জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-82

জীবন ট্রাক কৈশোর থেকে পৌঢ়ত্ব : পর্ব-২

:

এসএসসির যখন রেজাল্ট হলো – তখন জলদাস জেলেদের সাথে সমুদ্রে আমি রীতিমত জলদাসপুত্র। ১০ দিন পর নৌকো ঘাটে ভেরাতেই দেখলাম মা নদীতীরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাটির লাল হাঁড়ি নিয়ে। মাকে বললাম

– কি খবর মা! কার বিয়ে! রসগোল্লা কেন?

মা মুখে মিষ্টি গুজে দিয়ে বললো

– খা আগে, তারপর বলি। ৪টা তাজা মিষ্টি খাওয়ার পর জানলাম, কেবল আমিই ১ম বিভাগে পাস করেছি ৮৬-জনের মধ্যে। ১৪-জন ২য় বিভাগ, বাকিরা ৩য়। ঘাটের সব জেলেদের মিষ্টি খাওয়ালেন মা তার নিজ হাতে।

:

মার কেনা ৪০-টাকার সবুজ কালচে প্যান্ট পরে চট্টগ্রাম কলেজে গেলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির ইন্টারভ্যু দিতে। আগ্রাবাদ থেকে চকবাজারের কাছের সরকারি চট্টগ্রাম কলেজে বাস ভাড়া ষাট পয়সা। গাঁয়ের বেড়াহীন ভাঙা স্কুলের ছাত্র আমি, তাই চট্টগ্রাম কলেজের গ্যালারিতে ভর্তি পরীক্ষায় বসে বুক কেঁপে উঠলো। মৌখিক পরীক্ষায় যা যা জিজ্ঞেস করলো স্যারেরা, সব পট পট করে বললাম। সোভিয়েত সয়ুজ নভযানের কথা জানতে চাইলে তা এমন করে বললাম যে, শিক্ষক অবাক হয়ে গেলো। কারণ বিষয়গুলো বিষদভাবে পড়েছিলাম আমি সোভিয়েত পত্রিকাতে। আমি প্রতিদিন বাসে করে কলেজে যেতাম। পোশাকেও একটা গ্রাম্য ভাব ছিল। তাই চট্টগ্রামের বাইকে গাড়িতে কলেজে আসা স্থানীয় ছেলেরা খুব নেক নজরে দেখতো না আমাকে। এমনকি তাদের ভাষা বলতে পারিনা, শুটকি মাছ খাইনা বলে আরো বেশি জ্বলতো আমার প্রতি।

:

পরীক্ষার দুমাস আগে আগ্রাবাদের সরকারি বাসা ছেড়ে ইঞ্জিনিয়ার ভাই চলে যান সৌদি আরব কিং আব্দুল আজিজ ভার্সিটিতে। সুতরাং আমাকেও চলে আসতে হলো মায়ের কাছে আবার সেই গাঁয়ে। আগ্রাবাদ কলোনির প্রতিবেশি এক বাসাতে মা কথা বলে আসেন যে, এইচএসসি পরীক্ষার কদিন তাদের ড্রয়িং রুমে থেকে পরীক্ষা দেব আমি। পরীক্ষার দুদিন আগে আমার দ্বীপগাঁ থেকে বইপুস্তক খাতা কলম নিয়ে লঞ্চে রাত দুটোয় নামি চাঁদপুর স্টেশনে। সারারাত লঞ্চ স্টেশনে কাটিয়ে ভোরে চট্টগ্রামের লোকাল ট্রেনে উঠে বসি আগ্রাবাদ যেতে। কথিত বাসায় পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে যায় আমার। আগামি দিন পরীক্ষা। মার কথা বলা বাসাতে উপস্তিত হলে, তাদের বাসায় রাখার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করে তারা। নানাবিধ নাস্তা দেয় আমার সামনে প্রাক্তন প্রতিবেশি হিসেবে। কিন্তু রাগে কিংবা অভিমানে কিছু মুখে না দিয়ে একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে চলে যাই পাহাড়তলি বন্ধু আলী আজমের মেসে। আলী আজম পড়তো আমার সাথে। বাড়ি ছিল লাকসামের ছোট শরীফপুর। থাকতো পাহাড়তলী। দুদিনের জার্নিতে এতো ক্লান্ত ছিলাম যে, ঐ মেসে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙে সকাল ৭-টায়। কোনরূপ বই ধরা ছাড়া ১ম দিনের পরীক্ষা শেষ করি আমি।

:

প্রথম দিনের পরীক্ষা শেষে অপরিচিত চট্টগ্রাম কলেজে হোস্টেলে চলে যাই। হোস্টেল সুপার স্যারকে আমার সমস্যার কথা বললে, তিনি আমাকে একটা সিট দেন পরীক্ষার কদিনের জন্য। ঐদিন বিকেলেই পাহাড়তলী থেকে সব জিনিসপত্র নিয়ে কলেজ হোস্টেলে চলে আসি। সব খবর জানিয়ে ডাকে পত্র দেই মাকে। তিনি অতিরিক্ত ৪০০-টাকা মনিঅর্ডার করেন আমার হোস্টেলের নুতন ঠিকানায়। পরীক্ষা শেষে চট্টগ্রাম – বরিশালের সমুদ্রগামী জাহাজ আব্দুল মতিনে উঠে বসি একাকি। সন্দীপের কাছে গেলে জাহাজ আটকে যায় চরায়। ৩-দিন জাহাজ আটকে থাকে সাগরে। ৪র্থ দিন জোয়ারে চলতে শুরু করে জাহাজ। এ ৩ দিন জাহাজের সব খাবার শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই ছোট সাম্পান জাতীয় নৌকোতে সন্দীপ গিয়ে খাবার কিনে আনতে হয় আমাদের। ৪ দিন পর ঘরে ফিরি ধুসর মুখো বান্দরের চেহারা নিয়ে!

:

অনার্সে ভর্তি হই জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটিতে ভূগোল বিভাগে। মা শুনে কেঁদে বলেন, তোর নামে আবার ভার্সিটি আছে নাকি? গ্রামের মধ্যে এইটা আবার কেমন ভার্সিটি। জেলা শহরও না। সাভার নামক গ্রামে ভার্সিটি। বাবা মিথ্যে বলিসনা, তুই ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে কলজেটা জুড়া আমার রে সম্রাট! মাকে বললাম

– চিন্তা করোনা মা! ঢাবিতে ভর্তি হওয়া আমার ওয়ান টুর ব্যাপার!

কিন্তু ঢাবিতে ভর্তি না হয়ে মাকে না বলে আকস্মিক বাহরাইন সিকিউরিটি ফোর্স মানে পুলিশ বাহিনিতে চলে গেলাম আমি। ছমাস প্রশিক্ষণ নিলাম বুছাইথিনে। ফ্রান্সের স্টারলিং অস্ত্র চালনা শিখলাম। রফাতে রাজা শেখ ইসা বিন সালমানের দেহরক্ষির কাজ করলাম দুবছর। আকস্মিক পুলিশের একসেট ড্রেস, ৪০ হাজার টাকায় জাপানি একটা কালার টিভি ও ৮৭-হাজার টাকায় বেটামেক্স একটা ভিসিআর কিনে চলে এলাম ঢাকা। বিদ্যুৎহীন গ্রামে মাকে টিভি ভিসিআর দেখাতে নবাবপুর রোড থেকে ৩০-হাজার টাকায় জেনারেটর কিনে সবসহ উঠে বসলাম দ্বীপগাঁ যেতে ভোলার দ্বিতল লঞ্চে।

:

সবকিছু মার কাছে রেখে এবার ভর্তি হলাম বাংলা বিভাগ ঢাকা ভার্সিটিতে। মাকে খুশি করতে বাংলা সাহিত্যে পড়লাম, ভাষাতত্ত্বে পড়লাম আর পড়লাম এডুকেশনে ইন্সটিটিউট অব এডুকেশন এন্ড রিচার্সে। একদিন কলাভবনে নোটিস বোর্ডে টানানো দেখি, অনার্সে ভাল রেজাল্টের জন্য মাসে ২০০ টাকা বৃত্তি পেয়েছি আমি। নোটিসটা খুলে নিয়ে ছুটির সময় চলে গেলাম মায়ের কাছে। বললাম

– মা, দেখো তোমার জন্য কি গিফট এনেছি!

২০০ টাকা বৃত্তির খবর জেনে মা এক সের ঘন দুধ ক্রিমসহ খেতে বাধ্য করেছিল আমায়। ভার্সিটির সব রেজাল্ট ভাল হলে মা আমাকে কানাডা পাঠাবে এমন কথা দিলেন। স্নাতকোত্তর সব পরীক্ষা শেষ হলে জেদ্দা প্রবাসী ভাইকে মা আদেশ দিলেন, তার ছোট ছেলেকে যেকোনভাবে কানাডা যেন পাঠানোর ব্যবস্থা করে সে। মায়ের আদেশ মানবেনা এমন সাহস ভাইর ছিলনা কোনদিন, হোক সে যত বড় ইঞ্জিনিয়ার। তাই আমাকে নিয়ে গেলো সে সৌদি আরব। প্লান ওখান থেকে এক আরবির সাথে কানাডা পাঠাবে আমাকে। কিন্তু কানাডা যাওয়া হলোনা আমার। প্রায় ৮-বছর সৌদি থেকে একটা কলেজে শিক্ষকতা করে, দুতিনশবার ওমরা, আর ৩-বার মা, বাবার সাথে হজ্জ করে, চীন তাইওয়ানের সাথে বৈদেশিক ব্যবসা করে আবার ফিরে এলাম বাংলাদেশে। কিন্তু তখন মা আর নেই!

:

এসব জীবনের কথা চিন্তা করলে আমার হৃদয়ে মৃত্যুর প্লাবন ডাকে প্রায়শই। মাকে ছাড়া মনে হয় এ জীবন যেন – আবছায়া জীবন, আবছায়া সমুদ্রের নোনা জলের ক্লেদে ভরা। এ জগতে কতনা বাস্তুচ্যুত জীবনের বেলা অবেলা কালবেলার গুণ-গুণ শুনেছি হৃদয় ছুঁয়ে কিন্তু মা ছাড়া কি কাংখিত এ জীবন! আসলে কৈশোর থেকে আজ পৌঢ়ত্বের এ জীবন যেন আমাদের ভুলে যাওয়া স্বপ্নছটা প্রতিভার মাতন্ডে নাচা এ মুখোশ! এখানে মানবিক মানুষের নক্ষত্রপথের অন্তঃশূণ্যে হেঁটে যাওয়া পথ ছাড়া আর কি কিছু আছে! আমাদের জীবনের এসব অন্ধ হিম শীতলেরা কই থাকে আর কই চলে যায় তা আজও জানলাম না। এখনো দিন শেষের আলোকিত চাঁদ নিঃস্বত্ব সূর্যকে লুফে নেই জীবনের দিকে বার বার কিন্তু ভালবাসার স্বচ্ছল শাণিত নদীর নীল কাকচোখা জল কই পাবো আমি! যে জলে আমাদের জীবনের ক্লান্তিহীন উৎসানলগুলো জেগে থাকতো সারাদিন সারারাত! যার মাঝে থাকতো মা! আমার মা!

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 83]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =