেকে বিদায় নিলাম। দেলোয়ার হাত খরচের জন্য ১০০ রিয়াল দিলো আমাকে ওমানি। সারাদিন গাড়ি চললো। পথে আবদাল্লাহ ২-স্থানে গাড়ি থামালো, রুটি হুক্কা টানলো টানলো আরবি রীতিতে। আবার চললো। বিকেলের দিকে আস সুয়ায়মিয়াহ নামে একটা ছোট গ্রামে এলাম আমরা। গ্রামটি সাগরপাড়ে। সেখানে অন্য এক আরবির সাথে নানাবিধ কথা বলে, কিছু টাকার লেনদেন করে ইসুফ হামাদি নামে এক লোকের কাছে সমর্পন করলো আমাকে। আমার পাসপোর্টটিও দিল তার হাতে। আরবিতে অনেক কথা বললো তারা কিন্তু বুঝলাম না আমি। সন্ধ্যার একটু আগে আস সুয়ায়মিয়াহর সাগরপাড়ে গেলাম আমরা। মনে করলাম সমুদ্রতীরে ঘুরতে এসেছে আমাকে নিয়ে। আরবিতে কি বলাতে না বুঝতে পেরে উঠে বসলাম, সাম্পানের মত একটা দেশী নৌকায়। হামাদি নানা কথা বললো আরবীতে, আমি সমুদ্রকে ভয় পাই কিনা ইশারায় জানতে চাইলো। নদীতে ঝড়জলে সাঁতার কেটে বড় হয়েছি তাই ইশারায় বললাম ভয় পাইনা। খুশি হলো হামাদি। হাসলো সে, হুক্কা খাওয়া খয়েরি দাঁত বের করে।

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 76]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-75

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 38 = 46