“তোমাকে ভালবাসি, কখনো বলা হয় নি। যদি হারিয়ে যাও!” – শ্রাবণমেঘের দিন।

১) শ্রাবণের মেঘ আকাশে। সারাদিনের অজস্র বৃষ্টি শেষ চান্নি-পসর রাত।
মাঝরাতে কুসুম ডাকছে মতির উঠোনে দাঁড়িয়ে। মতি দরজা খুলে বাইরে এসে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কুসুমের দিকে।

-তারপর অধিকারী সাব। আফনের সংবাদ কি? 
– তুই এত রাইতে? বিষয় কি? 
-আফনের ঐ গানটা শুননের খুব ইচ্ছে হইল — চইলা আসলাম। 
-কোন গান?

কুসুম তখন গুন গুন করে গাইতে লাগলো —

তুই যদি আমার হইতি 
আমি হইতাম তোর। 
কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর……

-এসব ছিল কুসুমের কল্পনায়।

২) “শ্রাবণমেঘের দিন”। হূমায়ুন আহমেদের একটি অনন্য সৃষ্টি। পৃথিবীতে যতদিন একজন নর-নারী নিজের অবস্থান ভুলে মনে মনে কাউকে গভীর ভেবে ভালবাসবে ততদিন এই উপন্যাস পাঠকপ্রিয়তা হারাবে না।

“তোমাকে ভালবাসি, কখনো বলা হয়  নি। যদি হারিয়ে যাও!”

কুসুমের প্রেম ছিল এমন। অজপাড়াগাঁয়ের অশিক্ষিত দরিদ্র মেয়ে কুসুম। অজানা ভাললাগা থেকে ভালবাসা জড়ো হয় মতির জন্য। ছন্নছাড়া মতি একই গ্রামের দরিদ্র মা বাবা হারা ছেলে। পরিবার বলতে সে নিজেই। ভাঙ্গা ঘরে কখনো খেয়ে কখনো না খেয়ে দিন যায়। স্বপ্ন একটাই। গান। মতির গানের দল আছে। গ্রামের কোন অনুষ্ঠানে গান গায়। দরদ দিয়ে গান গায়।

সুখানপুকুর সহ আসেপাশে তিন গ্রামের প্রধান ইরতাজুদ্দিন এখনকার জমিদার। আছে বিশাল একটি বাড়ি। ১৯৭১ সালে খান সেনারা এই বাড়িতে থেকে অত্যাচার চালিয়েছিলো আসেপাশে গ্রামে। ইরতাজুদ্দিন ছিল খান সেনাদের সাহায্যকারী। স্বাধীনতার পর ইরতাজুদ্দিন আর তার ছেলের মাঝে ঝগড়া হয়। ছেলে চাইছিলো ইরতাজুদ্দিন যেন গ্রামের মানুষের কাছে ক্ষমা চায়। স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজাকারের ভুমিকার জন্য। কিন্তু ইরতাজুদ্দিনের অহংকারের কাছে ছোট হতে পারে নি। তাই বাবাকে রেখে শহরে চলে যায় ইরতাজুদ্দিনের ছেলে। অনেক বছর পর ইরতাজুদ্দিনের নাতনী বেড়াতে আসে সুখানপুকুর দাদার বাড়িতে।

শাহানা ইরতাজুদ্দিনের বড় নাতনী। মেডিকেলের ছাত্রী। কিছুদিন পর বিদেশে যাবে পি এইচ ডি করতে। এখানে এসেও দাদার গাম্ভীর্য দূরে রেখে গ্রামের এক সাধারণ মহিলার কুঁড়েঘরে গিয়ে ডেলিভারি করায়। যদিও এটা তার প্রথম বার ছিল। বই পড়লেও হাতেকলমে কখনো এমনটা করেন নি।

দেখতে অপরুপ সুন্দরী। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে মোহসিন নামে ছেলের সঙ্গে। বিয়ের পর আমেরিকা চলে যাবে বরের সাথে। গ্রামে এসে এখানকার পরিবেশ তার কাছে ভাল লেগেছে। ভাল লেগেছে গ্রামের বাউন্ডুলে মতিকে। জন্ম নেয় ভালবাসা। অপ্রকাশিত ভালবাসা।

৩) //আকাশে মেঘ আরো বাড়ছে। গুড় গুড় শব্দ হচ্ছে। যে কোন মূহুর্তে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামবে।

মতি আকাশের দিকে উদ্বিগ্ন চোখে একবার তাকিয়েই গান ধরলো–
“মরিলে কান্দিও না আমার দায়
ও যাদুধন। 
মরিলে কান্দিও না আমার দায়।”

ও আমার প্রিয়জন আমার মৃত্যুতে তুমি কেঁদো না। তুমি বরং কাফন পরাবার আগে আগে সুন্দর করে সাজিয়ে দিও। গান শুরু হলো খালি গলায়। তার সঙ্গে যুক্ত হলো হারমোনিয়াম, বেহালা ও বাঁশি। কি অপূর্ব গলা– ভরাট, মিষ্টি, বিষাদ মাখা। কিছুক্ষণ আগের উদ্দাম বাজনার স্মৃতি গাতক মতি উড়িয়ে নিয়ে গেলো। তীব্র একটা বিষাদ মতি মিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই বিষাদ পৃথিবীর বিষাদ নয়। এই বিষাদ অন্য কোন ভুবনের।

শাহানা স্পষ্ট দেখতে পোলো মানুষ টা মরে পড়ে আছে। তার অতি প্রিয়জন ফুলিয়ে ফুলিয়ে কাঁদছে । সেই কান্না ছাপিয়ে গান হচ্ছে।

“মরিলে কান্দিও না আমার দায়
ও যাদুধন। 
মরিলে কান্দিও না আমার দায়…….

সাধারণ একজন গ্রাম্য গায়ক– সাধারণ সুর অথচ কি অসাধারণ ভঙ্গিতে না সে জীবনের নশ্বরতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। মনের গভীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে নগ্ন হাহাকার। শাহানার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগলো। কেউ কি তাকে দেখছে? দেখুক। তার নিজেরও গায়কের সঙ্গে কেঁদে কেঁদে গাইতে ইচ্ছে করছে–

“মরিলে কান্দিও না আমার দায়
ও যাদুধন। 
মরিলে কান্দিও না আমার দায়……. //

৪) শাহানা প্রগতিশীল শহরের মেয়ে। তার মাঝে মায়া আছে। গ্রামের প্রকৃতি তাকে খুব কাছে টানে। কাছে টানে গ্রামের মানুষের সরলতা। শাহানা শান্ত হলেও তার চোখে আছে গভীর মমতা। চাইছে ইরতাজুদ্দিনের অহংকারের সাথে গ্রামের সহজ সরল মানুষকে একাকার করে নিতে। ইরতাজুদ্দিন তা চায় না। ধনী গরীবের ব্যবধান চায়। সম্মান চায়। সে বুঝে না এমন সম্মানের মাঝে লুকিয়ে থাকে প্রচন্ড ঘৃণা। যা ভয়ে প্রকাশ করতে পারে না।

শাহানা চলে যেতে হবে। সে মাত্র দশদিনের জন্য এসেছে। এর মাঝে মতির মায়া বড় হয় শাহানার মনে। কিন্তু চলে যে যেতে হবে..

মতি সাধারণের মাঝে অতি সাধারণ হলেও খুব বিনয়ী। পরোপকারী। কিছুদিনের মাঝে গ্রামের মানুষের কাছে প্রিয় মানুষ হয়ে উঠে শাহানা। অন্যদিকে কুসুমের বিয়ে হচ্ছে অন্য কারো সাথে।

ভালবাসা হারিয়ে যাওয়ার কারণ নিজে থেকেই আসে। যা হবার হয় তা হাজার চাইলেও হয় না। এখনে কোন যুক্তি কাজে আসে না। কেউ চায় কিন্তু পায় না। আর কেউ হারায় না পেয়েও।

আশেপাশে তিন গ্রামের মানুষ জড় হয়েছে ঘাটে শাহানা আজ চলে যাবে। মতিও দেখতে আসে। সবাই কাঁদছে কয়েকদিন আগে এই গ্রামে আসা একটি অহংকারী বাড়ির মেয়ে। এর মাঝে কতটা আপন হয়ে যায়। চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ভেঙ্গে যায় ইরতাজুদ্দিনের সব অহংকার। দাঁড়িয়ে ক্ষমা চায় নিজের কৃতকর্মের জন্য।

শাহানা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় চলে গেছে একটু আগে। এদিকে কুসুম বিষ খেয়েছে। মৃত্যু তার খুব নিকটে। সবাই মিলে নিয়ে যেতে চাইছে শাহানার কাছে। সবার বিশ্বাস শাহানা পারবে বাঁচাতে। ততক্ষনে শাহানা অনেক দূর চলে গেছে। পিছুপিছু বৈঠার ছোট নৌকায় কুসুমকে বাঁচাতে ছুটছে মতি আর কুসুমের বাবা। ফোটা ফোটা বৃষ্টি পড়ছে। মতির কানে ভাসছে দুরের কোন সুর—

তুই যদি আমার হইতি 
আমি হইতাম তোর……

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 + = 33