জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-79

নারকেলতলী গাঁয়ে বেড়াতে যাওয়া : পর্ব – ২

:

৪-ঘন্টা দুবাই ট্রানজিট। ঐ নারী আমার পিছু ছাড়েনা আর! ট্রানজিট লাউঞ্জেও আমার পাশের সিটেই বসে রইল সে। এমনকি ওয়াশরুমে গেলে তার হ্যান্ডব্যাগ রেখে গেলো আমার জিম্মায়। শেষতক ট্রানজিটের দামি কফি-শপের কফি আর এককাপ কিনতে পারলাম না আমি, দুকাপ কিনতে হলো নিজের পয়সায়। বললাম

– কি হয়েছিল আপনার বলবেন কিছু?

মেয়েটি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। শেষে বললো

– শুনতে পারবেন ভাইজান এ দুখখির কাহিনি?

-বলুন না শুনে দেখি! যদি কোন কাজে লাগে আপনার!

– আগে বললাম না সিরাজগঞ্জের নারকেলতলী গ্রামে বাড়ি আমার? চার ভাইবোন আমরা। মেট্রিক পাস করেছি গ্রামের স্কুল থেকে। তারপরই বাবা বিয়ে দিয়ে দেন পাশের গাঁয়ের শফিকুলের সঙ্গে। স্বামীর সাথে ঢাকা গিয়া জানতে পারি, সেইখানে বউ বাচ্চা আছে শফিকুলের। সতীনের ঘর করতে পারুম না। তাই ৩-দিনের মাথায় ফিরা আ্লইাম মায়ের কাছে। মারে বললাম মা! কলেজে পড়ুম আমি। আমার সাথের সককলে পড়ছে। আমিও পড়ুম। কৃষিকাজ করে বাবা। সংসারে আয় রোজগার নাই তেমুন। তারপরো মা তার জমানো টাকাতে কলেজে ভর্তি করলো আমারে। বাড়ি থাইকা অনেক দূরে কলেজে হাইটা আসা যাওয়া করি। এক বছর যাইতে আমার এক বান্ধবী খোঁজ আনে, ঢাকা থাইকা বিদেশ যাওনের!

:

বাবার সংসারের দুরবস্থা দেইখা একদিন ২ বান্ধবী ট্রেনে চইড়া ঢাকা যাই বিদেশ যাওনের অফিসে। ফকিরাপুল তাগো অফিস। আল বুরাক ম্যান পাওয়ার এজেন্সি। তারা কয়, টাকা বেশী লাগবো না!‍ কেবল বিমান ভাড়া ত্রিশ হাজার টাকা হইলেই চলবো। মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন। থাকা খাওয়া ডাক্তার ফ্রি। দিনে ৮-ঘন্টা ডিউটি। আমারে জেদ্দা পাঠানো হয়। আমার বান্ধবীরে জর্ডান। সে জানাইলো সে ভালই আছে এক খৃস্টানের বাড়িতে। আমি মনে করেছিলাম, আমার ভাগ্য ভাল। মুসলমানের দেশে যাইতাছি। পাক পবিত্র ঘরে থাকুম। ওমরা হজ্জ কইরা হাজী হইয়া দেশে ফিরুম। কিন্তু যাওয়ার পর থাইকাই ডেইলি ১৬/১৭ ঘন্টা ৩-মহিলা সতিনের কাম। যেই সতিনেরে ভয় পাইছি দেশে, সেই সতিন এখানে! একজনে ডাকে তো অন্যজনে রাগ করে। ভাষাও কিছু বুঝিনা। খাইতে দেয় রুটি আর আরবি খাবার। ডাইল ভাত কিছু নাই। ওগো খাবার খা্ইতে পারিনা। সবচাইতে বড় ব্যাপার হইলো, রাইতে ঘুমাইতে গেলে ঘরে বুড়া ব্যাটা আসতো শুইতে। তার শোয়া শেষ অইলে, আহে তার ছেলে। ঘরের সব মহিলারা জানে এই শোয়ার ঘটনা কিন্তু মহিলারা কেউ কিছু কয়না।

বিস্মিত হয়ে বললাম

– বলেন কি? স্ত্রীরা জানে তার ঘরের কাজের মেয়ের সাথে তার স্বামী ছেলে সেক্স করে? তারপরো কিছু কয়না?

– না কয়না। এমুনকি আপনে শুনলে তাজ্জব অইবেন, তারা বাপে পুতে, ভাই বইন একসাথে ল্যাংটা সিনেমা দেখে। তারে পর্ন সিনেমা নাকি কয়! পর্ন ভিডিও!

– স্টেরেঞ্জ! এমন স্বভাব আরবিদের?

– হ, এইটাই সত্য। আমার নিজ চোখে দেখা!

– তা তুমি এলে কিভাবে? তোমাকে আসতে দিলো তারা?

– ঢাকা থেকে আসার সময় ৩-দিনের একটা ট্রেনিং আছিল আামদের। প্লেনে ওঠার আগে আমাগোরে একটা কাগজ দেয়। তাতে বিপদ আপদে জেদ্দা এ্যামবেশির ঠিকানা ও ফোন নম্বর লেখা ছিল। আমি একদিন এ্যামবেশিতে ফোন কইরা আমার দূরবস্থার কথা বলি। তখন এ্যামবেশি থাইকা লোক যায় পুলিশ নিয়া ঐ বাড়িতে।

– তারা কি করে?

– তারা আরবিতে কি সব বইলা আমাকে এ্যামবেশিতে নিয়া আসে। তারপর ১০/১২ দিন পুলিশ ক্যাম্পে আটকা থাকি। আইজ এ্যামবেশির লোক আইসা পুলিশসহ এয়ারপোট নিয়া আইছে আমারে। দেখেন না কোন মালপত্র নাই আমার সাথে।

– কোন টাকা পয়সা পাও নাই?

– আমারে তিন হাজার রিয়াল দিছে পুলিশে। তা নাকি আমার ৬-মাসের বেতন। আচ্ছা ভাইজান ঢাকা নাইমা কি রিয়াল ভাংগাইয়া টাকা বানাইতে পারুম?

:

ট্রানজিট ক্যাম্পে কল আসে। ঢাকাগামী প্যাসেঞ্জারদেরকে ২৬ নং গেটে প্রসিড হতে বলে। এর মধ্যে জেনে নেই মেয়েটির নাম নার্গিস আক্তার। সেও ২৬ নং গেটের দিকে যায় আমার সাথে সাথে। সারা বিমানে নার্গিস নানাবিধ কথা বলে। অধিকাংশই তার বঞ্চনা আর অসহায়ত্বের কথা। ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে আমার লাগেজের জন্য বেল্টের কাছে যাই আমি। নার্গিসও আমার সাথে দাড়িয়ে থাকে। তার কোন লাগেজ নেই। আমার হেলপ চায় সে, তাই একা বের হয়না। বারিধারার ফ্ল্যাটে পৌঁছে নার্গিস কথা বলে তার মা বাবা ভাইবোনদের সাথে। দুয়েকদিন পর বাড়ি ফিরবে এমন কথা জানায় সে। নার্গিসের কাছে মোট ৩,৩০০ রিয়াল আছে। ৩০০০ রিয়াল বেতন। আর দুতাবাসের লোকেরা ৩০০ রিয়াল দিয়েছে তাকে। একুশ টাকা দরে তা ভাঙিয়ে ৬৯,৩০০ টাকা দেই নার্গিসকে। একসাথে এতো টাকা পেয়ে বেশ খুশি হয় সে।

:

পরদিন কাকরাইলের জনশক্তি অফিসে নিয়ে যাই তাকে। সেখানে ড. নুরুল ইসলামের সাথে পরিচয় আমার অনেক দিনের। একসময় ডেপুটেশনে দুজনে একসাথে কাজ করেছি। এখন সে জনশক্তি ব্যুরোর পরিচালক। বড় পদে আছে। নার্গিসের সব শুনে একটা কমপ্লিন নিলো সে। নার্গিসকে ওয়েজ আর্নার কল্যাণ তহবিল থেকে কিছু ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা করবে, এমন কথাও বললো। দুপুরে ঘরে ফিরে জর্ডানে কর্মরত বান্ধবী ইসরাতের সাথে বললো ইমোতে। ইসরাত খুব ভাল আছে। তার মালিক স্বামী স্ত্রী দুজনেই চাকুরী করে আম্মানে। তাদের দুটো বাচ্চাকে দেখতে হয় ইসরাতের। থাকা খাওয়া ঐ ঘরেই। মাসে বেতন ২৪-হাজার টাকা। এ পর্যন্ত ২-লাখ টাকার মত পাঠিয়েছে বাড়ি ইসরাত। আপাতত আসার ইচ্ছা নেই তার। খৃস্টান বলে রোববার ছুটি আছে ইসরাতের কিন্তু সে কই যাবে? কিছু চেনেনা। তাই রোববারেও তাদের সাথে কাজ করে ইসরাত। এ জন্য অতিরিক্ত কিছু টাকা দেয় মালিক। সে ভাল আছে ওখানে। নার্গিসের দু:খের কথা শুনে আফসোস করে ইসরাত। বলে মালিককে বলে তার কোন আত্মীয়োর জন্য নার্গিসকে নেয়ার চেষ্টা করবে ইসরাত!

:

২-দিন আমার ফ্ল্যাটে থেকে তৃতীয় দিন নার্গিসতে সিরাজগঞ্জের ট্রেনে তুলে দিতে যাই এয়ারপোর্ট স্টেশনে। তার টিকেট কাটার জন্য দীর্ঘ কিউতে দাঁড়িয়ে অবশেষে সাধারণ চেয়ার কোচের একটা সিট পাই। নিজেট পকেট থেকে টিকেটের টাকা পরিশোধ করি আমি। নার্গিসকে বলেছি – ৬৯,৩০০ টাকার পুরোটাই বাড়ি গিয়ে তুলে দেবে তোমার মা-বাবার হাতে। তাতে তারা খুশি হবে খুব। তাই ও টাকা ভাঙতে হবেনা তোমার। নার্গিস বলেছে – স্টেশনে নেমে বাসে বা টেম্পুতে বাড়ি ফিরতে পারবে সে। কারণ বাড়ি থেকে সে কলেজে আসতো সিরাজগঞ্জ শহরে। তাই পথঘাট চেনে সে। সিরাজগঞ্জগামী সোনারবাংলা এক্সেপ্রেস দাঁড়ায় এয়ারপোর্ট স্টেশনে। নার্গিসকে তুলে দেই “ঙ” লেখা কামড়ায়। ভেতরে না ঢুকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে নার্গিস। বিদায়ের পালা এবার। জল নামে নার্গিসের চোখে। বলে —

– ভাইজা!, আপতে এতো ভাল ক্যামনে!

ওর কথা শুনে, কাকডাকা ভোর কিংবা পউষের মধ্য রাতের কুহক পাখি ডেকে যায় বুকের গহীনে। মানুষের প্রতি এসব মমত্ব আমি মায়ের কাছে শিখেছি তা বলতে পারিনা অচেনা নার্গিসকে। কেবল ওর দিকে তাকিয়ে চেতনা নদীর দূর মোহনায় ভেসে যায় কতনা আকুলতার ডাহুক পাখি। এক মানবিকবোধে প্রতারিত গ্রামীণ নারী নার্গিসের দিকে তাকিয়ে থাকি আমি। তারপর বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অপরূপ অগ্নিশিল্পকলা খুঁজে মরি ওর পরিবারের কথা চিন্তনে। এসব চিন্তনে মানবিকতার অন্ধকার জগতের কুয়াশার পঞ্জরে হারিয়ে যাই যেন আমি। ট্রেন ছাড়ার ঘন্টা বাজলে নার্গিস হাত ধরে আমার কি এক আকুলতায়! বলে “ধন্যবাদ ভাইজান! আপনার মতন মানুষ যদি আরো থাকতো বাংলাদেশে”! প্রথম ভাললাগার বিদগ্ধ পিপাসিত প্রচারের মুগ্ধতা মেখে বলি

– আমি এমনই নার্গিস। আমার পুরো পরিবার এমন। আমার যে ভাইর কল্যাণে জেদ্দা গিয়ে তোমার সাথে প্লেনে দেখা হলো, সে ভাই আমার চেয়ে আরো ভাল!

:

চেয়ে থাকে নার্গিস আমার দিকে। প্রাণিজ প্রণয় সুখমিশ্রিত কাংখিত সময়ের ফুল ফুটতে দেখি যেন ঐ নার্গিস নামক মেয়েটার চোখে। কি এক আকুলতায় সে রুদ্ধ কন্ঠে বলে

– আমি একা যাইতে পারুম না ভাইজান! আমার সাথে আমার বাড়ি চলেন। আমারে আগাইয়া দেবেন! আপনারে দেখামু আমার মা বাবারে!

ট্রেন চলতে শুরু করেছে। নার্গিস হাত ছাড়েনা আমার! বলে উইঠা পড়েন ভাইজান। আমার বাড়ি চলেন। আপনে আমার বাড়ি গেলে আইজ ঈদের এক আনন্দ হইবে ভাইজান আমার বাড়িতে!

:

টিকেটহীন আমি কোনকিছু না ভেবে ট্রেনে উঠে বসি অচেনা এ মেয়েটির আকুতিতে। ট্রেন চলতে থাকে সিরাাজগঞ্জের দিকে। ট্রেনের শব্দ নয় যেন ঘাসের শিশির, পাটখড়ির গন্ধ কিংবা বুনো প্যাঁচার গান বাজছে ট্রেনের শব্দে! শোকার্ত মৃত মাছের পুচ্ছের শেষ মৃত তাড়নার মত আমি এগিয়ে যাই অচেনা এক নার্গিসের বাড়িতে! মনে হচ্ছে যেন জীবন ইঞ্জিনের বিবর্ণ গাড়ি টেনেটুনে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে কোন অচেনা গাঁয়ে!

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 80]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 73 = 74