টুনি

(১) “তুলসী তলে দিয়ে বাতি, খানকি বলে আমি সতী”
-মনেমনে ছড়াকেটে মজুমদার বাড়ির রাস্তায় এক গাল থুতু ছিটিয়ে দিলো ফজর আলী। তারপর দ্রুত গতিতে হাঁটছে বাজারের দিকে।

পেছন থেকে সাধন মজুমদার চেঁচিয়ে বলে-
“আলী ভাই, দুপুরে একবার আইও আমার বাড়ির দিকে।”

ফজর আলী কিছু বলল না। আরেক বার থুতু ছিটিয়ে সজোরে হাঁটে মসজিদের দিকে। ভোরবেলার ঘন কুয়াশায় দেখা যায় নি সেই থুতু কতটা ঘৃণায় মাখামাখি ছিলো।

মজুমদার বাড়িতে আজ অষ্টপ্রহর নাম কীর্তন ও মহোৎসব চলছে। মাইজগ্রামের হিন্দুরা ভোরবেলা থেকে সেখানে ব্যাস্ত । সাধন মজুমদার নতুন পাঞ্জাবি আর ধুতি পরে বের হয়েছে সকালে। গত ২০ বছরে কেউ তাকে ধুতি পরা দেখে নি। হঠাৎ দেখে মনে হয় কাকের পেখম। ফজর আলির দ্বিতীয় বারের থুতু এই পেখমে জন্য।

ফজর আলীর বয়স ৪০ না’কি ৬০ বুঝা যায় না। শক্তিসামর্থ্য শরীর– দেখতে এখনো চঞ্চল। কাঁচাপাকা দাঁড়ি। মাথায় টুপি–সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী পরে সর্বদা। সত্য এবং উচিৎ কথা বলতে রাজা-উজির কাউকে ভয় পায় না।

মাইজগ্রামের পাশে মাইজারহাট। সব মিলে ১০-১২ টা দোকান। সবচেয়ে পুরাতন ভাই ভাই ডিপার্টমেন্ট স্টোর ছিলো নির্মল সেনের। ফজর আলীর বয়স যখন ২০-২২ তখন থেকে সেনের দোকানে চাকরি করতো ফজর আলী। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে মাইজগ্রামের সাথে তার উঠাবসা। এই গ্রামের প্রতিটি বিবাহযোগ্য ছেলেমেয়ের বাপ-মার বিয়ে দেখেছে ফজর আলী। এই গ্রামের সবার সব ইতিহাস ফজর আলির নখদর্পণে।

নির্মল সেনের দোকানে চাকরি করে এক মেয়ে বিয়ে দিয়েছে, এক ছেলেকে পড়ালেখা শিখিয়েছে। ছেলে ২ বছর ধরে চাকরি করে শহরে। প্রতিবার বাড়ি আসলে বলতো–
”আব্বা আপনে আর এই দোকানে যাওন লাগব না। আল্লার রহমতে আমি এখন টাকা রুজি করি।”
ফজর আলী হাসি দিয়ে বলে–
“আমি কি টাকা রুজি করতে যাই নাকি এই দোকানে? আমার কামকাজ নাই। দোকানে বসে থাকি, সময় কাটে। তাছাড়া নির্মল দা বুড়া হয়েছে। দোকান আর কয় দিন।”
ছেলে আর কিছু বলে না। সময় কাটে বসে থাকুক।

গত দুইমাস হল নির্মল সেন দোকান বিক্রি করে দিয়েছে। দোকানের নতুন মালিক অনেক টাকার মালিক জাফর সিকদার। দোকান কিনে নি আসলে জায়গাটা কিনেছে। সব ফেলে দিয়ে অনেক টাকা খরচ করে ১০-১২ দিনে নতুন দোকান উঠিয়েছে। সেই সাথে শেষ হল ফজর আলীর কর্মজীবন। কিন্তু অভ্যাসবশত এখনো ভোরে চলে আসে বাজারে। মসজিদে নামাজ পড়ে একবার তাকায় দোকানের দিকে। চোখে মুখে ভেসে আসে এই দোকান নিয়ে অনেক বছরের স্মৃতি। তারপর ধীরেধীরে মাইজগ্রামের চেনা পথ ধরে চলে যায় বাড়িতে।

আজও নামাজ পড়ে বাড়ি যাচ্ছিলো। মজুমদার বাড়িতে উজ্জ্বল আলো– সাধন মজুমদারের ধুতি– আর গ্রামের সবার সমাগম দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। তাই ছড়াকেটে থুতু ছিটিয়ে দেয়।

(২) সাধন মজুমদারের বাবা রসহরি মজুমদার দুইটি বিয়ে করে। প্রথম স্ত্রী বড় ছেলে হারাধন কে জন্ম দিতেই মারা যায়। স্ত্রী হারিয়ে প্রথম সন্তান পেয়েছে। তাই রসহরি ছেলের নাম রাখে হারাধন। সদ্যজাত সন্তান লালন করা রসরাজের জন্য কঠিন হচ্ছিলো। পরে বিয়ে করে ঘরে তুলে আনে দ্বিতীয় স্ত্রী মঙ্গলী কে। উল্লেখ্য, সমাজের প্রচলিত আইনে স্ত্রীর একমাত্র দৈবদায়িত্ব সন্তান দেখাশুনা করা।

রসহরি পেশায় ছিলো কুলি। রেলওয়ে স্টেশনে কুলির কাজ করতো। মঙ্গলীর সংসারে আসে দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে চপলা সবার ছোট। মেয়ে জন্মের মাস দুয়েক আগে রসহরি মারা যায় ট্রেনে কাটা পরে। মেয়ের বয়স যখন সাত বছর তখন ছোট ছেলে উজ্জ্বল তখন নয় বছর মাত্র। সাধন বাবার মত কুলির কাজে ব্যাস্ত। একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি এসে দেখে মাকে উঠানে শুয়ে রেখেছে। চোখে তুলসী পাতা– মাথার পাশে আগরবাতি জ্বলছে। দৌড়ে এসে চিৎকার করে উঠে- “মাগো আমারে কোন অকুলে ভাসাই গেলা”

মা মারা যাওয়ার পর ছোট দুই ভাই বোনের দায়িত্ব আসে সাধনের উপর। বড় ভাই হারাধন স্ত্রী সন্তান নিয়ে আলাদা থাকে।

স্টেশানের বড়বাবু রমনী মোহন চক্রবর্তী। বাড়ি দূরে হওয়ায় স্টেশন কোয়াটারে থাকে। মাসে দুয়েকদিন বাড়ি যায়। স্ত্রী সন্তান ছেড়ে এভাবে আছে অনেক বছর এখানে। হালকা পাতলা মদ খেয়ে। মদ খেলে কিছু মুহূর্ত ভুলে যায় পরিবারের টান। মদ খায় সাধন আর শ্যামল দেবনাথের সাথে বসে। শ্যামল সাধনের সাথেই কুলির কাজ করে। যে রাতে মদ খাবে সে রাতে বড়বাবু সাধন কে টাকা দেয়। সাধন দেয় শ্যামল কে। শ্যামল মদ নিয়ে আসে। চক্রবর্তী হয়ে মদ কিনতে যাওয়া মানায় না। কোয়াটার রুমে বসে গোল হয়। শ্যামল গ্লাসে মদ ঢেলে দেয়। চানাচুর আর সিগারেটের প্যাকেট থাকে সামনে।সাধন মদ খায় মদ তাকে খেতে পারে না। ঝিম ধরে বসে থাকে খেয়ে। এই আসরে বাবু-কুলি কিংবা চক্রবর্তী-দেবনাথের পার্থক্য নেই।

এমন একদিন মদ খেয়ে সাধন বড়বাবু কে বলে-
“বাবু উজ্জ্বলের তো পড়ালেখা একটু আছে। আপনি তাকে স্টেশনে একটা কাজে লাগিয়ে দেন। আপনি চাইলে এটা আপনার বাম হাতের কাজ”।
রমনী মোহন একমুঠ চানাচুর মুখে দিয়ে বলে- “ধর চাকরি হয়ে গেছে”।
মাসখানেক পর উজ্জলের চাকরি হয় রেলওয়ে অফিসে।

ছোট বোন চপলার বিয়ের পর বিয়ে করে সাধন। দুইভাইয়ের রুজিরোজগার দিয়ে ঘর করে। আশেপাশে কয়েকটা জমিও কিনে। সাধন সেখানে শাকসবজি চাষ করে। আর্থিক অবস্থা ভালর দিকে বলা যায়।

একসময় সাধন বিয়ে করে কালিঘাটি গৌরাঙ্গ সেনের ছোট মেয়ে অর্চনাকে। অর্চনার দুধে আলতা গায়ের রঙ। মোটাসোটা শরীর শাড়ীর ভাজে ভাজে বের হয়ে থাকে। বুকের দিকে পুরুষ্ট স্তন যুগলের সংযোগস্থল আঁচলের বাইরে থাকে সব সময়। শাড়ী পরে নাভি থেকে চার আঙ্গুল নিচে। আরেকটু হলেই যৌনি ভেসে উঠবে,- এমন।

বিয়ের পর বছরখানেক কিছুটা শরীর ঢেকে চললেও পরে এটা সচরাচর দেখা যায় না। গ্রামের অনেক পুরুষ বাজারে যেতে বা ফিরে আসতে মজুমদার বাড়ির পাশে দাড়ায়। অর্চনার হাতে একগ্লাস পানি খেয়ে সব শান্ত করে।

(৩) গৌরাঙ্গ সেনের বড় মেয়ে কল্যাণী। বিয়ে দেয় শরণখোলা হেমন্ত দর্জির কাছে। হেমন্ত দর্জি দিনে এনে দিনে খায়। পরপর চার টা মেয়ে। বড় মেয়ে বিয়ে দিয়ে এখনো সেই ঋনে ডুবে আছে। তার উপর বাকি তিন মেয়ে সমানে মাথা তুলে আছে। কল্যাণীর রাতে ঘুম হয় না। মেজো মেয়ে সুনীতি দেখতে সুন্দর। ছোটখাটো গঠন। আক্কেলের দিকে একটু ভোঁতা।

অর্চনা একদিন কল্যাণীর বাড়ি যায়। রাতে খেয়ে কল্যাণী আর অর্চনা নানা কথা বলতেছে। একসময় অর্চনা বড় বোন কে বলে-
“দিদি, সুনীতি কে আমাদের উজ্জ্বলের জন্য দিয়ে দাও। কিছু লাগবে না। বিয়ের খরছ টা করলেই হবে।”

কল্যাণীর চোখ কপালে উঠে। বিস্ময়কর চেহারায় বলে-
“কি বলিস অর্চনা! তা কিভাবে হয়। সুনীতি কে তোর দেবরের সাথে বিয়ে দিই কি করে!”

“কেন দিবে না? উজ্জ্বলের কি নেই? চাকরি, সহায়সম্পদ সব আছে দেখতে শুনতে ভাল। আমাদের সম্পর্ক আমাদের সাথে থাকবে।তোমার মেয়েকে আমার বাড়িতে আনলে আমি নিজের মেয়ের মত রাখব।” -একটানা কথাগুলো বলে শেষ করে অর্চনা হেমন্ত দর্জির দিকে তাকায়।

হেমন্ত দর্জি কিছু বলে না। মুখ ঘুরিয়ে তাকায় কল্যাণীর দিকে। বুঝা যাচ্ছে এই সিদ্ধান্ত কল্যাণীর উপর নির্ভর।

“কিন্তু, আমরা না হয় মানলাম। অন্য কেউ কি মানবে? বোনের মেয়েকে দেবরের সাথে বিয়ে?” -একথা বলে জিজ্ঞাসা চোখে আরো কাছে এসে বসে কল্যাণী।

অর্চনা এক খিলি পান দিদির মুখে হাসিমুখে পুরে দেয়।

(৪) সাধন মজুমদারের ঘরে বৈঠক বসেছে। প্রথম সারিতে সুরেশ মাষ্টার, অনিল মহাজন, বনমালী দত্ত, হারাধন এরা বসেছে। তারপর আরো কিছু মানুষ একসাথে। শেষের এককোণে শ্যামল দেবনাথ বসেছে তার মাথায় গামছা দিয়ে ঢাকা। আর আছে ফজর আলী। মহিলারা একটু আড়ালে। রাত তখন সোয়া নয়টা হবে। বড় একটা প্লেটের উপর পান-সুপারি আর সিগারেট রাখা।

সুরেশ মাষ্টার মাইজগ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তি। পৈতৃক অনেক সম্পদ আর ভাল চাকরি নিয়ে সমাজে বেশ সম্মানের সাথে আছেন তিনি।

কয়েকটা কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে সুরেশ মাস্টার। তারপর বলে- “কই সাধন সামনে আয়। বল দেখি কি বলবি।”

এতক্ষণ সভায় অন্যান্যরা অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলছিলো। সুরেশ মাষ্টারের কথায় সবাই মনোযোগী হয়ে বসে। সাধন উঠে আসে সামনের দিকে।

“আমার বাপ-মা নাই। কষ্ট করে বড় হয়েছি। দায়িত্ব ছিলো চলপাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। উজ্জ্বল পড়ালেখা শিখছে বিয়ের বয়স হয়েছে। বড় ভাই– গ্রামবাসী হিসাবে আমার ছোট ভাইয়ের বিয়ে দেয়ার অনুমিত চাইছি।” -একটানে বলে নিচের দিকে তাকায় সাধন।

“তারে বিয়ে করাই লাভ কি। বুড়া হয়ে গেছে অনেক আগে।” -ফজর আলীর এমন রসিকতায় সবাই হেসে উঠে।

“বিয়ে তো করানো লাগবে। হারাধন দা তো আছে। তাকে বললে তো মুহূর্তে মেয়ে ঠিক হয়ে যায়। কম হলে ৫০ টা বিয়ের ঘটকালি তো সে’ই করছে। হারাধন দা মেয়ে দেখুক, আমরা তো আছি। কি বলেন আপনারা”। -সবার উদ্দেশ্যে বলে সুরেশ মাষ্টার।

সবাই হ্যাঁ -বোধক সম্মতি দিলো।

অর্চনার বাম কুনুইয়ের খোঁচা খেয়ে সাধন আবার সামনে আসে। কাচুমাচু ভঙ্গিতে বলে- “মেয়ে একটা আমি ঠিক করে রাখছি। চিনপরিচয় একটু আত্মীয়র মাঝে। আমার সম্মুন্দির মেয়ে। দেখতে ভাল। জাত-বংশ তো আমার পরিচিত।”

কথা শেষ না হতেই হারাধনের বউ চেঁচিয়ে উঠে– “তলে তলে পুকুর কাটা হয়ে গেছে। তো বৈঠকের কি দরকার? আর কল্যাণীর মেয়ে উজ্জ্বলের কি হয়? ভাগিনী। ভাগিনী কেমনে বিয়ে করে?”

বৈঠকে সোরগোল রটে গেলো। “শুনো, থামো সবাই। একটা সমাধান তো করা লাগবে। -প্রচণ্ড চেষ্টায় সুরেশ মাষ্টার সবাই কে থামায়।

হারাধন এতক্ষণ চুপচাপ ছিলো। তারপর বলেন- “আমার এই বিয়েতে মত নাই। তোমরা ইচ্ছে হলে করাও আমি এসবের মাঝে নাই।”
শুনে মনে হচ্ছে এটাই তার ফাইনাল কথা। বৈঠকে আবার সোরগোল। শেপালির চিৎকারে থাকা যাচ্ছে না।

অর্চনা সবার জন্য শরবত নিয়ে আসে। সবার সামনে সামনে একটা একটা গ্লাস রেখে যায়। সব শেষে যায় কোণায় শ্যামলের হাতে গ্লাস দিয়ে মাথা নিচু করে কি একটা খুঁজে। তারপর চলে আসে।

তারপর শ্যামল দাঁড়ায়। বলে- “সবার উদ্দেশ্যে আমার একটা কথা ছিলো।”

সুরেশ মাষ্টার বলেন- “বল। কি বলবি বল।”

“মতামত যদি জিজ্ঞাস করতে হয় যে বিয়ে করবে তাকে জিজ্ঞাস করা উচিৎ না? উজ্জ্বল তো সামনে। তাকে জিজ্ঞাস করলে তো সমাধান হয়ে যায়।” -এই কথা বলে শ্যামল গ্লাসের বাকি শরবত টা শেষ করে।

অনিল মহাজন বলে উঠে- “উজ্জ্বল কই। এদিকে আয়। তোর কি মতামত দেখি বল।”

এতক্ষনে উজ্জ্বল সবার মাঝে আসে। একটানা বলে- “আমি বিয়ে করলে এই মেয়েকে করব। না হলে বিয়ে করব না।”
শুনে মনে হচ্ছে কয়েকদিন ধরে এই কথা মনে মনে মুখস্থ করছিলো সে। শুধু বলার অপেক্ষায় ছিলো।

ফজর আলী উঠে আসে বৈঠকের মাঝে থেকে। প্লেট থেকে একটা পান নিয়ে মুখে দিতে দিতে বলেন-

গ্রামের নাম মাইজগ্রাম
মাঝেমাঝে পুকুর
মাসি হইল জা
আর ভাই হইল শ্বশুর।

(৫) উজ্জ্বলের বিয়ের একবছর পর টুনির জন্ম হয়। এই বাড়িতে সুনীতির বড়ই আদর যত্ন। সুনীতি অর্চনা কে মাসি ডাকলেও সাধন কে ডাকে দাদা। সাধন বাজার থেকে এসে বাজারের থলে টা সুনীতি কে দেয়। সেখানে সুনীতির জন্য থাকে কখনো একটা আপেল– কখনো একটা কমলা। বাজারে যাওয়ার সময় সাধন সুনীতি কে জিজ্ঞাস করে কি খাবে সুনীতি, কি খেতে ইচ্ছে করে। সাধন সাধ্যমত চেষ্টা করে তা নিয়ে আসতে।

সুনীতি এই বাড়িতে এসে বেশি খুশি। তার কাজ রান্নাবান্না করা ঘর গুছানো । বাকি সব মাসি করে দেয়। তবে সাধন মজুমদারের এক কথা কারো সাথে অযথা আড্ডায় বসা যাবে না। এসব অপ্রয়োজনীয় আড্ডা সংসারে অশান্তি নিয়ে আসে।

সংসার বলতে সুনীতির অভিজ্ঞতা এই ঘরেই। উজ্জ্বলের চাকরি সন্ধ্যা থেকে। বিকেলে চলে যায় সে আসে কখনো রাত ২টা কখনো ভোর ৪টা। মাসে ২-৩ বার তাদের শরীরে শরীরে কথা হয়। সুনীতি এতেই খুশি। সারা রাত কাজ করে আসে উজ্জ্বল। সব সময় শরীরে সহ্যে না। সুনীতি টুনিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। বেশিরভাগ সময় জানেই না রাতে কখন উজ্জ্বল এসে পাশে শুয়ে যায়। সকালে বুঝতে পারে।

বর্ষার মাঝামাঝি সময়। চারদিকে গুটিগুটি বৃষ্টি। গাছের পাতায় জমে বড় হওয়া বৃষ্টির পানি টিনের চালে টপ টপ শব্দ করে ঝরছে। সুনীতির ঘুম ভেঙে যায় প্রকৃতির ডাকে। টুনিকে সরিয়ে দিয়ে ধীরেধীরে বাড়ির পেছনে যায়। ফিরে আসার সময় মাসির ঘরের পাশে এসে থমকে দাঁড়ায় সুনীতি। ভেতর থেকে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ আর গোংরানি আওয়াজ। প্রায় ২ বছর সংসার জীবনে এই শব্দ সুনীতির অজানা থাকার কথা না। তবে আশ্চর্য হওয়ার কারণ হচ্ছে সাধন আজ সকালে শহরে গেছে কোন কাজে ফিরবে ২ দিন পর। মাসীর ঘর থেকে এই শব্দ আসার কথা না। ভাবতে ভাবতে ফিরে আসে সুনীতি। বাতি নিভিয়ে দিলে কিছুক্ষণ পরই দরজা খুলে ভেতরে আসে উজ্জ্বল। অন্ধকারে চুপচাপ শুয়ে থাকে একপাশে। সুনীতি শুয়ে শুয়ে হিসাব করে — দুইয়ে দুইয়ে চার।

(৬) সুনীতির বড় বোন বিমলার বিয়ে হয়ছিলো শ্যামতলা মহাজন বাড়িতে। বিমলার একহারা গড়ন। যেই হাটে রথ দেখে সেই হাটে কলা বেচে ফিরে। হরহরি মহাজনের সংসারের চাবি বলতে গেলে বিমলার হাতে।

একদিন বাপের বাড়িতে সুনীতি আর বিমলা বসে আছে। বিমলা বুঝতে পারে সুনীতি আগে থেকে কেমন যেন বদলে গেছে। জিজ্ঞাস করে সুনীতি কে। সুনীতি বিমলাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে। তার দুইদিন পরই সুনীতি কে নিয়ে মাইজগ্রাম ফিরে আসে বিমলা। সে রাতেই আবার বৈঠক বসে মজুমদার বাড়িতে। বৈঠকে আছে সুরেশ মাস্টার, বনমালী দত্ত, অনিল মহাজন, হারাধন, ফজর আলী, সাধন মজুমদার সহ অনেকেই। সবার শেষে এককোণে বসে আছে শ্যামল দেবনাথ।

শুরুতে সুরেশ মাষ্টার সুনীতি কে ডেকে জিজ্ঞাস করে- “সুনীতি, বল দেখি কেন ডাকলি সবাইকে।”

সুনীতি কাচুমাচু হয়ে সামনে আসে। বলে- “আমার মাসি টুনির বাপের সাথে ঘুমায়।”

বলতেই চারদিকে উপস্থিত সবার কলরব জমে উঠে।

“বেশ্যাগিরি বজায় রাখতে বিয়ের নামে তোকে নিয়ে আসছে। এই কথা আমি বললে আমারে সবাই খারাপ বলে।” – চিৎকার করে কথা গুলো বলছে হারাধনের স্ত্রী।

দাঁতের উপর দাঁত রেখে গর্জে উঠে সাধন। সুনীতি দিকে ক্ষিপ্ত হয়ে বলে -“তোকে আমি দেখে নিবো। কার কথায় আমার সংসারে এই অশান্তি ডেকে আনলি তুই। তোকে কে বুদ্ধি দিচ্ছে। হাত পা ভেঙ্গে দিব।”

অনিল মহাজন উজ্জ্বলকে সবার সামিনে ডাকে। জিজ্ঞাস করলো – “কিরে তোর বউ কি কয়?”

উজ্জ্বল উত্তর দেয়ার আগে শ্যামল দেবনাথ উঠে দাঁড়ায়। বলে- “আমার একটা কথা আছে।”
“কি কথা?” – জিজ্ঞাস চোখে তাকায় অনিল মহাজন।

শ্যামল বলে- “উজ্জ্বল যে অর্চনা বৌদির সাথে ঘুমায় এই কথার প্রমাণ কি? কেউ দেখছে নাকি মুখের কথা?”

কেউ কিছু বলার আগে দূর থেকে চিৎকার করে হারাধনের স্ত্রী – “মাগী চুদতে কেউ দেখে নাকি? সবাই তাকে মাগী ডাকে কেন?”

চিৎকার চেচামেচি তে সেদিনের বৈঠক আর বেশিদূর যায় নি। সুরেশ মাস্টার সুনীতি কে ডেকে বলেন -“তোমার মা বাবা কে নিয়ে এসো আগামী সপ্তাহে। তোমার বাবা মা আসলে তারপর বিচার হবে।”

বৈঠক শেষ হয়। সবার সাথে ফজর আলি উঠে আসে উঠোনে । হাসতে হাসতে বলে -“সুরেশ দা, যাওয়ার সময় মজুমদার বাড়ির মাটি অল্প নিয়ে যান। দুর্গাপূজা আসতেছে কয়েকদিন পর। কাজে লাগবে।”

এর পর অনেক বার মজুমদার বাড়িতে বৈঠক বসেছে। সব সময় শ্যামল উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাস করে – অর্চনা যে উজ্জ্বলের সাথে ঘুমায়, কে দেখেছে? প্রমাণ কী?
এভাবে একসময় অসমাপ্ত সিদ্ধান্তে বৈঠক বসা বন্ধ হয়।

(৭) মাইজগ্রামে একমাত্র পুকুর সেনপুকুর। আকারে দিঘির মত। পশ্চিম দিকে প্রসস্থ সান বাঁধানো ঘাট। দীর্ঘকাল ধরে এই গ্রামের সবাই এই পুকুর স্নান করে সকাল দুপুর।

সেদিন ছিল শনি বার– দুপুর বেলা। প্রতিদিনের মত স্থান করতে পানিতে নামে অর্চনা। আসেপাশে গ্রামের আরো অনেক মহিলা। অর্চনা ডুব দিয়েছে পানিতে। অনেক সময় পর চিৎকার দিয়ে দৌড়ে উপরে আসে। একটু পর অজ্ঞান হয়ে শুয়ে থাকে ঘাটে। তার দুচোখ রক্তজবার মত লাল চুল এলোমেলো। হাতে পিতলের কৃষ্ণ মূর্তি। সবাই ধরে কোলে করে বাড়ি নিয়ে যায়। উজ্জ্বল ডাক্তার নিয়ে আসে বাড়িতে। সব দেখে ডাক্তার কোন সমস্যা বুঝলো না।

তখন থেকে অর্চনা চুপচাপ বসে আছে। সব দেখে রাতে সাধন মজুমদার সবাই কে ডেকে বলে অর্চনার শরীরে কৃষ্ণর ছোঁয়া লেগেছে। মন্দির স্থাপন করা দরকার। চারদিকে উলুধ্বনি শোনা গেলো। শ্যামল দেবনাথ বাজালো শঙ্খ। তারপর থেকে রোজ সকাল সন্ধ্যা মজুমদার বাড়িতে অর্চনাকে ঘিরে পূজা বসে। প্রসাদ আর চরণামৃত নিয়ে আসে। অর্চনা কিছুক্ষণ পর পর “হরে কৃষ্ণ” বলে আওয়াজ করে।

আজ মজুমদার বাড়িতে মন্দির স্থাপন করা হচ্ছে। এই উপলক্ষে অষ্টপ্রহর নাম কীর্তন। চারদিকে ব্যস্ততা। সুরেশ মাস্টার, অবনী সেন, অনিল মহাজন, বনমালী দত্ত– সবার আর্থিক সহযোগিতায় আজকের এই নাম কীর্তন ও মহোৎসব। সবাই এদিক সেদিক ব্যস্ত। সবার মাঝে অজানা আনন্দে দৌড়াচ্ছে পাঁচ বছরের মা- হারা মেয়ে টুনি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “টুনি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 + = 23