এক ব্যারিস্টার ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা

কিছুক্ষণ আগে ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন নামের একজন ভদ্রলোকের ২ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও লক্ষ্য করলাম। যেখানে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন কর্মকর্তার স্ত্রী প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে আজকে রবিবার রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন।

(প্রথম)
এই কথিত ব্যারিস্টার বক্তব্য শুরু করেন এভাবে- ট্রাম্পের নিকট প্রিয়া সাহার উল্লেখিত ৩ কোটি ৭০ লক্ষ সংখ্যাটি রাষ্ট্রদ্রোহের সামিল। একটি সংখ্যার কারণে কারো বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা কি যৌক্তিক? একজন অশিক্ষিত মানুষ খুব সহজেই যে কাউকে ধর্ষক কিংবা দেশদ্রোহী খেতাব দিতে পারেন কিন্তু একজন ব্যারিস্টার যদি শুধুমাত্র একটি সংখ্যার ভিত্তিতে কারো বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহের সামিল হিশেবে চিহ্নিত করে থাকেন তাহলে সেই ব্যারিস্টার রাষ্ট্রের জন্যই বিপদজনক। কারণ তিনি নিজ স্বার্থসিদ্ধি লাভের জন্য যে কাউকে যে কোন কর্মকান্ডে ফাঁসিয়ে দিতে পারেন।

(দ্বিতীয়)
ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, “স্বয়ং ইউএসএ’র আমাদের যিনি যুক্তরাষ্ট্রের যিনি এম্বাসেডর উনি বলেছেন যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হচ্ছে গিয়ে বাঙলাদেশ। বাঙলাদেশের একজন সিটিজেন হয়ে এমেরিকার মতন জায়গায় গিয়ে এরকম একটা জায়গায় বাঙলাদেশের এইরকম ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য যে বক্তব্য দিয়েছেন এইটা আমি মনে করি শুধু ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ না এটা রাষ্ট্রদ্রোহের অ্যাবং (এবং) বাঙলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এই জন্য আমি ব্যারিস্টার হিশেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি রবিবারে, রবিবারে কোট (কোর্ট) খুলার সাথে সাথে উনার বিরুদ্ধে আমি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বাঙলাদেশের ইমেজ ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগে আমি আগামী রবিবার উনার বিরুদ্ধে মামলা করবো।”

একজন ব্যারিস্টার হয়ে তিনি কীভাবে চলিত ও সাধু ভাষার মিশ্রণে এবং ইংরেজি ও বাঙলার কুৎসিত বিকৃতিকরণে এবং অশুদ্ধ বাঙলা উচ্চারণে, সেইসাথে অশুদ্ধ বাঙলা ব্যাকরণে যেই বক্তব্য রেখেছেন তা মাধ্যমিক ফেল করা ছাত্রের সাথে খুব বেশি পার্থক্য নেই। একজন ব্যারিস্টার হয়ে যিনি শুদ্ধভাবে নিজের মাতৃভাষা বলতে পারেন না এবং একটি বাক্য শুদ্ধভাবে গঠন করতে জানেন না-তিনি আজকে আমাদের দেশের একজন আইনজীবী!

একজন ব্যারিস্টার যদি যুক্তি দিয়ে থাকেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এম্বাসেডর বলেছেন যে, বাঙলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এর মানেই হল- বাঙলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ! কোন যুক্তিপ্রমাণের প্রয়োজনই নেই। একজন মানুষ বলেছেন এই কারণেই তা সত্য। একজন ব্যারিস্টারের কাছ থেকে মাধ্যমিক ফেল করা শিক্ষার্থীর মতন নিম্নমানের যুক্তি শোনা হাস্যকরই নয় বরং ভয়ংকর। যেহেতু একজন ক্ষমতাশালী মানুষ বলেছেন সেহেতু তথ্য উপাত্তের কোন প্রয়োজন নেই। এটাই সত্য।

(তৃতীয়)
ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, “দুদকের কর্মকর্তার বউ হয়ে তিনি কীভাবে বললেন তার সব জায়গা জমি পুড়ে দেওয়া হয়েছে।” অর্থাৎ, এই কথিত ব্যারিস্টার জানেনই না যে, ০২ মার্চ ২০১৯ ভোর রাতে সন্ত্রাসীরা প্রিয়া সাহার পিরোজপুর জেলার নজীরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের চরবানির গ্রামের বাড়ি পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে বসতবাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়। একজন ব্যারিস্টার হয়ে তিনি কোন তথ্য সংগ্রহ না করেই কীভাবে লাইভ ভিডিও করার দুঃসাহস দেখাতে পারেন তা আসলেই দুশ্চিন্তার বিষয়।

(চতুর্থ)
ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, “যেখানে বাঙলাদেশ হচ্ছে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটা মানে ‘প্রকৃষ্ট’ উদাহরণ।” প্রকৃষ্ট উচ্চারণ করতে গিয়ে তার দাঁত ভাঙার মতন অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু এখানে প্রকৃষ্ট শব্দটি ব্যবহার করা হল কেনো? শব্দটি হতে পারতো ‘উৎকৃষ্ট’ উদাহরণ। কিংবা ‘প্রকৃত’ উদাহরণ। ‘প্রকৃষ্ট’ ভিন্ন অর্থ বহন করে। প্রকৃষ্টের স্ত্রীবাচক ‘প্রকৃষ্টা’। ইংরেজিতে Excellent, Prominent. এই যদি হয় ব্যারিস্টার হওয়ার নমুনা তাহলে বাঙলাদেশ আইনব্যবস্থার উপর মানুষের ভরসা বেশি দিন আর থাকবে না।

(পঞ্চম)
ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন অসংখ্যবার উল্লেখ করেন যে, বাঙলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। অথচ শেষের দিকে তিনি বলেন, “মুসলমানদের নামাজে যেখানে হিন্দু ভাইরা পাহারা দেন… এবং হিন্দুদের আমরা যেখানে প্রোটেকশন দেই এই রকম ভাবে মাইনরিটিদের সাথে সুসম্পর্ক স্বয়ং ইন্ডিয়াতেও নেই।”
বর্তমানে বাঙলাদেশ যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হয়েই থাকে তাহলে হিন্দুদের কেনো প্রোটেকশন দিতে হবে? প্রোটেকশন যদি দিতেই হয় তাহলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হল কীভাবে? যদি ধরেও নেই বাঙলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল ভূমি, তাহলে প্রতিবছর মন্দির ভাঙার ঘটনা ঘটে কীভাবে? কীভাবে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জমি দখল করে নেওয়া হয়? প্রতিবছর কেনো দূর্গাপূজা শুরুর আগে প্রতিমা ভাঙচুরের কাহিনী ঘটে? ১৯৭১ সাল থেকে আজ অব্দি মসজিদ ভাঙার ঘটনা কি ঘটেছে? কিন্তু মন্দির ভাঙার ঘটনা প্রতিবছরই ঘটে থাকে।

(ষষ্ঠ)
একজন ব্যারিস্টার কীভাবে তথ্য উপাত্ত, পরিসংখ্যান, প্রমাণ ছাড়া উঁচু গলায় কথা বলার দুঃসাহস দেখাতে পারে?

সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন,

আপনি যেমন বাঙলায় দূর্বল, ঠিক তেমনই হয়তো প্রিয়া সাহার ইংরেজি দূর্বল। এই কারণে প্রিয়া সাহা ‘Since 1947’ ব্যবহার করেন নি, ঠিক যেভাবে আপনি মাত্র ২ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে অগণিতবার ভুল ও অশুদ্ধ বাঙলায় কথা বলেছেন। সেইসাথে আপনি প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে মিথ্যে বলার অভিযোগ তুলেছেন, ঠিক একইভাবে আপনার ২মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে আপনি তথ্যপ্রমাণ, পরিসংখ্যান না দেখে ও জেনে কয়েকটি ভুল বা মিথ্যে বলেছেন। এই কারণে কি আপনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হবে? প্রিয়া সাহার থেকে আপনি বেশি অপরাধী কারণ আপনি ব্যারিস্টার হওয়া সত্ত্বেও ভুল বা মিথ্যে তথ্য প্রকাশ করে সাধারণ জনগণকে ক্ষুব্ধ করার চেষ্টা চালিয়েছেন। এই কারণেও কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

দয়া করে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আরিফ রহমানের ‘দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলা এবং বিলুপ্ত-প্রায় হিন্দু সম্প্রদায়’ লেখাটি পড়বেন। তাহলে জানতে পারবেন ১৯৬৪-২০১৩ পর্যন্ত কতো কোটি হিন্দু দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল। এবং ১৯৪৭-১৯৬১ পর্যন্ত শাহরিয়ার কবিরের অসংখ্য গবেষণায় লিপিবদ্ধ আছে। সেইসাথে সরকারীভাবেও লিপিবদ্ধ আছে। এবং বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, ইউটুইবে ইউএস সিনেটরের ভিডিওটি দেখবেন ও শুনবেন। “49 Million Hindus Missing from Bangladesh – US voiced for it but India is Silent!” এখন আবার উত্তেজিত হয়ে ইউএস সিনেটরের নামে মানহানির মামলা দিবেন না।

আর একটি কথা! বাইরের দেশে গিয়ে বাস্তব সত্য ও ঘটনাবলী প্রকাশ করা যদি রাষ্ট্রদ্রোহীতার সামিল হয়ে থাকে তাহলে বাঙলাদেশের শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, সজীব ওয়াজেদ জয়, তারেক জিয়াসহ অনেক রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় কারাগারে বন্দি থাকতো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “এক ব্যারিস্টার ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা

  1. সৈয়দ ছায়েদুল হক সুমন বেশ কবার বলেছেন ঐ ফেসবুক একাউন্ট তার নয়। কে বা কারা খুলেছে তা তিনি জানেন না। তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট এই যে, প্রিয়া সাহার বাড়ি যেখানে সেখানো কোন বাড়ি আগুনে পোড়ানো হয়নি।
    পিরোজপুরে তার বাবার বাড়ি তথা ভাইদের সাথে প্রতিবেশি হিন্দু ও মুসলমানদের জমি নিয়ে বিরোধ আছে। কথিত যে, প্রিয় সাহার ভাইরা নিজেদের একটা অব্যবহৃত ঘরে নিজেরা আগুন দিয়ে প্রতিবেশিদের নামে মামলা দিয়েছে। আর যে জমি নিয়ে বিরোধ চলছে, তার দাবীদার ২ পক্ষ, তা নদীতে ভাঙার পর চর পড়েছে ৩-জেলার সীমান্তে। এমন জটিল জমির ভাগ বাটোয়ার কেবল প্রিয়া সাহার নয়, মো: আ: কাদেরদের জন্যই। আমি মুসলিম পরিবারের সন্তান। আমাদের জমি নিয়ে ২০-বছর যাবৎ কেস চলছে। যায়গা জমির কেস প্রিয়া সাহার ইচ্ছাদে ২/১ দিনে এদেশে শেষ হয়না। যুগ যুগ চলে। সব জেনে কথা বলা উচিত। প্রিয়া সাহা নিশ্চিত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটা সন্ত্রাসি দেশের কাছে মিথ্যে কথা বলেছে।

  2. সৈয়দ ছায়েদুল হক সুমন বেশ কবার বলেছেন, ঐ ফেসবুক একাউন্ট তার নয়। কে বা কারা খুলেছে তা তিনি জানেন না। বাংলাদেশে যে কেউ যে কোন ব্যক্তির নামে ভুয়া একাউন্ট খুলে যা তা বলতে পারে।

    তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট এই যে, প্রিয়া সাহার বাড়ি যেখানে (স্বামীর বাড়ি যশোর) সেখানে কোন বাড়ি আগুনে পোড়ানো হয়নি। পিরোজপুরে তার বাবার বাড়ি তথা ভাইদের সাথে প্রতিবেশি হিন্দু ও মুসলমানদের জমি নিয়ে বিরোধ আছে। কথিত যে, প্রিয় সাহার ভাইরা নিজেদের একটা অব্যবহৃত ঘরে নিজেরা আগুন দিয়ে, প্রতিবেশিদের নামে মামলা দিয়েছে। আর যে জমি নিয়ে বিরোধ চলছে, তার দাবীদার ২-পক্ষ, তা নদীতে ভাঙার পর চর পড়েছে ৩-জেলার সীমান্তে। এমন জটিল জমির ভাগ বাটোয়ারা কেবল প্রিয়া সাহার নয়, মো: আ: কাদেরদের জন্যও জটিল। আমি মুসলিম পরিবারের সন্তান। আমাদের জমি নিয়ে ২০-বছর যাবৎ কেস চলছে। যায়গা জমির কেস প্রিয়া সাহার ইচ্ছেতে ২/১ দিনে এদেশে শেষ হয়না, যুগ যুগ চলে তা সবার জানা। সব জেনে কথা বলা উচিত। প্রিয়া সাহা নিশ্চিত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটা সন্ত্রাসি দেশের কাছে মিথ্যে কথা বলেছেন। যে সন্ত্রাসি দেশটি রোহিঙ্গাসহ নানাবিধ অজুহাতে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করতে চায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − 94 =