জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-77

আমার গাঁ ও বিদেশ গমন পর্ব : ৪

:

আবার কদিন পর অসুস্থ হলো হামাদ। খবর নিতে গেলে লুলু আর তার মা বাজারে নিয়ে গেল আমাকে। অনেক জিনিসপত্র কিনলো। আটা-চাল-ডাল নানাবিধ জিনিসপত্রে ঠাসা প্রায় ২০/২৫ কেজির মালামাল। সব বহন করতে হলো আমাকে ওদের বাড়ি পর্যন্ত। কিচেনে মাল রেখে ফিরে আসবো, এমন সময় ১৪/১৫ বছরের লুলু আকস্মিক জড়িয়ে ধরলো আমায়। কাছে টানতে চাইলো বুকের কাছে। কি সব বললো আরবিতে। কিন্তু আকস্মিক সবটা দেখে ফেললো তার মা। আমাকে শাসালো খুব। গালিগালাজ করলো আরবিতে। আর কিছু না বুঝলেও শয়তান, হারামি এসব শব্দ বুঝলাম। লুলুর মার চোখ রাঙানি দেখে তাড়াতাড়ি দৌঁড়ে বের হয়ে এলাম তার বাড়ি থেকে।

:

দুদিনের মাথায় হাসপাতালে মারা গেল হামাদ। ঐ দ্বীপের প্রায় সকল পুরুষ জানাজা পড়লো তার। আমাকেও পড়তে বললো। কিন্তু আমি হিন্দু মানুষ। জানাজার কিছুই জানিনা। তারপরো ২-ইন্ডিয়ানের সাথে ওদের দেখাদেখি হাত তুলে নামাজ পড়লাম আমি। কারণ আমার নাম অমল দেখে তারা বুঝতে পারলো না আমি হিন্দু নাকি মুসলমান। হামাদের মৃত্যুর পর মাছ ধরা বন্ধ হলো আমাদের। আমাদের এক মাসের বেতন দিয়ে বিদায় দেয়া হলো। মূলত মাস তিনেক মাছ ধরার কাছ করলাম আমি “আল হাল্লানিয়া” দ্বীপে। তাই আরবী ২/৪টা কথা শিখলেও তেমন কিছুই জানিনা। আমাদের ৩-জনের পাসপোর্ট আমাদের দিয়ে দিলো হামাদের স্ত্রী। বললো সে আর মাছ ধরার কাজ করবে না। তাই আমরা যেন চলে যাই যার যার দেশে। শাপেবর হলো আমার জন্য। একসাথে আমরা ৩-জনে মাসকাট যেতে আবার ফিরে এলাম আস সুয়ায়মিয়াহ গ্রামে। মানে সাগরতীরে! ওখানে এসে ভারতীয় দুজন আর মাসকট যাবেনা এমন কথা বলে, মাসকাটের বাসে তুলে দিলো আমাকে। ৪-ঘন্টায় মাসকাট পৌঁছে খুঁজতে থাকলাম দেলোয়ারকে। মনে আছে দেলোয়ার এয়ারপোর্ট থেকে একটা ট্যাক্সিতে আল আজাইবা বলে তার মেসে গিয়েছিল। বড় একটা মসজিদের পেছনে ছিল তার মেস!

:

মাসকাট বাস স্টপেজ নেমে অনেক বাঙালি পেলাম। এক বাঙালি দোকানিকে জিজ্ঞেস করলে সে ২-রিয়ালের একটা বাসে তুলে দিলো আমাকে। যেটা বাসটা আল আজাইবা যাবে। আমি ভাল করে চিনিনা বললে, সে বাস ড্রাইভারকে বলে দিলো আমাকে যেন আজাইবা নামিয়ে দেয়া হয়। সৌভাগ্যক্রমে বাস থেকে নেমেই বড় মসজিদটির বড় দুটো মিনার দেখতে পেলাম। মিনার ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম মসজিদের একদম কাছে। নিচেই একটা স্টেশনারী দোকান। যাতে বাঙালি কথা বলে। দেলোয়ারের কথা জিজ্ঞেস করলে সে মুখ কালো করে বললো –

– ভাই দেলোয়ারতো জেলে।

– কেন? কি কারণে জেলে গেছে সে ভাই?

– এক আরবির সাথে মারামারি করেছিল, পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে তারে!

– তার মেসের লোকজন নাই?

– তারা আসতে আসতে সন্ধ্যা।

আমার সব কথা শুনে বললো –

– সম্ভবত আপনার ভিসার ঘটনাতেই মারামারি করেছিল সে। আপনি পেছনে আমার বাসাতে রেস্ট করুন। তার মেসের লোকজন এলে সেখানে যাবেন!

:

মাগরিবের আযান হলে দেলোয়ারের মেসের লোকজনের দুজন কি কিনতে যেন ঐ দোকানে এলো। দোকানি আমাকে তাদের হাতে তুলে দিলো। সেখানে গিয়ে তাদের কাছে যে কাহিনি শুনলাম তার মোদ্দা কথা হচ্ছে –

আমার সেলুনের ভিসার বদলে আবদাল্লাহ আমার জন্য মিথ্যে বলে ফিসিং বোটের ভিসা দিয়েছে, যা অনেক দূরের এবং বেতন অনেক কম ইত্যাদি শুনে আবদাল্লাহর সাথে দেলোয়ারের কথা কাটাকাটি হয়। দেলোয়ার এক পর্যায়ে আবদাল্লাহকে ঘুষি দিলে তার নাক ফেটে রক্ত বের হয়! একটু পর পুলিশ আসে ও দেলোয়ারকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। বর্তমানে সে জেলে আছে ও আদালতে কেস চলছে। কেসে সে হারলে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে হয়তো। ঘটনা প্রায় ২-মাস আগে। তাকে জেলে নেয়ার কারণেই তার ফোন এতোদিন বন্ধ পেয়েছি। দেলোয়ারের জন্য খুব মায়া হলো এবং আমাকে এনে তার এতোবড় ক্ষতি হলো তাই মনে মনে নিজেকে নিজে গালি দিতে থাকলাম।

:

প্রায় ১৮-দিন দেলোয়ারের মেসে থেকে তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে জানলাম যে, দেলোয়ারের কেসে রায় হয়েছে। তাকে যে কোন সময় বাংলাদেশে ডিপোর্টেশন করা হবে। উপায়ান্তর না দেখে আমি আমার ৩-মাসের জমানো বেতন দিয়ে ঢাকা ফেরার একটা টিকেট কাটলাম, যদিও এতোদিন ফ্রি খেয়েছি ও থেকেছি দেলোয়ারের মেসে। মেসের লোকেরা তাদের কিছু জিনিসপত্র দিলো আমার কাছে, যাতে ঢাকা পর্যন্ত নিয়ে যাই আমি। আমার হাত যেহেতু খালি তাই সবাই যার যার ইচ্ছেমত মালপত্র দিলো। তাদের ঘরে ১৮-দিন থেকেছি খেয়েছি, তাই কাউকে না করলাম না। ফ্লাইটের নির্দিষ্ট দিনে মেসের লোকেরা এয়ারপোর্ট বিদায় জানাতে নিয়ে এলো আমাকে ট্যাক্সি করে। এবং তাদের সৌজন্যে প্লেনে উঠে বসলাম আমি।

:

সব প্যাসেঞ্জারটা উঠে গেছে এবার প্লেন ছাড়ার পালা। বিমানবালা আামাদের সিটবেল্ট বাঁধতে বললো। বেল্ট বেঁধে প্লেন ওড়ার অপেক্ষায় আছি এমন সময় আবার খুললো প্লেনের দরজা। দুজন পুলিশ হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে দেলোয়ারকে নিয়ে ঢুকলো বিমানে। আমার সিট পার করে আরো ৪/৫ লাইন পেছনে তখনো একটা খালি আসন ছিল। সেটির দিকে পুলিশরা নিয়ে গেলো দেলোয়ারকে। তার হাতকড়া খুলে নেমে গেলো তারা। আমি দৌঁড়ে যেতে চাইলাম দেলোয়ারের দিকে। কিন্তু ক্রুরা থামিলে দিলো আমায়! বললো বিমান এখনই টেকাপ করবে। সুতরাং কেউ উঠবেন না। আমি ঘাড় বাঁকা করে তাকিয়ে রইলাম পেছনে। যেখানে বসে আছে আমার গাঁয়ের দেলোয়ার। জীবনের বসন্তগীতি কিংবা হলুদাভ করুন আর্তিময় কান্নার মত বুকটা খা খা করে উঠলো আমার। আমাদের দুজনের কতনা প্রত্যাশা আজ লীন হয়ে যাচ্ছে বহতা জীবনের মায়ামৃগ স্বপ্নের হরিণগুলো। প্লেন ছেড়ে দিলো। জেগে থাকে মহাশ্মশানের গর্ভাঙ্কে দুখ ধূপের গনগনে ধোয়া বের হচ্ছে পেছন থেকে। আমরা দুজনে যাচ্ছি ঢাকার দিকে। তারপরো আমাদের দুখবিলাসের সেই দ্বীপগ্রাম। যার নাম জলদাস গাঁ!

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 78]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 66 = 71