হায়রে! বাঙালির মোবাইল ফোন

আমারে মাইরেন না ও ভাই, আমি ছেলেধরা না,আমার দুইডা বাচ্চা আছে। কিন্তু মুহুর্মুহু রব উঠছিলো,”মার, মাইরা হালা” কয়েকটা নামও শোনা যায়,” জয়েন/জন মার।”(সম্পূর্ণ ভিডিওটিতে শোনা যায়)

প্রকৃতপক্ষে, এই মহিলাই ৪ বছরের এক শিশুর মা, যাকে ভর্তি করাতেই স্কুলে খোঁজ নিতে এসেছিলেন । যখন মহিলাকে হেডমিস্ট্রিজের ঘর থেকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলো নিচে তখনো এই কথাই বলছিলেন। মানুষের পৈচাশিক প্রবৃত্তি তাতে মানেনি, কানে তোলেনি, বিশ্বাসও করেনি। হয়তো মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ জমা হয়েছে দেশের বর্তমান চলমান অবিচার ও অস্থির পরিস্থিতি নিয়ে, তার থেকেই এ ‘ক্যাটাস্থেসিস’ প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে- অন্যকে মারতে দেখে নিজের গায়ের জ্বালা মেটাবার জঘন্য প্রবণতা। স্কুলের লনের পাশে যখন মারছিলো তখনো হুঁশ ছিলো হয়তো মহিলার। বারবার শোনা যাচ্ছিলো “মাইরা ফেলা, গলা ধর, গুঁড়া কইরা দে।”

মহিলাকে ধরে যখন জনগণের ভীড়ের মধ্যে ফেললো তখনো হয়তো জ্ঞান ছিলো, মাটিতে শুয়ে হাত জোর করে একই কথা বলছিলো। কিন্তু কেউ লাঠি, কেউ মোবাইল ফোন হাতে ছুটে যায়-ভাইরাল ইভেন্ট করতে। ভীড়ের মধ্যে মব’স সাইকোলজি (ক্রাউড সাইকোলজি) ট্রিগারড হয়। লি-বন ও ফ্র‍য়েডীয় মতে এ অবস্থায় মানুষ তার নিজস্বতা ও দ্বায়িত্ববোধ হারিয়ে ইউনিটের মতো ভীড়ের সাথে চালিত হয় – শুদ্ধাশুদ্ধ বিবেচনা না করেই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মার খেয়ে অজ্ঞান হবার পরে মানুষের মধ্যে – যে প্রবৃত্তি দেখি(ভিডিও ক্লিপে) তাতে মানুষকে মানুষ বলার কোনো বাস্তবসম্মত যুক্তি খুঁজে পাই না, মানুষের আদলে পোশাক পরা পিশাচ বরং অধিকতর মানানসই মনে হয়। মহিলা তখন মারের দাপটে অজ্ঞান, এই অচেতন অবস্থায়ই – কেউ বলে শিরায় মার, কেউ বলে হাতে মার, আঙুল ভাঙ- বুকে মুখে কোথাও উপর্যুপরি বাদ যায় না- এই আমাদের বর্তমান যুব সমাজ। কয়েকজন প্রত্যক্ষ হয়ে অংশগ্রহণ করে, বাকিরা দেখেই উল্লসিত হয়, নারকীয় উল্লাসে ফেটে পড়ে, এরিস্টটলীয় ‘ক্যাটাস্টেথিস সূত্র’ এর যথাযথ প্রায়োগিক রুপ। কুকুর কিংবা বিড়াল অথবা ইতর ক্ষুদ্র প্রাণী মেরে মানুষ মাঝেমধ্যে যেমন পিশাচসুলভ চরিত্র চরিতার্থ করে, এ বাস্তবতা তার থেকেও জঘন্যরকম দৃশ্যে মঞ্চস্থ হয়েছে। লোকজন মুখ বুকে পাড়া দিয়ে যায়, কারো হাসিও শোনা যাচ্ছিলো, তারা উল্লসিত হচ্ছে। একজন আবার বলছে,”পুলিশে দিলে ছাইড়া দিবো।”

শেষে মারার পরে লোকজন ছবি নেয়, সেল্ফি নেয়, কেউ আবার মাথা তুলে ফেস দেখিয়ে ছবি তোলে বিকৃত মুখের। হায়রে! বাঙালীর মোবাইল ফোন।

গত বেশ কিছুদিন ধরেই আমরা ছেলেধরা নিয়ে কানাঘুষো শুনেছি, বেশ কতক ঘটনাও ঘটে গ্যাছে, এমনকি ঠিক আজও অন্যত্র ঘটেছে। কিন্তু আজকে ছেলেধরা সন্দেহে রেণু হত্যার এই ভাইরাল ঘটনার আগে মিডিয়া বা প্রশাসনের বিশেষ কোনো উদ্যোগ দেখিনি। আজ রেণু মারা যাবার পরে শুনলাম পুলিশ প্রশাসন ছেলেধরা নিয়ে বিশেষ বিবৃতি দিয়েছে।

এমন যদি ব্যাপার হয় যে ‘ চোর পালালেই বুদ্ধি বাড়ে’ আর জনগণকে ভিডিও ভাইরাল করে প্রশাসনের টনক নড়াতে হবে তবে প্রশাসনের ইন্টেলিজেন্স স্কোয়াডের কাজটা কি?- আমার মনে প্রশ্ন আসে, আপনারও আসতে পারে। তাদের কাছে হয়তো এর কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। তেমনি আমরাও অনিশ্চিত এই ঘটনার পরে রেণুর ৪ বছরের শিশু মেয়েটির ভবিষ্যত রক্ষার্থে প্রধানমন্ত্রী আবার কতো টাকা ডোনেট করবেন, আগেরবারের ধর্ষণ বা গাড়িচাপা পড়ে শিক্ষার্থী মরার ভাইরাল ইভেন্টগুলোর মতো।
এ জায়গায় দাঁড়িয়ে শুদ্ধতম কবি খ্যাত জীবনানন্দ দাশের কয়েকটি লাইন বড্ড প্রাসঙ্গিক মনে হয়-

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়
মহত্‍‌ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 82 = 84