জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-78

নারকেলতলী গাঁয়ে বেড়াতে যাওয়া : পর্ব – ১

:

আমিরাতের ইকে ফ্লাইটে বসেছি জেদ্দা থেকে ঢাকা যাবো বলে। আমার ট্রানজিট দুবাই। এখন সুযোগ হলেই আমিরাতে টিকেট কাটি আমি। কারণ ভাড়া তূলনামূলকভাবে কম। এয়ারক্রাফটগুলো নতুন আর আধুনিক। তা ছাড়া ইকোনমিক ক্লাসটাও বেশ খোলামেলা আরামদায়ক। জানালার পাশের আসনটাতে সিটবেল্ট বেঁধে বসতেই, পাশের খালি সিটটাতে একটা মহিলা এলো বোরখা মাথায় দিয়ে। বোরখায় আবৃত বলে মুখছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। বাঙালি চেহারা, তামাটে রং! বোরখা পরা মহিলা পাশে বসাতে কিছুটা অখুশি ভাব নিয়ে তাকিয়ে রইলাম বাইরে। মহিলাই কথা বললো প্রথম আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে

– ভাই কি ঢাকা যাইবেন?

একটু বিরক্তিভাবে বললাল

– ঢাকার ফ্লাইট যেহেতু কই আর যামু?

– কেন এই ফ্ল্যাইটটা আগে দুবাই যাইবো না?

ভুল বুঝতে পারলাম নিজের। হ্যাঁ! তাইতো! এটাতো আগে দুবাই যাবে। সেখান থেকে কত মানুষ কত দেশে যাবে! সবাই কি ঢাকার প্যাসেঞ্জার! নিজের ভুল বুঝতে পেরে বললাম

– ও সরি! এটা ঢাকা যাবেনা, ঢাকা যাবে দুবাই থেকে অন্য ফ্লাইট!

– ঢাকা কই থাকুন আপনি? ঢাকাতেই নাহি গ্রামে?

– নারে বহিন! ঢাকাতেই থাকি! বারিধারা!

– ওহ! বলে মহিলা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো!

– তা আপনি ঢাকা কই থাকেন?

– আমি ঢাকা থাকিনা। আমার বাড়ি সিরাজগঞ্জের নারকেলতলী গ্রামে।

– তো জেদ্দা কেন এসেছিলেন? ওমরা করতে?

– নারে ভাই! হজ্জ ওমরা কি আমাগো কপালে আছে?

– তো কেন এসেছিলেন?

– চাকুরী করতে আইছিলাম ৬-মাস আগে। করতে পারিনাই। তাই চইলা যাইতাছি!

– কেন? করতে পারেন নাই কেন?

– আরে ভাই বাসাবাড়ির কাম, এইদেশে সবাই করতে পারে?

বুঝলাম এ নারী সৌদি আরবে গৃহকর্মীর ভিসাতে এসেছে। সুবিধা হয়নি। তাই চলে যাচ্ছে।

– কেন মালিক ছিলনা?

– আর মালিক! আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো মহিলা। এবার চলতে শুরু করেছে বিমান। আস্তে আস্তে মাটিতে চলছে। বললাম

– সিট বেল্ট বাঁধুন। বিমান উড়বে এখন!

সিট বেল্ট বাধতে আমার সহায়তা নিল নারী। চোখ বুঝে হেলান দিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। টেকআপের সময় নার্ভাস লাগে আমার! তাই সাধারণত চোখ বুঝে থাকি আমি এ সময়টা। একমাস আগে জেদ্দা এসেছি আমি ওমরা ভিসাতে। আমার ধার্মিক ভাই প্রায় ৪০-বছর যাবত অবস্থান করছে সৌদি আরবে। তার ইচ্ছে তার খরচে ওমরা করি আমি। যেন ওমরা করার পর তার মত ধার্মিক হই আমি। ভাইকে শ্রদ্ধা করি, ভালবাসি খুব! তাই না করতে পারিনি তার প্রস্তাবে। এবং একদিন ঢাকা থেকে উড়াল দিলাম জেদ্দাতে ওমরা কাম ভাইর বাসাতে বেড়ানো।

:

ওমরা শেষ করেছি প্রথম দুদিনেই। কিন্তু তারপর মদিনা, মদিনার জ্বীন পাহাড়, বদর প্রান্তর, ওহুদ পাহাড়, তায়েফ, জাবালে রহমত, আরাফাত ময়দান, মিনা কোন কিছুই বাদ দেইনি। প্রায় একমাসে ভাইর গাড়িতে ভাতিজার ড্রাইভিংয়ে বলতে গেলে চষে বেড়িয়েছি সৌদি আরবের অনেক স্থান। তায়েফের আঙুর, আনার আর তরমুজ ক্ষেতও বাদ যায়নি এ ঘোরা থেকে। ঘন্টা দুয়েক আগে ভাই ছাড়তে এসেছিল এয়ারপোর্টে আমাকে। বিদায়ক্ষণে চোখের জলে ভিজে উঠেছিল তার ও আমার চোখ। কার্টুন ভরে ২০-কেজি “আজওয়া” খেজুর কিনে দিয়েছে ভাই, যেন এ “পবিত্র খেজুর” আত্মীয় স্বজনের মাঝে বিলি করি। খেজুরের সাথে ৩-ডজন তসবি আর জায়নামাজও কিনে দিয়েছে ভাই। এটাও তার পূণ্যকর্মের অংশ। নামাজ পড়ে এমন লোকদের মাঝে বিতরণ করতে হবে এ তসবি, জায়নামাজ আর খেজুর। নিজে ধর্ম বিষয়ে অনেক যৌক্তিক কথা বলি অনেকের সাথে, তর্কও করি। কিন্তু ভাইর সাথে কখনো তর্ক করিনা। কারণ তাতে মনে কষ্ট পাবে সে। ভাইবোনদের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসার কারণে তাকে কষ্ট দিতে চাইনা আমি। তাই তার ধার্মিকতার সব কাজকর্ম নিরবে সয়ে যাই আমি। যে কারণে ইতোপূর্বে হজ্জ করা আমি না করতে পারিনি ভাইর ওমরা করানোর প্রস্তাব। সেই আমি এখন ঢাকা যাচ্ছি ভাইর দেয়া জিনিসপত্র নিয়ে! পুরো দুস্তুর একজন আলেমের মত!

:

চিন্তা করতে করতে কখন দূর আকাশে উঠে সোজা হয়ে চলতে শুরু করেছে বিমান। পাশের নারী আবার কথা শুরু করে –

– ভাইজান, ঘুমাইছেন!

– নারে বইন, ঘুমাই নাই! কন!

– আমারে এট্টু হেলপ করবেন?

– কি হেলপ?

– যে আমারে পাঠাইছে, তার নামে ঢাকা গিয়া একটা মামলা করতে চাই।

– করবেন! তাতে আমার হেলপ কেন দরকার? আমিতো উকিল না!

– না মানে ঢাকাতো কিছু চিনিনা। তা ছাড়া আমার বাড়ি সিরাজগঞ্জের একটা গ্রামে!

– কেন মামলা করবেন কেন? কি সমস্যা?

– ২ বছরের চুক্তিকে পাঠাইছে আমারে। পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন। ডেইলি ৮-ঘন্টা কাজ। তার কিছুই পাইনাই। পাইছি কেবল অত্যাচার!

– কি অত্যাচার? মার ধোর?

– কোন কিছুই বাদ দেয় নাই। মালিকের ৩ বউর কাজ করতে হইতো সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত! তাতে জীবনডা আমার তেজপাতা। তারপর মালিক আর তার ২ ছেলের অত্যাচার!

– তারা কি করতো? মারতো?

– আরে না! বুঝেননা? ব্যাটারা কি অত্যাচার করতো আমার মত ২২/২৩ বছছরের মাইয়াগো লগে?

এবার তাকালাম মহিলার দিকে ভাল করে। আসলে কম বয়েসি নারী সে। বয়স বেশি নয়। মহিলা বললো ২২/২৩। তাই হবে হয়তো। নতুবা বড়জোর ২৫/২৬!

আবার সিট বাঁধতে বললো বিমান ক্রুরা। দুবাই নামবে একটু পরেই। তারই প্রস্তুতি।

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 79]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 58 = 67