জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-76

আমার গাঁ ও বিদেশ গমন পর্ব : ৩

:

আমার কল্পিত সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়া আর শেষ হলোনা। বেশ গতিশীল দেশী নৌকা হামাদি একাই চালালো প্রায় ৩ ঘন্টা। তারপর একটা দ্বীপে পৌঁছোলো নৌকা। আরে শালার সেলুন করেছে এই দ্বীপে! এখানে আসবে মানুষ চুল কাটতে! এখান থেকে দেশে যাবে ক্যামনে? প্রতি মিনিটে নানা কথা বললো হামাদি। কিছুই না বুঝতে পেরে কেবল মাথা নাড়ালাম। পিছু পিছু অনুসরণ করছি হামাদিকে। সম্ভবত তার বাড়ি। এল সেপের একটা বাড়ির একটা রুমে থাকতে দিলো আমায়। রাতে রুটি আর কিছু ভুনা মাংস খেতে দিলো একটা মেয়ে বোরখা পরা। আরবে নাকি সব মহিলারা বোরখা পরে। কেমন কাচা আর মসলাহীন বলে খেতে পারলাম না মাংস। গা গুলিয়ে বমি আসছে। তাই কেবল পানি আর রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম ক্লান্তিতে।

:

খুব ভোরে হামাদির ডাকাডাকিতে উঠে বসলাম। ইশারায় তাকে অনুসরণ করতে বললো সে। পিছু পিছু হাঁটছি তার। সম্ভবত সেলুনে যাচ্ছি। বাংলাদেশেওতো সব সেলুন সকালেই খোলে। আসলে পৃথিবীর সব দেশেই সেলুন সিস্টেম একই।

সেই বোটের ঘাটে এসে পৌঁছলাম। যেটাতে কাল আস সুয়ায়মিয়াহ থেকে এসেছিলাম। অনেক বোট ওখানে বাঁধা। একটা বোটে জাল আর দুজন লোক বসা। তাতে হামাদি উঠলো। আমাকে উঠতে বললো। বসা লোক দুটো সম্ভবত ভারতীয়। চেহারা আর পোশাকে ইন্ডিয়ান মনে হচ্ছে। হিন্দিতে বললো আ যাও, আ যাও!

হিন্দি বুঝিনা আমি, আরবি বুঝিনা। কই যাচ্ছি বোটে করে? উঠে বসলাম ওদের পাশে। বোট ছাড়লো। ঘন্টাখানেক চালানোর পর জাল ফেলছে ভারতীয় দুজন। হামাদি হাল ধরে আছে। আমাকেও বলছে জাল ফেলতে। কি করবো বুঝতে পারছি না। ভাঙা হিন্দি বুঝলো ভারতীয়রা। বললো

– ইয়ে কাম তোমার। কাম করো!

১০/১১টার দিকে বোটে আবার রুটি পোড়া মুরগি খেলাম সবার সাথে পানিসহ। বড় বড় ঢেউতে বমি করলাম বোটের ভেতরে। কয়েকবার জাল ফেললো আর তুললো ওরা। হাজারো প্রজাতির সপ্তপদি মাছ। একবার জাল তুললে বোট ভরে যায়! ৯০% মাছই ফেলে দিলো নদীতে। কেবল ২/৩ রকমের দামি মাছ রাখলো, যা ওখানের মানুষেরা খায়।

:

সারাদিন মাছ ধরে সন্ধ্যায় ফিশিং বোট ফিরে এলো ঘাটে। ফ্লাস্টিকের বড় বড় কেস ভর্তি মাছ। তা মাথায় করে নামালো ভারতীয় দুজন। আমার মাথায় তুলে দিলো একটা। ৩-বার আরতে আসা যাওয়া করে ৩-জনে ১০-কেস মাছ নামালাম। আমাদের কাজ শেষ। এবার বিশ্রাম আমাদের। এবার ভারতীয়দের সাথে যেতে হচ্ছে আমাকে। ওরা দুজন একটা রুমে থাকে। বোট ঘাটের কাছেই। সেখানে আমার জন্য আলাদা একটা রুম। তাতে ছেড়া পরিত্যক্ত কিছু বিছানা বালিশ জিনিসপত্র! সম্ভবত আগে এ রুমে কেউ থাকতো। ভারতীয় দুজন মুসলিম। তারা জানালো এ স্থানের নাম “আল হাল্লানিয়া”। ওমানের আস সুয়ায়মিয়াহ থেকে এর দূরত্ব ৪০ কিমি। আর পাশের সওদা দ্বীপ থেকে ৮ কিমি। মাত্র ৫৬ বর্গ কিমিটারের দ্বীপ এটি। এখানে আরব বা ওমানী লোক আছে ১৫০ জনের মত। বাকি ১০০ এর মত বিদেশী। যারা সবাই মাছ ধরে। এ দ্বীপের প্রধান কাজ মাছ ধরা আর বিক্রি করা। আমাকে হামাদি মাছ ধরার “ফিশারম্যান” হিসেবে এনেছে। কোন সেলুনের জন্য নয়। যদিও এ দ্বীপের বাজারে একটা সেলুন নাকি আছে।

:

আমার কাছে কোন মোবাইল নেই। তা ছাড়া “ফিশারম্যান”রা পালিয়ে যাবে বলে কোন মোবাইল কিনতে বা রাখতে দেয়া হয়না তাদের কাছে। মনে পড়লো মায়ের। মনে পড়লো ফিরোজার কথা। চোখে জল এনে রিকোয়েস্ট করাতে ২ ভারতীয় তাদের গোপনীয় মোবাইল বের করলো আমার জন্য। বললো

– ফোনমে বাত করনা মানা হ্যায়! আস্তে আস্তে বাত করো!

পকেটে রাখা কাগজ থেকে নম্বর বের করে লাগলাম দেলোয়ারকে। পুরো ঘটনা খুলে বললাম তাকে। এও জানালাম

– সাগরে থাকতে পারিনা আমি। ঢেউতে বমি আসে আমার। সেলুনে কাজ করতে চাই আমি!

দেলোয়ার আবদাল্লার সাথে কথা বলে আমাকে মাসকট নিয়ে আসবে এমন কথা বললো। আপাতত ধৈর্য ধরে কদিন থাকতে বললো ওখানে।

এবার শুরু হলো মাছ ধরার রুটিন ওয়ার্ক। প্রত্যহ সকালে উঠে সাগরে যাই। জাল ফেলি, জাল তুলি। হাজারো মাছ থেকে ২/৩ প্রকারের ভাল মাছ রেখে বাকি মাছ ফেলে দেই গহিন সমুদ্রে। হাঙরেরা ঐ মাছ খেতে গুতো দেয় বোটের গায়ে। কখনো বড় বড় ঢেউ এফোড় ওফোড় করে দেয় দেশী নৌকা। মনে হয় এই বোধহয় ডুবে যাবে বোট। মরে লাশটা ভাসতে ভাসতে হয়তো চলে যাবে বাংলাদেশে বিধবা মায়ের কাছে!

:

আবার সন্ধ্যার প্রাক্কালে ফিরে আসি ঘাটে। মাছ তুলি মাছের আরতে। সারা গা বেয়ে মাছের রক্তপানি নামে শরীরে। রুমে এসে বাতলির জলে স্নান করি। ভারতীয়দের সাথে রান্না করে খাই। কখনো ভাত কখনো রুটি। আবার কখনো কোন কাজে যাই বোট মালিক হামাদের বাড়ি। হামাদের ৩টা ছোট ছেলে আছে জানি। তারা লম্বা সাদা জামা গায়ে বালিতে খেলা করে। সম্ভবত স্কুলে যায়না তারা! দুয়েকবার বোটেও এসেছিল তারা মাছ দেখতে। মহিলা তেমন দেখিনি এখনো কেবল ১৪/১৫ বছরের মেয়েটি ছাড়া। হয়তো আছে ভেতরে আরো। শুনেছি এরা ৩/৪-টি বিয়ে করে। হামাদের হয়তো ৪ বৌ আছে ভেতরে। একদিন সকালে আমরা ৩ জনে বোটে উঠে বসে আছি। কিন্তু হামাদ আর আসে না। দেরী দেখে ভারতীয় দুজন আমাকে পাঠায় হামাদের খোঁজ করতে। গিয়ে দেখি জ্বরে কাতরাচ্ছে হামাদ। তাকে দরজার সামনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। হাসপাতালে নিতে, হয়তো গাড়ি আসবে। একটুপর এ্যামবুলেন্স জাতীয় একটা গাড়ি এলো। হামাদের ছোট ছেলেরা ধরলো, ২-মহিলা ধরলো, একটা টিনেজ মেয়েও ধরলো যে প্রথম দিন খাবার দিয়েছিল আমাকে। আমরা কজনে ধরে গাড়িতে ওঠালাম তাকে। গাড়ি ছাড়ার আগে আমি নেমে যেতে চাইলে টিনেজ মেয়েটি বললো – কাম, কাম! হাতের ইশারায়ও ডাকলো সে। ওদের সাথে গাড়িতে বসে হাসপতালে গেলাম। গ্রামের ছোট হাসপাতাল। দুজন মাত্র ডাক্তার। একজন পুরুষ, একজন নারী। এ দ্বীপের একমাত্র হাসপাতাল। নার্স আছে ৪/৫ জন। ভর্তি করালো হামাদকে। ৪/৫ দিন হাসপাতালে থাকলো সে। এ কদিন সাগরে গেলাম না আমরা। হাসপাতাল আর তার বাড়ি ঘুরে কাটালাম আমরা। জানলাম টিনেজ মেয়েটার নাম লুলু। সে হামাদের একমাত্র কন্যা প্রথম পক্ষের। ২য় পক্ষে এখনো কোন সন্তানাদি নেই। বেশ কবার হাসপাতাল ও বাড়িতে চোখাচোখি হলো লুলুর সঙ্গে। হাসিখুশি মেয়েটি বেশ খাতির করলো আমাকে। দেখা হলেই আরবিতে কি সব বলতো কিছুই বুঝতাম না আমি। জবাব না দিলে হেসে ঘর বা হাসপাতাল থেকে পেপসি বা দুধের ছোট প্যাকেট দিতো আমাকে পান করতে। সম্ভবত ঘুষ এটা,যাতে তার কথা শুনি আমি!

:

বোট ঘাটে বাঁধা! এই সুযোগে পুরো দ্বীপটা হেঁটে দেখলাম আমি। মরুময় পাহাড় আর বালির দ্বীপ। একস্থানে সমুদ্রতটে ১৫/২০টা উটও চোখে পড়লো। যত্নে লাগানো কিছু গেছুর গাছ। আর ঘাসের মত কাটাযুক্ত বাবলা গাছে পূর্ণ দ্বীপটি। এ দ্বীপে কিভাবে মানুষ এলো তা একটা বিষ্ময় বটে আমার কাছে। ৫-দিন হাসপাতালে থাকার পর ঘরে ফিরলো হামাদ। এ কদিন আমরা মাছ ধরিনি বলে গালাগালি করলো সবাইকে। আমি কিছু বুঝিনা বলে চুপচাপ রইলাম। সব রাগ গোস্বা গিয়ে পড়লো ভারতীয়দের উপর। আবার রুটিন কাজ শুরু। সকালে সমুদ্রযাত্রা। সন্ধ্যার পর ঘরে ফেরা। দুয়েকবার হামাদের বাড়ি যাওয়া। লুকিয়ে লুলুর দর্শন। মাস শেষ হলো। এবার বেতনের পালা। আমাকে যে রিয়াল দেয়া হলো তাতে দশ হাজার টাকা হয় বাংলাদেশি। খাবার খরচ কেটে নিয়েছে ভারতীয় দুজন। কারণ তারাই বাজার করেছিল এ কদিন। সেখানে দুজারের মত দিলাম তাদের। বাকি থাকলো ৮-হাজার। এ টাকা বাড়ি পাঠাবো কি আর দেলোয়ারকে দেব কি? দেলোয়ারকি প্রতারণা করেছে আমার সাথে তবে? তাকে ফোন দিলে বন্ধ পাই এখন। সম্ভবত নম্বর চেঞ্জ করেছে দেলোয়ার।

:

দুজন ভারতীয়। ওরাও সম্ভবত আমার মত অসহায় বন্দী। বললাম ভাই হামাদকে বলো আমাকে সেলুনের ভিসাতে এনেছে। বেতন তিন হাজার রিয়াল বা ষাট হাজার টাকা। শুনে হাসলো হামাদ। আরবিতে বললা –

– না না, তোমাকে এই বেতন আর মাছ ধরা ভিসাতেই এনেছি আমি! আবদাল্লাহকে কখনো বলিনি সেলুনের কথা বা ষাট হাজার টাকার কথা। ৫০০ রিয়াল বেতনে এনেছি তোমাকে মাছ ধরতে!

বুঝলাম দালাল আর হাত বদল হয়েছি আমি। হয়তো দেলোয়ার মিথ্যা বলে প্রতারণা করেছে আমার সাথে। টাকা পাঠাবো কিভাবে মাকে? কোন ব্যাংক বা কোন বাংলাদেশি নাই এখানে। ইন্ডিয়ান ওরা বললো দুতিনমাস পর ওরা সালালাহ গিয়ে টাকা পাঠায় দেশে।

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 77]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

53 − 50 =