জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-81

জীবন ট্রাক কৈশোর থেকে পৌঢ়ত্ব : পর্ব-১

:

রাস্তায় জেলে কৃষাণ ছেলেদের সাথে মার্বেল খেলছিলাম ধুলো মাটিতে। বুয়েট পড়া ফিউচার ইঞ্জিনিয়ার ভাই এটা দেখেই ঘাড় ঘুরিয়ে এলো আমাদের দিকে। চোখ গরম করে বললো

– তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে! স্কুলে যাবো তোকে নিয়ে!

আমি ঘাড় ত্যাড়া করে বললাম

– সবুজ সাথীর সব পড়া আমি পারি, তো স্কুলে গিয়া কি করবো?

– সেটা বুঝবি স্কুলে গেলে, চল কুইক!

ভাইকে ভালবাসতাম প্রচন্ড! সাথে সাথে ভয়ও করতাম। তাই লুঙ্গিটা খুলে ঝুপ করে লাফ দিলাম ভরা খালে, মানে গোসল করা। ভাই বললো

– তাড়াতাড়ি ওঠ, এখনই যাবো!

আমি ডুবের পরে ডুব দিতে থাকলাম। ভাই খালের পাকা শান বাঁধানো ঘাটে বসে তাড়া দিতে থাকলো ক্রমাগত। অবশেষে আমার এক ঘন্টার স্নান শেষ করতে হলো পাঁচ মিনিটে। লুঙ্গি পরে বাড়ি এলাম। ভাই বললো

– ইংলিশ প্যান্ট পর্! লুঙ্গি পরে স্কুলে যাবি জলদাসদের ছেলের মত?

– তাতে কি! সারাদিনতো লুঙ্গি পরেই থাকি!

ভাইর চাপাচাপিতে তার ঢাকা থেকে নেয়া ইংলিশ প্যান্ট পরলাম। পকেট দুটোতে হাত ঢুকিয়ে বললাম – “চলো”!

আমার মার্বেল খেলার সঙ্গীরা তাকিয়ে রইল আমার সাহেবি পোশাক দেখে। তাদের সামনে দিয়ে পকেটে দুটো হাত ঢুকিয়ে ভাইর পিছু পিছু চললাম গাঁয়ের পুরনো, বড় ও একামত্র হাইস্কুলের দিকে। এ স্কুল থেকেই ভাই অনেক বছর পর এইটে বৃত্তি পেয়েছে, মেট্রিকে প্রথম বিভাগে পাশ করেছে, এখন বুয়েটে পড়ে। তাই তাদের মুখ উজ্জ্বলকারী হিসেবে সব টিচাররা ভাইকে খাতির করে খুব! সুতরাং তার ছোট ভাই আমি! তাকেও তো কিছুটা খাতির করবেই। আমাকে নিয়ে ভাই প্রাইমারি শাখার হেড স্যারের রুমে ঢুকলেন। আমি বাকবাকুমসহ প্রথম পাঠ বইর সব বলে দিলাম কুটুস কুটুস করে। এমনকি পাঁচ যোগ চার যে নয় হয়, তাও বলতে পারলাম। স্যার বললেন

– শাহজাহান! তোমার ছোটভাই দেখি ওয়ানের সবই পারে! টুতে দেবে নাকি?

– স্যার! সম্ভবত ও টুর পড়াও সব পড়েছে পাশের বাড়ির বই থেকে!

হেড স্যার টুর বই থেকে প্রশ্ন করলেন। শেষে স্যার ও ভাইর যৌথ পরামর্শে আমাকে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হতো হলো। মানে ক্লাস ওয়ান আর টুতে কখনো পড়িনি আমি। ক্লাস থ্রির সবাই বড় বড় লম্বা। আমিই একমাত্র ছোট বল্টু।

:

ক্লাস ফাইভের বছর একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ। তাই সিক্সে উঠলাম কোন ক্লাস না করেই। মানে যুদ্ধের পুরো সময়টা বনবাদারে, নদী খাল বিলে আর মার্বেল খেলে কাটালাম। তারপর পেলাম অটো প্রমোশন। এইটে উঠেই সোভিয়েত কালচারাল সেন্টারের সাথে যোগাযোগ হলো আমার। তারা আমার স্কুলের ঠিকানায় আমার নামে রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠাতো বাংলা ভাষার সোভিয়েত ইউনিয়ন, সোভিয়েত নারী, উদয়ন আর যুববার্তা। প্রগতি প্রকাশন, যুবভরি বুলভার, মস্কো থেকে কত বই পুস্তক যে আসতো আমার নামে তার ইয়ত্তা নেই। একবার এলো বিশাল এক প্যাাকেট। খুলে দেখি তাতে “বাংলা রুশ বাংলা অভিধান”। কাপড়ে বাঁধানো ঐ অভিধান পেয়ে কি যে খুশি হয়েছিলাম, তা এখনো ভাষায় প্রকাশ অসাধ্য আমার!

:

আমার প্রায় সব সহপাঠী মুখস্ত করতো পাঠ্যবই। অনেক স্যারই বইর মত মুখস্ত লিখতে উৎসাহ দিতেন। স্যারেরা বইর মত হুবহু লিখলে পুরো নাম্বার দিতেন। হাবু, ফেরদৌস, মাহেব, নিরঞ্জন, জলিল ও জালাল এ কারণে বাংলা সমাজ ইসলামিয়াতে কখনো ১০০ তে ১০০ পেতো। আমি সব বানিয়ে বানিয়ে লিখতাম বলে কখনো ৮০% এর বেশি পাইনি স্কুল জীবনে। কেবল বাংলা টিচার আমার বানানো লেখাকে উৎসাহিত করতেন। কিন্তু ঐ মুখস্তকারীদের কারণে কখনো পরীক্ষায় ১ম, ২য় বা ৩য় স্থাল লাভ করিনি আমি। এসএসসি পরীক্ষার আগে বাবা ঢাকা থেকে ক্যারোলিন কাপড় আনলেন আমার জন্য। তখন ক্যারোলিন কাপড়ের খুব নাম। দুতিনজনে টানলেও ছেঁড়ে না। তাই অনেক দূরের ঘোলের হাঁটে গেলাম জামা বানাতে। বক্রম ভরা বিশাল কলারের জামা তৈরি করলাম পাঁচ টাকা মজুরীতে। আমার ক্যারোলিন সার্ট সবাইকে দেখানোর জন্য কখনো গেঞ্জি ছাড়া কেবল সার্টটি পড়তাম, যাতে পুরো শরীর দেখা যায়! মানে জামাটি যে ক্যারোলিনের তা সবাই যেন বোঝে। আমার বন্ধুরা প্রায়ই ধার নিতো আমার এ ক্যারোলিনের সার্টটি। মনে আছে শীতের সময় আমার এসএসসি পরীক্ষা হলেও, আমি গেঞ্জি ছাড়া ঐ সার্ট পরে গিয়েছিলাম পরীক্ষা হলে। উদ্দেশ্য দেখানো!

:

উপজেলা সদরের মুসলিম স্কুলে ছিল পরীক্ষা সেন্টার। আমরা গ্রামের স্কুলের ছাত্র। তাই ওখানের ছেলেদের ফুলপ্যান্টের তাপে আমাদের লুঙ্গি বেমানান মনে হলো। মাকে বললাম

– মা ফুলপ্যান্ট না হলে পরীক্ষা দিতে যাবোনা!

– কি বলিস বাবা! এখন ইংলিশ প্যান্ট পরে যা! কলেজে যাওয়ার সময় তোকে ফুলপ্যান্ট বানিয়ে দেব!

এসএসসি পরীক্ষার আগাম রেজাল্টা জানাতে বাদু মামা নিয়ে গেল হাসেম ফকিরের কাছে। সে জ্বীন সাধক। জ্বীনে বোর্ডের রেজাল্ট আগাম বলে দিতে পারে তাদের অশরীরি চোখ দিয়ে। এ জন্য ফকিরের ফি সোয়া চার টাকা। মা তুকতাক মন্ত্রতন্ত্র বিশ্বাস করেনা বলে সোয়া চার টাকা দিলোনা না আমায়। শেষে তাকে তাকে থেকে মোল্লা বাড়ির গরু আর ছাগল খোয়াড়ে দিয়ে জোগার করলাম সোয়া চার টাকা। প্রতিবেশির গরু ছাগল খোয়ারে দেয়াতে, অনেক খেসারত দিতে হয়েছিল আমাকে।

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 82]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 4 =