জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-80

গ্রামের স্কুলে পড়ি। তখনো গ্রামে টিভি পৌঁছায়নি। যাত্রাগান আর স্কুলের বার্ষিক নাটক দেখা ছাড়া আর কিছু নেই। ফ্যামেলি প্লানিং ডিপার্টমেন্ট থেকে মাঝে মধ্যে বড় নৌকোয় করে টকি দেখাতে আছে। বাজারে বসে তাকে সিনেমা বলি আমরা। শহরে মায়ের সাথে বেশ কবার সিনেমা দেখেছি। ঐ সিনেমা ভাল কি মন্দ তা জানিনা। তবে সাপ, হাতি অনেক সুন্দরী নারীরা গান গাইতে গাইতে আসে আবার যায়, সেটাই আনন্দের বস্তু। সুতরাং একবার সিনেমা দেখলে তার গল্প চলতো অন্তত ১-২ সপ্তাহ সবার মুখে মুখে। কেউ কেউ সিনেমার কাহিনি শোনাতে আমাদের। তা শুনে আমাদের নরম মনা কেউ কেউ কাঁদতো!
:
দ্বীপ গাঁ থেকে চার বন্ধু বরিশাল শহরে গেলাম সিনেমা দেখবো বলে। সবার হাতে সাকুল্যে ২০-টাকার মূলধন। আমি ৫-টাকা মার থেকে সহজে জোগার করতে পারলেও, বাকি ৩-বন্ধুর ১৫-টাকা জোগারে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। দুজনে ঘরের ধান চাল বিক্রি করে টাকা জোগার করেছে। অন্য করেছে মার টাকা চুরি। মহিষা থেকে বরিশালগামী লঞ্চে উঠলাম এক শুক্রবার ভোরে। হাফ লঞ্চভাড়া দিতে হলো ৪-জনের ৪-টাকা। তারপর ৪-জনের সিনেমার টিকেট সাথে কোল্ডড্রিংক খাওয়া। হলে ঢুকে শোর আগে ভারতীয় বাংলাগান “আজ দুজনার দুটি পথ ওগো” শুনে বিরহি হলাম ৪-জনেই। নিজেদের নায়ক নায়ক মনে হলো। কারণ অন্তত ৫-হাজার দ্বীপবাসীর মধ্যে আমরা ৪-জন ভাগ্যবান রাজপুত্র আজ হলে বসে সিনেমা দেখছি। শোর এক পর্যায়ে সিনে পর্দায় সাপ এলে সুদাম দৌঁড়ে দিলো গেটে দিকে। গেটম্যান আটকে বললো
– কি হয়েছে? সুদাম বললো
– দেখছেন না! সাপে লড়াইতাছে!
হলশুদ্ধ মানুষ হো হো করে হেসে উঠলো। আবার বসানো হলো সুদামকে। সিনেমা শেষ করে যখন হল থেকে বের হলাম, তখন সবার পকেট মিলে সাকুল্যে আছে ৪-টাকা। যা লঞ্চ ভাড়াতে দিতে হবে। লঞ্চ ছাড়বে আরো এক ঘন্টা পর। বাড়ি পৌছতে রাত হবে। ক্ষুধায় চো চো করছে পেট। বন্ধু সুদাম বললো
– চল হোটেলে ভাত খাই ডাল-গোস দিয়ে!
– ভাততো খাবি। তাতে ৪-জনের অন্তত ১০-১২ টাকা লাগবে। তো কিভাবে খাবি?
আমি ঠোঁট উল্টে বললাম
– চল আগেতো খাই, তারপর দেখা যাবে বিলের ব্যাপারটা।
:
নামকরা ওয়াজেদিয়া হোটেলে বসলাম ৪-জনে ভাত খেতে। ডাল খাসি, ভুনা মুরগী সবই খেলাম। মন্টু বললো ৪-টা ছোট মিষ্টি দৈ’র কথা। দৈও পেটপুরে খেলাম ৪-জনে। সব শেষে কামাল ৪টা কোকেরও অর্ডার দিলো। কারণ গ্রামে কোক পাওয়া যায়না। তাই শহরে এলে কোক খাই আমরা। এটা ম্যান্ডেটরী। কোক খেয়ে যাইনি এটা শুনলে স্কুলের সব বন্ধুরা হাসবে খুব! ঘন্টাখানেক বসে নানাবিধ খাবার খেয়ে এবার বিল দেয়ার পালা। চারজনেই ম্যানেজারের সামনে গিয়ে বিল দিতে চাইলাম। একজন দিতে চায়তো, অন্যজন তার হাত চেপে ধরে। বলে
– না, না! বিল আমি দেব। জলিল পকেটে হাত দেয়তো সুদাম ধরে ফেলে তাকে
– না দোস্ত কি করছিস! আমি বিল দেব আজ!
আমিও একই কান্ড করতে থাকলাম। বার দুই নিজের পকেটে হাত দিতেই সুদাম, জলিল, কামাল দুহাত চেপে ধরলো আমার!
:
প্রায় ১০-মিনিট এমন কান্ড দেখে অবাক হলো হোটেল ম্যানেজার। চোখে জল এনে বললো
– ভাইরে! তোমাদের বন্ধুত্ব দেখে চোখটা টাটিয়ে উঠলো আমার। এমন বন্ধুত্ব এ যুগে আছে? আমার কৈশোরের কথা মনে করিয়ে দিলে বাবা তোমরা আজ!
বললাম
– আংকেল! আমরা একজনের জন্য অন্যজন জীবন দিতে পারি! কি করতে পারি আমরা! দেখুনতো! আমি চাইলে ও দিতে চায়! আবার ও দিতে চাইলে আমি বিল দিতে চাই! এর একটা সহজ সমাধান দিতে পারেন কাকা?
ম্যানেজার কাকা হেসে বললেন
– পারবো না কেন বাবা! একটা বুদ্ধি এসেছে আমার মাথায়।
– চারজনেই একযোগে বললাম
– কি বুদ্ধি কাকা?
– তোমরা ৪-জনে একসাথে দৌঁড় দিয়ে সিটি কপোর্রেশন অফিস পর্যন্ত যাবে। তারপর ওখানের পতাকা স্টান্ডটা ছুঁয়ে আবার দৌঁড় দেবে এ দিকে। যে আগে আমার কাছে পৌঁছবে, সেই দেবে আজকের হোটেলের খাবার বিল।
:
চারজনেই আমরা রেস্টুরেন্ট চাচাকে ধন্যবাদ দিলাম। পায়ের ধুলো নিতে চাইলাম তার। তিনি বুকে টেনে নিলেন আমাদের চারজনকে। শেষে বললাম
– কাকা, আপনি ওয়ান টু থ্রি বলুন। আমরা দৌঁড় দেই।
আংকেল তার ক্যাশ ছেড়ে দরজার সামনে এলেন। তার খুব উৎসাহ! কোত্থেকে এক বাঁশিও জোগার করলেন তিনি। উৎসাহের আতিশয্যে চিৎকার করে বললেন
– ওয়ান.. টু… থ্রি.. স্টার্ট! তারপর বাঁশিও বাজালেন। আমরা অলিম্পিক ম্যারাথনের মত দৌঁড় দিলাম। কিন্তু দৌঁড়াচ্ছি। তা আর শেষ হলোনা। শেষে এক দৌঁড়ে লঞ্চ টার্মিনাল ভেঙে একদম ভোলার লঞ্চে। দেখি শেষ লঞ্চটা ছাড়ার জন্য স্টার্ট করেছে। আরে দুয়েক মিনিটের মধ্যেই ছাড়বে লঞ্চ! চারজনে লঞ্চের রেলিং ধরে হাঁপাচ্ছি আমরা! তখনো পকেটে আমাদের ৪-টাকা!
:
[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 81]
 
 
 
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 1